আজঃ রবিবার ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

যুদ্ধের গর্ভে জন্ম, মানবতার নেতা শাইখুল আজহার ড. আহমেদ তৈয়ব হাফি।

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান, লেখক ও কলামিস্ট, শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ইতিহাস কোনো কোনো মানুষকে শুধু জন্ম দেয় না—তাদের নির্মাণ করে সময়ের নিষ্ঠুর হাতুড়িতে। যুদ্ধ, উদ্বাস্তুতা, স্মৃতি ও সাধনার দীর্ঘ পথে হাঁটিয়ে তারা হয়ে ওঠে একটি যুগের নৈতিক প্রতিনিধি। শাইখুল আজহার, ইমামুল আকবর ড. আহমেদ তৈয়ব (হাফিযাহুল্লাহ্) তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন আধুনিক মুসলিম বিশ্বের ব্যথা, প্রতিরোধ ও বিবেকের এক গভীর ভাষ্য।

ড. আহমেদ তৈয়ব জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৬ সালের ৬ জানুয়ারি, মিশরের ঐতিহাসিক লুক্সুর অঞ্চলের এক প্রাচীন গ্রামে। নীলনদের তীরঘেঁষা এই ভূমি শুধু ফেরাউনদের নয়, বরং নবুয়তের স্মৃতি, আলেমদের সাধনা ও সভ্যতার দীর্ঘ উত্তরাধিকার বহন করে। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধর—একটি পরিচয় যা তাঁর জীবনে গৌরবের অলংকার হয়ে নয়, বরং দায়িত্বের ভার হয়ে উপস্থিত ছিল। এই বংশপরিচয় তাঁকে শিখিয়েছে বিনয়, ন্যায়বোধ এবং মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।

তাঁর শৈশব কেটেছে অস্থির সময়ের গর্ভে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত তখনো শুকায়নি, আর মধ্যপ্রাচ্য প্রবেশ করছিল নতুন সংঘাতের যুগে। ১৯৫৬ সালের আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন এক শিশু। বোমার শব্দ আর বিস্ফোরণের ভয় থেকে বাঁচতে তাঁকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল পাহাড়ের গুহায়। সেই গুহা ছিল না কোনো কাব্যিক রূপক; ছিল যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা, যেখানে একটি শিশুর চোখে সহিংসতা প্রথমবারের মতো তার নগ্ন রূপ মেলে ধরেছিল।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনকে ভেঙে দেয়নি—বরং ভিত গড়ে দিয়েছে। সেখান থেকেই তাঁর মনে জন্ম নেয় এই উপলব্ধি যে, অস্ত্র দিয়ে মানুষকে পরাস্ত করা যায়, কিন্তু ন্যায় ও জ্ঞান ছাড়া মানবতাকে রক্ষা করা যায় না। এই উপলব্ধিই তাঁকে আল-আজহারের পথে নিয়ে যায়—যেখানে ইসলামকে তিনি খুঁজে পান ভারসাম্য, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার ধর্ম হিসেবে।

দীর্ঘ অধ্যয়ন, আত্মসংযম ও সাধনার মধ্য দিয়ে ড. আহমেদ তৈয়ব নিজেকে গড়ে তোলেন এমন এক আলেম হিসেবে, যিনি ঐতিহ্যকে ধারণ করেন কিন্তু সময়কে অস্বীকার করেন না। তাঁর চিন্তায় কুরআন ও সুন্নাহর গভীরতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আধুনিক বিশ্বের জটিল বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে আল-আজহারের শীর্ষ নেতৃত্বে নিয়ে আসে—এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানের কণ্ঠকে তিনি সমকালীন বিশ্বের সঙ্গে সংলাপে যুক্ত করেন।

শাইখুল আজহার হিসেবে তাঁর অবদান কেবল প্রশাসনিক নয়; তা নৈতিক ও ঐতিহাসিক। তিনি ধর্মের নামে সহিংসতা, চরমপন্থা ও বিকৃত ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে ইসলাম কখনো প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলে না; কথা বলে ন্যায়, দয়া ও সহাবস্থানের ভাষায়। আন্তধর্মীয় সংলাপ, মানবিক সহনশীলতা এবং বিশ্বশান্তির প্রশ্নে তিনি আজ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নৈতিক কণ্ঠস্বর।

আজ, যখন তিনি ৮০ বছরে পদার্পণ করেছেন, ড. আহমেদ তৈয়ব কেবল আল-আজহারের শাইখ নন—তিনি এক সময়ের বিবেক। যুদ্ধের গুহায় আশ্রয় নেওয়া সেই শিশুটি আজ আল-আজহারের মিনার থেকে বিশ্বমানুষের উদ্দেশে শান্তি ও মানবতার আহ্বান জানান।

তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত নেতৃত্ব জন্ম নেয় না ক্ষমতার করিডরে। তা জন্ম নেয় স্মৃতির ভার, সহনশীলতার সাধনা এবং মানুষের জন্য কিছু করার নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা থেকে। ইতিহাস তাই তাঁকে শুধু একজন আলেম হিসেবে নয়, এক যুগের নৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবেই স্মরণ করবে।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে যা জানিয়েছে আইসিসি।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের নাম কাটল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। বাংলাদেশের পরিবর্তে জায়গা দেয়া হয়েছে স্কটল্যান্ডকে। বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকেও জানিয়েছে আইসিসি। সংস্থাটির সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য দিয়েছে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই। আইসিসির একটি সূত্র পিটিআইকে জানায়, ‘গতকাল (শুক্রবার) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যানকে একটি ই-মেইল পাঠানো হয়েছে। সেখানে জানানো হয়, (বাংলাদেশ) ভারতের আসবে কি না সে সিদ্ধান্ত জানাতে যে ২৪ ঘণ্টার যে সময়সীমা আইসিসি দিয়েছিল তার মধ্যে বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উত্তর দেয়নি।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ইইউ ও ট্রাম্প মুখোমুখি অবস্থানে।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ইইউ ও ট্রাম্প মুখোমুখি অবস্থানে। একদিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অন্যদিকে শুল্ক আরোপের হুমকি। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন – গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবির বিরোধিতা করলে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর আরোপিত শুল্কেের শতভাগ বাস্তবায়ন করবেন।এদিকে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একজোট হয়েছে ইউরোপের মিত্র দেশগুলো।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন- হুমকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের অধীনে থাকা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের মালিক হতে পারে না।

আলোচিত খবর

নির্বাচনে নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ আইজিপির।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সকল পুলিশ সদস্যকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সতর্কতা ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) বাহারুল আলম। একই সঙ্গে জনবান্ধব পুলিশিং আরও শক্তিশালী করে জনগণের জান-মাল রক্ষায় নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।শনিবার (২৪ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ লাইন্সের সিভিক সেন্টারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশ অফিসার ও ফোর্স সদস্যদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাক-নির্বাচনি সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আইজিপি।

আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় বডি-ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যা পুলিশি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করবে।তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে যে কোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও পেশাদার আচরণ বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং জনগণের প্রত্যাশিত পুলিশি সেবা সহজ ও কার্যকরভাবে দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে।

এ সময় আইজিপির দিকনির্দেশনার আলোকে সকল ইউনিটকে শৃঙ্খলা, দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়। সভায় উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা নির্বাচনকালীন চ্যালেঞ্জ, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং কল্যাণমূলক বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল— দ্বীপ থানাসমূহের জন্য স্পিডবোট সরবরাহ, মোটরসাইকেল ক্রয়ে ঋণ সুবিধা, দ্বীপ ভাতা চালু ও বৃদ্ধি এবং নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সরকারি সুবিধা বৃদ্ধি।সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজ।

সমাপনী বক্তব্য দেন অতিরিক্ত আইজিপি ও চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান। সভায় চট্টগ্রাম রেঞ্জ কার্যালয়, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশসহ চট্টগ্রাম বিভাগের আওতাধীন ২৯টি ইউনিটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিভিন্ন পদবীর মোট ৪৫৮ জন অফিসার ও ফোর্স সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ