জাতীয়:

সীমান্ত রক্ষায় বিজিবিকে স্মার্ট প্রযুক্তিতে সজ্জিত করা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী।

ঢাকা অফিস:

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সীমান্তে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ মোকাবেলায় বিজিবিকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘নিচ্ছিদ্র নজরদারি এবং আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তে ‘স্মার্ট ডিজিটাল সার্ভিলেন্স এন্ড টেকনিক্যাল রেসপন্স সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা সোমবার (৪ মার্চ) সকালে ঢাকার পিলখানাস্থ বিজিবি সদর দপ্তরের বীর উত্তম আনোয়ার হোসেন প্যারেড গ্রাউন্ডে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দিবস-২০২৪ উপলক্ষে দেওয়া প্রধান অতিথি’র ভাষণে এই কথা বলেন।
সরকার প্রধান বলেন, তাঁর সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ বিওপি এবং নীলডুমুল, কাচিকাটা, ভাসমান বিওপপি’তে রাডার স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, ‘অত্যাধুনিক ও যুগোপযোগী প্রযুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে বিজিবি’র অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়ানোয় কাজ ও দক্ষতার প্রতি তাদের আগ্রহ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ইতোমধ্যে বিজিবি’কে আরো শক্তিশালী করার জন্য ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আইন-২০১০’ পাশ করেছি। একইসঙ্গে একটি আধুনিক, শক্তিশালী, দক্ষ ও ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে বিজিবি আজ গড়ে উঠেছে। এখন তারা জল, স্থল এবং আকাশ পথের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে আমরা বিশ^মানের আধুনিক সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১’ প্রণয়ন করেছি। যেভাবে আমরা বাংলাদেশকে ২০৪১ সাল নাগাদ ‘উন্নত সমৃদ্ধ দেশ’ হিসেবে গড়তে চাই, আমাদের বিজিবিও তেমনি একটি স্মার্ট বাহিনী হবে।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গত ১৫ বছরে বিজিবিতে সৈনিক পদে মোট ৩৫ হাজার ৫১৭ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। ৫৫ হাজার ১৮৭ সদস্যকে বিভিন্ন পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে এবং আমরাই প্রথম বিজিবিতে নারী সদস্যদের অন্তর্ভূক্ত করেছি। এই পর্যন্ত বিজিবিতে ৯৯৬ জন নারী সৈনিক ভর্তি হয়েছে। বিজিবি ভিশন ২০৪১ অনুযায়ী এই বাহিনীতে আরো ১৫ হাজার জনবলের পদ সৃজনের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। কমব্যাট ড্রেস প্রদানসহ প্রতিটি ক্ষৈত্রেই তারা যেন আরো উন্নত হয় তার যথাযথ ব্যবস্থা আওয়ামী লীগ সরকার করে দিয়েছে এবং তাদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমুখী ব্যবস্থাও প্রবর্তন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, বিজিবি’কে আমরা বিশ্বমানের চৌকস বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অত্যাধুনিক অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জামাদি বিজিবি’তে যুক্ত হওয়ায় এই বাহিনীর আভিযানিক সক্ষমতার পাশাপাশি মনবল, কর্ম উদ্দীপনা এবং দক্ষতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও দুর্গম এলাকায় বসবাসকারি জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য এক হাজার ৩৫ কি.মি. সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করছে। সেই সাথে মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের যে সীমান্ত রয়েছে, সেখানেও সড়ক নির্মাণের কাজ চলমান আছে। ইতোসধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৩১৭ কি. মি. সড়ক নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে।

জাতির পিতার ভারতের সঙ্গে করে যাওয়া স্থল সীমানা চুক্তির আলোকে দুই দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ ছিটমহল বিনিময়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত শাস্তিপূর্ণ পরিবেশে ছিটমহল বিনিময় করে আমরা বিশে^ একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি।’
শেখ হাসিনা এইসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালনের জন্য বিজিবি’কেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, জাতির পিতা ১৯৭৪ সালে সমুদ্র আইন করে গেলেও ’৭৫ এর পর কোন সরকারই এই ‘স্থল সীমানা চুক্তি’ বা ‘সমুদ্র আইন’ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি যা আওয়ামী লীগ সরকারে এসেই আবার নিষ্পত্তি করেছে।
সরকার প্রধান বলেন, ভারত এবং মিয়ানমারের সীমান্তে ৪টি ব্যাটালিয়ান, সুন্দরবন এলাকায় দ’ুটি ভাসমান বিওপিসহ মোট ৬২টি নতুন বিওপি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ৫৩৯ কি.মি. অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে ৪০২ কি.মি সীমান্ত নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়াও আরো ২৪২টি নতুন বিওপি তৈরি এবং সীমান্ত থেকে অধিক দূরত্বে আরো ১২৬টি বিওপি নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। বিওপিগুলোতে ভালো অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নির্ভর ভি-স্যাট প্রযুক্তির মাধ্যমে টেলিফোন সুবিধার কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রত্যন্ত সীমান্ত এলাকার ৩৫টি বিওপিতে ভি-স্যাট প্রযুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে টেলিফোন সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ১৫টিতে এই সুবিধা স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রসঙ্গে বলেন, প্রায় ১০ লাখের ওপর মিয়ানমারের নাগরিক আজকে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে আমাদের বিজিবিসহ সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাব সকলেই সেখানে নজরদারি রাখছে। আমরা মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছি। তবে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা চলছে যাতে আমরা এই অবস্থার থেকে পরিত্রাণ পাই এবং তাদের নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারি। আমরা প্রতিবেশির সঙ্গে কোন বিবাদে না গিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি।
সরকার প্রধান বলেন, সীমান্তে অত্যন্ত্র প্রহরীর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে যখনই কোন প্রয়োজন দেখা দেয় সেই বিএনপি-জামায়াতের অগ্নিসন্ত্রাস থেকে শুরু করে নানা ধরনের ঘটনায় বিজিবির সদস্যরা সাধারণ মানুষের পাশে থেকে তাদের জানমাল রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন এবং জাতির আস্থা ও বিশ^াস আপনারা অর্জন করেছেন।
‘যেকোন পেশাদার বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর সরকার বিজিবি সদস্যদের উন্নত প্রশিক্ষণের বিভিন্ন পদক্ষেপ হিসেবে সাতকানিয়ার বর্ডার গার্ড সেন্টার এন্ড কলেজ স্থাপন এবং চুয়াডাঙ্গায় আরো একটি প্রশিক্ষণ সেন্টার স্থাপনের কাজ চলছে। ট্রেনিং সেন্টারে ৩শ’ মিটার ¯œাইপার ফায়ারিং রেঞ্জ নির্মাণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহারের লক্ষ্যে খুলনার বর্ডার গার্ড টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে একটি আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। বিজিবি’র খেলোয়াড়দের জন্য সেক্টর সদর দপ্তর ময়মনসিংহে শেখ কামাল ইনডোর স্টেডিয়াম নামে মাল্টিজিমসহ ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গাজায় ইসলায়েলের অভিযানের পটভূমিতে তিনি আরও খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রতি ইঞ্চি পতিত জমি চাষের আওতায় আনার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন, যেন বাংলাদেশকে কারও কাছে হাত পাততে না হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাড়ি এবং অফিস চত্বরে আপনার প্রতি ইঞ্চি জমি চাষের জন্য ব্যবহার করুন। এইসব ক্ষেত্রে সবাইকে অবদান রাখতে হবে।’
শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে একটি প্রশিক্ষিত বাহিনীর শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বিজিবি সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘মনে রাখবেন শৃঙ্খলা এবং চেইন অব কমান্ড একটি শৃঙ্খলা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি। কখনও শৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটাবেন না। চেইন অব কমান্ড মেনে চলবেন।’
সরকার প্রধান ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি আধাসামরিক বাহিনীতে সংঘটিত ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে বর্ণনা করেন। ওই ঘটনায় সেনাবাহিনীর ৫৭ কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে তারা ইতোমধ্যেই বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। কাজেই আগামীতে বাহিনীতে এমন ঘটনা যেন ঘটতে না পারে।’
শেখ হাসিনা ওই নৃশংস ঘটনায় নিহতদের স্মরণ করেন এবং তাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
তিনি বিজিবি সদরদপ্তরে ‘প্রেরনা’ শিরোনামের বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্যও উন্মোচন করেন।
এরআগে প্রধানমন্ত্রী বিজিবি সদরদপ্তরে পৌঁছলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও বিজিবি মহাপরিচালক
মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী তাঁকে স্বাগত জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বিজিবি মহাপরিচালকের সাথে একটি খোলা জিপে চড়ে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং প্যারেড কমান্ডার তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যান। পরে তিনি আধাসামরিক বাহিনীর জাতীয় পতাকাবাহী দলের সাথে চারটি কন্টিনজেন্টের বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ এবং স্বাগত মঞ্চ থেকে রাষ্ট্রীয় অভিবাদন গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী পরে ৭২ জন নির্বাচিত বিজিবি সদস্যদের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ বিজিবি পদক, রাষ্ট্রপতি বিজিবি পদক, বিজিবি পদক-সেবা এবং রাষ্ট্রপতি বিজিবি পদক-সেবা বিতরণ করেন। পরে তিনি বিজিবি’র ঐতিহ্যবাহী দরবারেও যোগ দেন।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে; চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে চট্টগ্রাম নগরের জেএম সেন হলে শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করে অংশ নেননি। সবার লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বাধীন করা, গণতন্ত্র রক্ষা করা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।তিনি বলেন, আমরা মুসলমান হই, হিন্দু হই, বৌদ্ধ হই কিংবা খ্রিস্টান হই, ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের নাগরিক।

যে ধর্মেরই হই না কেন, যেহেতু এই দেশে আমরা জন্মেছি, এই দেশে বড় হচ্ছি, তাই আমাদের পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে লাখ লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

অনেকে শহীদ হয়েছেন। সেদিন কেউ দেখেননি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ কিংবা কে খ্রিস্টান। সবাই দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্য নিয়ে লড়াই করেছেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষা ও জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে রাজপথে নেমেছেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। গুলিবিদ্ধ কিংবা আহত ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় জানতে চেয়ে কেউ তাঁদের পাশে দাঁড়াননি। হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, আমার ভাই শহীদ হয়েছে, আমার ভাই আহত হয়েছে। বাকিরা তাঁদের ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। কেউ জিজ্ঞেস করেননি, কী তাঁর ধর্ম পরিচয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মানুষের অধিকার ও মানবিকতার প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য নয়।প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের বিচার করা উচিত নয়।

তিনি নিজেকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁকে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে হয়েছে। বাংলাদেশে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হলেও লন্ডনে অবস্থানের সময় সেই পরিচয় তাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠ করেনি। তাই সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু পরিচয় নয়, একজন মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তারেক রহমান বলেন, দেশের আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র একজন নাগরিককে যে অধিকার ও সুযোগ দেবে, অন্য নাগরিকও তা পাবেন। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও অধিকার খর্ব করা যাবে না।

মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব আন্দোলনে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সবাই শান্তিতে বসবাস করবেন এবং মিলেমিশে থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে যদি সেই বাংলাদেশ গড়তে হয়, আপনাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই। আপনি হিন্দু হোন, মুসলমান হোন, বৌদ্ধ হোন কিংবা খ্রিস্টান হোন, যাই হোন না কেন, আপনার সহযোগিতা আমার দরকার। কারণ আপনার সহযোগিতা ছাড়া আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব না।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীমসহ বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য ও নেতারা।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলে প্রতিদিন ব্যয় ৫৪ লাখ, গড়ে আয় ১১ লাখ টাকা

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পর্যটন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খোলার প্রত্যয় নিয়ে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা হয়েছিল। ১০ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে টানেলটিতে ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর গাড়ি চলাচল শুরু হয়। যেখানে ২০২৫ সালে প্রতিদিন গাড়ি চলাচল করার কথা ছিল ২৮ হাজার ৩০৫টি। সেখানে চলেছে মাত্র ৩ হাজার ৮৭২টি, যা প্রত্যাশার মাত্র ১৪ শতাংশ। একই বছর আয় হওয়ার কথা ছিল ৪০০ কোটি। বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ৩৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। টানেলটি সচল রাখতে গত তিন বছরে লোকসান গুনতে হয়েছে ৪০৯ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেছেন, সমীক্ষায় ট্রাফিক বেশি দেখানো হয়নি। তখন ধারণা করা হয়েছিল, টানেল নির্মাণের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক হয়ে যাবে। কিন্তু কভিড মহামারী, আর্থিক বিষয় ও সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে টানেলের কাজ যে গতিতে এগিয়েছে, আনুষঙ্গিক কাজগুলো সে গতিতে এগোয়নি।

এদিকে লোকসান কমাতে সেতু কর্তৃপক্ষ ১০টি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে। এর মধ্যে সিসিসিসির সঙ্গে করা ৯৮৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি থেকে জনবল ও ব্যয় কমিয়ে ১২৩ কোটি টাকা সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আনোয়ারা-বরকল-গাছবাড়িয়া সড়ক এবং আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া সড়ক প্রশস্তকরণ ও কর্ণফুলী ড্রাই-ডক এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আনোয়ারা প্রান্তে সাতটি নতুন জেটি নির্মাণ।

এগুলো চালু হলে টানেল থেকে বছরে ২০০ থেকে ২৪০ কোটি টাকা অতিরিক্ত টোল আদায় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি চায়না ইকোনমিক জোন ও কোরিয়ান ইপিজেডের কার্যক্রম গতিশীল করা এবং দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক টানেল দিয়ে চলাচলে উদ্বুদ্ধ করতে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদন, ২০১৩ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে টানেলের প্রাক্কলন ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের এই ফারাক পাওয়া গেছে। যৌথভাবে কর্ণফুলী টানেলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছিল চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) ও হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওভি আরুপ।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষার এই ত্রুটি, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আর্থিক লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। জানতে চাইলে সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বললেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার (ফিজিবিলিটি স্টাডি) মধ্যেই যত ধরনের সমস্যা, এটি খুব পরিষ্কার। বিগত দিনে এ ধরনের বড় প্রকল্প কেন নেওয়া হয়েছিল, তা জনগণের কতটা কাজে লাগল এবং ভুলটা কোথায় ছিল— এটি কি স্রেফ ভুল ছিল, নাকি অপরাধ ছিল, তা খতিয়ে দেখা হবে।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, টানেল পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে বছরে ব্যয় হবে ৩২ থেকে ৪৫ কোটি টাকা। সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিসিসি) সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য ৯৮৪ কোটি টাকার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি করা হয়েছে।
চুক্তিমূল্য অনুযায়ী, টানেল সচল রাখতে বছরে ব্যয় দাঁড়ায় ১৯৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রতিদিনে ব্যয় হচ্ছে ৫৪ লাখ টাকা। বিপরীতে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত টানেল থেকে মোট টোল আদায় হয়েছে মাত্র ৪৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে আয় হয়েছে ১১ লাখ টাকা। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে ৪২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। গত তিন অর্থবছরে টানেল সচল রাখতে ৫১৩ কোটি টাকা খরচ হলেও টোল আদায় হয়েছে মাত্র ১০৪ কোটি টাকা।

সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের কারণে টানেল ব্যবহারকারী মোট গাড়ির প্রায় ৫০ শতাংশই হবে ট্রাক। কিন্তু সেতু কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, টানেল চালুর পর থেকে চলাচল করা গাড়ির মধ্যে ৭০ দশমিক ৬০ শতাংশই প্রাইভেট কার, জিপ ও মাইক্রোবাসের মতো হালকা যানবাহন। বাস চলেছে ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ, ট্রাক ১৭ দশমিক ৯৫ এবং ট্রেইলার চলেছে মাত্র ১ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলছিলেন, প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়া ও দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য অনেক সময় সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বাস্তব অনেক কিছু উপেক্ষা করে প্রাক্কলন করা হয়। এটি ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, সমীক্ষায় ভুল হয়েছে। তবে যেহেতু বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হয়ে গেছে, তাই টানেলটিকে সচল ও কার্যকর করতে হলে আনোয়ারা প্রান্ত থেকে কক্সবাজারমুখী বাইপাস সড়ক এবং ফ্লাইওভারের সংযোগ দ্রুত শেষ করতে হবে।

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত শাহ আমানত তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু ও কালুরঘাট সেতুর ওপর থেকে যানবাহনের চাপ কমানো। কিন্তু সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), সেতু কর্তৃপক্ষ এবং রেলওয়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে শাহ আমানত সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৭ হাজার ৪১৬টি এবং শতবর্ষী কালুরঘাট সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১১ হাজার গাড়ি চলাচল করে। অর্থাৎ দুটি সেতু ও একটি টানেল মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪২ হাজার ২৪৪টি যানবাহন কর্ণফুলী নদী পারাপার হয়। এর মধ্যে শাহ আমানত সেতু দিয়ে ৬৫ শতাংশ এবং কালুরঘাট সেতু দিয়ে ২৬ শতাংশ— অর্থাৎ দুই সেতু মিলিয়ে ৯১ শতাংশ গাড়ি পার হচ্ছে। আর টানেল দিয়ে পার হচ্ছে মাত্র ৯ শতাংশ গাড়ি।

শাহ আমানত সেতুতে গাড়িপ্রতি গড় টোল পড়ছে মাত্র ৮২ টাকা, যেখানে টানেলে গাড়িপ্রতি গড় টোল পড়ছে ৩০৬ টাকা ৬৩ পয়সা। প্রাইভেট কারের টোল সেতুতে ৭৫ টাকা হলেও টানেলে ২০০ টাকা। আবার ৩১ আসনের কম বাসের টোল সেতুতে ৫০ টাকা হলেও টানেলে তা ৬ গুণ বেশি— ৩০০ টাকা। এ ছাড়া সেতুতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচলের সুযোগ থাকলেও টানেলে তা নিষিদ্ধ।

আলোচিত খবর

আরও পড়ুন

সর্বশেষ