
চট্টগ্রামের খলিফাপট্টি সার্বজনীন পূজা উদযাপন পরিষদের এবারের থিম ‘রক্তাঞ্জলি’। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদী রূপই এবার ফুটে উঠেছে তাদের মণ্ডপসজ্জায়। মণ্ডপের প্রবেশপথে পা রাখতেই চোখে পড়ে সাদা কাপড়ে ছোপ ছোপ লাল রং। দেয়ালে সাঁটানো খবরের কাগজের কাটিং, যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতনের নানা খবর। একপাশে কানে হাত দিয়ে বসে আছে এক শিশু। দুর্গার পায়ে ফুলের বদলে দেওয়া হচ্ছে রক্ত।
কেবল খলিফাপট্টি নয়, চট্টগ্রামের মণ্ডপগুলো এবার যেন হয়ে উঠেছে একেকটি জীবন্ত ক্যানভাস। খবরের কাগজের রূঢ় বাস্তবতা আর কাব্যের স্নিগ্ধ ভাষা মিলেমিশে একাকার হয়েছে পূজার নানা ভাবনায়। কোথাও জীবনের দায়বদ্ধতা, কোথাও সৃষ্টির আদি উপাদান জলের আখ্যান উঠে এসেছে প্রতিমা ও আলোকসজ্জায়।
এছাড়া গোসাইলডাঙ্গা সার্বজনীন শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দির প্রাঙ্গণে একতা গোষ্ঠীর আয়োজনে ফুটে উঠেছে ‘ভার’ বা দায়বদ্ধতার গল্প। বাবার কাঁধে সন্তানের ভার, প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায় কিংবা নিজের আত্মার প্রতি নিজের দায়িত্ব-এসব বিষয়কে পাহাড়ের মতো ভারী অথচ দেবীর আশীর্বাদের মতো পবিত্র রূপে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে উত্তর কাট্টলী জ্বালাকুমারী বাড়ির বৈশাখী সংঘের মণ্ডপে গেলে মনে হবে জলের এক মায়াবী দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছেন দর্শনার্থীরা। ‘জল দুয়ার’ থিমে জলের প্রতিটি বিন্দু থেকে সৃষ্ট প্রাণ, বিবর্তন ও আরাধনার গল্প মাটি ও আলোর খেলায় মূর্ত করে তুলেছেন শিল্পীরা।
মণ্ডপগুলোর এই সৃজনশীলতা ও নান্দনিক আয়োজনের স্বীকৃতি দিতে এবার উদ্যোগ নিয়েছে ‘শারদ সম্মাননা পর্ষদ’। চট্টগ্রাম নগরীর ৪৬টি নিবন্ধিত পূজামণ্ডপের মধ্যে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে সেরা পাঁচটি মণ্ডপের নাম ঘোষণা করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
নগর ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, উৎসবের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে একটি সম্প্রীতিময় নগরী গড়ে তুলতে সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ জরুরি।পূজামণ্ডপের ব্যতিক্রমী আয়োজনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে আয়োজকদের উৎসাহিত করার কথাও জানান তিনি। চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত জুরি প্যানেল সরেজমিনে মণ্ডপগুলো পরিদর্শন করে এই মূল্যায়ন করেন। সেরা পাঁচের তালিকায় খলিফাপট্টি, গোসাইলডাঙ্গা ও উত্তর কাট্টলীর পাশাপাশি স্থান পেয়েছে পতেঙ্গা শ্যামা সংঘ (থিম: যুগান্তরের বার্তাবহন) এবং দক্ষিণ নালাপাড়া পূজা উদযাপন পরিষদ (থিম: আত্মকথন)।
চিত্রশিল্পী আহমেদ নেওয়াজ বলেছেন, প্রতিটি মণ্ডপের থিম, নান্দনিকতা ও শিল্পভাবনা ছিল প্রশংসনীয়। সরেজমিনে পরিদর্শনপূর্বক বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নে সেরা নির্বাচন করা ছিল আমাদের জন্য বেশ দায়িত্বপূর্ণ।’ আরেক বিচারক চিত্রশিল্পী দীপক দত্ত বলেছেন, ‘নান্দনিক রূপায়ন, ঐতিহ্য রক্ষা ও সুশৃঙ্খল পরিবেশের সার্বিক সূচক বিবেচনায় নিয়ে আমরা নিরপেক্ষ মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছি।
এবারের সম্মাননায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন চিত্রশিল্পী আহমেদ নেওয়াজ, চিত্রশিল্পী দীপক দত্ত, আলোকচিত্র শিল্পী শোয়েব ফারুকী, নাট্যজন ও বাচিকশল্পী বাপ্পা চৌধুরী ও কংকন দাশ, সিনিয়র সাংবাদিক নাসির উদ্দিন হায়দার, ফারুক তাহের ও অনুপম পার্থ, চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির নৃত্য প্রশিক্ষক প্রিয়াংকা বড়ুয়া। বিচারকরা নিবন্ধিত মণ্ডপগুলোর শিল্পমান, থিমের গভীরতা, আলোকসজ্জা, পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করেছেন।