রিপন শান

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

 

ঊনিশ শতকের ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানরা ছিল সকল পক্ষের দ্বারা শোষিত এক সম্প্রদায়। উপমহাদেশের এক সময়কার শাসকরা ব্রিটিশদের কাছে তাদের শাসন ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি তাদের সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অবস্থাকেও হারিয়ে বসেছিল। ব্রিটিশদের প্রতি তাদের বিরাগ ও তাদের প্রতি ব্রিটিশদের সন্দেহপ্রবণতা পাশাপাশি ব্রিটিশদের সহযোগিতা নিয়ে প্রতিবেশি সম্প্রদায়সমূহের মধ্য থেকে নতুন গড়ে ওঠা পুঁজিপতিরা মুসলমানদের জন্য সামগ্রিক পরিস্থিতিকে প্রতিকূল করে তোলে। এরমধ্যে বাংলার মুসলমানদের অবস্থা ছিল সর্বাধিক শোচনীয়।

এই প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে মুসলমানদের বের করে আনার জন্য যে সকল মহাপুরুষ অগ্রসর হন, মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ তাদের মধ্যে অন্যতম। সাংবাদিকতার জগতে বাঙালী মুসলমানের অবস্থান তৈরি এবং তাদের বক্তব্যকে প্রচারের কাজে তিনি অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন।

১৮৬৮ সালের ৭ই জুন বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বশিরহাট মহকুমার হাকিমপুর গ্রামে এই মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাওলানা আবদুল বারী খাঁ ছিলেন সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভীর জিহাদ আন্দোলনের একজন সক্রিয় সদস্য। এমন পিতার সন্তান হিসেবে মাওলানা আকরম খাঁ শৈশব থেকেই ছিলেন বিপ্লবী মানসিকতার মানুষ।
শৈশবেই তিনি তার পিতা-মাতাকে হারান। কিন্তু তাতে হতাশ না হয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। ১৯০০ সালে তিনি কলকাতা আলীয়া মাদরাসা থেকে এফ. এম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

অল্প বয়সেই মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ সাংবাদিকতা ও রাজনীতির সাথে জড়িত হন। সাংবাদিকতার শুরুতে তিনি ‘আহল-ই-হাদীস’ ও ‘মোহাম্মদী আখবার’ পত্রিকায় কাজ করেন। পরবর্তীতে কলকাতার বিখ্যাত মুসলমান ব্যবসায়ী হা্জী আলতাফের সহযোগিতায় ১৯১০ সালে তিনি ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ নামে এক পত্রিকার প্রকাশ শুরু করেন।

মাওলানা আকরাম খাঁর সম্পাদনায় পত্রিকাটি বাংলা, আসাম সহ ভারত ও বার্মার অন্যান্য স্থানের বাংলাভাষী মুসলমানদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সমালোচনা ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তুর্কি ওসমানী খেলাফতের প্রতি সমর্থন পত্রিকাটি ব্রিটিশ সরকারের ক্রোধের শিকার হয়। ফলে সরকারী আদেশে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

১৯১৩ সালে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর উদ্যোগে বাংলার আলেমদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার মানসে “আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাঙ্গালা” নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। মাওলানা আকরাম খাঁ এই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। পাশাপাশি ১৯১৫ সালে সংগঠনটির মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হওয়া ‘মাসিক আল-এসলাম’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯১৯ সালে তুর্কি ওসমানী খেলাফতের সমর্থনে ভারতে সৃষ্ট খিলাফত-অসহযোগ আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯২০ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় খিলাফত কমিটির মহাসম্মেলনে তিনি কমিটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। একই বছর তিনি উর্দু দৈনিক ‘জামানা’ ও পরের বছর ১৯২১ সালে বাংলা দৈনিক ‘সেবক’ প্রকাশ করেন এবং এই পত্রিকা দুটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। খিলাফত-অসহযোগ আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে এই দুটি পত্রিকা ভূমিকা পালন করে। ১৯২৩ সালের ১০ ডিসেম্বরে দৈনিক সেবকে “অগ্রসর! অগ্রসর!” শিরোনামে এক সম্পাদকীয় লেখার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে। ব্রিটিশ রাজবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে বিচারে তাকে এক বছরের কারাদন্ড প্রদান করা হয় এবং দৈনিক সেবক পত্রিকার প্রকাশনার অনুমতি বাতিল করা হয়।

১৯২৭ সালে মাসিক হিসেবে ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকা নতুন করে প্রকাশিত হয়। মুসলিম সমাজের চিন্তাজগতে সংস্কার সাধন ও ইসলামী মূল্যবোধের প্রচারে মাসিক মোহাম্মদী ভূমিকা পালন করে । এই সময়ে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে সাম্প্রদায়িকতাপূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ ও ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক ‘শ্রীপদ্ম’কে নির্ধারন করার জন্য ভারতীয় হিন্দু নেতৃবৃন্দ দাবী করলে মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয় । এ নিয়ে মাওলানা আকরাম খাঁ মাসিক মোহাম্মদীতে তার লেখার মাধ্যমে মুসলমানদের বিরোধীতার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। মূলত মাসিক মোহাম্মদীতে তার লিখনী মুসলমানদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সচেতনতার জন্ম দেয় । এই সচেতনতার প্রেক্ষিতে তারা ভারতীয় উপমহাদেশে নিজেদের আলাদা আবাসভূমি গড়ে তোলার দিকে অগ্রসর হয়।

১৯৩৬ সালে মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ মুসলিম লীগে যোগদান করেন। একই বছর ৩১ অক্টোবর, ‘আজাদ’ নামে কলকাতা থেকে একটি বাংলা দৈনিক পত্রিকার প্রকাশ শুরু করেন। বাংলা ও আসামের বাঙালি মুসলমানের মুখপত্র হিসেবে পত্রিকাটি বিপুল জনপ্রিয় হয়।

১৯৩৭ সালে তিনি মুসলিম লীগের বাংলা প্রদেশের প্রাদেশিক সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। একই বছর অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের নির্বাচনে পরিষদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। মূলত এসময় তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের কণ্ঠস্বরকে প্রকাশের জন্য সংগ্রাম করেন। একদিকে দৈনিক আজাদের মাধ্যমে তিনি মুসলমানদেরকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন ও স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য উদ্বুদ্ধ করছিলেন, অপরদিকে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ও বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য হিসেবে বাঙালি মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করছিলেন। ১৯৪০ এর দশকে তার নেতৃত্বেই বাঙালি মুসলমানরা ভারতে তাদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ‘পাকিস্তান’ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করলে তিনি ভারতের অধীনস্থ কলকাতা ছেড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় চলে আসেন। একইসাথে ১৯৪৮ সালের দিকে কলকাতা থেকে দৈনিক আজাদ ও মাসিক মোহাম্মদীকে ঢাকায় নিয়ে আসেন।

১৯৫৪ সালে স্বাস্থ্যগত কারনে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন । তবুও দৈনিক আজাদ ও মাসিক মোহাম্মদীর মাধ্যমে ইসলামী মূল্যবোধ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা এবং বাঙালি মুসলমানদের মাঝে সাংস্কৃতিক সচেতনতা তৈরির জন্য মাওলানা আকরাম খাঁ কাজ করে গেছেন।

শুধু সাংবাদিকতা ও রাজনীতিই নয়, মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ ছিলেন একজন সুসাহিত্যিক । ছাত্রজীবনে বাংলা, ফারসী ও উর্দু ভাষায় তিনি কাব্যচর্চা করতেন। তার রচিত বিভিন্ন গ্রন্থের মধ্যে রাসূল (সা.)-এর সীরাতগ্রন্থ ‘মোস্তফা-চরিত’, ‘মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’, ‘সমস্যা ও সমাধান’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি বাংলায় পাঁচ খন্ডে কুরআনের তাফসীর ‘তাফসীরুল কুরআন’ রচনা করেন।

১৯৬৯ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকার বংশালে আহলে হাদীস মসজিদে নামাজরত অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মসজিদ প্রাঙ্গনেই তাকে দাফন করা হয়।মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁর হাত ধরেই বাঙালি মুসলমানের সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি । ব্রিটিশ ভারত ও পাকিস্তানি আমলের অনেক প্রথিতযশা মুসলিম সাংবাদিক মাওলানা আকরাম খাঁর তত্ত্বাবধানেই সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন ।

সাংবাদিকতার মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানদের বক্তব্যকে প্রচারের ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম অগ্রসর হন । সাফকথায়, সাংবাদিকতায় বাঙালি মুসলমানদের পথনির্দেশনা দানে আলোকবর্তিকা হিসেবে যিনি প্রথম এগিয়ে এসেছিলেন ; তিনিই বহুমাত্রিক বাঙালি মুসলিম সমাজচিন্তক মনীষী মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ ।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

বাফার গোডাউন নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ইউরিয়া সার সংরক্ষণের বাফার গোডাউন নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) তত্ত্বাবধানে চলমান এ নির্মাণকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের ফলে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এতে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হন প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী।

জানা যায়, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সুষ্ঠুভাবে সার সংরক্ষণ ও বিতরণ নিশ্চিত করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণকাজ করছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। এই প্রকল্পের ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশায় মার্ক বিল্ডার্স লিমিটেড নামের বাস্তবায়নাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উঠেছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। ৫০ কোটি টাকার এপ্রকল্প নির্মাণে নিম্নমানের বালু, পাথর, ইট ও রডসহ নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই কাজটি চাঁদপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হকের।

নীরব সমাজব্রতী ও শিক্ষানুরাগী আলহাজ্ব আবুল হোছাইন সওদাগর (রহ.) অধ্যাপক মাওলানা এস এম ইউনুছ

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

 

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্গত বাকলিয়া একটি ঐতিহাসিক এবং ঐতিহ্যবাহী জনপদ। এই এলাকাকে কেন্দ্র করে একাধিক ওয়ার্ড এবং একটি প্রশাসনিক থানা। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, ধনী, দরিদ্র শ্রমজীবী ও পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার বহু মানুষের আবাসস্থল বাকলিয়া এলাকা। পূর্ব বাকলিয়ার একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আলহাজ্ব মোহাম্মদ আবুল হোছাইন (প্রকাশ বাংলাদেশ বাণিজ্য ভান্ডার)। চলন বলন আচরণে তিনি একজন নীরব ও নিরহংকার মানুষ ছিলেন। সদা হাসিমাখা চেহারা নিয়ে কথা বলতেন। কখনও কারো সাথে রূঢ় আচরণ করেছেন বলে আমার জানা নেই। তাঁর পিতার নাম মরহুম কালা মিয়া, মাতা মরহুমা মেওয়াজান খাতুন। তিনি স্থানীয় ঘাটকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী শেষ করে কাজেম আলী উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৫৮ সনে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি পরিবারের হাল ধরেন এবং তাঁর মামা দানবীর আহমদীয়া করিমিয়া সুন্নিয়া ফাজিল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব সোনামিয়া সওদাগরের ব্যবসায়িক সহায়ক হিসেবে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন। অত্যন্ত সততা আন্তরিকতা ও দক্ষতার সাথে মামার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে মামার আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন। মামা-ভাগিনার যৌথ প্রচেষ্টায় ব্যবসার পরিধি অধিকতর সম্প্রসারিত হয়। শুটকির আড়ত ব্যবসা ছাড়াও নতুনভাবে আমদানি ব্যবসা এবং শিল্প কারখানা, হাসেম টেক্সটাইল মিলস লি: এবং চম্পা অয়েল মিলস লি: সহ আরও নানাবিধ প্রতিষ্ঠান তিনিই তদারকি করতেন। একযুগেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের পর নিজে আছদগঞ্জ ইসলাম কলোনীর মুখে বাংলাদেশ বাণিজ্য ভান্ডার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে ইমপোর্ট এক্সপোর্ট এবং শীপ ব্রেকিং সহ নানাবিধ ব্যবসার মাধ্যমে প্রভূত উন্নতি সাধন করেন।

ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি তিনি সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখেন। তাঁর সামাজিক ও দ্বীনি কর্মের উন্নত নিদর্শন হচ্ছে বাকলিয়াস্থ আহমদীয়া করিমিয়া সুন্নিয়া ফাযিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা। আলহাজ্ব সোনামিয়া সওদাগর তাঁর পীর ও মুর্শিদ গাউসে জামান শাহসুফি আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি (রহ.) কর্তৃক স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে এ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এই স্বপ্ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মামাকে নানাভাবে উৎসাহ ও উদ্দীপনা দিয়ে উজ্জীবিত করেন এবং ১৯৭৩ সনে প্রথমে তাঁর পীর ও মুর্শিদের নামে আহমদিয়া ফোরকানীয়া মাদ্রাসা চালু করেন। পরবর্তীতে পিতার নামসহ আহমদিয়া করিমিয়া সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসা নামে ১৯৭৭ সনে দাখিল স্তরে উন্নীত করেন এবং বোর্ডের স্বীকৃতি লাভ করেন। মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাকাল হতে সুদীর্ঘ সময় তিনি এই মাদ্রাসার সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। আমি ১৯৮৩ সনে এ মাদ্রাসায় সহসুপার পদে যোগদান করি। উনার অনুপ্রেরণায় ১৯৮৬ সনে অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করি এবং তাঁর ঐকান্তিক সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় ১৯৮৯ সনে এই মাদ্রাসাকে আলিম স্তরে উন্নীত করে ১৯৯১ সনে তৎকালীন মন্ত্রী মরহুম জিয়াউদ্দিন বাবলুর সহযোগিতায় এম.পি.ও ভুক্ত করতে সক্ষম হই।

আমার সুদীর্ঘ ছয় বছর অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে মাদ্রাসার সময়ে এবং দুঃসময়ে তিনি বটবৃক্ষের ছায়া দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করেন এবং কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ রেখেছেন। এর জন্য আমি তাঁর কাছে ঋণী।

বৃহত্তর বাকলিয়া বিভিন্ন শ্রেণি পেশার বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হলেও এলাকাটি শিক্ষা ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ ছিল। আজ থেকে তিন দশক পূর্বে পূর্ব বাকলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ব্যতীত বৃহত্তর বাকলিয়ায় আর কোনো বিদ্যালয় ছিল না। এলাকার মানুষগুলো শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও তারা ছিলেন শিক্ষানুরাগী। প্রায় প্রতিটি পরিবার ছিল একটি মিনি পাঠশালা, প্রত্যেক ঘরে ঘরে লজিং মাস্টার থাকতো। তখনকার দিনে একটি প্রবাদ বাক্য ছিল, “বাকলিয়ার ভাত না খাইলে শিক্ষিত হওয়া যায় না।” বৃহত্তর চট্টগ্রামের অনেক বড় বড় শিক্ষাবিদ বাকলিয়ায় লজিং থেকে শিক্ষিত হয়েছেন। বাড়িতে লজিং মাস্টার রাখা বাকলিয়ার মানুষের পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। শিক্ষায় পশ্চাৎপদ এলাকাকে আলোকিত করতে স্কুল, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা ছিল সময়ের দাবি। এই দাবি পূরণ করার লক্ষ্যে তিনি উত্তর-পূর্ব বাকলিয়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে বাস্তবায়ন কমিটির সম্পাদক ছিলেন আবুল হোছাইন সওদাগর। পরে তা নুরুল ইসলাম বি.এস.সির অর্থায়নে সানোয়ারা উচ্চ বিদ্যালয় নামকরণ হয়। ঐ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি ছিলেন তিনি। এছাড়াও তিনি ঘাটকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি ছিলেন। বায়তুর জমা জামে মসজিদের পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন। পটিয়া বানিগ্রাম হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) জামে মসজিদের প্রধান উপদেষ্টাসহ বহু দ্বীনি, সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

মরহুম আবুল হোসাইন ছিলেন ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত ধার্মিক এবং সামাজিক। সমাজের গরিব দুঃখী-দুস্থ মানবতার সেবায় তিনি সবসময় নিজেকে নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করতেন। তাঁর সক্ষমতা অনুযায়ী সাহায্য সহযোগিতা করতেন। তিনি ধর্মীয় অনুশাসন ব্যক্তিগতভাবে এবং পারিবারিকভাবে যথাযথ পালন করতেন। তিনি হুজুর কেবলা আল্লামা সৈয়দ তৈয়ব শাহ (রহ.)-এর ভক্ত ও মুরিদ ছিলেন। তিনি তাঁর সন্তানদেরকেও ধর্মীয় বিধি-বিধান মেনে চলতে তাগাদা দিতেন। আর্থসামাজিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে তিনি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে না পারলেও তাঁর সন্তানদের সবাইকে উচ্চ শিক্ষিত করেছেন। তিনি মৃত্যুকালে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও ছয় ছেলে এবং অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

বাকলিয়ায় তাঁর জন্মস্থান হলেও সন্তানদের ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা শেখানোর জন্য জীবনের বেশিরভাগ সময় শহরের প্রাণকেন্দ্র আসকারদীঘির পশ্চিমপাড়, নন্দনকানন, জামালখান এলাকায় অতিবাহিত করেন এবং জীবন সায়াহ্নে নিজ এলাকায় পৈতৃক ভিটায় সুরম্য বাড়ি তৈরি করে সুখে সানন্দে শেষ জীবন সম্পন্ন করেন। ২০২৪ সনের ১১ অক্টোবর শুক্রবার রাত ৯.৩০ মিনিটে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মহান আল্লাহ তাঁর জীবনের সকল খেদমতকে কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে উচ্চাসনে সমাসীন করুন আমিন।

মাওলানা এস.এম.ইউনুছ:
সাবেক বিভাগীয় প্রধান
আরবী ও ইসলামি শিহ্মা বিভাগ চট্টগ্রাম কলেজ
চট্টগ্রাম।

আলোচিত খবর

১২ লাখ ৭০ হাজার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ আগামীকাল

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল আগামীকাল শনিবার প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সারা দেশের ১২ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটছে।আগামীকাল সকাল ১১টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ফলাফল ঘোষণা করা হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ফল প্রকাশ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।


অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের সচিব, সকল বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।
উদ্বোধনের পরপরই পরীক্ষার্থীরা একযোগে নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নির্ধারিত ওয়েবসাইট এবং এসএমএসের মাধ্যমে তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল জানতে পারবেন। অনলাইনে https://eduboardresults.gov.bd I https://educationboardresults.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে ফল জানা যাবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ