
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “নিশ্চয় আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি। অতএব আপনার রবের উদ্দেশ্যেই নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন।” ( সুরা কাউসার, আয়াত : ০১-০২)। আভিধানিক দৃষ্টিকোণ হতে আরবি কুরবুন হতে কুরবানি শব্দের উৎপত্তি যার শাব্দিক অর্থ নৈকট্য অর্জন করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট গৃহপালিত পশু জবেহ করাকে কুরবানি বলে। কুরবানি নিছক আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়, এতে রয়েছে অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, দর্শন ও আধ্যাত্মিকত উৎকর্ষতা।

কুরবানির আধ্যাত্মিকতার প্রথম শিক্ষা হলো মহান আল্লাহর নিকট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ (Total submission to almighty Allah). মহান আল্লাহর নিকট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ এর মূল অর্থ হলো—নিজের ইচ্ছা, ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান, সম্মান এবং জীবনকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর আদেশ ও নির্দেশনার কাছে নিঃশর্তভাবে সমর্পণ করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “প্রত্যেক জাতির জন্য আমি কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে, যে সমস্ত জন্তু তিনি রিয্ক হিসেবে দিয়েছেন তার উপর। তোমাদের ইলাহ তো এক ইলাহ; অতএব তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ কর; আর অনুগতদেরকে সুসংবাদ দাও।’ (সুরা হজ্ব, আয়াত : ৩৪)। আল্লাহর তায়ালার প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের বাস্তব চিত্র প্রতিভাত হয় যখন হজরত ইব্রাহিম (আঃ) স্বীয় প্রাণাধিক সন্তান হজরত ইসমাঈল (আঃ)’কে বলেন, “‘হে প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি, অতএব দেখ তোমার কী অভিমত’; সে বলল, ‘হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’। (সুরা ছাফফাত: আয়াত : ১০২)। যেভাবে হজরত সাইয়্যিদুনা ইসমাইল (আঃ) কোন দ্বিধা দ্বন্দ্ব ব্যতিরেকে আল্লাহর প্রতি স্বীয় প্রাণ কুরবানির দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তারই পদাঙ্ক অনুসরণে মহান আল্লাহর নিকট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ হলো কুরবানির আধ্যাত্মিক প্রধান শিক্ষা।
কুরবানির আধ্যাত্মিকতার দ্বিতীয় শিক্ষা হলো ত্যাগ স্বীকার করা। ত্যাগ স্বীকার বলতে বুঝায় আল্লাহর কাছে প্রতিদান ও ছওয়াব লাভের আশায় কোন মহান ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে সম্পদ, সময় কিংবা জীবন বিসর্জন দেওয়া’। সমগ্র বিশ্বে স্বীয় জীবন উৎসর্গ ও আত্মত্যাগের মহান দৃষ্টান্ত ও আদর্শ স্থাপন করেছিলেন হজরত ইসমাইল (আঃ)। তাঁরই অনুসৃত সুন্নাহ কুরবানি শিক্ষা দেয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে স্বীয় জীবন উৎসর্গ তথা আত্মত্যাগ করা। আল্লাহর পথে উৎসর্গ করার অন্যতম অপর উপাদান হলো অর্থ-সম্পদ। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা কখনোই কল্যাণ লাভ করবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে দান করবে। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, আল্লাহ তা সবই জানেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯২) কুরবানি তথা ঈদুল আজহার সময় সামর্থ্যবানদের জন্য আল্লাহর রাস্তায় প্রাণী উৎসর্গ করাও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বড় মাধ্যম। তাই কুরবানি শিক্ষা দেয় জান-মালকে বিশুদ্ধ নিয়তে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ ও ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা সৃষ্টি পূর্বক আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা হাসিল করা।
কুরবানির আধ্যাত্মিকতার তৃতীয় শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি অর্জন করা। পশু কুরবানি প্রদানের মাধ্যমে স্বীয় পশুত্ব স্বভাব যেমন হিংসা, বিদ্বেষ, হিংস্রতা, শত্রুতা, বক্রতা, স্বেচ্ছাচারিতা, লালসা, স্বার্থপরতা ইত্যাদি বিসর্জনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করার মধ্যে রয়েছে কুরবানির মাহাত্ম্য ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। তাযকিয়াতুন্ নাফস তথা আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “আর শপথ নাফসের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন। অতঃপর তাকে অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। অবশ্যই সেই সফলকাম হবে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে। আর অবশ্যই সেই ব্যর্থ মনোরথ হবে যে নিজকে কলুষিত করবে। (সুরা শামস,আয়াত : ৭-১০)। আত্মশুদ্ধির প্রতি গুরুত্বারোপের ব্যাপারে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলা হলো, কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি বলেনঃ প্রত্যেক বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী সত্যভাষী ব্যক্তি। তারা বলেন, সত্যভাষীকে তো আমরা চিনি, কিন্তু বিশুদ্ধ অন্তরের ব্যক্তি কে? তিনি বলেনঃ সে হলো পূত-পবিত্র, নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ, যার নাই কোন পাপাচার এবং নাই কোন দুশমনি, হিংসা-বিদ্বেষ, আত্মহমিকা ও কপটতা। (ইবনে মাজাহ)। কুরবানি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং কুরবানি শিক্ষা দেয় পশু কুরবানির মাধ্যমে পশুসুলভ স্বভাব বর্জনপূর্বক আত্মশুদ্ধি অর্জন পূর্বক ইনসানে কামেল হওয়ার আধ্যাত্মিক অভিযাত্রায় অন্তর্ভূক্ত হওয়ার।
কুরবানির আধ্যাত্মিকতার চতুর্থ শিক্ষা তাকওয়া অর্জন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশ্ত ও রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” (সুরা হজ্জ, আয়াত : ৩৭)। তাকওয়া আধ্যাত্মিক পরিক্রমার অন্যতম প্রধান স্তর। তাকওয়ার পরিচিতি সম্পর্কে হজরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) হজরত ওমর (রাঃ)’কে বলেন, ‘আপনি কি কখনো কাঁটা বিছানো পথে চলেছেন?’ ওমর (রাঃ) বললেন, ‘হ্যাঁ’। কা‘ব (রাঃ) বললেন, ‘সেখানে আপনি কিভাবে চলেছেন?’ ওমর (রাঃ) বললেন, ‘কাপড়-চোপড় গুটিয়ে অত্যন্ত সাবধানে চলেছি’। কা‘ব (রাঃ) বললেন, ‘ওটাই তো তাক্বওয়া’।” কুরবানির আধ্যাত্মিক শিক্ষা তাকওয়া সম্পর্কে বিদায় হজ্বে নবী করিম (দঃ) ইরশাদ করেন, ‘হে মানব সম্প্রদায় ! নিশ্চয়ই তোমাদের পালনকর্তা মাত্র একজন। তোমাদের পিতাও মাত্র একজন। মনে রেখ! আরবের উপর অনারবের, অনারবের উপর আরবের, লালের উপর কালোর এবং কালোর উপর লালের কোনরূপ প্রাধান্য নেই তাক্বওয়া ব্যতীত। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকটে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাক্বওয়াশীল’। (সূত্র : বায়হাক্বী কৃত শুআবুল ঈমান)
কুরবানির আধ্যাত্মিকতার পঞ্চম শিক্ষা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, বলুন , ‘নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির রব’। (সুরা আনয়াম, আয়াত : ১৬২)। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সব সৃষ্টিরই একমাত্র কামনা। স্বীয় প্রাণ ও সম্পদ উৎসর্গের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জিত হয়। ইসলাম ধর্মে একজন মুমিনের জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য ও মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি (রিজা) অর্জন। আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের ব্যাপারে পবিত্র কোরআন শরীফে অন্য আয়াতে বর্ণিত রয়েছে, ‘আর কোন কোন লোক এরূপ আছে যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আত্মা বিক্রয় করে। আর আল্লাহ হচ্ছেন তার বান্দাদের উপর স্নেহপরায়ণ’। (সুরা বাক্বারাহ, আয়াত : ২০৭)। সহীহ বুখারী শরীফে নবীগণের অধ্যায়ে বর্ণিত, “হজরত হাজেরা (আঃ) স্বীয় স্বামী হজরত ইবরাহিম (আঃ)’কে বললেন, হে ইবরাহীম! আপনি আমাদেরকে কার নিকট রেখে যাচ্ছেন? ইবরাহীম (‘আঃ) বললেন, আল্লাহর কাছে। হাযেরা (‘আঃ) বললেন, আমি আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।” সুতরাং পশু কুরবানির সাথে সাথে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সচেষ্ট থাকা কুরবানির আধ্যাত্মিক শিক্ষা যা প্রতিটি ঈমানদারের অভীষ্ট লক্ষ্য।
ইবাদতের বাহ্যিক দিক সম্পাদনের সাথে সাথে সমভাবে অন্তর্নিহিত আভ্যন্তরীণ শিক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ ও পালনের গুরুত্বারোপ করে তরিকা। বাংলার জমিনে প্রবর্তিত একমাত্র তরিকা ‘তরিকায়ে মাইজভান্ডারীয়া' শিক্ষা দেয় আত্মশুদ্ধি, আত্মত্যাগ, আত্মপরিচয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আত্মিক উৎকর্ষ সাধন পূর্বক স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন পূর্বক তাঁরই নৈকট্য অর্জন করা। একইভাবে কুরবানির আধ্যাত্মিক শিক্ষা অর্জনের মূল উপাদান পরিলক্ষিত হয় মাইজভান্ডারী কালামে -
কোরান শরীফ ভীত আছে হেন প্রেম রীত,
হজরত ইসমাইল নবীর কোরবানী মন ভুলিওনা।
প্রেম শাস্ত্র খেলা নয়, সাবধানে প্রাণ দিতে হয়,
ইমাম হোসাইনের খেলা দাস হাদী ভুলিওনা।
অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে হজরত ইসমাইল (আঃ) এর কুরবানির কথা স্মরণ রেখে আল্লাহর প্রতি স্বীয় অস্তিত্বকে উৎসর্গের প্রস্তুত থাকা এমনকি হজরত সায়্যিদুনা ইমাম হোসাইন (রাঃ) এর প্রাণ উৎসর্গের মাধ্যমে কুরবানির বাস্তবায়ন হৃদয়ে ধারণ ও ফানা ফিল্লাহর মাকাম অর্জনের ব্রতী হওয়ার বাসনা রাখা কুরবানির আধ্যাত্মিকতার প্রধান শিক্ষা যা তরিকায়ে মাইজভান্ডারীয়া শিক্ষা দেয়।
লেখক পরিচিতি : ইসলামী লেখক ও গবেষক