চট্টগ্রাম-১১ সংসদীয় আসন নানা কারণেই এটি মর্যাদার আসন হিসেবে পরিচিত। এ আসন থেকে নির্বাচন করে একবার জয়ী হয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী টানা একাধিকবার এ আসন থেকে জয়ী হয়েছিলেন। ফলে আসনটি ‘খসরুর নিজস্ব আসন’ হিসেবেও পরিচিতি পায়।
এছাড়া এআসনে ‘অর্থনীতির লাইফলাইন’ বন্দর অবস্থিত। সেই বন্দরসহ একগুচ্ছ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যে এলাকায় সেটি দেশের আমদানি-রফতানিসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি-প্রকৃতির অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ তো করেই, তদুপরি বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীর মিলনমোহনার এ আসনটি ভৌগলিকভাবেও বেশ গুরুত্ব বহন করে।
নগরীর বন্দর, ইপিজেড, পতেঙ্গাসহ আশপাশের আরও কিছু এলাকা মিলিয়ে চসিকের ১০টি ওয়ার্ড নিয়ে চট্টগ্রাম-১১ আসন।
এ আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে সংখ্যালঘু ভোটারেরও আধিক্য আছে। চট্টগ্রাম ইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেড এ আসনে হওয়ায় বিপুল সংখ্যক ভিন্ন জেলার শ্রমজীবী ভোটারের বসবাস এখানে।এ ছাড়া, চট্টগ্রাম বন্দর, চট্টগ্রাম কাস্টমস, পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা তেল শোধনাগার, ইস্টার্ন রিফাইনারি, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ঘাঁটি, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শিল্প-কলকারখানা অধ্যুষিত আসনটির দিকে বাড়তি নজর থাকে দেশের ব্যবসায়ী মহল থেকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এ আসনে প্রার্থী করেছে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে। আর বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ শফিউল আলমকে।
চারবারের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রীর সঙ্গে একবারের কাউন্সিলরের লড়াইটা আসলেই জমে কি-না, শেষমুহূর্তে চমকপ্রদ কোনো ঘটনা ঘটে যায় কি না, তা নিয়ে কৌতুহল আছে চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে। অবশ্য ধানের শীষ এবং দাঁড়িপাল্লা- উভয় প্রতীকের প্রচার চলছে সমানতালে।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম-১১ আসনে মোট প্রার্থী সাতজন। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আমীর খসরু-শফিউল হলেও আরও আলোচনায় আছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু তাহের, বাসদের নিজামুল হক কাদেরী ও ইসলামিক ফ্রন্টের মুহাম্মদ আবু তাহের।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বনেদি পরিবারের সন্তান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাদের মূল নিবাস উত্তর কাট্টলী এলাকায়। খসরুর বাবা বর্তমানে প্রয়াত মাহমুদুন্নবী চৌধুরীও রাজনীতিবিদ ছিলেন। পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই পরিবারের বড় সন্তান আমীর খসরু দেশে স্নাতক পর্যন্ত পড়াশোনার পর লন্ডন থেকে হিসাববিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
পারিবারিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকা আমীর খসরু নব্বইয়ের দশকে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে পড়ে যান। ১৯৯১ সালে বন্দর-পতেঙ্গা আসন থেকে জয়ী হওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়া আসনটি ছেড়ে দিয়ে উপনির্বাচনে খসরুকে প্রার্থী করেন। প্রথম নির্বাচনেই বাজিমাত করেন তিনি। এরপর ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত দুটি সংসদ নির্বাচনে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনেও তিনি জয়ী হন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের সরকারে তিনি বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
আসনটির গুরুত্ব বিবেচনায় দলের ‘হেভিওয়েট নেতা’ আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে বিএনপি আবারও প্রার্থী করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রায় ১৭ বছর ধরে চট্টগ্রামে বিএনপির রাজনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক আমীর খসরুর মনোনয়নে উজ্জীবিত দলটির নেতাকর্মীরাও, যদিও প্রথমদিকে তিনি ওই আসন থেকে নির্বাচন করবেন না বলে ধারণা দিয়েছিলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের মনোনয়ন পেয়ে শুরু থেকেই জোর গণসংযোগ ও প্রচারে নেমে গেছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শুধু মিছিল-স্লোগান আর বক্তব্য-বিবৃতির মধ্যেই তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। আগের চেয়ে প্রচারের ধরণও পালটে এবার খসরু হেঁটে ঢুকে যাচ্ছেন অলিগলিতে, বাসাবাড়ি, কলোনিতে, বস্তিতে, মার্কেট-দোকানপাটের ভেতরে। হাত মেলাচ্ছেন, বুকে টেনে নিচ্ছেন, কুশল বিনিময় করছেন আর ধানের শীষে ভোট প্রার্থনা করছেন। ফলে খসরু যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই উপচে পড়া জনসমাগম দেখা যাচ্ছে। সাধারণ ভোটাররাই বলছেন, অতীতে আমীর খসরুকে এমনভাবে প্রচার করতে তারা দেখেননি। শুধু আমীর খসরু নন, স্ত্রী তাহেরা আলম, ছেলে বিএনপি নেতা ইসরাফিল খসরুও নেমে গেছেন জোর প্রচারে।
ধানের শীষের পক্ষে জোয়ার তৈরি হয়েছে জানিয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমাদের নেতা তারেক রহমান সাহেব চট্টগ্রামে এসে জনসভা করেছেন। লাখ, লাখ মানুষের সমাগম হয়েছে। বিএনপির প্রার্থীরা যেখানেই যাচ্ছেন, মানুষ নিজ থেকেই এগিয়ে আসছে।
একধরনের জোয়ার দেখতে পাচ্ছি সর্বত্র। মানুষ বলছে, আমরা এবার ভোট দিতে চাই, গণতন্ত্র ফিরে পেতে চাই, আমরা সুন্দরভাবে বাঁচতে চাই। মানুষকে এ নিশ্চয়তা যে বিএনপি ছাড়া আর কেউ দিতে পারছে না, সেটা তারা বুঝে গেছে। এজন্য ধানের শীষের জোয়ার তৈরি হয়েছে। ইনশল্লাহ, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সব আসনে বিএনপি বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।বন্দর-পতেঙ্গাসহ পুরো চট্টগ্রামকে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির হাব হিসেবে গড়ে তোলা, স্থানীয় সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এদিকে জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ শফিউল আলমও উচ্চশিক্ষিত, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেরিন সাইয়েন্সে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা। ছাত্রজীবন থেকে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। পরে জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০১৫ সালে তিনি চসিকের ৩৭ নম্বর উত্তর-মধ্য হালিশহর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর পর প্রথমবার সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনের মাঠে এসেই আলোচনা তৈরি করেছেন তিনি। প্রতিদিন মিছিল, সমাবেশ, গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
প্রতিহিংসামুক্ত উদার, মানবিক চট্টগ্রাম-১১ আসন গড়া এবং স্থানীয় সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাচ্ছেন শফিউল আলম। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, আমার বক্তব্য হচ্ছে, কোনো প্রতিহিংসা থাকবে না, জুলুম থাকবে না। আমি নির্বাচিত হলে বিএনপির কারও গায়ে একটা ফুলের টোকাও দিতে দেব না। আওয়ামী লীগ যারা করেন, আওয়ামী লীগ করা তো অপরাধ না, তাদের ওপর কোনো জুলুম করা হবে না।
মামলা বাণিজ্য করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর অনেক অত্যাচার করা হচ্ছে। আমি কাউকে আর এ অন্যায় করতে দেব না। জামায়াত, বিএনপি, আওয়ামী লীগ- আমরা সবাই মিলেমিশে ঐক্যবদ্ধভাবে থাকব।
দ্বিতীয়ত, আমার এলাকায় যানজট সমস্যা মারাত্মক, জলাবদ্ধতার সমস্যা আছে। এলাকায় একটি সরকারি হাসপাতাল নেই। গণকবর, গণশ্মশান নেই। আমি নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধানে সাধ্যমতো ভূমিকা রাখব। এ ছাড়া, চট্টগ্রাম বন্দর, কলকারখানা এখানে হওয়ায় প্রচুর চাঁদাবাজি হয়। আমি চাঁদাবাজমুক্ত এলাকা গড়ব।