রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে জনবল সংকটে ৫৩টি রেলস্টেশন বন্ধ

দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় স্টেশনের মূল্যবান সরঞ্জাম ও সম্পদ চুরির ঝুঁকি

চট্টগ্রাম ব্যুরো

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে সেবার মান দিনে দিনে গতি হারাচ্ছে। যার ফলে বন্ধ রয়েছে পূর্বাঞ্চলের ৫৩টি রেলস্টেশন। বিশেষ করে স্টেশন মাস্টার থেকে শুরু করে গেটকিপার, পয়েন্টসম্যান ও লোকোমাস্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ট্রেন পরিচালনা ও যাত্রীসেবা।রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনবল সংকটের কারণে কর্মরতদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়ছে। কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মী না থাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

জানা গেছে, পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে মোট জনবলের প্রায় অর্ধেকই শূন্য। বিশেষ করে গেটকিপার ও পয়েন্টসম্যান সংকটের কারণে রেলক্রসিং এবং স্টেশন পরিচালনায় বাড়ছে ঝুঁকি। অন্যদিকে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক লোকোমাস্টার থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে কর্মরত চালকদের। এতে ট্রেনের সময়সূচি ঠিক রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

পূর্বাঞ্চল চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্টেশন মাস্টার (গ্রেড-১) পদে ২৭টি অনুমোদিত পদের একটিতেও কর্মকর্তা নেই। গ্রেড-২ এর ৬৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। অর্থাৎ এই গ্রেডে ৬৩টি পদই শূন্য। স্টেশন মাস্টার (গ্রেড-৩) পদে ১৫৬টির মধ্যে কর্মরত ১৩৪ জন, শূন্য ২২টি। গ্রেড-৪ এর ২৪৫টি পদের মধ্যে কর্মরত ৬৬ জন, শূন্য ১৭৯টি। এছাড়া সহকারী স্টেশন মাস্টারের ৩৬৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৪৭ জন, শূন্য ২১৯টি। কেবিন মাস্টারের ৪০টি পদের মধ্যে কর্মরত ১৭ জন, শূন্য ২৩টি। সবচেয়ে বেশি সংকট গেটকিপার ও পয়েন্টসম্যান পদে। ৪৫০টি গেটকিপার পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৯৪ জন, শূন্য ২৬৫টি। আর ৯৮৫টি পয়েন্টসম্যান পদের মধ্যে কর্মরত ৫৫৮ জন, শূন্য রয়েছে ৪২৭টি।

এদিকে এমন জনবল সংকটে পূর্বাঞ্চলে বন্ধ রয়েছে ৫৩টি রেলস্টেশন। এর মধ্যে ৫১টি সম্পূর্ণ এবং দুটি আংশিক বন্ধ। স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যান না থাকায় অনেক স্টেশনের সিগন্যাল রুম ও টিকিট কাউন্টারে তালা ঝুলছে।যার ফলে রেলস্টেশন বন্ধ থাকায় যাত্রীসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় এসব স্টেশনের মূল্যবান সরঞ্জাম ও সম্পদ চুরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঢাকা বিভাগের ৩২টি স্টেশন সম্পূর্ণ এবং দুটি আংশিক বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিভাগের ১৯টি স্টেশন সম্পূর্ণ বন্ধ। চট্টগ্রাম বিভাগের বন্ধ স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে-বাড়বকুন্ড, বারৈয়াঢালা, মিরসরাই, মস্তাননগর, মুহুরীগঞ্জ, কালিদহ, শশদী, নাওটি, আলীশহর, ময়নামতি, ঝাউতলা, সরকারহাট, কাঞ্চননগর, ধলঘাট, দৌলতগঞ্জ, খিলা, বজরা, শাহাতলী ও চিতোষী রোড।বিভাগীয় পরিবহন বিভাগ বলছে, জনবল সংকটের কারণেই এসব স্টেশন চালু করা যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জনবল নিয়োগ হলে পর্যায়ক্রমে বন্ধ স্টেশনগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এদিকে জনবল সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে ট্রেন পরিচালনাতেও। পূর্বাঞ্চলে ১২০ জন লোকোমাস্টারের প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৬৫ জন। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক লোকবল দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে।রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, লোকোমাস্টারদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য আগে মাইলেজসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হতো। এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত ডিউটি করতেও অনীহা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ট্রেনের সময়সূচিতে।

লোকোমাস্টার মো. ওমর ফারুক বলেন, মাইলেজসহ বেশ কিছু সুবিধা বাতিল হওয়ায় লোকোমাস্টাররা অতিরিক্ত ডিউটি করতেও অনীহা প্রকাশ করছেন। আগে জনবল সংকট থাকায় নিয়মিত ডিউটির পরও আমরা অতিরিক্ত কাজ করতাম। এর জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হতো। এখন সেগুলোও নেই।তিনি বলেন, রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী ১০০ মাইল বা আট ঘণ্টা ট্রেন পরিচালনার জন্য রানিং স্টাফরা এক দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ রানিং ভাতা বা মাইলেজ পেতেন। বর্তমানে সেই সুবিধা নেই।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে; চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে চট্টগ্রাম নগরের জেএম সেন হলে শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করে অংশ নেননি। সবার লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বাধীন করা, গণতন্ত্র রক্ষা করা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।তিনি বলেন, আমরা মুসলমান হই, হিন্দু হই, বৌদ্ধ হই কিংবা খ্রিস্টান হই, ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের নাগরিক।

যে ধর্মেরই হই না কেন, যেহেতু এই দেশে আমরা জন্মেছি, এই দেশে বড় হচ্ছি, তাই আমাদের পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে লাখ লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

অনেকে শহীদ হয়েছেন। সেদিন কেউ দেখেননি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ কিংবা কে খ্রিস্টান। সবাই দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্য নিয়ে লড়াই করেছেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষা ও জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে রাজপথে নেমেছেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। গুলিবিদ্ধ কিংবা আহত ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় জানতে চেয়ে কেউ তাঁদের পাশে দাঁড়াননি। হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, আমার ভাই শহীদ হয়েছে, আমার ভাই আহত হয়েছে। বাকিরা তাঁদের ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। কেউ জিজ্ঞেস করেননি, কী তাঁর ধর্ম পরিচয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মানুষের অধিকার ও মানবিকতার প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য নয়।প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের বিচার করা উচিত নয়।

তিনি নিজেকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁকে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে হয়েছে। বাংলাদেশে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হলেও লন্ডনে অবস্থানের সময় সেই পরিচয় তাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠ করেনি। তাই সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু পরিচয় নয়, একজন মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তারেক রহমান বলেন, দেশের আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র একজন নাগরিককে যে অধিকার ও সুযোগ দেবে, অন্য নাগরিকও তা পাবেন। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও অধিকার খর্ব করা যাবে না।

মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব আন্দোলনে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সবাই শান্তিতে বসবাস করবেন এবং মিলেমিশে থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে যদি সেই বাংলাদেশ গড়তে হয়, আপনাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই। আপনি হিন্দু হোন, মুসলমান হোন, বৌদ্ধ হোন কিংবা খ্রিস্টান হোন, যাই হোন না কেন, আপনার সহযোগিতা আমার দরকার। কারণ আপনার সহযোগিতা ছাড়া আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব না।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীমসহ বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য ও নেতারা।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলে প্রতিদিন ব্যয় ৫৪ লাখ, গড়ে আয় ১১ লাখ টাকা

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পর্যটন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খোলার প্রত্যয় নিয়ে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা হয়েছিল। ১০ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে টানেলটিতে ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর গাড়ি চলাচল শুরু হয়। যেখানে ২০২৫ সালে প্রতিদিন গাড়ি চলাচল করার কথা ছিল ২৮ হাজার ৩০৫টি। সেখানে চলেছে মাত্র ৩ হাজার ৮৭২টি, যা প্রত্যাশার মাত্র ১৪ শতাংশ। একই বছর আয় হওয়ার কথা ছিল ৪০০ কোটি। বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ৩৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। টানেলটি সচল রাখতে গত তিন বছরে লোকসান গুনতে হয়েছে ৪০৯ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেছেন, সমীক্ষায় ট্রাফিক বেশি দেখানো হয়নি। তখন ধারণা করা হয়েছিল, টানেল নির্মাণের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক হয়ে যাবে। কিন্তু কভিড মহামারী, আর্থিক বিষয় ও সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে টানেলের কাজ যে গতিতে এগিয়েছে, আনুষঙ্গিক কাজগুলো সে গতিতে এগোয়নি।

এদিকে লোকসান কমাতে সেতু কর্তৃপক্ষ ১০টি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে। এর মধ্যে সিসিসিসির সঙ্গে করা ৯৮৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি থেকে জনবল ও ব্যয় কমিয়ে ১২৩ কোটি টাকা সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আনোয়ারা-বরকল-গাছবাড়িয়া সড়ক এবং আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া সড়ক প্রশস্তকরণ ও কর্ণফুলী ড্রাই-ডক এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আনোয়ারা প্রান্তে সাতটি নতুন জেটি নির্মাণ।

এগুলো চালু হলে টানেল থেকে বছরে ২০০ থেকে ২৪০ কোটি টাকা অতিরিক্ত টোল আদায় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি চায়না ইকোনমিক জোন ও কোরিয়ান ইপিজেডের কার্যক্রম গতিশীল করা এবং দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক টানেল দিয়ে চলাচলে উদ্বুদ্ধ করতে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদন, ২০১৩ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে টানেলের প্রাক্কলন ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের এই ফারাক পাওয়া গেছে। যৌথভাবে কর্ণফুলী টানেলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছিল চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) ও হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওভি আরুপ।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষার এই ত্রুটি, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আর্থিক লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। জানতে চাইলে সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বললেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার (ফিজিবিলিটি স্টাডি) মধ্যেই যত ধরনের সমস্যা, এটি খুব পরিষ্কার। বিগত দিনে এ ধরনের বড় প্রকল্প কেন নেওয়া হয়েছিল, তা জনগণের কতটা কাজে লাগল এবং ভুলটা কোথায় ছিল— এটি কি স্রেফ ভুল ছিল, নাকি অপরাধ ছিল, তা খতিয়ে দেখা হবে।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, টানেল পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে বছরে ব্যয় হবে ৩২ থেকে ৪৫ কোটি টাকা। সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিসিসি) সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য ৯৮৪ কোটি টাকার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি করা হয়েছে।
চুক্তিমূল্য অনুযায়ী, টানেল সচল রাখতে বছরে ব্যয় দাঁড়ায় ১৯৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রতিদিনে ব্যয় হচ্ছে ৫৪ লাখ টাকা। বিপরীতে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত টানেল থেকে মোট টোল আদায় হয়েছে মাত্র ৪৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে আয় হয়েছে ১১ লাখ টাকা। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে ৪২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। গত তিন অর্থবছরে টানেল সচল রাখতে ৫১৩ কোটি টাকা খরচ হলেও টোল আদায় হয়েছে মাত্র ১০৪ কোটি টাকা।

সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের কারণে টানেল ব্যবহারকারী মোট গাড়ির প্রায় ৫০ শতাংশই হবে ট্রাক। কিন্তু সেতু কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, টানেল চালুর পর থেকে চলাচল করা গাড়ির মধ্যে ৭০ দশমিক ৬০ শতাংশই প্রাইভেট কার, জিপ ও মাইক্রোবাসের মতো হালকা যানবাহন। বাস চলেছে ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ, ট্রাক ১৭ দশমিক ৯৫ এবং ট্রেইলার চলেছে মাত্র ১ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলছিলেন, প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়া ও দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য অনেক সময় সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বাস্তব অনেক কিছু উপেক্ষা করে প্রাক্কলন করা হয়। এটি ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, সমীক্ষায় ভুল হয়েছে। তবে যেহেতু বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হয়ে গেছে, তাই টানেলটিকে সচল ও কার্যকর করতে হলে আনোয়ারা প্রান্ত থেকে কক্সবাজারমুখী বাইপাস সড়ক এবং ফ্লাইওভারের সংযোগ দ্রুত শেষ করতে হবে।

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত শাহ আমানত তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু ও কালুরঘাট সেতুর ওপর থেকে যানবাহনের চাপ কমানো। কিন্তু সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), সেতু কর্তৃপক্ষ এবং রেলওয়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে শাহ আমানত সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৭ হাজার ৪১৬টি এবং শতবর্ষী কালুরঘাট সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১১ হাজার গাড়ি চলাচল করে। অর্থাৎ দুটি সেতু ও একটি টানেল মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪২ হাজার ২৪৪টি যানবাহন কর্ণফুলী নদী পারাপার হয়। এর মধ্যে শাহ আমানত সেতু দিয়ে ৬৫ শতাংশ এবং কালুরঘাট সেতু দিয়ে ২৬ শতাংশ— অর্থাৎ দুই সেতু মিলিয়ে ৯১ শতাংশ গাড়ি পার হচ্ছে। আর টানেল দিয়ে পার হচ্ছে মাত্র ৯ শতাংশ গাড়ি।

শাহ আমানত সেতুতে গাড়িপ্রতি গড় টোল পড়ছে মাত্র ৮২ টাকা, যেখানে টানেলে গাড়িপ্রতি গড় টোল পড়ছে ৩০৬ টাকা ৬৩ পয়সা। প্রাইভেট কারের টোল সেতুতে ৭৫ টাকা হলেও টানেলে ২০০ টাকা। আবার ৩১ আসনের কম বাসের টোল সেতুতে ৫০ টাকা হলেও টানেলে তা ৬ গুণ বেশি— ৩০০ টাকা। এ ছাড়া সেতুতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচলের সুযোগ থাকলেও টানেলে তা নিষিদ্ধ।

আলোচিত খবর

আরও পড়ুন

সর্বশেষ