সংক্ষিপ্ত জীবনী

মহান ১০ আশ্বিন খলিফায়ে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী, ফানাফিল্লা-বাকাবিল্লা হযরত মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আল্লামা রিজুয়ান উদ্দীন মাইজভাণ্ডারী (রহঃ) প্রকাশ শাহনগরীর ৯৮তম বার্ষিক ওরশ শরিফ

শেখ মুহাম্মদ ইসমাইল, সংগঠক ও সমাজকর্মী

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

বাংলাদেশে প্রবর্তিত একমাত্র তরিকা, তরিকায়ে মাইজভাণ্ডারীয়ার মহান প্রবর্তক, আহলে বাইতে রাসূল, ইমামুল আউলিয়া, খাদেমুল অলদ, গাউসুল আযম হযরত মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ)-এর অন্যতম খলিফা, ফানাফিল্লাহ-বাকাবিল্লাহ, মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আল্লামা রিজুয়ান উদ্দীন মাইজভাণ্ডারী (রহঃ), প্রকাশ শাহনগরী কেবলা।

আল্লামা রিজুয়ান উদ্দীন শাহনগরী (রহঃ) ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ফটিকছড়ি উপজেলার ১৩নং লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মাওলানা আব্দুল করিম। মাওলানা আব্দুল করিম একজন আলেম ও কামেল আউলিয়া ছিলেন, যাঁর অসংখ্য কেরামত রয়েছে বলে লোকমুখে শুনা যায়।

আল্লামা শাহনগরীর পূর্বপুরুষ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সুদূর আরব থেকে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আব্দুল্লাহপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে আল্লামা শাহনগরীর পূর্বপুরুষেরা ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে (মসজিদের ইমামতি) করার সুবাদে শাহনগর গ্রামে বসবাস স্থাপন করেন।

আল্লামা রিজুয়ান উদ্দীন শাহনগরী শৈশবে শাহনগর গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং গোল্ড মেডালিস্ট লাভ করেন।

পড়ালেখা শেষ করে আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য হুজুর গাউসুল আযম হযরত মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করে বেলায়েত অর্জন করেন এবং কঠোর রিয়াজতে মশগুল থাকেন।

তিনি দুনিয়াবি লোভ-লালসা ত্যাগ করে খোদার প্রেমে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে চট্টগ্রাম হাটহাজারী থানার অন্তর্গত ফরহাদাবাদ ও শফিনগর এলাকায় রিয়াজতের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। তিনি কঠিন সাধনা করেন এবং তাঁর পীর হুজুর গাউসুল আযম হযরত মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এবং পরবর্তীতে ইউসুফে সানী হযরত মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারী, প্রকাশ বাবা ভাণ্ডারী (কঃ)-এর কাছ থেকে বেলায়েত অর্জন করে বেলায়েতের উচ্চ মোকামে গিয়ে পৌঁছেন।

তাঁর বেলায়েতের মোকাম এত উঁচু ছিল যে, যখন আল্লামা শাহনগরী বাবা ভাণ্ডারী (কঃ)-এর হুজরা শরিফে প্রবেশ করতেন, তখন বাবা ভাণ্ডারী (কঃ) তাঁকে দাঁড়িয়ে সম্মান করতেন এবং হুক্কা মোবারক গ্রহণ করার জন্য আরজ করতেন। কিন্তু আল্লামা শাহনগরী বাবা ভাণ্ডারীর হুক্কা মোবারকে সম্মান প্রদর্শন করে (চুমু দিয়ে) বাবা ভাণ্ডারীকে বলতেন—
“আপনি হচ্ছেন সুলতানের সুলতান, আর আমি হচ্ছি গোলামের গোলাম।”
এই কথা বলে তিনি বাবা ভাণ্ডারী (কঃ) থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসতেন।

আল্লামা শাহনগরীর শান বর্ণনা করতে গিয়ে খলিফায়ে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী হযরত মাওলানা মোছহাব উদ্দীন শাহপুরী (রহঃ) বলেন—
“মাননীয় শাহনগরী আউলিয়ার প্রধান,
উলমা দপ্তরে আর গৌরব তাঁহান।”
— রত্নভাণ্ডার

আল্লামা শাহনগরী (রহঃ) দীর্ঘদিন আল্লাহর রিয়াজতে কঠোর সাধনার মাধ্যমে অতিবাহিত করেন। তাঁর সঙ্গে অসংখ্য আউলিয়া কেরাম চলাফেরা করতেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম খলিফায়ে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী মুফতিয়ে আজম সৈয়দ আমিনুল হক ফরহাদাবাদী (রহঃ) মাওলানা বজলুল করিম মন্দাকিনী (রহঃ), মাওলানা রহম আলী (রহঃ), মাওলানা করম আলী (রহঃ), মাওলানা আব্দুল হাদী কাঞ্চনপুরী (রহঃ) সহ অসংখ্য আউলিয়া কেরাম ছিলেন।

লোকমুখে আল্লামা শাহনগরীর অসংখ্য কেরামতের কথা শোনা যায়। তার মধ্যে একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য—
ফটিকছড়ি সিনিয়র মাদ্রাসার সম্মানিত প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা আমিনুল্লাহ সুন্দরপুরী (রহঃ) একদিন ভক্তবৃন্দসহ কোনো এক মাহফিল থেকে আসার সময় পথিমধ্যে আল্লামা শাহনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। আল্লামা শাহনগরী দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাওলানা আমিনুল্লাহ সুন্দরপুরী কাছাকাছি আসলে আল্লামা শাহনগরী তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “মওলানা সাহেব, আমার পায়খানার হাজত হয়েছে, আমার জন্য পানি নিয়ে আসেন।”
এই কথা বলে আল্লামা শাহনগরী জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেলেন। মাওলানা সুন্দরপুরী পানি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলেন। আল্লামা শাহনগরী হাজত শেষ করার পর মাওলানা সুন্দরপুরী নিজ হাতে তাঁকে পরিষ্কার করে দেন।
মাওলানা সুন্দরপুরী যখন আল্লামা শাহনগরীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, তখন পেছনে থাকা এক ভক্ত বলে উঠলেন, “হুজুর, আপনি এই পাগল লোকটাকে কেন পানি দিয়ে পরিষ্কার করে দিলেন?”
ভক্তের কথার উত্তরে মাওলানা সুন্দরপুরী তাঁকে চুপ থাকতে বলেন। কিন্তু ততক্ষণে আল্লামা শাহনগরী সামনে এসে বলে উঠলেন, “মওলানা সাহেব, মানুষ পায়খানা করলেও মরে, না করলেও মরে।”
সুন্দরপুরী তাঁর ভক্তকে বললেন, “তোমাকে আর বাঁচাতে পারলাম না।” সেই রাতে লোকটি পায়খানা বন্ধ হয়ে মারা যায়—এমনটি লোকমুখে বর্ণিত আছে।

আল্লামা শাহনগরীর নিকট গ্রামের মানুষ দুধ, মধু, দইসহ অনেক খাবার নিয়ে আসতেন। তিনি সকল তরলজাতীয় খাবার দিয়ে শরবত তৈরি করে উপস্থিত আশেক-ভক্তদের খাওয়াতেন।
একদিন এক ব্যক্তি কৃষিজমিতে পোকামাকড়ের উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে এক বোতল বিষ নিয়ে আল্লামা শাহনগরীর নিকট দোয়ার জন্য আসেন। তখন আল্লামা শাহনগরী তাঁর আপন ভাতিজা মোহাম্মদ মিয়াকে উদ্দেশ্য করে শরবতে বিষের বোতলটি দিয়ে দিতে বলেন।
তখন আশেক-ভক্ত ছাড়াও মাওলানা মকবুল আলী (রহঃ), মাওলানা আমিনুর রহমান (রহঃ) সহ অসংখ্য আলেম-উলামা উপস্থিত ছিলেন। তাঁর ভাতিজা মোহাম্মদ মিয়া শাহনগরীর হুকুমমতো বিষের বোতলটি শরবতে ঢেলে দেন। এরপর উপস্থিত সকলের মাঝে শরবত বিতরণ করার পর বাকি শরবত সকলের পরিবারের জন্য দিয়ে দেওয়ার হুকুম করা হয়। লোকমুখে বর্ণিত আছে, বিষ মেশানো সেই শরবত পান করেও কারও কোনো ক্ষতি হয়নি।

আল্লামা রিজুয়ান উদ্দীন শাহনগরী (রহঃ)-এর খেদমতে একজন মহিলা নিয়োজিত ছিলেন। তিনি নিয়মিত আল্লামা শাহনগরী (রহঃ)-এর ওজুর পানি গরম করে দিতেন এবং বিভিন্নভাবে তাঁর খেদমত করতেন।
একদিন ওই মহিলা নিজ বাড়ি থেকে আল্লামা শাহনগরী (রহঃ)-এর খেদমতে আসার পথে সন্ধ্যার পর লালপুল নামক স্থানে কয়েকজন দুষ্কৃতকারী তাঁকে আটকে রেখে অশোভন কথাবার্তা বলতে থাকে।
এ অবস্থায় ওই মহিলা আল্লামা শাহনগরী (রহঃ)-কে স্মরণ করে তাঁর সাহায্য কামনা করেন। লোকমুখে বর্ণিত আছে, এরপর ওই দুষ্কৃতকারীরা যেন দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং সারারাত সেই স্থানেই অন্ধের মতো ঘুরতে থাকে। আর ওই মহিলা নিরাপদে আল্লামা শাহনগরী (রহঃ)-এর খেদমতে পৌঁছে যান।
পরবর্তীতে দুষ্কৃতকারীরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয় এবং আল্লামা শাহনগরী (রহঃ)-এর কদম মোবারকে উপস্থিত হয়ে নিজেদের অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।

আল্লামা শাহনগরীর নিকট অসংখ্য আলেম-উলামা আসা-যাওয়া করতেন। তাঁদের মধ্যে যারা শাহনগরীর কাছ থেকে বেলায়েত অর্জন করে কামেল আউলিয়া হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—মাওলানা আমিন ফকির (রহঃ), গোপালঘাটা; মাওলানা আব্দুল গফুর শাহ (রহঃ), ফটিকছড়ি; মাওলানা মকবুল শাহ (রহঃ), গোপালঘাটা; মাওলানা আমিনুল্লাহ সুন্দরপুরী (রহঃ), ফটিকছড়ি—সহ আনেকে রয়েছেন।

এই মহান জাতেপাক ১০ আশ্বিন, ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে, ৭৫ বছর বয়সে ওফাত বরণ করেন।
প্রতি বছর ১৫ মাঘ, ২৯ জানুয়ারি, হুজুর গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী (কঃ)-এর ওরশ এবং আল্লামা শাহনগরীর বেলাদত ও বেলায়েত বার্ষিকী উপলক্ষে ওরশ শরিফ এবং ১০ আশ্বিন বার্ষিক ওরশ শরিফ মহাসমারোহে শাহনগরীর রওজা মোবারক প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

মাইজভাণ্ডারীয়া তরিকার দীপ্ত সূর্য বিশ্বঅলি শাহানশাহ্ হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ইসলাম ধর্মের সাধন-মার্গের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় সুফিতাত্ত্বিক সাধনা তথা সুফিবাদ। এই সুফি সাধনারই একটি বিশেষ ধারা ‘মাইজভাণ্ডারীয়া তরিকা’। এটি ‘মোখালিফাতি নফস বা নফসে ইনসানি’র কু-প্রবৃত্তি বন্ধ করে রূহে ইনসানির সু-প্রবৃত্তি জাগ্রত করার জন্য বিধান শিথিল, সকল ধর্ম গোঁড়ামি মুক্ত, খোদা আনুগত্য সনাতন ইসলামের নৈতিক পুণ্যতাদানকারী, জিকির-ফিকির পদ্ধতি ছাড়াও কর্মে-মর্মে মানবতার উন্নয়নকারী, ব্যবসায়ী পীরত্বের অসমর্থক, কাদেরিয়া, চিশতিয়া, সোহরাওয়ার্দীয়া, মুজাদ্দেদীয়া, মৌলভীয়াসহ সকল তরিকার সংমিশ্রণে উদ্ভূত বাংলাদেশের মাটিতে প্রচারিত বেশ আলোচিত একটি জনপ্রিয় তরিকার নাম।

“গাউসুল আজম হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.) [১৮২৬-১৯০৬] প্রবর্তিত ও প্রতিষ্ঠিত এই তরিকার আধুনিক রূপকার ছিলেন তাঁরই রক্ত আদর্শ এবং বেলায়েতের উত্তরাধিকারী বিশ্বঅলি শাহানশাহ্ হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)। তৎ জামানার তাপসকুলের শিরোমণি এই মহান সাধকের ২৬ আশ্বিন পবিত্র বার্ষিক ওরশ শরীফ উপলক্ষে কিঞ্চিৎ স্মৃতিচারণ।

পবিত্র নাম মোবারক: বিশ্বঅলি শাহানশাহ্ হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)।পিতা: অছিয়্যে গাউসুল আজম খাদেমুল ফোকরা হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.) [১৮৯৩-১৯৮২]।

জন্ম: ১০ পৌষ ১৩৩৫ বঙ্গাব্দ, ১২ রজব ১৩৪৭ হিজরী, ২৫ ডিসেম্বর, ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ।স্থান: গাউসিয়া আহমদিয়া মনজিল, মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম।মাতা: গাউসুল আজম বিল বিরাসত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ গোলাম রহমান মাইজভাণ্ডারী প্রকাশ: হযরত বাবা ভাণ্ডারী (ক.)’র [১৮৬৫-১৯৩৭] দ্বিতীয় শাহজাদী ‘উম্মুল আশেকীন সৈয়দা সাজেদা খাতুন (র.)’ [-১৯৬৮]।

পিতামহ: প্রথম মোতাওয়াল্লি-এ-দরবার, বেলায়েতে মা’আবে শাহজাদা হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ ফয়জুল হক ফানা-ই ওয়াসেল মাইজভাণ্ডারী (ক.) [১৮৬৫-১৯০২]।প্র-পিতামহ: বাংলার মাটিতে প্রবর্তিত একমাত্র তরিকা, বিশ্বসমাদৃত ‘তরিকা-ই-মাইজভাণ্ডারীয়া’র প্রবর্তক গাউসুল আজম হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.) [১৮২৬-১৯০৬]।

শিক্ষা জীবন

জীবন ও জগতকে জানার প্রয়োজনে শিক্ষার ভূমিকা অপরিহার্য। হযরত গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.)’র দোয়ার মেহেরাব নামীয় হুজরা শরীফে মহান অলিয়ে কামেল পিতার মুখে মুখেই প্রথম ‘রব্বী যিদনী ইলমা’ বলে শিক্ষা জীবনে যাত্রা শুরু করেন। গৃহ শিক্ষক মাওলানা মোজাম্মেল হক সাহেবের নিকট আরবি ও মাইজভাণ্ডার আহমদিয়া জুনিয়র মাদ্রাসায় পিতার তত্ত্বাবধানে তৃতীয় শ্রেণি পাশ করার পর ১৯৪১ সালে মাওলানা মোজাহেরুল হক (বিএবিটি) সাহেবের সাথে তাঁরই তত্ত্বাবধানে ফটিকছড়ি করোনেশন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়স্থ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন।

অনুধর্ব ১ বছর অতিক্রান্তান্তে ঐ শিক্ষক বিএবিটি সাহেবের আকস্মিক মৃত্যুএ আবার বাড়ি ফিরে পার্শ্ববর্তী নানুপুর আবু সোবহান উচ্চ বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ঐ স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে কৃতিত্ব রাখেন। উল্লেখ্য যে, তখন চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পিতার আগ্রহে আরো উচ্চ শিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম কলেজিয়েট হাই স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি ও ১৯৪৭ সালে যুদ্ধকালীন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান দৈনিক পাঞ্জাবী পত্রিকায় ১৯৪৮ সালের ৩১ আগস্ট এস এস সি পরীক্ষায় কৃতিত্বের ফলাফল প্রকাশিত হয়। পরে চট্টগ্রাম গভর্নমেন্ট কলেজ হতে ১৯৫১ সালে আই এ পাশ করেন।

১৯৫৩ সালে বি এ পরীক্ষার তৃতীয় দিনে দৈবিক সূত্রে আধ্যাত্মিক প্রভাব প্রকাশ পেয়ে গেলে সাদা খাতা জমা দিয়ে পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে খোদায়ী পরীক্ষায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৫৩ সালে বাড়ি ফেরার কিছুদিন পর তিনি আহার নিদ্রা একেবারেই ত্যাগ করেন। আধ্যাত্মিক বিভোরতাক্রমশঃ এতই বৃদ্ধি পেতে লাগলো যে, সামনে যাকে পান তাকে মারতে লাগলেন। “নামাজ-কালাম না পড়ে কিসের এতো নাচানাচি” ইত্যাদি বকাঝকা করে মানুষকে সামনে থেকে তাড়াতে লাগলেন।

এমতাবস্থায় পিতার কাছে অভিযোগ গেলে পিতা কারণ জিজ্ঞাসা করেন। উত্তরে তিনি কিছু একান্ত প্রশ্ন করার অনুরোধ করেন। পিতা অনুমতি দিলে হুজরা শরীফের দরজা বন্ধ করে পিতার কাছে প্রশ্ন করলেন—

  1. “হযরত কেবলা কে? বাবাজান কেবলা কে?”পিতা জবাব দেন, “আল্লাহর অলি-দু’য়ে মিলে এক।”পুত্র আবার প্রশ্ন করেন, “আপনি কে?”তিনি উত্তর দেন, “আমি হযরতের অছি। আর বাবাজান কেবলার ফয়েজপ্রাপ্ত। তাঁরা আমার মধ্যে আছেন।”

পুনঃ কী যেন প্রশ্ন করলেন (অশ্রুত)। এতে পিতা উচ্চস্বরে (রাগতে) বলেন—

“আমাকে এখনও চিন নাই? আমি কে তা কি দেখবে?”

তারপর অনেকক্ষণ নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ।

দরজা খুলে দিলে বাইরের অবস্থানরত লোকেরা দেখে পিতার মুখমণ্ডল রক্তিম লালিমাময়। পুত্র দু’হাতে ভর দিয়ে মুখ নিচু করে বসে আছেন, ভীত-বিহ্বল, মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। পিতা খাদেমদের নির্দেশ দিলেন, “ওকে অন্দর বাড়িতে নিয়ে যাও।”

ধরাধরি করে তাঁকে মায়ের বিছানায় নিয়ে শোয়ানো হলো। ছেলের অবস্থায় মা রুদ্ধবাক। সেবিকারা মাথায় পানি ঢালতে লাগলো। বহুখণ পর কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেন। কিন্তু রাতে ঘুম হয় না। এ ঘর ও-ঘর ছোটাছুটি করেন। বাবার হুজরায় গিয়ে বারবার ডাকতে থাকেন। পিতার স্নেহভরা কণ্ঠ, “ঘুমাতে যাও।”

বায়াত ও খেলাফত

বুযুর্গ পিতার ব্যবস্থাপনায় তৎকালীন আন্দারকিল্লা শাহী জামে মসজিদের খতিব আযম আল্লামা সফিরুর রহমান হাশেমী (র.) সাহেবের উপস্থিতিতে মাইজভাণ্ডারীয়া তরিকার প্রবর্তকের দোয়ার মেহরাবে (গদি শরীফে) তরিকার নীতি অনুসারে “সবক” পাঠান্তে আপন পিতার হাতে বায়াত হন।

১৯৬৬ সালে ২২ জানুয়ারি, ৯ মাঘ ১৩৭৩ বাংলা, হযরত গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর ওরশ শরীফের পূর্বদিন দেশ-বিদেশ থেকে আগত মেহমানগণের উপস্থিতিতে আধ্যাত্মিক পিতা ও জাগতিক হযরত অছিয়্যে গাউসুল আজম সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.) তদীয় মুর্শিদ ও ‘তরিকা-ই-মাইজভাণ্ডারীয়া’র প্রবর্তক গাউসুল আজম হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর স্বপ্নাদেশ—“জিয়াউল হক মিঞার আমানত তাঁকে অর্পণ করুন”—পালনার্থে হযরত গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর গদি শরীফে বসিয়ে খেলাফতের এ মহান খোদায়ী গুরু ভার গ্রহণ করেন।

সংসার জীবন

১৪ মাঘ, ১৩৬২ বাংলা, ৮ জানুয়ারি ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ মঙ্গলবার, নিজ পিতার সনামধন্য মুরিদ চট্টগ্রাম ফটিকছড়ির প্রখ্যাত জমিদার জনাব বদরুজ্জামান সিকদার সাহেবের কনিষ্ঠ কন্যা মোহাম্মদ মুনওয়ারা বেগমের সঙ্গে এ মহান সাধকের জীবন পরিচয় সূত্র ঘটে।

রিয়াজত-সাধনা

রিয়াজতকালীন সময়ে তিনি যে দুঃসাধ্যময় ত্যাগ স্বীকার করেছেন বর্তমান সময়ে তাঁর এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই। যেমন—বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে চট্টগ্রাম প্রদক্ষিণ। কক্সবাজারের সৈকতে অদৃশ্য হয়ে দুই তিন ঘণ্টা পর ফিরে আসা। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবানসহ চট্টগ্রামের গহীন অরণ্যে চার-পাঁচ দিনের জন্য নিখোঁজ হয়ে ভক্তদের কাছে ফিরে আসা। পৌষ-মাঘ মাসের শীতকালে পার্শ্বস্থ লোহার খালে (পরিত্যক্ত) অনেক দিন নাক দেখা দিয়ে সমস্ত শরীর ডুবিয়ে রাখা ইত্যাদি। এভাবে অসংখ্য কঠোর রিয়াজতের মাধ্যমে তিনি অধ্যাত্ম পথের শেষ স্তর পাড়ি দিতে সক্ষম হয়েছেন।

সাধনাকালে জীবনের ১৩টি বছর মহান আল্লাহর প্রেমে এমন বিভোরভাবে কাটিয়েছেন যে পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজনরা তৎসময়ে পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠান। দীর্ঘ ৬ মাস অত্যন্ত কষ্টের সময় কাটাতে হয়েছিল এ মহান সাধকের। দশ দশটি বৈদ্যুতিক শক দিয়ে শরীরকে আগুনছেঁকা করার পর ডাক্তারগণ বলতে বাধ্য হলেন—“তিনি আত্মা বিলোপের সকল স্তর অতিক্রম করে স্রষ্টার স্থায়ী প্রেমে বিমুগ্ধ হয়ে বিশুদ্ধ আনন্দ বোধের শেষ স্তরে ‘বাকা বিল্লাহ’ উন্নীত হয়ে গেছেন।” আপনারা এই মহান সাধককে বাড়ি নিয়ে যান, কারণ তিনি সাধারণ পাগলদের মতো নন।

বাংলাদেশের পাহাড়, পর্বত, শহর নগরের সর্বত্র তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। ১৯৫৪ সাল হতে ওফাতপূর্ব পর্যন্ত এক রাত ঘুমিয়ে কাটাতে প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ দেখেননি। এমন কঠোর রিয়াজত-সাধনার মাধ্যমে মহান রাব্বুল আলামীনের এতই নৈকট্য হাসিল করেছেন যে, নিজ জবানীতে তা এভাবে প্রকাশ করেন—

“হে বিশ্ববাসী! আমার দিকে তাকাও। আমাকে বুঝতে হলে কোরআন দেখ।”

“আকাশের উপরে বসে আমি মানুষের কাজকর্ম দেখি আর উপরের দিকে আল্লাহর সাথে কথা বলি।”

“রহমাতুল্লিল আলামীন রাসূলের রহমতের সীমা জুড়ে আমার বেলায়তী কর্ম-ক্ষমতা।”

নিজের অবস্থা এবং অবস্থানকে স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি আরো ঘোষণা করেন—

“আমার দরবার আন্তর্জাতিক প্রশাসন অফিস, সেখান থেকে এ বিশ্ব পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়।”

“আমার তরিকা দুই পয়সার তরিকা নয়, আমার তরিকা কোটি কোটি গুণ বড়।”
কারামত

তাঁর জীবনী গ্রন্থে প্রায় ১৩৪টির বেশি কারামত উল্লেখ থাকলেও তেল ছাড়া গাড়ি চালানোর কথা এবং তাৎক্ষণিক মানুষের হাজত মকসুদ পূরণে অকাতরে দান দক্ষিণা সহযোগিত মানবতার কথা বেশ উল্লেখযোগ্য।

ওয়ারিশান / ওফাত

তিনি ৫ কন্যা সন্তান ও একমাত্র (বর্তমান মাইজভাণ্ডার শরীফ গাউসিয়া হক মঞ্জিলের সাজ্জাদানশীন) পুত্র সন্তানের কাছে এই সুবিশাল দরবারে পাকের গুরু দায়িত্বভার অর্পণ করে এ মহান অলি ওফাত লাভ করেছেন ১৩ অক্টোবর ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ, ২৬ আশ্বিন ১৩৯৫ বাংলা, ১ রবিউল আউয়াল ১৪০৯ হিজরি, বুধবার।

পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণের সময় তাঁর বিছানা ছিল জিকিরের বিছানা। যেভাবে তাঁর পুরা জীবন ছিল জিকিরের জীবন। তিনি ওফাত লাভ করেছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর হাসপাতালে। তখন তাঁর কণ্ঠে ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ শব্দ ধ্বনিত হচ্ছিল। হাসপাতালে উপস্থিত সঙ্গী-সাথী, পরিবারের সদস্য, ডাক্তার, নার্স, কর্মচারী-কর্মকর্তা, ভক্তবৃন্দ, সবাই একযোগে তাঁর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ জিকির করছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে তাঁর অন্তিম মুহূর্ত ছিল জিকিরে মুখরিত এক রাজকীয় অভিবাত্রা। ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’

চট্টগ্রামের বহুল প্রচারিত ‘আজাদী’ ও ‘পূর্বকোণ’সহ বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকার ভাষ্যমতে এটি ছিল দেশের দরবার শরীফসমূহের মধ্যে স্মরণকালের বৃহত্তম নামাযে জানাযা।

১৪ অক্টোবর ‘দৈনিক আজাদী’ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ৩ কলামব্যাপী সংবাদের শিরোনাম ছিল এ রকম—

‘জানাযায় পাঁচ লক্ষাধিক লোকের সমাবেশ—শাহানশাহ্ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারীর দাফন সম্পন্ন।’

মাইজভাণ্ডার শরীফ গাউসিয়া হক মঞ্জিলের উদ্যোগে প্রতি বছর ২৬ আশ্বিন, ১১ অক্টোবর মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে তাঁর বার্ষিক ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়।

সুফিবাদী লেখক ও গবেষক।

ফটিকছড়ির দক্ষিণ ভুইয়া গাজীর বাড়ীতে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী ও ফাতেহা-এ ইয়াজদাহুম

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

: প্রখ্যাত পীরে দস্তগীর, সৈয়্যদুল আজম, গাউসুল আজম, গৌছে জামান, কুতুবুল আকতাব হযরত শাহ মাওলানা ক্বারী হাকিম হাফেজ মোহাম্মদ বজলুল রহমান (রহঃ) এবং কুতুবে জামান রাহনুমায়ে শরিয়ত ও ত্বরীকত মুর্শিদে বরহক, হযরতুলহাজ্ব মাওলানা শাহ মুহাম্মদ জিলুর রহমান (আলী শাহ) (রহঃ)’র বার্ষিক ফাতেহা এবং বাড়ীর সকল মরহুম মুরুব্বিগণের ইছালে সাওয়াব উপলক্ষে আজিমুশ্শান নূরানী মাহফিল গত শনিবার (৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ফটিকছড়ির দক্ষিণ ভুইয়া গাজীর বাড়ীতে অনুষ্ঠিত হয়।

মাহফিলে প্রধান অতিথি ছিলেন, বেতাগী আস্তানা শরীফরে সাজ্জাদানশীন হযরত মাওলানা মুহাম্মদ গোলামুর রহমান (আশরফ শাহ্) মাঃজিঃ আলী। দক্ষিণ ধর্মপুর আধু ওসমান শাহি জামে মসজিদের খতিব মাওলানা মোহাম্মদ হারুন রশীদ আলকাদেরীর সভাপতিত্বে মাহফিলে প্রধান বক্তা ছিলেন, আজিমনগর মাদ্রাসায় গাউসুল আজমের আরবি প্রভাষক হযরতুল আল্লামা মুজিবুল হক মাইজভাণ্ডারী। জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আব্দুল আজিজের পরিচালনায় মাহফিলে ফটিকছড়ির দক্ষিণ ভুইয়া গাজীর বাড়ীর পরিবারবর্গ ও এলাকার সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

আলোচিত খবর

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায়

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছেছে । আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইড মিটিং এ দুই দেশের মধ্যে এ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ বিষয়ে বক্তব্য স্পষ্ট, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ