নিরাপদ খাবার কোথায়? ভোক্তার জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি আর কতদিন

- জাহাঙ্গীর আলম

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম মহানগরীর ব্যস্ততম সড়ক, বাণিজ্যিক এলাকা কিংবা আবাসিক পাড়া—চোখের সামনে সারি সারি হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বেকারি, ফাস্টফুডের দোকান। কোথাও ঝকঝকে সাজসজ্জা, কোথাও আধুনিক নাম ও বাহারি বিজ্ঞাপন। বাইরে থেকে দেখলে সবই যেন পরিপাটি। কিন্তু সেই খাবারের পেছনের রান্নাঘর, সংরক্ষণব্যবস্থা কিংবা ব্যবহৃত কাঁচামালের দিকে তাকালেই কি একই চিত্র দেখা যায়? সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানের তথ্য অন্তত সেই নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।

মানুষ বাইরে খাবার খায় প্রয়োজনেই। কর্মব্যস্ত নগরজীবনে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ হোটেল-রেস্টুরেন্টের খাবারের ওপর নির্ভর করেন। কেউ অফিসের ব্যস্ততায়, কেউ ব্যবসায়িক কাজে, কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে, কেউবা পরিবার নিয়ে। একজন ক্রেতা যখন একটি খাবারের দোকানে প্রবেশ করেন, তখন তিনি ধরে নেন—টাকা দিয়ে যে খাবারটি কিনছেন, সেটি নিরাপদ এবং মানুষের খাওয়ার উপযোগী। কিন্তু যদি সেই বিশ্বাসের আড়ালে থাকে পচা খাবার, মেয়াদোত্তীর্ণ উপকরণ, পোড়া তেল, অপরিষ্কার রান্নাঘর কিংবা কাঁচা ও রান্না করা খাবার পাশাপাশি সংরক্ষণের মতো অনিয়ম, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—ভোক্তার নিরাপত্তা কোথায়?

সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা অধিকারবিষয়ক অভিযানে এমন বেশ কিছু অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে পচা খাদ্য উপকরণ, কোথাও মেয়াদোত্তীর্ণ মাংস, সবজি, ফল বা দই, কোথাও নিম্নমানের উপকরণ কিংবা অননুমোদিত রং ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পোড়া তেলে খাবার তৈরির পাশাপাশি কাঁচা ও রান্না করা খাবার একই স্থানে সংরক্ষণের মতো বিষয়ও উঠে এসেছে। কোথাও আবার অপরিচ্ছন্ন পাত্র, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ কিংবা পোকামাকড়ের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযানের পর এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটিকে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের জরিমানাও করা হয়েছে।

একটি সাম্প্রতিক অভিযানে নগরের ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে মোট ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অন্য একটি অভিযানে চকবাজারের একটি ফুড কোর্টের চারটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগেও নগরের বিভিন্ন এলাকায় খাবারের প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে জরিমানার ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং নগরের খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথাই এসব অভিযান সামনে নিয়ে আসছে।তবে এখানেই শেষ নয়; বরং এখান থেকেই শুরু হওয়া উচিত আরও বড় প্রশ্নের। জরিমানা করার পর কী হয়?

একটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হলো, জরিমানার টাকা সরকারি কোষাগারে গেল, অভিযান শেষ হলো—তারপর? প্রতিষ্ঠানটি কি পরদিন থেকে স্থায়ীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলল? রান্নাঘর কি পরিচ্ছন্ন হলো? মেয়াদোত্তীর্ণ উপকরণ কি আর ব্যবহার করা হলো না? পোড়া তেল কি বাদ দেওয়া হলো? কাঁচা ও রান্না করা খাবারের জন্য পৃথক সংরক্ষণব্যবস্থা তৈরি হলো? নাকি কয়েকদিন পর আবারও আগের চিত্র ফিরে এল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আসলে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।কারণ জরিমানা শাস্তির একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু জনস্বাস্থ্য রক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। একজন মানুষ পচা বা দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হলে তার কষ্টের মূল্য কোনো জরিমানার অঙ্ক দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। তার চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টার ক্ষতি, পরিবারের দুশ্চিন্তা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি—এসবের দায় কে নেবে?

একজন ভোক্তা খাবার কিনে রান্নাঘরের ভেতরে প্রবেশ করেন না। তিনি দেখতে পারেন না মাংসটি কতদিন ধরে রাখা হয়েছে, সবজিটি তাজা কি না, তেল কতবার ব্যবহার করা হয়েছে, ফ্রিজের তাপমাত্রা ঠিক আছে কি না কিংবা রান্নার পাত্রটি কতটা পরিষ্কার। তিনি প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশ্বাস করেই খাবার খান। সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কেউ যদি নিম্নমানের বা অনিরাপদ খাবার পরিবেশন করেন, তাহলে সেটি শুধু ব্যবসায়িক অনৈতিকতা নয়—এটি ভোক্তার মৌলিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুতর বিষয়।

চট্টগ্রামের মতো বন্দরনগরী ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নগরে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ নগরের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করেন। দেশ-বিদেশের মানুষও এই নগরে আসেন। ফলে এখানকার খাদ্যব্যবস্থার মান শুধু স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্য নয়, নগরের সামগ্রিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত।

প্রশ্ন হলো, একটি শহরে শত শত খাবারের প্রতিষ্ঠান থাকলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘর ও খাদ্য সংরক্ষণব্যবস্থা কি নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছে? যেসব প্রতিষ্ঠান একবার জরিমানা হয়েছে, তাদের পুনরায় পরিদর্শন করা হচ্ছে কি? একই ধরনের অনিয়ম পুনরাবৃত্তি হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত নজরদারি কতটা কার্যকর? এসব প্রশ্নের উত্তর সাধারণ মানুষ জানার অধিকার রাখেন।

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও রেস্টুরেন্টগুলোর রান্না, খাদ্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিবেশনে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কী হচ্ছে তার ওপর। নির্দেশনা দেওয়ার চেয়ে নির্দেশনা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সেটিই বড় কথা।
অভিযানের সময় ক্যামেরার সামনে রান্নাঘর পরিষ্কার করে রাখলেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। দরকার প্রতিদিনের স্বাস্থ্যবিধি, নিয়মিত তদারকি এবং ব্যবসায়ীদের নিজেদের দায়িত্ববোধ।

ব্যবসা করা অপরাধ নয়। লাভ করাও অপরাধ নয়। বরং একটি ভালো রেস্টুরেন্ট বা বেকারি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, মানুষের প্রয়োজন মেটায় এবং অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু লাভের জন্য যদি খাবারের মান কমানো হয়, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয় কিংবা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি করা হয়, তখন ব্যবসা আর কেবল ব্যবসা থাকে না—তা জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে পরিণত হয়।এখানে ব্যবসায়ীদের বিবেকের প্রশ্নও আছে।

একজন ক্রেতা হয়তো বুঝতে পারছেন না তার প্লেটে পরিবেশিত খাবারের উপকরণ কতটা নিরাপদ। কিন্তু খাবার প্রস্তুতকারী জানেন তিনি কী ব্যবহার করছেন। ক্রেতা জানেন না তেলটি কতবার ব্যবহার করা হয়েছে; রান্নাঘরের দায়িত্বশীল ব্যক্তি জানেন। ভোক্তা জানেন না ফ্রিজে রাখা খাবারটির মেয়াদ শেষ হয়েছে কি না; ব্যবসায়ী জানেন। তাই তথ্যের এই অসমতার জায়গায় ব্যবসায়ীর দায়িত্ব আরও বেশি।শুধু প্রশাসনের ভয়েই নয়, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত।

একই সঙ্গে ভোক্তারও দায়িত্ব আছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার না খাওয়া, খাবারের মান নিয়ে সন্দেহ হলে অভিযোগ করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য দেওয়া দরকার। তবে ভোক্তাকে সচেতন করার পাশাপাশি প্রশাসনিক নজরদারি শক্তিশালী করাও জরুরি। কারণ একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে একটি রেস্টুরেন্টের রান্নাঘরের ভেতরের প্রতিটি বিষয় পরীক্ষা করা সম্ভব নয়।

চট্টগ্রাম মহানগরীতে সাম্প্রতিক অভিযানগুলো তাই কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানার খবর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এসব অভিযান নগরের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, সেটি দেখারও একটি সুযোগ। অভিযান থেকে তথ্য নিতে হবে, পুনরাবৃত্ত অনিয়মের কারণ খুঁজতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই যেখানে কোনো রেস্টুরেন্টে অভিযান চালানোর জন্য অভিযোগ জমা পড়ার অপেক্ষা করতে হবে না; নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে অনিয়ম আগেই শনাক্ত হবে। এমন একটি ব্যবস্থা চাই যেখানে শুধু জরিমানা নয়, সংশোধন বাস্তবায়নের অগ্রগতিও দেখা হবে। এমন একটি ব্যবস্থা চাই যেখানে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো উৎসাহিত হবে এবং বারবার অনিয়ম করা প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের আওতায় আরও কার্যকরভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি হবে।

কারণ খাবার কোনো সাধারণ পণ্য নয়। খাবারের সঙ্গে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সরাসরি জড়িত।একজন মানুষ দিনের পর দিন পরিশ্রম করে উপার্জিত টাকা দিয়ে খাবার কিনছেন। সেই খাবার যদি তার সুস্থ থাকার বদলে অসুস্থতার কারণ হয়, তাহলে এর চেয়ে বড় ভোক্তা-অবিচার আর কী হতে পারে?

আমরা চাই না চট্টগ্রামের কোনো মা-বাবা সন্তানকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে গিয়ে ফিরে এসে হাসপাতালের পথে ছুটুন। আমরা চাই না একজন শ্রমজীবী মানুষ দিনের উপার্জনের টাকা খাবারে খরচ করে পরদিন চিকিৎসার জন্য আরও বেশি টাকা ব্যয় করুন। আমরা চাই না একটি পরিবারের আনন্দের খাবার অসুস্থতার কারণ হয়ে উঠুক।

তাই এখন সময় এসেছে প্রশ্ন করার—নিরাপদ খাবার কোথায়? ভোক্তার জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি আর কতদিন?অভিযান হোক, জরিমানা হোক, আইন প্রয়োগ হোক—কিন্তু তার সাথে থাকতে হবে স্থায়ী সমাধান। খাদ্য ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল হতে হবে, প্রশাসনকে নিয়মিত নজরদারি করতে হবে এবং ভোক্তাকে সচেতন হতে হবে। এই তিন পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্ব ছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

সবশেষে একটি কথা মনে রাখা দরকার—আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে হয়তো কোনো অনিয়মের তাৎক্ষণিক দায় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব, কিন্তু মানুষের ক্ষতি, মানুষের অধিকার এবং মানুষের আমানতের দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একজন বিশ্বাসী মানুষের কাছে সেই জবাবদিহি শুধু রাষ্ট্রের কাছে নয়, মহান আল্লাহর কাছেও।
একটি জরিমানার রসিদ হয়তো অপরাধের আইনি মূল্য নির্ধারণ করতে পারে; কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষের কষ্টের মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না।

তাই প্রয়োজন এমন একটি খাদ্যব্যবস্থা, যেখানে ব্যবসা থাকবে, মুনাফা থাকবে, কিন্তু মানুষের স্বাস্থ্যকে মুনাফার বলি হতে হবে না।নিরাপদ খাবার কোনো বিলাসিতা নয়—এটি মানুষের অধিকার। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি ব্যবসায়ীর নৈতিক দায় এবং রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্যগত দায়িত্বও।

লেখক, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

গণমাধ্যমে সংবেদনশীল সাংবাদিকতার চর্চা জোরদারে চট্টগ্রামে বিভাগীয় সংলাপ

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

 

সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা, নেতিবাচক জেন্ডার-বিষয়ক ধ্যানধারণা চ্যালেঞ্জ করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সংবেদনশীল সাংবাদিকতা: সংলাপ ও করণীয়’ শীর্ষক বিভাগীয় সংলাপ। এতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রায় ৫০ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী অংশ নেন।

প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি), প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এবং চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের যৌথতায় আয়োজিত এ সংলাপে সাংবাদিকতায় জেন্ডার-সংবেদনশীলতা, নৈতিক সংবাদ পরিবেশন, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মর্যাদাপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব এবং সংবাদমাধ্যমে প্রচলিত জেন্ডারগত স্টেরিওটাইপ চ্যালেঞ্জ করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি সাংবাদিকেরা তাঁদের পেশাগত অভিজ্ঞতা, বাস্তব চ্যালেঞ্জ ও উত্তম চর্চা বিনিময় করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ। তিনি বলেন, “গণমাধ্যম শুধু সংবাদ পরিবেশন করে না, মানুষের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক মূল্যবোধ গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সংবাদ পরিবেশনে জেন্ডার-সংবেদনশীলতা, নিরপেক্ষতা এবং সব মানুষের মর্যাদা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ প্রতিফলন নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক মানুষই সমাজের পাহারা কিন্তু সাংবাদিকদের দায়িত্ব আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সাংবাদিকেরা প্রতিনিয়ত ইতিহাসের একটি অংশ নির্মাণ করেন। সংবাদে ভুল তথ্য পরিবেশিত হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাস সম্পর্কে বিভ্রান্ত করতে পারে। তাই সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের প্রতিটি পর্যায়ে তথ্যের যথার্থতা, দায়িত্বশীলতা এবং সংবেদনশীলতা বজায় রাখা জরুরি।

তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদে ভুক্তভোগীদের প্রতি সংবেদনশীলতার পরিবর্তে তাঁদের চরিত্র ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে নারী-পুরুষসহ সব মানুষের বিষয়ে পক্ষপাত থেকে বেরিয়ে এসে তাঁদের বক্তব্য ও বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মাহীন নেওয়াজ চৌধুরী বলেন, “জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠায় তরুণদের পাশাপাশি গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ ও গল্প বলার ধরনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারলে ক্ষতিকর সামাজিক ধ্যানধারণা চ্যালেঞ্জ করা এবং আরও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের পথ সুগম হবে। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ ও সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।”

চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি বলেন, “সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাগত উৎকর্ষের সঙ্গে সংবেদনশীলতা এবং দায়িত্বশীলতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জেন্ডার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতার চর্চা জোরদার করতে সাংবাদিকদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

সংলাপে ‘সাংবাদিকতায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা” বিষয়ক ব্যবহারিক নির্দেশিকা নিয়ে আলোচনা পরিচালনা করেন প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সহযোগী অধ্যাপক মনিরা শরমিন। তিনি বলেন, “জেন্ডার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতা মানে শুধু নারী বা নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সংবাদ করা নয়; বরং সংবাদে সব মানুষের অভিজ্ঞতা, পরিচয় ও মর্যাদাকে যথাযথভাবে তুলে ধরা। সংবাদ সংগ্রহ, ভাষা, ছবি, শিরোনাম, তথ্যসূত্র নির্বাচন এবং উপস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে সচেতনতা জরুরি। এই নির্দেশিকা সাংবাদিকদের দৈনন্দিন কাজে সেই চর্চাকে আরও কার্যকর করতে সহায়ক হবে।”

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সালেহ নোমান। এতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের পাশাপাশি ‘সমতায় তারুণ্য’ প্রকল্পের কনসোর্টিয়াম অংশীদার জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের বিভাগীয় সমন্বয়ক সুজয় বড়ুয়া অংশ নেন। এছাড়া প্রকল্পের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ম্যানেজার হুসাইন শাকির, মিডিয়া স্পেশালিস্ট সৈয়দ মো. তাফহিম এবং জেন্ডার স্পেশালিস্ট ফারজানা রূপা।

চার বছর মেয়াদি ‘সমতায় তারুণ্য: ইয়ুথ ফর ইকুয়ালিটি’ প্রকল্পটি নেদারল্যান্ডস সরকারের অর্থায়নে ১ ডিসেম্বর ২০২৩ থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো, বাংলাদেশের আটটি বিভাগের সব বৈচিত্র্যপূর্ণ তরুণ জনগোষ্ঠী—যার মধ্যে কিশোরী ও তরুণীরাও অন্তর্ভুক্ত—যেন সহিংসতামুক্ত জীবনযাপন করতে পারে, নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে এবং নিজ নিজ সম্প্রদায়, গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জেন্ডারগত স্টেরিওটাইপ চ্যালেঞ্জ করার জন্য নিজেদের উদ্যোগ ও কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।

চট্টগ্রামের এ সংলাপের মাধ্যমে সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক শেখা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতার চর্চা বিস্তারে সহযোগিতা জোরদারের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ধারাবাহিক বিভাগীয় সংলাপের বৃহত্তর লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের গণমাধ্যমে আরও দায়িত্বশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক সংবাদচর্চার পরিবেশ গড়ে তোলা।

চবি মনোবিজ্ঞান বিভাগের উদ্যােগে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উদযাপন

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের উদ্যোগে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আজ রবিবার (১১ অক্টোবর ২০২৬) সকাল ১০.৩০টায় জীববিজ্ঞান অনুষদের অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সকাল ১০টায় র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চবি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম ও জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এ.এম. মাসুদুল আজাদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে মনোবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. অরুণাভ বৈরাগী সভাপতিত্ব করেন। “জীবনের অভিজ্ঞতা শুনি; সত্যিকারের কথা, সত্যিকারের পরিবর্তন” প্রতিপাদ্য বিষয়ের ওপর বক্তব্য রাখেন বিভাগের প্রফেসর ড. মোঃ শাহীনুর রহমান। বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লাইলুন নাহারের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সহকারী অধ্যাপক মোঃ আলমগীর হোসাইন।

বক্তব্যে চবি উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বর্তমান সমাজে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমান ও হেয়প্রতিপন্ন করার প্রবণতা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। সামান্য বিরোধ বা অনলাইনে লেখা কোনো মন্তব্যকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ চরম মানসিক সংকটে পড়ছেন। এসব ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আরও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা যেন অন্যের মানসিক ক্ষতির কারণ না হয়, সে বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। তিনি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানান এবং সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সচেতনতা, সহমর্মিতা, কাউন্সেলিং ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগ ও প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলা গেলে শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার পথ আরও সুগম হবে। মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে—শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগ আরও জোরদার করুন।

বক্তারা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার গুরুত্ব এবং ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের উপর গুরুত্বারোপ করেন। উক্ত অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন চবি প্রক্টর, মনোবিজ্ঞান বিভাগসহ জীববিজ্ঞান অনুষদের অন্যান্য বিভাগের শিক্ষকবৃন্দ, আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ ও শিক্ষার্থীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

আলোচিত খবর

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায়

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছেছে । আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইড মিটিং এ দুই দেশের মধ্যে এ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ বিষয়ে বক্তব্য স্পষ্ট, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ