নাগরিকদের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনলাইন অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত সহায়তা দেওয়ার জন্য সাইবার সাপোর্ট অ্যান্ড রেসপন্স সেন্টার চালু করেছিল চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকিং, ফেক আইডি তৈরি এবং অন্যান্য সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠা একটা ভুয়া আইডি, ইনবক্সে আসা একটা হুমকি কিংবা মুহূর্তের অসতর্কতায় ব্যাংক একাউন্ট শূন্য হওয়া-অদৃশ্য এক আতঙ্ক সাইবার অপরাধ। প্রযুক্তির অপব্যবহার বন্ধে নগরবাসীকে নিরাপদ ডিজিটাল সেবা দিতে সিএমপির ‘সাইবার সাপোর্ট এন্ড রেসপন্স সেন্টারে’ চলতি বছরের ৯ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা এই সেন্টারটি এখন সাইবার অপরাধের শিকার ভুক্তভোগীদের শেষ ভরসাস্থল।
জানা গেছে, গত জুন মাসে শুরু হওয়া এ সাইবার সাপোর্ট সেন্টারে ২৯১টি অভিযোগ জমা পড়েছে। নিষ্পত্তি করা হয়েছে ১৮৬টি। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৮৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হ্যাকিং, অপপ্রচার, মানহানি ও হুমকি সংক্রান্ত। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ডিজিটাল লেনদেন সংক্রান্ত ৯৩টি। নিখোঁজ ও অন্যান্য বিষয়ে ১৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে। কেউ চাইলে সশরীরে হাজির না হয়ে ই- মেইলে কিংবা হটলাইন নম্বরেও অভিযোগ জানাতে পারবে।
পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানান, এই সেন্টারের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ধরণ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অনলাইন অপরাধ সংক্রান্ত স্ক্রিনশট, লিংক, কল রেকর্ড, এসএমএসসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণেও সহায়তা করা হচ্ছে, যা তদন্ত কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করছে। তিনি আরও বলেন, সেন্টারটি পাসওয়ার্ড নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতা এবং সামগ্রিক ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে নাগরিকদের সচেতন করছে।
জানা গেছে, সাইবার সাপোর্ট সেন্টার যাত্রা শুরু করার পর সশরীরে আবেদন নিলেও গত এক সপ্তাহ ধরে অনলাইনে অভিযোগ নিচ্ছে। কারো সেন্টারে আসতে সমস্যা হলে ফেসবুক পেইজ অথবা ই-মেইলে অভিযোগ দিতে পারছে।
নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজমের উপ পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. শামীম হোসেন জানান, প্রতারণার মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের সিন্ডিকেটের নাগাল কখনো পাওয়া যায় না। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি যতটুকু পারা যায় মানুষকে সেবা দিতে। সাপোর্ট সেন্টারে প্রতিদিন আট থেকে ১০ জন ভুক্তভোগী আসেন। তবে সব ধরনের অভিযোগ নেয়া সম্ভব হয় না।
বিশেষ করে আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগগুলো মামলা করার পরামর্শ দেয়া হয়। কারণ মামলা না হলে সংশ্লিষ্টদের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যায় না। প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত দুইজন সাব ইন্সপেক্টর অভিযোগ গ্রহণ করেন। আমলে নেয়ার মতো অভিযোগগুলো নেয়া হয়।
অনেকগুলো আমলযোগ্য অপরাধের বিষয় থাকে।সেগুলো থানায় মামলা হয়।ডিসি শামীম হাসান জানান, সাইবার বুলিং, পর্নোগ্রাফি, ভুয়া ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ। এসব বিষয়ে সেবা দেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ কমিশনার মহোদয়ের উদ্যোগে সাইবার সাপোর্ট সেন্টারটি করা হয়েছে। তবে পেশাদার দক্ষ কর্মকর্তা এবং কেন্দ্রীয়ভাবে আলাদা সাইবার ইউনিট না হলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ বর্তমানে প্রথাগত অপরাধ কমে গেছে। সাইবার অপরাধ বেড়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং ও ভুয়া ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ খোয়া গেলে নিয়মিত মামলা হতে হয়। আদালতে অনুমতি সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য প্রদান করেন।
ডিসি শামীম হোসেন বলেন, দেখা গেছে ব্যাংকে হিসাব আছে আপনার নামে, চেক বইও নিয়েছেন, ডেবিট কার্ডও নিয়েছেন। ওই হিসাবে অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। কিন্তু যার নামে একাউন্ট সে কিছুই জানে না। অনেকে আছে একাউন্ট ভাড়া দেয়। অনেক সময় আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষকে সাহায্য দেয়ার নামে এনআইডি নিয়ে ভুয়া একাউন্ট খোলা হয়।
টেলিগ্রাম অ্যাপসের মাধ্যমে কোন ব্যক্তিকে লোভনীয় অপার দেয়া হল। প্রথম প্রথম কিছু লাভও দেয়া হয়। এক পর্যায়ে টেলিগ্রামে গ্রুপে এড করে নেয়া হয়। পরে ব্যাংকে খোলা একাউন্টের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। এ ধরনের ঘটনায় থানায় মামলা করে আদালতের অনুমতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে তথ্য নিয়ে দেখা যায়, যার নামে একাউন্ট সে হয়তো দিনমজুর। সে জানেই না তার একাউন্টে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।