চট্টগ্রামে থানা হাজতে আসামির আত্যাহত্যায় স্বজনদের আহাজারি

চট্টগ্রামে চান্দগাঁও থানার হাজতে মামলার আসামির অস্বাভাবিক মৃত্যু

চট্টগ্রাম ব্যুরো:

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রামে থানা হাজতে সাত মামলার এক আসামির অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তার নাম মো. জুয়েল (২২)। গতকাল বুধবার ভোর ৬টা ২৫ মিনিটের দিকে নগরের চান্দগাঁও থানার হাজতখানায় এ ঘটনা ঘটে। ডাকাতি ও ছিনতায় মামলায় গ্রেফতারের ৬ ঘণ্টার মাথায় এ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। জুয়েল চান্দগাঁও খেজুরতলা এলাকার মৃত আব্দুল মালেক প্রকাশ আব্দুল মাবুদের ছেলে।
পুলিশ জানায়, আসামি জুয়েলকে রাত ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে নগরের কোতোয়ালী থানার পাথরঘাটা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর চান্দগাঁও থানার হাজতে রাখা হলে সেখানেই তিনি ‘আত্মহত্যা’ করেছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ।
জানা গেছে, কোতোয়ালী থানায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়ের হওয়া একটি অস্ত্র মামলায় আদালতের পরোয়ানামূলে চান্দগাঁও থানা পুলিশ জুয়েলকে বাসা থেকে গ্রেফতার করে। নিয়ম অনুযায়ী, রাতে তাকে থানা হাজতে রাখা হয়। গতকাল বুধবার দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করার কথা ছিল।
থানায় গিয়ে দেখা গেছে, হাজতখানার ভেতরে দেয়ালের সঙ্গে লাগোয়া একপাশে আধাদেয়াল ঘেরা একটি শৌচাগার আছে। এর ওপরে আছে ভেন্টিলেটর। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, পরণের শার্ট খুলে শৌচাগারের আধাদেয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে প্রথমে জুয়েল শার্টের এক হাত ভেন্টিলেটরের সঙ্গে বাঁধেন। নিচে ঝুলে থাকা হাতটি গলায় পেঁচিয়ে তিনি ঝুলে পড়েন। মিনিটখানেকের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে যান।

চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল কবীর জানান, রাতভর হাজতে জুয়েল একাই ছিলেন। রাত আড়াইটার দিকে ডিউটি অফিসার গিয়ে হাজতে তার সঙ্গে কথা বলেন। ভোর ৫টা ২৫ মিনিট থেকে ৬টা পর্যন্ত ডিউটি অফিসার ও হাজতরক্ষীর সঙ্গে জুয়েলের হাজতের সামনে দফায় দফায় কথা হয়। ভোর ৬টা ২৪ মিনিট থেকে ৬টা ২৭ মিনিটের মধ্যে তাকে ভেন্টিলেটরের সঙ্গে শার্ট বেঁধে ঝুলে পড়তে দেখা যায় সিসি ক্যামেরায়। ‘ভোরে ডিউটি অফিসার ও সেন্ট্রি যখন জুয়েলের কাছে যায়, তখন সে জানায়, সকালে নাস্তা খাওয়ার পর সে একটি ওষুধ খায়, কিন্তু ওষুধের নাম সে জানে না। এজন্য তাকে তার ভগ্নিপতি সাগরের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে দেয়ার জন্য বলেন। ডিউটি অফিসার তাকে মোবাইলে কথা বলে দেন। ছয়টার পর হাজতখানার সামনে থেকে ডিউটি অফিসার ও সেন্ট্রি চলে যান। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর সেন্ট্রি পরিবর্তন করা হয়। সকাল সাতটায় নতুন সেন্ট্রি দায়িত্ব গ্রহণ করে পাঁচ মিনিট পর গিয়ে দেখেন, জুয়েল ঝুলে আছে। তখনও রাতের ডিউটি অফিসারই দায়িত্বরত ছিলেন।
জুয়েলের বোন সালমা বেগম বলেন, সকালে পুলিশের ফোন থেকে কল করে জুয়েল প্রথমে আমার বড় বোনের সঙ্গে কথা বলে। এরপর আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলে তার জন্য ওষুধ নেয়ার কথা জানায়। আমি ও আমার স্বামী সকাল সাতটার একটু পরে ওষুধ নিয়ে থানায় আসি। আমাদের নয়টা পর্যন্ত এখানে (ডিউটি অফিসারের কক্ষ) বসিয়ে রাখে পুলিশ। দুই ঘণ্টা পর পুলিশ আমাদের একটি ভিডিও দেখায়। সেখানে দেখি, আমার ভাই তার শার্ট খুলে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে।এদিকে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট থানায় গিয়ে লাশের সুরতহাল সম্পন্ন করে। পুলিশের পক্ষ থেকেও আলাদাভাবে সুরতহাল করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে শুধুমাত্র গলায় ফাঁসজনিত জখমের চিহ্ন ছাড়া অস্বাভাবিক আর কিছু পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (উত্তর) মো. জাহাঙ্গীর।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনবছর আগে জুয়েল মাদক সেবন, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িত ছিলেন। সাত-আটমাস আগ থেকে অপরাধ কর্মকাণ্ড ছেলে প্রথমে টানা রিকশা চালাতে শুরু করে। এরপর সম্প্রতি তার ভগ্নিপতি রুবেলসহ মিলে ব্যাটারি চালিত রিকশা (ইজিবাইক) চালাতে শুরু করেন। নগরীর কোরবানিগঞ্জ এলাকায় একটি গ্যারেজ থেকে ইজিবাইক ভাড়া নিয়ে চালাতেন।
গত ২৫ জুন রাত সাড়ে এগারোটার দিতে যাত্রী নিয়ে যান নগরীর ফিরিঙ্গিবাজার লইট্যাঘাট এলাকায়। সেখানে জুয়েলকে বেধড়ক পিটিয়ে রিকশা ছিনিয়ে নেয় একদল দুর্ব্ত্তৃ। এ ঘটনা গ্যারেজ মালিককে জানানোর পর তিনি কোনোভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্বাস করেননি। তিনি এক লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
সালমা বেগম আরো বলেন, এক লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা মালিককে দিতে হবে শুনে জুয়েল পাগলের মতো হয়ে যায়। এত টাকা কোত্থেকে দেবে, বারবার শুধু একথা বলে টেনশন করতো। আমি, আমার বোন ও জুয়েলের স্ত্রী মিলে ত্রিশ হাজার টাকা জোগাড় করি। সেটা নিতে প্রথমে রাজি হয়নি গ্যারেজ মালিক। জুয়েলকে ডেকে নিয়ে গ্যারেজে আটকে মারধর করে। পরে সেই টাকা রেখে প্রতিদিন দুইশ টাকা করে কিস্তি দাবি করে। ‘বাসায় ফিরে জুয়েল প্রথমে একবার নিজের রুমে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আমার মা দেখে তাকে কোনোমতে রক্ষা করে। এরপর বাসার বাইরে টয়লেটে ঢুকে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। তখন আমার বোন এবং অন্যান্য ভাড়াটিয়ারা দেখে তাকে বের করে আনে।
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে ছিনতাইকারীদের এবং পরবর্তীতে গ্যারেজ মালিকের মারধরের কারণে জুয়েল অসুস্থ হয়ে পড়েন। ব্যাথায় কাতর জুয়েল কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন ওষুধ সেবন করে আসছিলেন।
এদিকে বেলা বারোটার দিকে থানার সামনে যান জুয়েলের মা, স্ত্রীসহ আরও কয়েকজন স্বজন। তারা থানার সামনে আহাজারি করছিলেন। পুলিশকে উদ্দেশ্য করে তার মা মিনারা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে সুস্থ অবস্থায় এনেছেন আপনারা। সে হাসিমুখে আপনাদের সাথে এসেছে। সে কেন মারা যাবে ? তাকে আমার কাছে ফেরত দেন। আমি আমার ছেলেকে জীবিত ফেরত চাই। তাদের সামনে দিয়ে লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নেয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। অ্যাম্বুলেন্স যাত্রার সময় আহাজারিরত স্বজনরা সামনে শুয়ে সেটা কিছুক্ষণ আটকে রাখেন। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে লাশ মর্গে নিয়ে যায়।এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে চান্দগাঁও থানার ওসি জাহিদুল কবীর জানিয়েছেন।
চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল কবির বলেন, তার বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় ডাকাতির প্রস্তুতি এবং অস্ত্র আইনে মোট ৭টি মামলা রয়েছে। এ ঘটনায় আমরা জিডি করেছি। ম্যাজিস্ট্রেট এসে সুরতহাল করে লাশের পোস্টমর্টেমের জন্য মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

পাহাড়তলী ডিজেল শপে এক-তৃতীয়াংশ জনবল, জোড়াতালিতে সচল শত শত ইঞ্জিন

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

 

পূর্বাঞ্চলের রেল বহরের মিটারগেজ লোকোমোটিভ সচল রাখার অন্যতম প্রধান কারিগরি কেন্দ্র চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানা। রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ কেপিআইভুক্ত এই স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জনবল সংকট, বাজেট স্বল্পতা, আমদানিনির্ভর যন্ত্রাংশের ঘাটতি এবং ঋণপত্র বা এলসি জটিলতার সঙ্গে লড়াই করে আসছে। মঞ্জুরিকৃত ৩৩০টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত মাত্র ১১০ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জনবলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দিয়েই প্রতিদিন পূর্বাঞ্চলের রেল বহরের লোকোমোটিভ মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সচল রাখার কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

কারখানা-সংশ্লিষ্টদের মতে, বছরের পর বছর নতুন নিয়োগ না হওয়া এবং অভিজ্ঞ ও প্রবীণ টেকনিশিয়ানদের অবসরে যাওয়ায় দক্ষ জনবলের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রমের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। একদিকে পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য বিপুলসংখ্যক লোকোমোটিভ প্রয়োজন, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নেই। ফলে সীমিতসংখ্যক মেকানিক ও টেকনিশিয়ানকে অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও দৈনিক মজুরি বা অদক্ষ শ্রমিকের সহায়তাও নিতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জনবল সংকটের পাশাপাশি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে লোকোমোটিভের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ। পূর্বাঞ্চলের বহরে থাকা বহু মিটারগেজ লোকোমোটিভ পুরোনো হওয়ায় নিয়মিতভাবেই বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রয়োজন হয়। এসব যন্ত্রাংশের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু ডলার সংকট, ব্যাংকে এলসি খোলার জটিলতা, বাজেট বরাদ্দের দীর্ঘসূত্রতা এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সময়মতো কারখানায় পৌঁছায় না। কারখানা-সংশ্লিষ্টদের দাবি, কোনো প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের রিকুইজিশন দেওয়ার পর বাজেট ও প্রশাসনিক অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পাহাড়তলী) দপ্তর থেকে সেটি হাতে পেতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়।

ফলে মেরামতের টেবিলে এসে থেমে থাকে লোকোমোটিভ। প্রয়োজনীয় জেনুইন স্পেয়ার পার্টস না থাকায় পুরোনো ইঞ্জিন কিংবা অচল ইঞ্জিন থেকে কার্যকর যন্ত্রাংশ খুলে অন্য ইঞ্জিনে ব্যবহার করে অনেক সময় কাজ চালিয়ে নিতে হয়। কারিগরি কর্মীদের ভাষায়, এক ইঞ্জিনের ‘জীবন’ বাঁচাতে আরেকটি অচল ইঞ্জিনের পার্টস ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ইঞ্জিন সচল করা সম্ভব হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

কারখানা সূত্রের ভাষ্য, ইয়ার্ড বা লাইন থেকে কোনো লোকোমোটিভ বিকল হয়ে পাহাড়তলী ডিজেল শপে এলে সেটিকে দ্রুত মেরামত করে লাইনে ফেরত পাঠানোর চাপ থাকে। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, দক্ষ জনবল এবং পর্যাপ্ত সময়ের অভাবে অনেক সময় গভীর সংস্কার বা নির্ধারিত ওভারহোলিং করা সম্ভব হয় না। তখন সাময়িক বা দ্রুত মেরামত—কারিগরি ভাষায় ‘কুইক ফিক্স’—করে ইঞ্জিনটি লাইনে পাঠানো হয়। এর ফলে কোনো কোনো ইঞ্জিন কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ চলার পর একই ধরনের ত্রুটি নিয়ে আবারও কারখানায় ফিরে আসে। রেলওয়ের কারিগরি পরিভাষায় এ ধরনের পুনঃপুন বিকল হওয়াকে ‘রিপিট ফেইলিওর’ বলা হয়। কর্মীদের ভাষায়, এটাই অনেকটা ইঞ্জিনের ‘ইউ-টার্ন’।

একটি লোকোমোটিভ বারবার বিকল হয়ে কারখানায় ফিরে এলে একদিকে মেরামত সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, অন্যদিকে ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রস্তুত লোকোমোটিভের সংখ্যা কমে যায়। ফলে অন্য ইঞ্জিনগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এভাবে সংকটটি একটি চক্রে পরিণত হয়—যন্ত্রাংশের অভাব, দ্রুত মেরামত, লাইনে পাঠানো, পুনরায় বিকল হয়ে ফিরে আসা এবং আবার মেরামতের চাপ।

তবে নানা সংকটের মধ্যেও পাহাড়তলী ডিজেল শপের কারিগরি সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২টি মৃতপ্রায় লোকোমোটিভ মেরামত করে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে পাঠানো হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪টি মৃতপ্রায় এবং ২টি দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ মেরামত করে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে প্রেরণ করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও ৪টি মৃতপ্রায় লোকোমোটিভ মেরামত করে সচল করা হয়েছে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫টি মৃতপ্রায় এবং ২টি দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ মেরামত করে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ চার অর্থবছরে মোট ১৫টি মৃতপ্রায় এবং ৪টি দুর্ঘটনাকবলিত—সর্বমোট ১৯টি লোকোমোটিভ মেরামতের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

কারখানা সূত্র অনুযায়ী, গত তিন-চার বছরে এখানকার মেকানিকরা প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮টি লোকোমোটিভের ছোট-বড় মেরামত ও লাইট ওভারহোলিংয়ের কাজ সম্পন্ন করেছেন। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগে ট্রেনের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে বিশেষ প্রস্তুতিও নিতে হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিটি ঈদের আগে একযোগে প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫টি লোকোমোটিভ প্রস্তুত করে লাইনে আউট-টার্ন দেওয়ার কাজ করেছে এই কারখানা। সীমিত জনবল ও যন্ত্রাংশের মধ্যেও পূর্বাঞ্চলের রেল বহর সচল রাখতে কারখানাটির ওপর যে চাপ রয়েছে, তার বড় অংশই এখানকার কর্মীদের সামাল দিতে হচ্ছে।

শুধু পুরোনো মিটারগেজ লোকোমোটিভ নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে আনা ৩০০০ সিরিজের ২২টি আধুনিক লোকোমোটিভও বিভিন্ন সময়ে কারিগরি ত্রুটির কারণে পাহাড়তলী ডিজেল শপে মেরামত করতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে আধুনিক লোকোমোটিভের ক্ষেত্রেও দক্ষ মেকানিক, ডায়াগনস্টিক সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টসের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এদিকে সংকটের মধ্যেই কারখানাটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে নেওয়া হয়েছে একাধিক উদ্যোগ। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দুটি আধুনিক অটোমেশন মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। এর একটি স্বয়ংক্রিয় ডায়াগনস্টিকস মেশিন। কারখানা-সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মাধ্যমে লোকোমোটিভের জটিল ইলেকট্রিক্যাল ও ফুয়েল সিস্টেমের ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করা যাচ্ছে। অন্যদিকে পার্টস ক্লিনিং ও ফিটিং অটোমেশন মেশিনের মাধ্যমে সিলিন্ডার হেড, ক্র্যাঙ্কশ্যাফ্টসহ ভারী যন্ত্রাংশ পরিষ্কার ও ফিটিংয়ের কাজ তুলনামূলক দ্রুত ও নিখুঁতভাবে করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ম্যানুয়াল কাজের ক্ষেত্রে ভুলের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি মেরামতের গুণগত মান ও সময়—দুই ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মূল্যবান কর্মঘণ্টা সাশ্রয় এবং মেরামত করা যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতা সঠিকভাবে যাচাই করে কার্যোপযোগিতা নির্ণয়ের জন্য সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে Jib Crane, AC Motor Testing Plant এবং Compressor Testing Plant তৈরি ও স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তিগত সুবিধার মাধ্যমে মেরামত ও পরীক্ষণ কার্যক্রমে সময় কমানোর পাশাপাশি যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতা যাচাই আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতি সত্ত্বেও মূল সংকট থেকে যাচ্ছে জনবল ও যন্ত্রাংশে। আধুনিক ডায়াগনস্টিক মেশিন ত্রুটি শনাক্ত করতে পারলেও ত্রুটিপূর্ণ অংশ পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় জেনুইন স্পেয়ার পার্টস না থাকলে মেরামত সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। একইভাবে দক্ষ জনবল ছাড়া আধুনিক যন্ত্রপাতির সর্বোচ্চ ব্যবহারও নিশ্চিত করা কঠিন।

একটি ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল অনেকাংশে নির্ভর করে সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্ধারিত ওভারহোলিংয়ের ওপর। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে নির্ধারিত সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ সংস্কার ব্যাহত হলে ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ক্র্যাঙ্কশ্যাফ্ট, ট্র্যাকশন মোটর, টার্বোচার্জারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্টের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে পুরোনো লোকোমোটিভগুলোকে দীর্ঘদিন সচল রাখার ব্যয়ও বাড়তে থাকে এবং সময়ের আগেই ইঞ্জিন অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানার কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) প্রকৌশলী এতেশাম মো. শফিক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে কারখানায় দক্ষ জনবল ও মানসম্মত স্পেয়ার পার্টসের ঘাটতি চলায় মেরামত কাজ করা অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। তবে দক্ষ জনবল ঘাটতি মোকাবেলা এবং মুল্যবান কর্মঘন্টা সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন রকম অটোমেশন প্রযুক্তি এর ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত প্ল্যান্টস এন্ড মেশিনারিজ এর পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতে ডায়াগনস্টিক প্ল্যান্টস ও স্থাপন করা হচ্ছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

তিনি বলেন, “সরঞ্জাম বিভাগ যদি বাজেট ও এলসি জটিলতা কাটিয়ে আমদানিকৃত মালামালের দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে কারখানার কাজের গতি ও লোকোমোটিভ সচল করার হার আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।”

কারখানা-সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়তলী ডিজেল শপের বর্তমান সংকট সমাধানে শুধু নতুন মেশিন স্থাপন যথেষ্ট নয়। মঞ্জুরিকৃত শূন্য পদে দ্রুত দক্ষ জনবল নিয়োগ, অভিজ্ঞ মেকানিকদের জ্ঞান নতুন কর্মীদের মধ্যে স্থানান্তর, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ, সময়মতো বাজেট বরাদ্দ এবং জেনুইন স্পেয়ার পার্টস আমদানির জন্য দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

কারণ পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগ অনেকাংশেই লোকোমোটিভের নির্ভরযোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। একটি ইঞ্জিন বারবার বিকল হওয়া মানে শুধু একটি মেশিনের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় ট্রেন পরিচালনা, শিডিউল, যাত্রীসেবা এবং পুরো রেল বহরের ওপর বাড়তি চাপ। পাহাড়তলী ডিজেল শপের কর্মীরা সীমিত জনবল ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিদিন সেই চাপ সামাল দিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে গত চার অর্থবছরে ১৯টি মৃতপ্রায় ও দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভকে মেরামতের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সচল করে রানিং ডিভিশনে ফেরত পাঠানো এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে বিভিন্ন টেস্টিং প্ল্যান্ট ও অটোমেশন স্থাপনের মাধ্যমে কারখানাটি তার সক্ষমতারও প্রমাণ দিয়েছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে অপ্রতুল জনবল, পুরোনো যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতা এবং জেনুইন স্পেয়ার পার্টস পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান না হলে এই সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হবে। মঞ্জুরিকৃত জনবল পূরণ, নির্ধারিত ওভারহোলিং নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় জেনুইন স্পেয়ার পার্টস দ্রুত সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে দেশীয় প্রযুক্তির এসব উদ্যোগের সুফল আরও বড় পরিসরে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। এতে পূর্বাঞ্চলের লোকোমোটিভ বহরের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি বারবার বিকল হয়ে কারখানায় ফিরে আসা ইঞ্জিনের সংখ্যাও কমানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

 

সরকারি জায়গায় বালু ফেলে দখল চেষ্টার অভিযোগ বিএনপি নেতার ভাইয়ের বিরুদ্ধে

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলায় সরকারি জায়গা বালু দিয়ে ভরাট করে দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক আরাফাতের রহমান হাসানের ছোট ভাই তারেক রহমান রাজনের বিরুদ্ধে।

রোববার (৪ অক্টোবর) দুপুরে কবিরহাট সরকারি ডিগ্রি কলেজের পূর্ব গেটসংলগ্ন প্রায় দুই শতক জায়গায় বালু ফেলে ভরাটের কাজ শুরু করলে স্থানীয়রা এতে বাধা দেন। তবে সরকারি জায়গা দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তারেক রহমান রাজন। এ ঘটনায় মালিকানা নির্ধারণে জায়গা মাপের উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কবিরহাট বাজারের কলেজ গেট সড়কের পাশে খুঁটি দিয়ে চিহ্নিত নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন সরকারি জায়গায় কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই বালু ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। বিষয়টি নজরে আসার পর স্থানীয়রা ভরাটকাজে বাধা দেন। একই সঙ্গে জায়গাটির প্রকৃত মালিকানা ও ভরাটের বৈধতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

অভিযোগের বিষয়ে তারেক রহমান রাজন বলেন, ওই জায়গার পেছনে তার কেনা দুই শতক জমি রয়েছে। নিজের জমি ভরাটের সুবিধার্থে সাময়িকভাবে সামনের জায়গায় বালু রাখা হয়েছে। সরকারি জায়গা দখল চেষ্টার কোনো ঘটনা ঘটেনি।

এ বিষয়ে কবিরহাট উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক আরাফাতের রহমান হাসান বলেন, ভাইয়ের বিরুদ্ধে সরকারি জায়গা দখলের চেষ্টার অভিযোগ সঠিক নয়। সেখানে আমার ছোট ভাইয়ের চান্দিনা ভিটার জায়গা কেনা রয়েছে। তবে জায়গাটি সামনে নাকি পেছনে, তা তিনি নিশ্চিত নন।

কবিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পূদম পুষ্প চাকমা বলেন, খবর পেয়ে তহশিলদার ও সার্ভেয়ারকে ম্যাপসহ ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। সেখানে ব্যক্তি মালিকানাধীন ও সরকারি দুই ধরনের জায়গা রয়েছে। সোমবার সকালে মাপ দিয়ে কোনটি সরকারি এবং কোনটি ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা, তা চিহ্নিত করা হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

ইউএনও আরও বলেন, সরকারি জায়গায় বালু ফেলে ভরাটের জন্য উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে কেউ কোনো অনুমতি নেননি। অভিযোগ পাওয়ার পরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বার্তা প্রেরক
গিয়াস রনি
মু.০১৬৭৬-৬৯৮৬২৬, নোয়াখালী।

আলোচিত খবর

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায়

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছেছে । আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইড মিটিং এ দুই দেশের মধ্যে এ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ বিষয়ে বক্তব্য স্পষ্ট, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ