চট্টগ্রাম বিভাগের প্রতি ৬ জন বাসিন্দার মধ্যে ১ জনের কাছে ব্র্যাকের সেবা পৌঁছেছে। এ বিভাগে কর্মরত ১৫ হাজার ৯৮৪ জন কর্মী ব্র্যাকের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন, এদের মধ্যে ৩৭ শতাংশই নারী। এ বিভাগে সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৯১৫টি কার্যালয় এবং সামাজিক ব্যবসা উদ্যোগের ৩৯টি কার্যালয়ের মাধ্যমে এসব কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। সোমবার চট্টগ্রাম বিভাগে ব্র্যাকের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়।
এছাড়া আগামী ৫ বছরে ব্র্যাক সারাদেশে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি নারী ও যুবসমাজকে কেন্দ্র করে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ মাদক, সন্ত্রাস ও কিশোর গ্যাং। এগুলো সামাজিক ব্যাধি। কিশোরদের বিপথগামী হওয়ার পথ বন্ধে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ করছি। আমার মনে হয়, নতুন বিল্ডিং কোডে প্রতিটি ভবনে শিশুদের খেলার জায়গা রাখা উচিত। তিনি ব্র্যাককে নগরের অন্তত দুইটি খেলার মাঠ, দুই ওয়ার্ডের ডোর টু ডোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান।আলোচনা করেন ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন পরিচালক কেএএম মোর্শেদ। ব্র্যাকের সমন্বিত কর্মসূচির সিনিয়র ম্যানেজার আঞ্জুমান আরা বেগম চট্টগ্রামে বিভাগে ২০২৫ সালে ব্র্যাকের কর্মসূচিগুলো তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, চট্টগ্রাম বিভাগে ৮ হাজার ৫০৭টি অতি-দরিদ্র পরিবার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে এবং ১০ হাজার ৩৯৪টি পরিবার অতিদারিদ্র্য থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু-সহনশীলতা বিষয়ে সহায়তা পেয়েছেন ৯ হাজার ৪৬৪ জন এবং ৪৭১জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সহায়তা পেয়েছেন। মাইক্রোফইন্যান্সের আওতায় আর্থিক সেবা পেয়েছেন ২৭ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। ১৪ লাখ ১৩ হাজার ৯৬৫ জন সদস্যের মধ্যে ৮৯ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। এ ছাড়া ১ হাজার ১৭৬ জন বেকার যুবককে উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগে কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্য কার্যক্রমের মাধ্যমে ২ লাখ ৩ হাজার ৮২২ জন স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক সেবা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের আওতায় এসেছেন। ৩১ হাজার ২০২ জন উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষার আওতায় এসেছেন। এ ছাড়া ১৩ হাজার ৬৬৬ জন গর্ভবতী নারী পূর্ণাঙ্গ প্রসবপূর্ব সেবা পেয়েছেন এবং ৭ হাজার ২১৩টি নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩৮ হাজার ৬০৪ জনের চক্ষু পরীক্ষা এবং ১০ হাজার ১১৯টি চশমা বিতরণ করা হয়েছে।
এ বিভাগে ১৫০টি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩ হাজার ৫১ জন শিক্ষার্থী এবং ১৩৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩ হাজার ৪৮ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন ১১ হাজার ৬০ জন, যার মধ্যে ৫২ শতাংশ নারী। মানবপাচার থেকে ফিরে আসা ১ লাখ ৭২ হাজার ১৯৩ জন ব্যক্তি সচেতনতা, শারীরিক-মানসিক ও আর্থিক পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন।
৮ লাখ ১৪ হাজার ৪৫৩টি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সেবা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং ৩০৫ জন নারী জীবিকা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। নারীর ক্ষমতায়ন ও আইনি সহায়তার অংশ হিসেবে ২৯ হাজার ৭৫৪ জন আইনি সহায়তা পেয়েছেন এবং ৫৮টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা হয়েছে। ৭৭ জন নারী ও ৬৫ জন পুরুষ যুব চেঞ্জমেকার হিসেবে সম্পৃক্ত হয়েছেন।
এ বিভাগে আড়ংয়ের ৬টি আউটলেট, আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশনের ১টি উৎপাদন কেন্দ্র ও ১৬টি উপকেন্দ্র, ব্র্যাক ফিশারিজের ১টি হ্যাচারি এবং ব্র্যাক টি-এর ১টি চা বাগান পরিচালিত হচ্ছে। ব্র্যাক আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশনের মাধ্যমে ৫ লাখ ৯৩ হাজার ১০৬টি গবাদিপশুকে কৃত্রিম প্রজনন সেবা দেওয়া হয়েছে।
বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি, সিনিয়র সাংবাদিক নাজিমুদ্দীন শ্যামল, ড. জিনবোধি ভিক্ষু, প্রফেসর মিজানুর রহমান, উইম্যান চেম্বারের সহ-সভাপতি সুলতানা নুরজাহান রোজী প্রমুখ।
ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন পরিচালক কে এ এম মোর্শেদ বলেন, ব্র্যাকের কর্মকাণ্ডের ৮০ ভাগের বেশি নিজেদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়, দাতাদের সহায়তা ১৮ থেকে ১৯ ভাগ। ব্র্যাক তাই নিজেদের সিদ্ধান্তেই দেশ ও মানুষের প্রয়োজনে উন্নয়নমূলক যে কোনো কাজ হাতে নিতে পারে। এ জন্য কারো অনুমোদন বা পরামর্শের প্রয়োজন হয় না। ব্র্যাকের বিস্তৃতি আজ বিশ্বজুড়ে, তবে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষ। ব্র্যাকের জন্ম বাংলাদেশে, এটি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান।
তিনি বলেন, ব্র্যাকের অন্যতম দর্শন হচ্ছে, মানুষের ভেতরের অমিত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা এবং তা এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করা। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পাঠান মো. সাইদুজ্জামান (শিক্ষা ও আইসিটি) বলেন, সরকারের পর যে প্রতিষ্ঠানটি তৃণমূলে সবচেয়ে বেশি সুসংগঠিত, সেটি হচ্ছে ব্র্যাক। ব্র্যাকের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষ যুব সমাজ গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশের ৭০ ভাগ মৃত্যুর কারণ হচ্ছে অসংক্রামক রোগ। এ থেকে পত্রিাণ পেতে সাধারণ মানুষের মধ্যে হেলথ এডুকেশন বা স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষার প্রয়োজন, যেখানে ব্র্যাক এগিয়ে আসতে পারে।
চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত উপ মহাপরিদর্শক মো. নাজিমুল হক বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে দেশে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিচ্ছন্নতাসহ নানা বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে এনজিওগুলো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। সেই ধারাবাহিতা রক্ষার জন্য তিনি ব্র্যাকসহ দেশের সকল এনজিওর প্রতি আহ্বান জানান।