কুরবানি : আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ও তরিকায়ে মাইজভান্ডারীয়া

লেখক : পীরজাদা সাইফুল্লাহ ফারুকী চরণদ্বীপি

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “নিশ্চয় আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি। অতএব আপনার রবের উদ্দেশ্যেই নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন।” ( সুরা কাউসার, আয়াত : ০১-০২)। আভিধানিক দৃষ্টিকোণ হতে আরবি কুরবুন হতে কুরবানি শব্দের উৎপত্তি যার শাব্দিক অর্থ নৈকট্য অর্জন করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট গৃহপালিত পশু জবেহ করাকে কুরবানি বলে। কুরবানি নিছক আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়, এতে রয়েছে অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, দর্শন ও আধ্যাত্মিকত উৎকর্ষতা।


কুরবানির আধ্যাত্মিকতার প্রথম শিক্ষা হলো মহান আল্লাহর নিকট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ (Total submission to almighty Allah). মহান আল্লাহর নিকট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ এর মূল অর্থ হলো—নিজের ইচ্ছা, ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান, সম্মান এবং জীবনকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর আদেশ ও নির্দেশনার কাছে নিঃশর্তভাবে সমর্পণ করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “প্রত্যেক জাতির জন্য আমি কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে, যে সমস্ত জন্তু তিনি রিয্ক হিসেবে দিয়েছেন তার উপর। তোমাদের ইলাহ তো এক ইলাহ; অতএব তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ কর; আর অনুগতদেরকে সুসংবাদ দাও।’ (সুরা হজ্ব, আয়াত : ৩৪)। আল্লাহর তায়ালার প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের বাস্তব চিত্র প্রতিভাত হয় যখন হজরত ইব্রাহিম (আঃ) স্বীয় প্রাণাধিক সন্তান হজরত ইসমাঈল (আঃ)’কে বলেন, “‘হে প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি, অতএব দেখ তোমার কী অভিমত’; সে বলল, ‘হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’। (সুরা ছাফফাত: আয়াত : ১০২)। যেভাবে হজরত সাইয়্যিদুনা ইসমাইল (আঃ) কোন দ্বিধা দ্বন্দ্ব ব্যতিরেকে আল্লাহর প্রতি স্বীয় প্রাণ কুরবানির দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তারই পদাঙ্ক অনুসরণে মহান আল্লাহর নিকট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ হলো কুরবানির আধ্যাত্মিক প্রধান শিক্ষা।

কুরবানির আধ্যাত্মিকতার দ্বিতীয় শিক্ষা হলো ত্যাগ স্বীকার করা। ত্যাগ স্বীকার বলতে বুঝায় আল্লাহর কাছে প্রতিদান ও ছওয়াব লাভের আশায় কোন মহান ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে সম্পদ, সময় কিংবা জীবন বিসর্জন দেওয়া’। সমগ্র বিশ্বে স্বীয় জীবন উৎসর্গ ও আত্মত্যাগের মহান দৃষ্টান্ত ও আদর্শ স্থাপন করেছিলেন হজরত ইসমাইল (আঃ)। তাঁরই অনুসৃত সুন্নাহ কুরবানি শিক্ষা দেয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে স্বীয় জীবন উৎসর্গ তথা আত্মত্যাগ করা। আল্লাহর পথে উৎসর্গ করার অন্যতম অপর উপাদান হলো অর্থ-সম্পদ। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা কখনোই কল্যাণ লাভ করবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে দান করবে। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, আল্লাহ তা সবই জানেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯২) কুরবানি তথা ঈদুল আজহার সময় সামর্থ্যবানদের জন্য আল্লাহর রাস্তায় প্রাণী উৎসর্গ করাও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বড় মাধ্যম। তাই কুরবানি শিক্ষা দেয় জান-মালকে বিশুদ্ধ নিয়তে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ ও ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা সৃষ্টি পূর্বক আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা হাসিল করা।

কুরবানির আধ্যাত্মিকতার তৃতীয় শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি অর্জন করা। পশু কুরবানি প্রদানের মাধ্যমে স্বীয় পশুত্ব স্বভাব যেমন হিংসা, বিদ্বেষ, হিংস্রতা, শত্রুতা, বক্রতা, স্বেচ্ছাচারিতা, লালসা, স্বার্থপরতা ইত্যাদি বিসর্জনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করার মধ্যে রয়েছে কুরবানির মাহাত্ম্য ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। তাযকিয়াতুন্ নাফস তথা আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “আর শপথ নাফসের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন। অতঃপর তাকে অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। অবশ্যই সেই সফলকাম হবে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে। আর অবশ্যই সেই ব্যর্থ মনোরথ হবে যে নিজকে কলুষিত করবে। (সুরা শামস,আয়াত : ৭-১০)। আত্মশুদ্ধির প্রতি গুরুত্বারোপের ব্যাপারে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলা হলো, কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি বলেনঃ প্রত্যেক বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী সত্যভাষী ব্যক্তি। তারা বলেন, সত্যভাষীকে তো আমরা চিনি, কিন্তু বিশুদ্ধ অন্তরের ব্যক্তি কে? তিনি বলেনঃ সে হলো পূত-পবিত্র, নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ, যার নাই কোন পাপাচার এবং নাই কোন দুশমনি, হিংসা-বিদ্বেষ, আত্মহমিকা ও কপটতা। (ইবনে মাজাহ)। কুরবানি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং কুরবানি শিক্ষা দেয় পশু কুরবানির মাধ্যমে পশুসুলভ স্বভাব বর্জনপূর্বক আত্মশুদ্ধি অর্জন পূর্বক ইনসানে কামেল হওয়ার আধ্যাত্মিক অভিযাত্রায় অন্তর্ভূক্ত হওয়ার।

কুরবানির আধ্যাত্মিকতার চতুর্থ শিক্ষা তাকওয়া অর্জন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশ্ত ও রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” (সুরা হজ্জ, আয়াত : ৩৭)। তাকওয়া আধ্যাত্মিক পরিক্রমার অন্যতম প্রধান স্তর। তাকওয়ার পরিচিতি সম্পর্কে হজরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) হজরত ওমর (রাঃ)’কে বলেন, ‘আপনি কি কখনো কাঁটা বিছানো পথে চলেছেন?’ ওমর (রাঃ) বললেন, ‘হ্যাঁ’। কা‘ব (রাঃ) বললেন, ‘সেখানে আপনি কিভাবে চলেছেন?’ ওমর (রাঃ) বললেন, ‘কাপড়-চোপড় গুটিয়ে অত্যন্ত সাবধানে চলেছি’। কা‘ব (রাঃ) বললেন, ‘ওটাই তো তাক্বওয়া’।” কুরবানির আধ্যাত্মিক শিক্ষা তাকওয়া সম্পর্কে বিদায় হজ্বে নবী করিম (দঃ) ইরশাদ করেন, ‘হে মানব সম্প্রদায় ! নিশ্চয়ই তোমাদের পালনকর্তা মাত্র একজন। তোমাদের পিতাও মাত্র একজন। মনে রেখ! আরবের উপর অনারবের, অনারবের উপর আরবের, লালের উপর কালোর এবং কালোর উপর লালের কোনরূপ প্রাধান্য নেই তাক্বওয়া ব্যতীত। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকটে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাক্বওয়াশীল’। (সূত্র : বায়হাক্বী কৃত শুআবুল ঈমান)

কুরবানির আধ্যাত্মিকতার পঞ্চম শিক্ষা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, বলুন , ‘নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির রব’। (সুরা আনয়াম, আয়াত : ১৬২)। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সব সৃষ্টিরই একমাত্র কামনা। স্বীয় প্রাণ ও সম্পদ উৎসর্গের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জিত হয়। ইসলাম ধর্মে একজন মুমিনের জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য ও মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি (রিজা) অর্জন। আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের ব্যাপারে পবিত্র কোরআন শরীফে অন্য আয়াতে বর্ণিত রয়েছে, ‘আর কোন কোন লোক এরূপ আছে যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আত্মা বিক্রয় করে। আর আল্লাহ হচ্ছেন তার বান্দাদের উপর স্নেহপরায়ণ’। (সুরা বাক্বারাহ, আয়াত : ২০৭)। সহীহ বুখারী শরীফে নবীগণের অধ্যায়ে বর্ণিত, “হজরত হাজেরা (আঃ) স্বীয় স্বামী হজরত ইবরাহিম (আঃ)’কে বললেন, হে ইবরাহীম! আপনি আমাদেরকে কার নিকট রেখে যাচ্ছেন? ইবরাহীম (‘আঃ) বললেন, আল্লাহর কাছে। হাযেরা (‘আঃ) বললেন, আমি আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।” সুতরাং পশু কুরবানির সাথে সাথে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সচেষ্ট থাকা কুরবানির আধ্যাত্মিক শিক্ষা যা প্রতিটি ঈমানদারের অভীষ্ট লক্ষ্য।

ইবাদতের বাহ্যিক দিক সম্পাদনের সাথে সাথে সমভাবে অন্তর্নিহিত আভ্যন্তরীণ শিক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ ও পালনের গুরুত্বারোপ করে তরিকা। বাংলার জমিনে প্রবর্তিত একমাত্র তরিকা ‘তরিকায়ে মাইজভান্ডারীয়া’ শিক্ষা দেয় আত্মশুদ্ধি, আত্মত্যাগ, আত্মপরিচয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আত্মিক উৎকর্ষ সাধন পূর্বক স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন পূর্বক তাঁরই নৈকট্য অর্জন করা। একইভাবে কুরবানির আধ্যাত্মিক শিক্ষা অর্জনের মূল উপাদান পরিলক্ষিত হয় মাইজভান্ডারী কালামে –
কোরান শরীফ ভীত আছে হেন প্রেম রীত,
হজরত ইসমাইল নবীর কোরবানী মন ভুলিওনা।
প্রেম শাস্ত্র খেলা নয়, সাবধানে প্রাণ দিতে হয়,
ইমাম হোসাইনের খেলা দাস হাদী ভুলিওনা।
অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে হজরত ইসমাইল (আঃ) এর কুরবানির কথা স্মরণ রেখে আল্লাহর প্রতি স্বীয় অস্তিত্বকে উৎসর্গের প্রস্তুত থাকা এমনকি হজরত সায়্যিদুনা ইমাম হোসাইন (রাঃ) এর প্রাণ উৎসর্গের মাধ্যমে কুরবানির বাস্তবায়ন হৃদয়ে ধারণ ও ফানা ফিল্লাহর মাকাম অর্জনের ব্রতী হওয়ার বাসনা রাখা কুরবানির আধ্যাত্মিকতার প্রধান শিক্ষা যা তরিকায়ে মাইজভান্ডারীয়া শিক্ষা দেয়।

লেখক পরিচিতি : ইসলামী লেখক ও গবেষক

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

সাবেক মেয়র মনজুরের সঙ্গে আমিন ভাণ্ডার দরবার শরীফের প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আলহাজ্ব হোসনেরা মনজুর আলম ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোহাম্মদ মনজুর আলমের সঙ্গে আমিন ভাণ্ডার দরবার শরীফের প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেছেন। সাক্ষাৎকালে হযরত শাহসুফি মাওলানা সৈয়দ গোলামুর রহমান গাউসুল আজম বাবাভাণ্ডারী (ক.)-এর খলিফা, মাইজভাণ্ডারী গানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকার এবং ফটিকছড়ির দক্ষিণ ধর্মপুরের মহান অলি হযরত শাহসূফি সৈয়দ আমিনুল হক ধর্মপুরী মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর আধ্যাত্মিক জীবন, সাধনা ও ধর্মীয় অবদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ধর্মীয় ঐতিহ্য আধ্যাত্মিক সাধনা ও মাইজভান্ডারী সংগীতের ঐতিহ্য সংরক্ষণে এ মতবিনিময়ীকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ সময় প্রতিনিধিদল তাঁর আধ্যাত্মিক দর্শন, মাইজভাণ্ডারী সংগীত ও সুফিবাদী ভাবধারার তাৎপর্য তুলে ধরেন। আলোচনা শেষে আলহাজ্ব মোহাম্মদ মনজুর আলমকে আমিন ভাণ্ডার দরবার শরীফ পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে তাঁকে আমিন ভাণ্ডার দরবার শরীফের আমন্ত্রণপত্র এবং ‘সৈয়দ আমিনুল হক ধর্মপুরী মাইজভাণ্ডারী গান সমগ্র’ বইটি সৌজন্য উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়। সভায় হযরত শাহসূফি সৈয়দ আমিনুল হক ধর্মপুরী মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর পরিবারের সদস্য শাহজাদী ফাতেমা বেগম (খুশি), শাহজাদী আকলিমা আক্তার (পুতুল) ও শাহজাদী রাজিয়া সুলতানা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানের সমন্বয়ক সাংবাদিক আল সিরাজ মাইজভাণ্ডারী, মো. জাভেদ হাসান, রাকিব, পিএস লিটনসহ অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ সহ উপস্তিত ছিলেন।

পাবনার ভাঙ্গুড়ায় বড়াল ও গুমানি নদীতে প্রতিমা বিসর্জন; শেষ হল শারদীয় দুর্গোৎসব

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

প্রভাষক গিয়াস উদ্দিন সরদার,
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
পাবনার ভাঙ্গুড়ায় বড়াল ও গুমানি নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
ষষ্ঠী থেকে বিজয় দশমী পর্যন্ত,পাঁচ দিনব্যাপী পূজা-অর্চনা, আনন্দ, উৎসব ও নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বুধবার ২১ অক্টোবর সন্ধ্যার পূর্বলগ্নে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান ভক্তরা।

বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটলেও ভক্তদের মনে রয়ে গেছে বিদায়ের বিষাদ আর আগামী শরতে দেবী কে আবার বরণ করে নেওয়ার প্রত্যাশা।
বুধবার দুপুর ২টা থেকে ভাঙ্গুড়া উপজেলার বিভিন্ন মন্দিরের পূজামণ্ডপ থেকে ঢাক-ঢোল ও বাদ্যযন্ত্রের তালে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে প্রতিমা নিয়ে নদীর ঘাটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। পরে নির্ধারিত স্থানে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এ সময় ভক্তদের মধ্যে একদিকে ছিল প্রিয় দেবীকে বিদায় জানানোর আবেগ, অন্যদিকে ছিল পরিবার, সমাজ ও দেশের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়।

বড়াল নদীতে ভাঙ্গুড়া কেন্দ্রীয় মন্দির, কালীবাড়ি দুর্গা মন্দির, জগাতলা দুর্গা মন্দির, পাথরঘাটা দুর্গা মন্দির ও শরৎনগর বাজার মন্দিরের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। অন্যদিকে চড়-ভাঙ্গুড়া ঘোষপাড়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির, কৈডাঙ্গা সার্বজনীন দুর্গা মন্দির, নৌবাড়ীয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির, বেতুয়ান সার্বজনীন দুর্গা মন্দির, দিলপাশার দুর্গা মন্দির ও অষ্টমনিষা দুর্গা মন্দিরে প্রতিমাও বিসর্জন দেওয়া হয়।

প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে নদীর ঘাটগুলোতে ভক্তদের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান তারা। বিসর্জনের সময় ভক্তরা সব অশুভ শক্তির বিনাশ, শুভ শক্তির বিকাশ এবং দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, বিজয়া দশমীর তাৎপর্য শুধু প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের মনের কাম, ক্রোধ, হিংসা ও লালসার মতো আসুরিক প্রবৃত্তি বিসর্জন দেওয়াই এর অন্যতম শিক্ষা। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে পারস্পরিক ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করার মধ্য দিয়েই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতিবছর শরৎকালে দেবী দুর্গা পিতৃগৃহে আগমন করেন। কয়েক দিনের পূজা-অর্চনা ও আনন্দ-উৎসব শেষে বিজয়া দশমীতে তাকে বিদায় জানানো হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, দেবী ফিরে যান কৈলাসে স্বামী মহাদেবের গৃহে। এরপর আবারও শরতের আগমনে দেবীর আগমনের অপেক্ষায় থাকেন ভক্তরা।
প্রতিমা বিসর্জনে অংশ নেওয়া ভক্তরা জানান, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসবের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। দেবী দুর্গার কাছে তারা পরিবার-পরিজনের সুখ-শান্তি, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির পাশাপাশি দেশবাসীর কল্যাণ কামনা করেছেন। আগামী বছর আবারও উৎসবের আনন্দে দেবীকে বরণ করে নেওয়ার প্রত্যাশা তাদের।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি বাবু সংগীত কুমার পাল বলেন, প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সূরাইয়া মমতাজের তত্ত্বাবধানে পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি আরও বলেন, অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিকাশের মধ্য দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে উঠুক—এটাই তাদের প্রত্যাশা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করবে, শারদীয় দুর্গোৎসবের শিক্ষা হোক সেই মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রেরণা।

আলোচিত খবর

রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে; চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে চট্টগ্রাম নগরের জেএম সেন হলে শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করে অংশ নেননি। সবার লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বাধীন করা, গণতন্ত্র রক্ষা করা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।তিনি বলেন, আমরা মুসলমান হই, হিন্দু হই, বৌদ্ধ হই কিংবা খ্রিস্টান হই, ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের নাগরিক।

যে ধর্মেরই হই না কেন, যেহেতু এই দেশে আমরা জন্মেছি, এই দেশে বড় হচ্ছি, তাই আমাদের পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে লাখ লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

অনেকে শহীদ হয়েছেন। সেদিন কেউ দেখেননি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ কিংবা কে খ্রিস্টান। সবাই দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্য নিয়ে লড়াই করেছেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষা ও জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে রাজপথে নেমেছেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। গুলিবিদ্ধ কিংবা আহত ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় জানতে চেয়ে কেউ তাঁদের পাশে দাঁড়াননি। হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, আমার ভাই শহীদ হয়েছে, আমার ভাই আহত হয়েছে। বাকিরা তাঁদের ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। কেউ জিজ্ঞেস করেননি, কী তাঁর ধর্ম পরিচয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মানুষের অধিকার ও মানবিকতার প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য নয়।প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের বিচার করা উচিত নয়।

তিনি নিজেকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁকে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে হয়েছে। বাংলাদেশে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হলেও লন্ডনে অবস্থানের সময় সেই পরিচয় তাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠ করেনি। তাই সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু পরিচয় নয়, একজন মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তারেক রহমান বলেন, দেশের আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র একজন নাগরিককে যে অধিকার ও সুযোগ দেবে, অন্য নাগরিকও তা পাবেন। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও অধিকার খর্ব করা যাবে না।

মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব আন্দোলনে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সবাই শান্তিতে বসবাস করবেন এবং মিলেমিশে থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে যদি সেই বাংলাদেশ গড়তে হয়, আপনাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই। আপনি হিন্দু হোন, মুসলমান হোন, বৌদ্ধ হোন কিংবা খ্রিস্টান হোন, যাই হোন না কেন, আপনার সহযোগিতা আমার দরকার। কারণ আপনার সহযোগিতা ছাড়া আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব না।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীমসহ বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য ও নেতারা।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ