এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

মানুষ জীবন বাঁচাতে নানা খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করে। শিশুরাও নানা খাবার খায়। জন্মের পর একটি শিশু প্রথম ৫/৬ মাস কেবল মায়ের বুকের দুধ পান করে। ৬ মাস পেরুলে শিশুরা অল্প অল্প করে মাতৃদুগ্ধের পাশাপাশি হাল্কা খাবারে অভ্যস্ত হয়। কয়েক দিন আগে ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় লিড নিউজের শিরোনাম ছিল : ৪৫ ভাগ শিশু ঠিকমতো মায়ের দুধ পায় না। অভিভাবকরা শিশুদেরকে অপ্রয়োজনীয় ফুড সাপ্লিমেন্ট খাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

শিশু খাদ্যে বিষ ও ভেজালের ছড়াছড়ি নিয়ে প্রায়ই গণমাধ্যমে নানা খবর প্রকাশিত হয়ে আসছে। শিশুদেরকে মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে বাজারের টিনের দুধে অভ্যস্ত করা অবশ্যই বর্জনীয়। তা জেনেও এক শ্রেণির ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে বেবি ফুড লিখে দিচ্ছে। অথচ মায়ের দুধে যে পুষ্টিগুণ রয়েছে, তা এই বেবি ফুডে নেই। অন্যদিকে বাজার থেকে অভিভাবকরা শিশুদের জন্য যে খাবার কেনে তাও যেন বিষ ও ভেজালে ভরা। শিশু খাদ্যে ভেজাল রুখতে অভিভাবকদের মধ্যে যে ধরনের সচেতনতা ও সতর্কতা দরকার, তা আমাদের দেশে এখনো গড়ে উঠেনি। ফলে শিশুদের স্বাস্থ্যহানি রোধ করা যাচ্ছে না।
বাজারে শিশুদের জন্য উপাদেয় চিপস, কেক, চকলেট, আচার, বিস্কুট, ঝালমুড়ি, চানাচুরসহ যা মুখরোচক খাবারের ছড়াছড়ি আমরা দেখে আসছি তা অনেকটাই ভেজালে ঠাসা। অলিগলিতে ছোট-বড় দোকানগুলোতে চকলেট, মিমি চকলেট, ওয়েফার বিস্কুট, জেলি আচার বিষাক্ত রঙ মিশানো হাতে বানানো আইসক্রিম, জেলি লিচু নামক অখাদ্য নানান সামগ্রী প্রতিনিয়ত শিশুরা খাচ্ছে। তা খেয়ে শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ভেজাল খাদ্য খাওয়ার ফলে বদহজম, গ্যাস্ট্রিক, আলসার, পেট ফাঁপাসহ নানা জটিল রোগ-ব্যাধি শিশুদের মাঝে বাসা বাঁধছে। অনেকের লিভার ও কিডনি নষ্ট হচ্ছে ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে।

শহর নগরে এমনকি গ্রামের স্কুল, কিন্ডার গার্টেন, মাদ্রাসার শিশু শিক্ষার্থীরা স্কুলের বাইরে থাকা আচার, ঝালমুড়ির ভাসমান দোকানগুলো থেকে এসব ভেজাল খাবার কিনে খাচ্ছে। ফলে এসব খেয়ে তারা নানা অসুখে ভুগছে। মেয়াদোত্তীর্ণ আচার কিংবা ঝালমুড়ি যে কতটা বিষাক্ত ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সে ব্যাপারে অনেক শিক্ষক অভিভাবক সচেতন নন। এসব মুখরোচক ভেজাল খাবার থেকে শিশুদের ফিরিয়ে আনতে স্কুলে স্কুলে শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।
স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসন চাইলে এসব ভেজাল খাবার বিকিকিনি বন্ধ করতে পারে। কিন্তু এ ধরনের কোনো উদ্যোগই দেখা যায় না। সবচেয়ে uh হলো, চিপস, বিস্কুট, চানাচুরসহ নানা শিশু খাদ্যে উৎপাদনের তারিখ এবং মেয়াদোত্তীর্ণের যে তারিখ দেয়া হয় তা অবাস্তব ও ত্রুটিপূর্ণ। একটি ১০/২০ টাকার বিস্কুট কিংবা ১০/২০ টাকা দামের চিপসের মেয়াদোত্তীর্ণের সময়সীমা থাকে এক দেড় বা দুই বছর। কোনো উন্নত দেশে এই নিয়ম নেই। কেবল ব্যতিক্রম আমাদের এই স্বদেশ।
এদেশে শিশু খাদ্যসহ নানা খাদ্যপণ্যের মেয়াদ উত্তীর্ণের সময়সীমা এত দীর্ঘ থাকে যে, এর আগেই খাদ্যপণ্যগুলোর গুণগত মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। একটি খাদ্যপণ্যের মেয়াদ এক দেড় বা দুই বছর লেখা থাকে খাদ্যপণ্যের মোড়ক বা প্যাকেটে। অবাস্তব এই দীর্ঘ মেয়াদের কারণে খাদ্যপণ্যগুলো এর আগেই পচে যায়, নষ্ট হয়ে যায়। এ ধরনের বাসি মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার খেয়ে শিশুসহ সব বয়সী মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
খাদ্যপণ্য দেখভালের জন্য নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বা বিএসটিআই নামে সরকারের একটি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আছে। খোদ এই সংস্থার বিরুদ্ধে বড় দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ আছে। উৎকোচ ও ঘুষের বিনিময়ে এই বিএসটিআই খাদ্যপণ্যের হালাল সনদ দেয়। মেয়াদোত্তীর্ণের সনদও দেয় এই সংস্থাটি। কিন্তু অনেক সময় এই সনদের কার্যকারিতা থাকে না। ঘুষের বিনিময়ে খাদ্যপণ্যের মেয়াদ লিখে দিয়েই দায় সারে বিএসটিআই। বাজার থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য তুলে নেয়া বা পণ্যের গুণমান কতটা রক্ষা করা হচ্ছে তা মোটেই তদারকি করা হয় না। ফলে এসব মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য খেয়ে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে।
অবাক ব্যাপার যে, ৩০ টাকা দামের এক কাপ আইসক্রিমের মেয়াদ লেখা থাকে এক দেড় বছর। ১৫০ টাকা দামের ৫০০ গ্রাম আইসক্রিম কিংবা ৩০০ টাকা দামের ১ লিটার আইসক্রিমের মেয়াদ লেখা থাকে এক-দেড় বছর। ফ্রিজে রাখা হলেও এই আইসক্রিম এক দেড় বছর পর্যন্ত অক্ষত, নিরাপদ ও খাওয়ার উপযোগী থাকবে তা কখনো কল্পনাই করা যায় না। এই আইসক্রিমের মুদ্রিত মেয়াদের সময়সীমা পেরুনোর আগেই তা খাবার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অথচ তা আমরা নির্দ্বিধায় খেতে বাধ্য হচ্ছি। বিএসটিআই তা দেখেও না দেখার ভান করে। বাজারে তাদের তদারকি মোটেও লক্ষ্য করা যায় না। ফলে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্যই যেন ভোক্তাদের একমাত্র ভরসা। বিএসটিআই যদি তাদের ওপর অর্পিত বাজার তদারকির দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতো তবে পরিস্থিতি এতটা অসহনীয় হয়ে উঠতো না। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিএসটিআই পুরোপুরি ব্যর্থ। মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য বাজার থেকে তুলে নিতে তারা মোটেই উদ্যোগী নয়। এ বিষয়ে পত্রিকায় অভিযোগ তুললে বিএসটিআইয়ের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা তাদের জনবলের অভাবকে দায়ী করে দায়মুক্ত হবার চেষ্টা করে। ভোক্তাদের জীবন-বাঁচার প্রশ্ন এই ভেজাল খাদ্যপণ্য। এটি অন্য দশটি সাধারণ সমস্যার মতো নয়। ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য যখন মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন তো নীরবতা পালনের কোনো সুযোগ নেই। এখানে বাঁচা-মরার প্রশ্ন জড়িত। বিএসটিআই কেন ভেজাল ও বিষে ভরা পণ্য বাজার থেকে তুলে নেবে না? কেন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে এই সংস্থার নিস্পৃহ ভূমিকা আমাদের চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে?
একটি পাউরুটির মেয়াদ রাখা হয় সাধারণত ৪/৫/৬ দিন। এই পাউরুটির মেয়াদ দুদিনের বেশি রাখা ঠিক নয় জেনেও পাউরুটি যারা তৈরি করে তারা অযৌক্তিক বাড়তি সময় গায়ে লিখে দেয়। এক প্যাকেট তরল দুধ ফ্রিজে রাখলেও দুই-তিনদিনের বেশি তরতাজা থাকার কথা নয়। তবুও দুধের মোড়কে ৫/৬/৭ দিন মেয়াদ লেখা থাকে। এমনকি মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এই দুধ বা পাউরুটি ভোক্তাদের খাওয়ানো হচ্ছে নানা কৌশলে। পাউরুটির মেয়াদের লেবেল পাল্টে ফেলা যায়। বাসি পাউরুটি স্টিকার পাল্টে দিয়ে অবলীলায় ভোক্তাদের খাওয়ানো হচ্ছে। কে দেখবে এসকল অনিয়ম-অপরাধ!
শিশু খাদ্য হিসেবে টিনের যে দুধ পাউডার বাজারে সরবরাহ করা হয় তাও শতভাগ শিশুদের খাওয়ার উপযোগী নয়। নিম্ন মানের ভেজাল শিশু খাদ্য শিশুদের খেতে হচ্ছে। ফলে শিশুরা নানা জটিল কঠিন রোগের শিকার হচ্ছে। শুধু শিশুখাদ্য দুধ নয় বাজারে থাকা প্রায় সকল খাদ্যপণ্যে ভেজাল ধরা পড়ে সরকারি নানা অভিযানে। হলুদ মরিচ গরম মসলার গুঁড়ো, কলাসহ মৌসুমী ফল ছাড়াও বিভিন্ন ফলসহ ক্ষতিকারক উপাদান ব্যবহার করে। এমনকি মাছ মুরগী খাদ্যেও ভেজাল হচ্ছে। অনেক সময় দোকানদারদের সামান্য জরিমানা করে ছেড়ে দেয়া হয়। মাঝে মাঝে ভেজাল বিরোধী অভিযান সত্ত্বেও ভেজাল বিষে ভরা খাদ্যপণ্য থেকে আমাদের তবুও নিষ্কৃতি মেলে না। বাজারে যে নামকাওয়াস্তে অভিযান চালানো হয় তা যথেষ্ট নয়, বরং কালেভদ্রে এ অভিযানের কোনো সুফলই পায় না ভোক্তারা। আমাদের সমাজের কম-বেশি অনেকের নৈতিক মান অনেক নিচে নেমে এসেছে। অনেকেই ধর্মের রীতি-নীতি মেনে চলেন না। নীতি-নৈতিকতার ধার ধারে না অনেকেই। ফলে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে অবক্ষয় প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। খাদ্যে ভেজাল মেশানো নৈতিকতারই ঘাটতির জানান দেয়। অতএব, বাজার থেকে ভেজাল খাদ্যপণ্য তুলে নিতে বিএসটিআইসহ সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য কঠোর আইন প্রণয়ন ও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিএসটিআইয়ের জনবল বাড়িয়ে সংস্থাটিকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়ে ভেজাল খাদ্যপণ্য বিকিকিনি প্রবণতা রুখতে হবে। না হয় ভেজাল খেয়ে আধমরা-অর্ধমৃত মানুষ হিসেবে জীর্ণশীর্ণ হয়ে বেঁচে থাকা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকবে না।
লেখক : ফটো জার্নালিস্ট, প্রাবন্ধিক






