স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত নতুন রোগী, নতুন সেবা, নতুন বাজার কিংবা নতুন প্রচারণার বিষয়গুলোই সামনে আসে। কিন্তু এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও ভাবা দরকার—যারা ইতোমধ্যে আমাদের সেবা নিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কটি আমরা কতটা ধরে রাখতে পারছি? একজন রোগী একবার হাসপাতালে এসেছেন মানেই সম্পর্ক শেষ নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে সেখান থেকেই একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের শুরু হতে পারে।
কেউ একবার চিকিৎসা নেন, কেউ নিয়মিত ফলোআপে আসেন, কেউ পরিবারের অন্য সদস্যের চিকিৎসার জন্য আবার ফিরে আসেন। আবার কোনো রোগী আজ একটি সেবা নেওয়ার পর ভবিষ্যতে অন্য স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হলে একই প্রতিষ্ঠানের কথা ভাবতে পারেন। তাই একজন রোগীকে শুধু একটি ভিজিট, বিল কিংবা লেনদেন হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। তিনি একই সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের সম্ভাবনাও তৈরি করেন।
একজন রোগীর নাম, চিকিৎসার ইতিহাস, রিপোর্ট, অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা হাসপাতাল ভিজিটের তথ্য থাকলেই রোগীকে পুরোপুরি বোঝা যায় না। জানতে হবে—তিনি প্রথমবার কেন এসেছিলেন, কোন সেবা নিয়েছিলেন, তাঁর ফলোআপের প্রয়োজন ছিল কি না, আবার এসেছেন কি না, না এলে কেন আসেননি এবং ভবিষ্যতে তাঁর বা পরিবারের অন্য সদস্যের প্রয়োজন হলে তিনি কোথায় যাচ্ছেন। এসব প্রশ্ন শুধু মার্কেটিংয়ের জন্য নয়; এগুলোর সঙ্গে রোগীর অভিজ্ঞতা, সেবার মান এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিও জড়িত।
আমার অভিজ্ঞতায়, ডেটা যদি শুধু অতীতের হিসাব সংরক্ষণ করে, তার মূল্য সীমিত। কিন্তু সেই ডেটা যদি রোগীর প্রয়োজন বুঝতে, সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য দিতে এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করতে সহায়তা করে, তখন সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সম্পদে পরিণত হয়।
রোগীর সঙ্গে পরবর্তী যোগাযোগও শুধু একটি ফোনকল বা এসএমএস—‘আপনার পরবর্তী অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় হয়েছে’—এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ফলোআপ, স্বাস্থ্যতথ্য, রিপোর্ট, পরবর্তী করণীয় বা চিকিৎসকের পরামর্শের বিষয়ে যথাসময়ে জানানো যেতে পারে। তবে এখানে একটি ভারসাম্য জরুরি। রোগীকেন্দ্রিক যোগাযোগ মানে বেশি বেশি বার্তা পাঠানো নয়; বরং সঠিক রোগীকে, সঠিক সময়ে, তাঁর প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য দেওয়া। একই সঙ্গে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও সম্মতিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি এই যোগাযোগকে সহজ করতে পারে। তবে Digital does not mean one-size-fits-all। কেউ ফোনে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কেউ অনলাইনে তথ্য খোঁজেন, কেউ সরাসরি হাসপাতালে এসে কথা বলতে চান। আবার অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের একজন সদস্য রোগীর হয়ে যোগাযোগ করেন। তাই রোগীকেন্দ্রিক যোগাযোগের অর্থ সবাইকে একই বার্তা একই মাধ্যমে পাঠানো নয়; বরং রোগীর প্রয়োজন বুঝে উপযুক্ত মাধ্যম বেছে নেওয়া।
নতুন রোগী আনা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধুমাত্র নতুন রোগী অর্জনের ওপর নির্ভর করলে মার্কেটিংয়ের চাপ ও ব্যয় দুটোই বাড়তে থাকে। অন্যদিকে, একজন রোগীর সঙ্গে ভালো চিকিৎসা, ভালো সেবা ও ইতিবাচক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আস্থা তৈরি হলে তিনি ভবিষ্যতে আবার সেবা নিতে পারেন, পরিবারের সদস্যকে নিয়ে আসতে পারেন এবং নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। ভালো সেবা নিজেই একটি শক্তিশালী সম্পর্ক ও ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারে।
এ কারণে হাসপাতালের প্রবৃদ্ধি পরিমাপের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু Reach, Leads, Calls বা New Patients নয়; কতজন রোগী পুনরায় এসেছেন, কোথায় রোগীরা সেবা নেওয়া বন্ধ করেছেন, কোন যোগাযোগমাধ্যমে তাঁরা বেশি সাড়া দিচ্ছেন এবং কোন ধরনের সমস্যায় তাঁরা বারবার যোগাযোগ করছেন—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। রোগী ধরে রাখা শুধু মার্কেটিং বিভাগের সাফল্য নয়; এর সঙ্গে চিকিৎসা, নার্সিং, ফ্রন্ট ডেস্ক, অ্যাপয়েন্টমেন্ট, বিলিং, রিপোর্ট এবং সামগ্রিক রোগী-অভিজ্ঞতা জড়িত।
স্বাস্থ্যসেবায় Patient Retention-কে শুধু ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে দেখাও ঠিক নয়। একজন রোগীর জন্য সময়মতো চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ফলোআপ এবং নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন, সেখানে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো সহজ করা; যেখানে ফলোআপ প্রয়োজন, সেখানে সময়মতো মনে করিয়ে দেওয়া; আর যেখানে সচেতনতা প্রয়োজন, সেখানে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া—এসবই রোগীকেন্দ্রিক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার অংশ।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন করছি—কীভাবে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়? এখন এর পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন করার সময় এসেছে—যারা ইতোমধ্যে আমাদের কাছে এসেছেন, তাঁদের আমরা কতটা ভালোভাবে বুঝতে পারছি?
আমার কাছে আগামী দিনের স্বাস্থ্যসেবা মার্কেটিংয়ের বড় পরিবর্তন এখানেই। হাসপাতালের প্রবৃদ্ধির সমীকরণ শুধু New Patient Acquisition নয়; এর সঙ্গে থাকতে হবে Patient Relationship, Follow-up, Patient Experience এবং Long-term Trust। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু একজন রোগীকে বারবার হাসপাতালে নিয়ে আসা নয়; এমন একটি সেবা-অভিজ্ঞতা তৈরি করা, যেখানে প্রয়োজনের সময় তিনি স্বাভাবিকভাবেই সেই প্রতিষ্ঠানটির কথা ভাবেন।
লেখক, মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর,
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম