‘কিশোর’ শব্দটি কানে আসলেই একটু আদর, ভালোবাসা-ভালো লাগা, কিছুটা আবেগ কিংবা হৃদ্যতা মনে ভেসে ওঠে। সন্দেহ নেই, বয়সটাও আদুরে। কোমলমতি চেহারাটাকে ভালোবাসতে সবারই মন চায়। কঠোর মানসিকতার মানুষও কিশোর-তরুণ বয়সীদের ভালোবাসে। বয়সটাই এমন।
কিন্তু এখন? কিছু কিছু কিশোরের অসংলগ্ন আচরণের কারণে মানুষের স্মৃতিপটে এখন সে ধরনের সহানুভূতি কমই জেগে উঠছে। এর সংগত কারণও আছে। এতসব কারণ এখন সময়, অবস্থা, প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি—সামগ্রিক দৃশ্যপট বিবেচনায় কিশোর অপরাধের বিষয়টি এখন কঠিন বাস্তবতা। প্রতিনিয়ত এ বাস্তবতা কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। আগামীতে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে কিনা কিংবা আদৌ সম্ভব কিনা তাও বলা যাচ্ছে না।
দুই। নিকট অতীতেও সন্ধ্যার পর কিশোর বয়সী কেউ বাসার বাইরে থাকত না। বলা যায়, পরিবার থেকে এমন অনুমতি ছিল না। অনেকটা নিষিদ্ধই ছিল। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকাটা কোনো মতেই অনুমতি ছিল না। কেউ কখনো কোনো কারণে যদি সন্ধ্যার পর বাইরে থেকে যেত, তখন তার ওপর অলিখিত ‘১৪৪ ধারা’ জারি হয়ে যেত। পুরো বুক ধুকধুক নিয়েই তাকে ঘরে ফিরতে হতো। প্রতিনিয়ত শঙ্কায়ই থাকতে হতো। মনে মনে ভাবত—‘জানি না আজ কী হবে। কোন ঝড়ো হাওয়া বইবে আমার ওপর।’ এমন কঠোর ও কঠিন মনোভাব নিয়ে বাসায় ফিরতে হতো। তদুপরি বাসায় ফিরেই কঠোর জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হতো। রীতিমতো আদালতের জবানবন্দি দেওয়া বা জেরার মতোই অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে কখনো বেত্রাঘাত, কখনো হুমকি-ধামকিসহ নানা শাস্তির সম্মুখীন হতে হতো।
কিন্তু এখন? এখন তো প্রায়ই সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা। আগের এসব দৃশ্য, পরিস্থিতি কিংবা শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার মতো কোনো অবস্থাই এখন আর অবশিষ্ট আছে কিনা সন্দেহ। ফলে পরিবার ও সমাজে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সন্ধ্যার পর একজন কিশোর বা শিক্ষার্থীর কাজ কী? সন্ধ্যার পর তো ক্লাস বা কোচিং থাকার কথা নয়। তাহলে কেন একজন কিশোর বা শিক্ষার্থী সন্ধ্যার পর বাসার বাইরে থাকবে? অভিভাবকই বা কেন তাদের সন্তানদের সন্ধ্যার পর বাইরে থাকার অনুমতি দেবেন? এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন এবং সতর্ক হওয়া জরুরি।
প্রতিদিন সন্ধ্যার পর চট্টগ্রাম শহরের জামাল খান মোড়, কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়াম এলাকা, চেরাগি পাহাড় মোড়, জিইসি মোড়, বিবিরহাট
বশর মার্কেট,গ্রীন ভিউ, সুন্নিয়া মাদ্রাসার মাঠ সংলগ্ন" রেললাইনের উত্তর- দক্ষিণ, এশিয়া ফ্যান ফ্যাক্টরি পূর্ব পাশে, মুরাদ পুর, চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্সের পূর্ব পাশের সড়ক এবং দক্ষিণ পাশের সড়ক, ষোল শহর,
দুই নাম্বার গেট বিপ্লব উদ্যান ও এর আশেপাশের এলাকা সহ- বিভিন্ন অভিজাত বিপণিবিতানের চত্বরে কিশোর-তরুণদের সরব উপস্থিতি অনেক প্রশ্নেরই উদ্রেক করে। হয়তো কোনো সচেতন অভিভাবক চোখ-কান খোলা রেখে এসব এলাকায় একটু সময় ব্যয় করলে বাস্তব ও কঠিন অবস্থা অবলোকন করার সুযোগ হবে। তবে এমনটি মোটেও নয় যে, এসব স্থানে সব কিশোর-তরুণের উপস্থিতি অপরাধের সঙ্গে জড়িত। অতএব এখনো সময় আছে সতর্ক, সচেতন, কঠোর ও সাবধান হওয়ার।
তিন। কিশোর-তরুণরা অপরাধে জড়াচ্ছে কেন? বিষয়টি আসলেই একটি গবেষণার। তবে এর অনেক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সর্বসাকুল্যে কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ বলা যায়। এর মধ্যে আছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের ঘাটতি, সমকালীন প্রেক্ষাপটে পারিবারিক অনুশাসন কমে যাওয়া, বন্ধু নির্বাচনে অপরিণামদর্শিতা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ কমে যাওয়া, উন্নত প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্টতা ও অনুকরণ, সুষ্ঠু ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা না হওয়া, ক্রমাগত হারে খেলার মাঠ কমে যাওয়া, সামাজিকভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন না থাকা, প্রতিনিয়ত সাইবার জগতে ডুবে থাকা এবং সেখান থেকে যা শিখছে তা প্রয়োগ করতে গিয়ে বিপথগামী হওয়া।
তাছাড়া ভিন্ন একটি চিত্রও আছে। অনেক পরিবারে দেখা যায় বাবা-মা দুজনই চাকরিজীবী। ফলে সন্তানের প্রতি তাদের সচেতনতা থাকার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা হচ্ছে না। এতে করে সন্তানরা সহজেই বিপথগামী হয়ে উঠছে।
তবে একটি বিষয় খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার মাধ্যমে প্রচুর টাকার মালিক হচ্ছে অনেকে। ফলে এসব পরিবারের সন্তানরা ছোটবেলা থেকেই অর্থের প্রতি প্রলুব্ধ হচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই সহজে তাদের হাতে চলে আসছে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অর্থ। সেই অর্থ কেউ কেউ খরচ করছে নানা অপকর্মে। মিশছে অপরাধচক্রের সঙ্গে।
চার। কিশোর অপরাধ প্রবণতার নতুন সংস্করণ হলো ‘কিশোর গ্যাং’। সাধারণত কিশোর গ্যাং বলতে বোঝায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা কয়েকজনের একটি গ্রুপ বা অভিন্ন কোনো স্বার্থকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দল। মূলত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়েই গড়ে উঠছে এ ধরনের গ্যাং বা গ্রুপ। স্কুল-কলেজের কিছু ছাত্র আড্ডা দিতে দিতে গড়ে ওঠে ছোট ছোট গ্রুপ। একসঙ্গে ঘোরাঘুরি, চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় পরস্পর বন্ধুত্ব। পরে ক্ষমতা, সিনিয়র-জুনিয়র, আধিপত্য, নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হয় দ্বন্দ্ব। বন্ধুত্বের রূপ নেয় হিংস্র ও সহিংসতায়। ঘটায় ছোটখাটো সন্ত্রাস, ছিনতাইয়ের ঘটনা। এই কিশোররা ড্রাগ, খুন, ইভটিজিং, ছিনতাই, মাদকসেবন, চুরি এমনকি ধর্ষণের মতো ভয়ংকর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে। বলা যায় যে আমাদের দেশে প্রথম, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর উত্তরায় কিশোর আদনান হত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি প্রকাশ পায়। এরপর থেকে শুরু হয় কিশোর গ্যাংয়ের নানা অপকর্ম।
পাঁচ। কিশোর অপরাধের কারণে পরিবার ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। মা-বাবা প্রতিনিয়তই চিন্তিত থাকেন সন্তানদের নিয়ে। কখন কোন দুঃসংবাদ কানে বাজে। একজন বিপথগামী কিশোরের জন্য একটি পরিবার যারপরনাই শঙ্কিত থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি একটি পরিবারের জন্য হয়ে ওঠে চরম অভিশাপ। কিন্তু এমন আতঙ্কিত সময় পার আর কত?
ঘটনা তো ঘটছে বা ঘটবে একদিন। সেই একটি ঘটনাই অনেক কিছু এলোমেলো করে দেওয়ার মতো। প্রশ্ন উঠতে পারে, আজকের সময় কাটানোর উপায় না থাকলে কিশোর-তরুণদের সময় কাটানোর দোষের কী আছে? এমন প্রশ্নও আসতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটা সময় কাটানোর নয়, গুরুত্বপূর্ণ এবং মুখ্য বিষয় হলো, সময়টা কখন, কোথায়, কার সঙ্গে এবং কী করে কাটানো হচ্ছে, সেটাই বিবেচ্য।
আজকের একটি সময় কাটানোর বিষয়টাও একজন কিশোরের আগামী জীবনের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। অতএব এখনো সময় আছে সতর্ক, সচেতন, কঠোর ও সাবধান হওয়ার।
এর জন্য প্রয়োজন পরিবারের কর্তব্যবোধ, অভিভাবক, সমাজ এবং দায়িত্বশীলদের সতর্ক ও সচেতনতা। কিশোর-তরুণদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ। কিশোরদের সামাজিক-পরিবারিক সহযোগিতা প্রদান। সুস্থ-সুন্দর সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ দেওয়া। খেলাধুলা, মননশীল ও শৈল্পিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহী করে তোলা। পাঠ্যবই ও বাহ্যিক জ্ঞান আহরণের সুযোগ করা। নৈতিকতা ও মানবিক জ্ঞান আহরণে তৎপর হওয়া। তবেই কিশোর-তরুণ হবে বিপদমুক্ত। সমাজ হবে জ্ঞাননির্ভর। দেশ পাবে মেধাবী সন্তান।