একটানা অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং
নদীর জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রাম মহানগরের জনজীবন প্রায় বিপর্যস্ত। জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে মহানগরের বিভিন্ন সড়ক, ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল এবং কমে গেছে গণপরিবহনের সংখ্যা।
এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গন্তব্যস্থলে যেতে বাধ্য হওয়া চাকরিজীবী, বিমানবন্দরগামী যাত্রী, পথচারী, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও দিনমজুরসহ খেটে খাওয়া মানুষ। মৌসুমি বায়ু ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম। চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ ৩৮৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।

এতে নগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা, পাঁচ জেলায় বন্যার আশঙ্কা, পাহাড়ধসের ঝুঁকিসহ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে স্থগিত করা হয়েছে বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাও।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৩৮৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পতেঙ্গা কেন্দ্র। নিম্নচাপ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী কয়েক দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টিতে আগ্রাবাদ, পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, চকবাজার, বাদুরতলা, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, মৌলভীপুকুরপাড়, সিডিএ আবাসিক এলাকা, দুই নম্বর গেট, হালিশহরের কে ও এল ব্লক, রামপুর, বাটালি রোড এবং সিঅ্যান্ডবি এলাকাসহ নগরের বিভিন্ন সড়কে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমেছে। অনেক বাসাবাড়ি ও দোকানপাটেও পানি ঢুকে পড়েছে।ইশান মহাজন সড়কে একটি বড় গাছ ভেঙে পড়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পতেঙ্গা এলাকায় অতিবৃষ্টিতে সিবিচ সড়কের একটি অংশ ধসে পড়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি কয়েকটি স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও ফেনীর নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের কিছু নিম্নাঞ্চলও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করছে।
নিম্নচাপজনিত বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে সাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীন ৪৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ছয়টি কিন্ডারগার্টেনসহ নগরের অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
চসিকের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা জানিয়েছেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মঙ্গলবারের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পরে সুবিধাজনক সময়ে এ পরীক্ষা নেওয়া হবে। সকাল ৮টার মধ্যেই সব প্রধান শিক্ষককে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই কারণে পরীক্ষা স্থগিত করেছে নগরের স্যার মরিস ব্রাউন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এবং নন্দনকাননের ফুলকি সহজ পাঠ বিদ্যালয়ও।
স্যার মরিস ব্রাউন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুজহাত নাঈম সিদ্দিকী জানান, প্রতিকূল আবহাওয়া বিবেচনা করে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিতব্য প্রথম সাময়িক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
তবে চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অর্ধবার্ষিক ও প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পঞ্চম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ এবং দশম শ্রেণির ‘ইংরেজি প্রথম পত্র’ পরীক্ষা নেয়া হয়।
অভিভাবকদের তীব্র আপত্তির পর শেষ পর্যন্ত দুপুর ১টা থেকে অনুষ্ঠিতব্য ষষ্ঠ শ্রেণির ‘ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র’ এবং নবম শ্রেণির ‘ইংরেজি প্রথম পত্র’ পরীক্ষা স্থগিত করে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা থেকে আসা এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, জলাবদ্ধতা ও ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেই সন্তানকে নিয়ে যেতে হয়েছে স্কুলে। পথে বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি থাকায় পোহাতে হয়েছে দুর্ভোগ।
তার ভাষ্য, সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ নুরুল আমিন স্বীকার করেছেন, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা দেরি হয়েছে। এর মধ্যেই অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে পৌঁছে যাওয়ায় সকালের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। তবে বিকেলের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। তার দাবি, সকালের পরীক্ষায় প্রায় ৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেছেন, এটি কোনো পাবলিক পরীক্ষা নয়। তাই আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায় পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রয়েছে। অনুকূল পরিবেশ না থাকলে পরীক্ষা স্থগিত করে পরে সুবিধাজনক সময়ে নেওয়াই নিয়ম।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্তব্যরত আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায়ও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও আছে।