প্রযুক্তির আশীর্বাদ নাকি আসক্তি? নোমোফোবিয়া নিয়ে নতুন ভাবনা

মোবাইল ছাড়া অস্থিরতা: ডিজিটাল যুগের নতুন মানসিক সংকট নোমোফোবিয়া

জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ডিজিটাল জীবনের নীরব বিপদ: মোবাইল নির্ভরতা ও নোমোফোবিয়া

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

বর্তমান বিশ্বে মোবাইল ফোন আর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, ব্যবসা, বিনোদন এবং সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষ স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তবে একই সঙ্গে তৈরি করেছে নতুন কিছু মানসিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে অন্যতম হলো নোমোফোবিয়া (Nomophobia)— মোবাইল ফোন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অযৌক্তিক ভয় বা উদ্বেগ।

বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা কয়েকশ কোটি ছাড়িয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন শিক্ষা, ই-কমার্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন সেবার কারণে মানুষের জীবন ক্রমেই স্মার্টফোনকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। ফলে মোবাইল ফোন হারিয়ে যাওয়া, চার্জ শেষ হয়ে যাওয়া কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো ঘটনা অনেকের জন্য সাধারণ অসুবিধার চেয়ে বড় মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, নোমোফোবিয়া এখনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো পৃথক মানসিক রোগ না হলেও এটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক সমস্যা। মোবাইল ফোন কাছে না থাকলে উদ্বেগ, অস্থিরতা, বিরক্তি, ভয় কিংবা অসহায়ত্বের অনুভূতি তৈরি হওয়াই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। অনেকেই বারবার ফোন চেক করেন, কোনো নোটিফিকেশন না এলেও স্ক্রিন অন করে দেখেন অথবা কয়েক মিনিট ফোন ব্যবহার না করলেই অস্বস্তি অনুভব করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোনের কার্যক্রম। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব কিংবা বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপের নোটিফিকেশন মানুষের মধ্যে তাৎক্ষণিক আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। ধীরে ধীরে এই অভ্যাস নির্ভরতায় রূপ নেয়। যখন সেই উৎস হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, তখন মস্তিষ্কে এক ধরনের শূন্যতা ও উদ্বেগ তৈরি হয়।

নোমোফোবিয়ার লক্ষণ সাধারণত দুই ধরনের— মানসিক ও শারীরিক। মানসিক লক্ষণের মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, ভয়, মনোযোগের ঘাটতি, বিরক্তি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। অন্যদিকে শারীরিক লক্ষণের মধ্যে হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঘাম হওয়া, হাত কাঁপা, শ্বাস-প্রশ্বাসে অস্বস্তি কিংবা ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এসব লক্ষণ অব্যাহত থাকলে তা ব্যক্তির কর্মক্ষমতা, শিক্ষাজীবন এবং পারিবারিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ প্রজন্ম নোমোফোবিয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ তারা প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত। বর্তমানে অনেক তরুণের দিনের শুরু এবং শেষ হয় স্মার্টফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। বাস্তব জীবনের সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং স্মার্ট প্রযুক্তির বিস্তারের এই যুগে নোমোফোবিয়ার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, মানুষের নির্ভরতাও তত বাড়ছে। ফলে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর স্বাস্থ্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে ‘ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং’ এবং ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে।

নোমোফোবিয়া থেকে মুক্ত থাকতে হলে সচেতনতার বিকল্প নেই। প্রতিদিন কিছু সময় মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো, বই পড়া, খেলাধুলা কিংবা সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। বিশেষ করে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার না করা এবং দিনের নির্দিষ্ট সময়কে ‘স্ক্রিনমুক্ত সময়’ হিসেবে নির্ধারণ করা কার্যকর হতে পারে।

প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি হয়েছে, মানুষের মানসিক শান্তি কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। তাই প্রযুক্তিকে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু তার দাসে পরিণত হওয়া যাবে না। স্মার্টফোন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তবে বাস্তব জীবন, মানবিক সম্পর্ক এবং মানসিক সুস্থতার চেয়ে কোনো প্রযুক্তিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। নোমোফোবিয়ার মতো সমস্যাগুলো আমাদের সেই বাস্তবতাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। ডিজিটাল যুগে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়তে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে রশি ছিঁড়ে পাইলট আহত, বিদেশি জাহাজ আটক

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে একটি বিদেশি জাহাজ থেকে পড়ে বন্দরের নিজস্ব পাইলট আহত হয়েছেন। ‘বক্স এনডেভার’ জাহাজ থেকে মই (ল্যাডার) বেয়ে নিচে নামার সময় রশি ছিঁড়ে নিচে পড়ে যান তিনি। আহত ব্যক্তির নাম ক্যাপ্টেন আ জ ম রবিউজ্জামান। গত শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে এ ঘটনার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। শনিবার (২২ আগষ্ট) সকাল থেকে তদন্ত শুরু করেছে কমিটি।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, জাহাজের পাশে থাকা বোটে না পড়ে গভীর সাগরে পড়ে গেলে রবিউজ্জামানের মৃত্যুঝুঁকি ছিল। সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। ডান হাতে ও পিঠে আঘাত পেয়েছেন তিনি। তাকে বন্দর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

দুর্ঘটনার পর জাহাজটি আটক করে বন্দরের বহির্নোঙরে চার্লি অ্যাংকরেজে নোঙর করে রাখা হয়েছে। বহির্নোঙর থেকে মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাঙ বন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার কথা ছিল জাহাজটির। এ ঘটনায় দুই সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শনিবার (২২ আগষ্ট) সকাল থেকে তদন্ত শুরু হয়।

চট্টগ্রামে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

পরিবেশ সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জামাল খান রোড সমাজ কল্যাণ পরিষদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ, মশক নিধন, মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে।শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেল ৩টায় নগরীর চেরাগী পাহাড় চত্বরে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কর্মসূচিতে জামাল খান রোডকে সবুজ, পরিচ্ছন্ন, দখলমুক্ত ও নিরাপদ এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন এবং হকারমুক্ত ফুটপাতের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

আয়োজকরা জানান, জামাল খান রোডকে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন রাখা, মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ, দখলমুক্ত ফুটপাত নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।কর্মসূচিতে “একটি গাছ, একটি প্রাণ—সবুজ হোক জামাল খান”, “মশক নিধন করি, সুস্থ সমাজ গড়ি” এবং “মাদককে না বলি, সুন্দর সমাজ গড়ি”—এমন বিভিন্ন সচেতনতামূলক স্লোগান দেওয়া হয়।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। পরে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে চেরাগী পাহাড় চত্বরে বৃক্ষরোপণ করা হয়। কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন জামাল খান রোড সমাজ কল্যাণ পরিষদের আহ্বায়ক মনজুর রহমান চৌধুরী এবং সঞ্চালনা করেন মোহাম্মদ আকতার উদ্দিন ডালিম। এ সময় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মুহাম্মদ নুর উদ্দিন চৌধুরী সোহেল, শেহতাব আহম্মেদ, আজাদ হোসেন,অ্যাডভোকেট ওসমান গনি, জনাব আরিফ, জনাব ওসমান গনি, জিয়া উদ্দিন আহমেদ, মনছুর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদ শাহীন আকবর খান, সরোয়ার আলম, রাশেদুল ইসলাম, শৈবাল পারিয়াল, মোহাম্মদ আমিন,সাদ, ইফতু ও সামি।

বক্তারা বলেন, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ নগর গড়তে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা দখলমুক্ত ফুটপাত, সুস্থ ও নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন এবং সবুজ-পরিচ্ছন্ন জনবান্ধব জামাল খান রোড গড়ে তোলার আহ্বান জানান। কর্মসূচির সঙ্গে জামাল খান রোড দোকান মালিক সমিতি একাত্মতা প্রকাশ করে। সমিতির পক্ষে বক্তব্য রাখেন দীপঙ্কর কিশোর চৌধুরী ও ইকবাল। কর্মসূচির শেষে চেরাগী পাহাড় চত্বর থেকে জামাল খান রোড হয়ে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। শোভাযাত্রায় স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।“ঐক্য, সেবা ও মানবতায়—সমৃদ্ধ হোক জামাল খান”—এই প্রত্যয়ে একটি সুন্দর, সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ জামাল খান রোড গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন আয়োজকরা।

আলোচিত খবর

জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

আজ শনিবার (২২ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর তিনি শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। তখন বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ