মহানবীর (সা.) আদর্শ অনুসরণে দেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের

ডেস্ক নিউজ

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহমর্মিতা, ক্ষমা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষ্যে দেওয়া এক বাণীতে তারেক রহমান বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ অনুসরণ করে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভাগমন মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য ও মহিমান্বিত ঘটনা। তার আবির্ভাব মানুষের জন্য সত্য ও আলোর এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। তিনি মানুষকে তাওহিদের দিকে আহ্বান করার পাশাপাশি সত্য, ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, মানবিকতা ও শান্তির শিক্ষা দিয়েছেন। তার পবিত্র জীবন ও কর্ম সমগ্র মানবজাতির জন্য চিরন্তন পথনির্দেশ ও অনুসরণীয় আদর্শ হয়ে আছে।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মুসলমানসহ বিশ্বের সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে আন্তরিক মোবারকবাদ ও শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি, যিনি মানবজাতির হেদায়াত ও কল্যাণের জন্য সর্বশেষ নবী ও রাসূল, রহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মদতে (সা.) পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তার প্রতি অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক।

পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, মহানবীর (সা.) জীবন ছিল পবিত্র কুরআনের শিক্ষার বাস্তব ও জীবন্ত প্রতিফলন। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, দয়া ও পরোপকারের অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন।
মহানবী (সা.) জাতি, বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও সামাজিক অবস্থানের বিভেদ অতিক্রম করে মানুষের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় জোর দিয়েছেন উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, তিনি এতিম, দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল ও সহমর্মী হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।

পরিবার, প্রতিবেশী, নারী, শিশু এবং সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তার শিক্ষা মানুষে মানুষে বিভেদ নয়, বরং ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্ব নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। যুদ্ধ, সংঘাত, হিংসা, বৈষম্য, অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয় মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করছে। এমন এক সময়ে মহানবীর (সা.) শান্তি, ন্যায়, সহমর্মিতা, ক্ষমা ও মানবিকতার শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

তার জীবনাদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায়, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
তরুণ প্রজন্মকে মাদক, সন্ত্রাস, উগ্রতা ও অপরাধ থেকে দূরে রেখে জ্ঞান, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের চেতনায় গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মহানবীর (সা.) জীবন ও আদর্শ তরুণদের সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে এবং সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহানবীর (সা.) শিক্ষা শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য নয়, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশের ক্ষেত্রেও গভীর তাৎপর্য বহন করে। তার আদর্শ ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক আচরণে ধারণ করতে হবে।বাণীর শেষে মহান আল্লাহর কাছে মহানবী হজরত মুহাম্মদের (সা.) জীবনাদর্শ ও সুন্নাহ অনুসরণ করার তাওফিক কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে শান্তি, ন্যায়, সাম্য, সমৃদ্ধি ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করেন তিনি।পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশবাসীসহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে আন্তরিক মোবারকবাদ ও শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে; চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে চট্টগ্রাম নগরের জেএম সেন হলে শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করে অংশ নেননি। সবার লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বাধীন করা, গণতন্ত্র রক্ষা করা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।তিনি বলেন, আমরা মুসলমান হই, হিন্দু হই, বৌদ্ধ হই কিংবা খ্রিস্টান হই, ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের নাগরিক।

যে ধর্মেরই হই না কেন, যেহেতু এই দেশে আমরা জন্মেছি, এই দেশে বড় হচ্ছি, তাই আমাদের পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে লাখ লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

অনেকে শহীদ হয়েছেন। সেদিন কেউ দেখেননি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ কিংবা কে খ্রিস্টান। সবাই দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্য নিয়ে লড়াই করেছেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষা ও জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে রাজপথে নেমেছেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। গুলিবিদ্ধ কিংবা আহত ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় জানতে চেয়ে কেউ তাঁদের পাশে দাঁড়াননি। হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, আমার ভাই শহীদ হয়েছে, আমার ভাই আহত হয়েছে। বাকিরা তাঁদের ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। কেউ জিজ্ঞেস করেননি, কী তাঁর ধর্ম পরিচয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মানুষের অধিকার ও মানবিকতার প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য নয়।প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের বিচার করা উচিত নয়।

তিনি নিজেকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁকে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে হয়েছে। বাংলাদেশে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হলেও লন্ডনে অবস্থানের সময় সেই পরিচয় তাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠ করেনি। তাই সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু পরিচয় নয়, একজন মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তারেক রহমান বলেন, দেশের আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র একজন নাগরিককে যে অধিকার ও সুযোগ দেবে, অন্য নাগরিকও তা পাবেন। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও অধিকার খর্ব করা যাবে না।

মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব আন্দোলনে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সবাই শান্তিতে বসবাস করবেন এবং মিলেমিশে থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে যদি সেই বাংলাদেশ গড়তে হয়, আপনাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই। আপনি হিন্দু হোন, মুসলমান হোন, বৌদ্ধ হোন কিংবা খ্রিস্টান হোন, যাই হোন না কেন, আপনার সহযোগিতা আমার দরকার। কারণ আপনার সহযোগিতা ছাড়া আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব না।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীমসহ বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য ও নেতারা।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলে প্রতিদিন ব্যয় ৫৪ লাখ, গড়ে আয় ১১ লাখ টাকা

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পর্যটন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খোলার প্রত্যয় নিয়ে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা হয়েছিল। ১০ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে টানেলটিতে ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর গাড়ি চলাচল শুরু হয়। যেখানে ২০২৫ সালে প্রতিদিন গাড়ি চলাচল করার কথা ছিল ২৮ হাজার ৩০৫টি। সেখানে চলেছে মাত্র ৩ হাজার ৮৭২টি, যা প্রত্যাশার মাত্র ১৪ শতাংশ। একই বছর আয় হওয়ার কথা ছিল ৪০০ কোটি। বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ৩৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। টানেলটি সচল রাখতে গত তিন বছরে লোকসান গুনতে হয়েছে ৪০৯ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেছেন, সমীক্ষায় ট্রাফিক বেশি দেখানো হয়নি। তখন ধারণা করা হয়েছিল, টানেল নির্মাণের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক হয়ে যাবে। কিন্তু কভিড মহামারী, আর্থিক বিষয় ও সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে টানেলের কাজ যে গতিতে এগিয়েছে, আনুষঙ্গিক কাজগুলো সে গতিতে এগোয়নি।

এদিকে লোকসান কমাতে সেতু কর্তৃপক্ষ ১০টি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে। এর মধ্যে সিসিসিসির সঙ্গে করা ৯৮৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি থেকে জনবল ও ব্যয় কমিয়ে ১২৩ কোটি টাকা সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আনোয়ারা-বরকল-গাছবাড়িয়া সড়ক এবং আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া সড়ক প্রশস্তকরণ ও কর্ণফুলী ড্রাই-ডক এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আনোয়ারা প্রান্তে সাতটি নতুন জেটি নির্মাণ।

এগুলো চালু হলে টানেল থেকে বছরে ২০০ থেকে ২৪০ কোটি টাকা অতিরিক্ত টোল আদায় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি চায়না ইকোনমিক জোন ও কোরিয়ান ইপিজেডের কার্যক্রম গতিশীল করা এবং দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক টানেল দিয়ে চলাচলে উদ্বুদ্ধ করতে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদন, ২০১৩ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে টানেলের প্রাক্কলন ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের এই ফারাক পাওয়া গেছে। যৌথভাবে কর্ণফুলী টানেলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছিল চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) ও হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওভি আরুপ।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষার এই ত্রুটি, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আর্থিক লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। জানতে চাইলে সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বললেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার (ফিজিবিলিটি স্টাডি) মধ্যেই যত ধরনের সমস্যা, এটি খুব পরিষ্কার। বিগত দিনে এ ধরনের বড় প্রকল্প কেন নেওয়া হয়েছিল, তা জনগণের কতটা কাজে লাগল এবং ভুলটা কোথায় ছিল— এটি কি স্রেফ ভুল ছিল, নাকি অপরাধ ছিল, তা খতিয়ে দেখা হবে।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, টানেল পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে বছরে ব্যয় হবে ৩২ থেকে ৪৫ কোটি টাকা। সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিসিসি) সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য ৯৮৪ কোটি টাকার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি করা হয়েছে।
চুক্তিমূল্য অনুযায়ী, টানেল সচল রাখতে বছরে ব্যয় দাঁড়ায় ১৯৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রতিদিনে ব্যয় হচ্ছে ৫৪ লাখ টাকা। বিপরীতে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত টানেল থেকে মোট টোল আদায় হয়েছে মাত্র ৪৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে আয় হয়েছে ১১ লাখ টাকা। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে ৪২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। গত তিন অর্থবছরে টানেল সচল রাখতে ৫১৩ কোটি টাকা খরচ হলেও টোল আদায় হয়েছে মাত্র ১০৪ কোটি টাকা।

সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের কারণে টানেল ব্যবহারকারী মোট গাড়ির প্রায় ৫০ শতাংশই হবে ট্রাক। কিন্তু সেতু কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, টানেল চালুর পর থেকে চলাচল করা গাড়ির মধ্যে ৭০ দশমিক ৬০ শতাংশই প্রাইভেট কার, জিপ ও মাইক্রোবাসের মতো হালকা যানবাহন। বাস চলেছে ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ, ট্রাক ১৭ দশমিক ৯৫ এবং ট্রেইলার চলেছে মাত্র ১ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলছিলেন, প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়া ও দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য অনেক সময় সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বাস্তব অনেক কিছু উপেক্ষা করে প্রাক্কলন করা হয়। এটি ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, সমীক্ষায় ভুল হয়েছে। তবে যেহেতু বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হয়ে গেছে, তাই টানেলটিকে সচল ও কার্যকর করতে হলে আনোয়ারা প্রান্ত থেকে কক্সবাজারমুখী বাইপাস সড়ক এবং ফ্লাইওভারের সংযোগ দ্রুত শেষ করতে হবে।

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত শাহ আমানত তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু ও কালুরঘাট সেতুর ওপর থেকে যানবাহনের চাপ কমানো। কিন্তু সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), সেতু কর্তৃপক্ষ এবং রেলওয়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে শাহ আমানত সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৭ হাজার ৪১৬টি এবং শতবর্ষী কালুরঘাট সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১১ হাজার গাড়ি চলাচল করে। অর্থাৎ দুটি সেতু ও একটি টানেল মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪২ হাজার ২৪৪টি যানবাহন কর্ণফুলী নদী পারাপার হয়। এর মধ্যে শাহ আমানত সেতু দিয়ে ৬৫ শতাংশ এবং কালুরঘাট সেতু দিয়ে ২৬ শতাংশ— অর্থাৎ দুই সেতু মিলিয়ে ৯১ শতাংশ গাড়ি পার হচ্ছে। আর টানেল দিয়ে পার হচ্ছে মাত্র ৯ শতাংশ গাড়ি।

শাহ আমানত সেতুতে গাড়িপ্রতি গড় টোল পড়ছে মাত্র ৮২ টাকা, যেখানে টানেলে গাড়িপ্রতি গড় টোল পড়ছে ৩০৬ টাকা ৬৩ পয়সা। প্রাইভেট কারের টোল সেতুতে ৭৫ টাকা হলেও টানেলে ২০০ টাকা। আবার ৩১ আসনের কম বাসের টোল সেতুতে ৫০ টাকা হলেও টানেলে তা ৬ গুণ বেশি— ৩০০ টাকা। এ ছাড়া সেতুতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচলের সুযোগ থাকলেও টানেলে তা নিষিদ্ধ।

আলোচিত খবর

আরও পড়ুন

সর্বশেষ