উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন। রোববার (৯ আগস্ট) ইস্পাহানি কমপ্লেক্সের উত্তর পাহাড়তলীতে অবস্থিত পিটিএল ট্রেনিং সেন্টারে আয়োজিত পাহাড়তলী টেক্সটাইলস লিমিটেডের লিড প্লাটিনাম সনদ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি চট্টগ্রামের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা এবং সৌরশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আধুনিক ও টেকসই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।
পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল উৎপাদনে অনন্য মাইলফলক অর্জন করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ইস্পাহানির শতভাগ রপ্তানিমুখী স্পিনিং মিল পাহাড়তলী টেক্সটাইলস লিমিটেড। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (টঝএইঈ) পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ইউনিট-২-কে বিশ্বমানের লিড প্লাটিনাম সনদ দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে ইস্পাহানি গ্রুপের চেয়ারম্যান মির্জা সালমান ইস্পাহানির হাতে সনদটি তুলে দেন গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল, শ্রীলঙ্কার চেয়ারম্যান মাহেন্দ্র জায়ালাথ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইস্পাহানি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা শাকির ইস্পাহানি, পরিচালক মির্জা আহমেদ ইস্পাহানি এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন।
এছাড়া চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিল্পপতি, লিড প্লাটিনাম কনসালট্যান্ট, স্থপতি, ব্যাংকার, ইস্পাহানি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার, নবায়নযোগ্য সৌরশক্তির ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন কারখানার উচ্চমান বজায় রাখার স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে এ সনদ দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) দেওয়া আন্তর্জাতিক এই সনদ অর্জনকে চট্টগ্রামে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পায়নের ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন চউক চেয়ারম্যান।
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ন রেখে অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পায়ন করতে হবে। পাশাপাশি সূর্যের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং সৌরশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার একটি আধুনিক ও টেকসই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত। পাহাড়তলী টেক্সটাইলস এ ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
তিনি বলেন, উন্নয়ন ও শিল্পায়ন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই উন্নয়ন যেন প্রকৃতিকে ধ্বংস করে না হয়। গাছপালা সংরক্ষণ করে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি এই দর্শন ধারণ করে এগিয়ে আসে, তাহলে শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।
চউক চেয়ারম্যান বলেন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার শুধু পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখে না, বরং ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ-সাশ্রয়ী ও টেকসই নগর গড়ে তুলতেও সহায়তা করে। তাই নতুন শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, আজকের দিনটি আমাদের জন্য বিশেষ ও ঐতিহাসিক। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামে এসেছেন। এমন একটি ঐতিহাসিক দিনে পাহাড়তলী টেক্সটাইলসের লিড প্লাটিনাম সনদ অর্জন ও সনদ গ্রহণ নিঃসন্দেহে আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামের সব কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি পাহাড়তলী টেক্সটাইলসের এই মডেল অনুসরণ করে, তাহলে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, চট্টগ্রামকে একটি সবুজ, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব শিল্পনগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের ফুসফুস হিসেবে যে পরিচয়ে আমরা দেখতে চাই, এ ধরনের উদ্যোগ সেই পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করবে।
জানা গেছে, পাহাড়তলী টেক্সটাইলস লিমিটেড ১৯৫৪ সাল থেকে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি উৎপাদন ইউনিট রয়েছে। এসব ইউনিটে বছরে প্রায় ২৩ হাজার মেট্রিক টন সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৭০ শতাংশ কাঁচামাল পরিবেশবান্ধব উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়। আধুনিক
পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতির পাশাপাশি ক্যাপটিভ জেনারেটর থেকে নির্গত এক্সহস্ট গ্যাস পুনর্ব্যবহার করে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো হয়। এছাড়া প্রায় ১০ লাখ লিটার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। ১২ হাজারের বেশি গাছ সমৃদ্ধ সবুজ পরিবেশও পাহাড়তলী টেক্সটাইলসকে আন্তর্জাতিক তৈরি পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
পাহাড়তলী টেক্সটাইলসের এ অর্জন বাংলাদেশের শিল্প খাতে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।