চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি বৃহস্পতিবার তৃতীয় দিনে গড়িয়েছে। এদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানববন্ধন, খোলা চিঠি পাঠ, সংবাদ সম্মেলন, গণস্বাক্ষর ও মশাল মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের ক্যাম্পাসে প্রবেশ ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক তালাবদ্ধ করে রাখেন তারা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রমও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার অপরাহ্নে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে দৈনিক ইত্তেফাককে জানিয়েছেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। তবে তিনি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে কবে যোগ দেবেন, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।এদিকে চুয়েট শিক্ষক সমিতি নতুন উপাচার্যকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রহণ না করার কথা জানিয়ে সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। দাবি পূরণে আগামী রবিবার শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে ক্যাম্পাসে এক বিশাল মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা চত্বর থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রধান ফটকসংলগ্ন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো চুয়েট ক্যাম্পাস।পরে বাস্কেটবল মাঠে ‘৫৬’ আকৃতিতে মোমবাতি প্রজ্বালন করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের আলোজ্জ্বল ৫৬ দিনের কর্মদিবসকে তারা এভাবে স্মরণ করেন।

এর আগে বেলা পৌনে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেয় চুয়েট শিক্ষক সমিতি।
মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা নবনিযুক্ত উপাচার্যের নিয়োগসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন এবং অধ্যাপক ড. সায়েমকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহারের দাবি জানান। এ সময় আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের অবস্থান ও দাবি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি পাঠ করেন চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তফা খালিদ বিন শামস আরিয়ান। পরে সন্ধ্যায় খোলা চিঠিটি প্রধান ফটকের সামনে টাঙিয়ে দেওয়া হয়।
ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধনে অংশ নেন। এ সময় ‘ভিসি কে, ভিসি কে, সায়েম স্যার ছাড়া আবার কে?’, ‘গর্জে উঠুক রাজপথ, সায়েম স্যারের প্রত্যাবর্তন হোক’ এবং ‘দাবি মোদের একটাই, সায়েম স্যারকে ভিসি চাই’সহ নানা প্রকম্পিত স্লোগান দেন তারা। শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল দাবিসংবলিত নানা ধরনের প্ল্যাকার্ড।মানববন্ধনে পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী দেবজিত দাশ গুপ্ত বলেন, সায়েম স্যার একজন বহুমুখী গুণসম্পন্ন মানুষ। তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য একজন শিক্ষক ও উপাচার্য ছিলেন। তাকে পুনরায় উপাচার্য পদে নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত আমাদের দাবি ও আন্দোলন চলবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাস ত্যাগ করে বাড়ি না ফেরার ঘোষণাও দেন তারা।
বিকাল ৩টায় চুয়েট কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনকে সাথে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে চুয়েট শিক্ষক সমিতি। সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসানুল্লাহ স্পষ্ট জানান, শিক্ষকরা নতুন ভিসিকে গ্রহণ করবেন না। তারা সাবেক উপাচার্য সায়েমকে পুনর্বহালের মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত সমাধানের দাবি জানান।দাবি আদায়ে স্মারকলিপি দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রীর কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হবে বলে জানানো হয়। এছাড়া আগামী রবিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করবেন। দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন শিক্ষক নেতারা।
উল্লেখ্য, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে কুয়েটের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে ওই রাতেই ক্যাম্পাসে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় সর্বাত্মক শাটডাউন। বন্ধ রয়েছে ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম। বুধবার দ্বিতীয় দিনের শাটডাউনের পাশাপাশি গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করা হয়। অধ্যাপক ড. সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ চুয়েট পরিবার।