চট্টগ্রামে এবার ঈদুল আজহায় চাহিদার তুলনায় কোরবানির পশুর ঘাটতি রয়েছে। তবে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর ঘাটতি থাকবে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনা গবাদিপশুতে পূরণ হবে ঘাটতি। কিন্তু পশুখাদ্যের উচ্চমূল্য, শ্রমিকের মুজরি বৃদ্ধি ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে এবার পশুর দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে চট্টগ্রাম নগর ও উপজেলাগুলোতে সাত লাখ ৮৩ হাজার পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। চাদিহার তুলনায় ৩৫ হাজারের বেশি পশুর ঘাটতি থাকলেও আশাপাশের উপজেলা ও দেশের অন্যান্য জেলা থেকে সরবরাহকৃত পশু এই ঘাটতি পূরণ করবে বলে মনে করছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
জেলা প্রাণীসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, প্রতিবছর কোরবান উপলক্ষে চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্টকৃত ও কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর একটি তালিকা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিস¤পদ দপ্তর। এ বছর তালিকা প্রস্তুত করা হয় গত ২১ এপ্রিল।
সে তালিকায় দেখা গেছে, এ বছর চট্টগ্রাম মহানগর ও উপজেলায় স্থানীয়ভাবে ৭ লক্ষ ৮৩ হাজার ১৫১টি গবাদিপশু হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছে। যা গতবছর (২০২৫) ছিল ৮ লক্ষ ৬০ হাজার ৮৮২টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে স্থানীয় উৎপাদন কমেছে ৭৭ হাজার ৭৩১টি।এর আগে ২০২২ সালে চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে গবাদি পশুর উৎপাদন ছিল ৭ লক্ষ ৯১ হাজার ৫০১টি। ওই হিসেবে এ বছরের স্থানীয় উৎপাদন এবারসহ গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এছাড়া ২০২৪ সালে ৮ লক্ষ ৫২ হাজার ৩৫৯টি, ২০২৩ সালে ৮ লক্ষ ৪২ হাজার ১৬৫টি, ২০২১ সালে ৭ লক্ষ ৫৬ হাজার ৩৩৪টি, ২০২০ সালে ৬ লক্ষ ৮৯ হাজার ২২টি ও ২০১৯ সালে স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছিল ৬ লক্ষ ১০ হাজার ২১৯টি গবাদিপশু।এর মধ্যে এবার স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্টকৃত গরুর সংখ্যা ৪ লক্ষ ৯৯ হাজার ২৭৯টি।
যা গতবছর ছিল ৫ লক্ষ ৩৫ হাজার ৮১৩টি। অর্থাৎ এক বছরে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গরুর সংখ্যা কমেছে ৩৬ হাজার ৫৩৪টি। এছাড়া এবছর স্থানীয়ভাবে ১ লক্ষ ৯৪ হাজার ৫১৯টি ছাগল হৃষ্ট করা হয়। যা গতবছর ছিল ২ লক্ষ ৫১ হাজার ৭৪টি। এছাড়া এ বছর ৪৭ হাজার ৮৩৪টি মহিষ হৃষ্টপুষ্ট করা হয়, যা গতবছর ছিল ৬৪ হাজার ১৬৩টি। পাশাপাশি গতবছর ৫৫ হাজার ৬৯৭টি ভেড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হলেও এ বছর সংখ্য কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৪২৩-এ।
জেলা প্রাণিস¤পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ি, এ বছর চট্টগ্রামে কোরবানি পশুর চাহিদা রয়েছে ৮ লক্ষ ১৮ হাজার ৬৭১টি গবাদিপশুর। ওই হিসেবে এবার স্থানীয় উৎপাদনের বিপরীতে ৩৫ হাজার ৫২০টি গবাদিপশুর ঘাটতি রয়েছে।
ওই দপ্তরের তথ্যমতে, এবার চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলা ও নগরীর পাঁচলাইশ, কোতোয়ালী, ডবলমুরিং এলাকায় কোরবানির পশুর চাহিদা ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি। এর মধ্যে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি। ফলে চাহিদার তুলনায় ৩৫ হাজার ৫২০টি পশুর ঘাটতি রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর জানান, গত কোরবানির ঈদের পশুর চাহিদা ছিলো ৮ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৯টি। সেই হিসেবে গতবারের তুলনায় এবার ৭৭ হাজারের বেশি পশুর চাহিদা কমে গেছে। তবে চাহিদার পাশপাশি উৎপাদনও গতবারের চেয়ে কিছুটা কম হয়েছে। যে পশু মজুদ আছে সেটা চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের জন্য যথেষ্ট। যেটুক ঘাটতি আছে সেটা পূরণে তিন পার্বত্য জেলা ও কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জসহ উত্তরের জেলাগুলো থেকে পশু আসবে। ফলে শেষ পর্যন্ত পশু উদ্বৃত্তও থাকতে পারে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ি, এবার চট্টগ্রাম জেলায় ষাঁড়, বলদ, গাভি, ছাগল, মহিষ, ভেড়া মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৬৯,৪৭৮টি পশুর মজুদ আছে ফটিকছড়ি উপজেলায়। এছাড়া মিরসরাইয়ে ৬০,৩৪০, সন্দ্বীপে ৬২,৩১০, সীতকুণ্ডে ৪৩,৮২০, হাটহাজারীতে ৫৪,৭৫৬, রাউজানে ৪৩,৬০৮, রাঙ্গুনিয়ায় ৪৬,৫৬১, বোয়ালখালীতে ৩১,১৬২, পটিয়ায় ৫৯,৭৩৫, চন্দনাইশে ৩৮,৫৫৯, সাতকানিয়ায় ৫২,৯৯৮, লোহাগাড়ায় ৩৭,২৯১, বাঁশখালীতে ৬০,৩৮৯, আনোয়ারায় ৪০,৯৮০ ও কর্ণফুলীতে ৩২,৪৪৩টি পশুর মজুদ রয়েছে। এরসব এলাকার প্রত্যেকটিতেই চাহিদার চেয়ে উল্লেখযোগ্য পশু উদ্বৃত্ত আছে।
অন্যদিকে নগরীর পাঁচলাইশে ২৫,৫৯৮, কোতোয়ালীতে ৭,৪৭২ ও ডবলমুরিংয়ে ১৬,৬৬০টি পশুর মজুদ রয়েছে। তবে এই তিনটি এলাকায় পশুপালন কম হওয়া এবং ঘনবসতির কারণে পাঁচলাইশ এলাকায় ৩০,১৫২, কোতোয়ালীতে ৩১,১৫৮ ও ডবলমুরিং এলাকায় ৪৭,০২০টি পশুর ঘাটতি রয়েছে। যা আশপাশের উপজেলা ও দেশের অন্য জেলা থেকে বেপারীদের আনা পশু দিয়ে ঘাটতি পূরণ হবে বলে মনে করছেন প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিস¤পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর আরো বলেন, গো-খাদ্যের দাম বাড়তি, মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যা, সবকিছু মিলিয়ে গবাদিপশু হৃষ্টপুষ্টকরণ কমেছে। মূল সমস্যা হচ্ছে গবাদি পশুর খাদ্যের দাম। যার খরচ যোগান দিতে না পেরে চট্টগ্রাম জেলায় ৩০০ খামার ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে আশার বাণী শুনিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রামে গবাদি পশুর উৎপাদন কমলেও কোরবানিতে পশু সংকট হবে না। অন্যান্য জেলায় গবাদি পশুর উৎপাদন প্রচুর বেড়েছে। ওইসব এলাকা থেকে তো চট্টগ্রামে কোরবানির পশু আসবে। তাছাড়া এবার চট্টগ্রামে কোরবানির চাহিদাও কমেছে, ফলে সমস্যা হবে না।
এদিকে খামারিদের অভিযোগ, জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা চট্টগ্রামের বাইরের লোক। তাই তারা চট্টগ্রামে কোরবাানির পশুর উৎপাদন বাড়ুক সেটা চাই না। তারা ছলে-বলে কৌশলে চট্টগ্রামের বাইরে থেকে গবাদি পশু এনে ঘাটতি পুরণে ব্যস্ত। কারণ উত্তরবঙ্গের যে কোন জায়গার চেয়ে চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর দাম দ্বিগুণ। যা সম্পদ পাচারের শামিল।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ স¤পাদক মালিক মোহাম্মদ ওমর বলেন, সাধারণ মানুষের যে খাদ্যপণ্য চালসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে গেলে বাজার মনিটরিং করা হয়, অভিযান চলিয়ে জরিমানা করা হয়। এতে বাজার নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু গো-খাদ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু হয় না। ফলে হঠাৎ করেই গো-খাদ্যের উৎপাদকরা দাম দেড়গুণ করে ফেলে। যেমন সয়াবিনের খৈল ২৬০০ টাকা থেকে ৩৩০০ টাকা করে ফেলেছে, এটা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই।