জুন-জুলাই থেকে ডেঙ্গু বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সেপ্টেম্বর অক্টোবর থেকে ডেঙ্গু বাড়ার হার তুলনামূলকভাবে কমে আসতো। তবে এবার জুন-জুলাইয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী খুব বেশি ছিল না। আগস্ট থেকে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকে। তবে সদ্য শেষ হওয়া সেপ্টেম্বরে সেটি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এই ধারা অক্টোবরেও চলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চলতি বছর চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৪ হাজার ৪৬৬ জন। ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ২১ জন। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের। সেপ্টেম্বর মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৩০ জন। অন্যদিকে চলতি বছর মোট মৃত্যুর মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে ১৭ জন এবং পুরুষ রয়েছে ৪ জন। তবে আক্রান্তের দিকে পুরুষের হার বেশি। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ২ হাজার ১৯৩ জন পুরুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়, নারী আক্রান্ত হয় ১ হাজার ২৭৮ জন এবং শিশু আক্রান্ত হয় ৯৯৫ জন।
এদিকে ১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে সর্বশেষ তথ্য অনুসারে আগের ২৪ ঘণ্টায় সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ১০৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩১ জন, ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালে ১৩ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৩০ জন, চট্টগ্রাম সিএমএইচ হাসপাতালে ৫ জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে ১২ জন এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৬ জন।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীর মূল চিকিৎসা হচ্ছে ফ্লুইড ম্যানেজম্যান্ট। অনেক রোগী এনএস-১ রিপোর্ট হওয়ার সাথে সাথে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাচ্ছেন। এটির আসলে কোনো দরকার নাই। ডেঙ্গুর প্ল্যাটিলেট কাউন্ট ১০ হাজারের নিচে নেমে গেলে তখন ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হয়। তখন ক্রিটিক্যাল কেয়ার ম্যানেজম্যান্টের প্রয়োজন পড়ে। আবার প্ল্যাটিলেট কমা শুরু হয় জ্বর কমে যাওয়ার পরপর। তখন শারীরিক কিছু অসুবিধা দেখা দেয়। ওই সময় হাসপাতালে ভর্তি হতে পারে। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্ল্যাটিলেট নিয়ে আতঙ্ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আসলে প্ল্যাটিলেট যখন বাড়া শুরু হয় তখন দ্রুতই বাড়ে। কাজেই ডেঙ্গু জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন প্রায় থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া রয়েছে ভ্যাপসা গরম। এমন আবহাওয়া ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশার বংশবিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এছাড়া যত্রতত্র ডাবের খোসা, গাড়ি টায়ার ও বাসা বাড়ির ছাদে ফুলের টবে পানি জমে সেখান থেকে মশার বংশবিস্তার হয়।
এদিকে চট্টগ্রাম নগরীর বাইরে সীতাকুণ্ডের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। মহানগরের বাইরে ১ হাজার ৯২০ জন ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে সীতাকুণ্ডে আক্রান্ত ৫৬২ জন। এরপরে কর্ণফুলীতে আক্রান্ত হয়েছেন ২৬৭ জন।এছাড়া রাঙ্গুনিয়ায় ১৪৫ জন, বাঁশখালীতে ১৪২ জন, সাতকানিয়া ১০৯ জন, আনোয়ারায় ১০৭ জন, রাউজানে ৯৩ জন, পটিয়ায় ৮৮ জন, হাটহাজারীতে ৭৬ জন, মীরাসরাইতে ৭৪ জন, বোয়ালখালীতে ৭১ জন, চন্দনাইশে ৬৫ জন, লোহাগাড়ায় ৬১ জন, ফটিকছড়িতে ৩৭ জন এবং সন্দ্বীপে আক্রান্ত হয়েছেন ২৩ জন।
চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, এখন প্রায় প্রতিদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি হওয়ার কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে যাচ্ছে। ফলে এসব পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। কোনো স্থানে যেন তিনদিনের বেশি পানি না জমে সেই বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনও মশক নিধনে তাদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
জানা গেছে, গত বছর ২০২৫ সালে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৮৬৪ জন এবং মারা যান ২৭ জন। এছাড়া ২০২৪ সালে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং মারা যান ৪৫ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১৪ হাজার ৮৭ জন। এর মধ্যে মারা যান ১০৭ জন এবং ২০২২ সালে মোট আক্রান্ত ৫ হাজার ৪৪৫ জনের মধ্যে মারা যান ৪১ জন।