৩৪ হাজার কোটি টাকার পদ্মা ব্যারেজে পিডি নিয়োগ: হাসান মাহমুদের যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও অতীত নিয়ে যত প্রশ্ন

পদ্মা ব্যারেজের পিডি নিয়োগে ‘হাসান মাহমুদ’ কেন? নেপথ্যে কার সুপারিশ

কামাল পারভেজ, অতিথি প্রতিবেদক:

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

দেশের অন্যতম বৃহৎ পানি অবকাঠামো প্রকল্প ‘পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়)। প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া এই প্রকল্পের লক্ষ্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, সেচ, নদী পুনরুদ্ধার ও লবণাক্ততা মোকাবিলা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। ১৩ মে ২০২৬ একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ পর্যন্ত।

এমন একটি মেগা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে গত ২৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান মাহমুদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-২ শাখার অফিস আদেশ অনুযায়ী, তিনি ফেনী পানি উন্নয়ন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পালন করবেন।
কিন্তু নিয়োগের পরই প্রশ্ন উঠেছে—এত বড় প্রকল্পের নেতৃত্বে তাঁকেই কেন?

গ্রেড ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে বড় প্রশ্ন:
সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের অনুমোদিত জনবল কাঠামোয় প্রকল্প পরিচালকের পদটি দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় গ্রেডের জন্য নির্ধারিত বলে দাবি করা হয়েছে। অথচ হাসান মাহমুদ বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, অর্থাৎ চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা। একই প্রতিবেদনে বাপাউবোর সিভিল ক্যাডারের জ্যেষ্ঠতা তালিকায় তাঁর অবস্থান ৬২ এবং তাঁর আগে ৬১ জন কর্মকর্তা থাকার দাবি করা হয়েছে।
এখানেই মূল প্রশ্ন—যদি অনুমোদিত জনবল কাঠামোতে পিডির পদ নির্দিষ্ট গ্রেডের কর্মকর্তার জন্য হয়ে থাকে, তাহলে চতুর্থ গ্রেডের একজন কর্মকর্তাকে কোন বিধান ও প্রশাসনিক যুক্তিতে ওই দায়িত্ব দেওয়া হলো?
বিষয়টি পরিষ্কার করতে প্রয়োজন প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি, জনবল কাঠামো, সংশ্লিষ্ট নোটশিট এবং নিয়োগের অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রকাশ করা।

‘৬১ জনকে ডিঙিয়ে’—দাবির সত্যতা কোথায়?:
নিয়োগ নিয়ে বাপাউবোর প্রকৌশলীদের একটি অংশের অভিযোগ, হাসান মাহমুদের চেয়ে জ্যেষ্ঠ ৬১ জন কর্মকর্তাকে পাশ কাটিয়ে তাঁকে পিডি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বাপাউবোর জ্যেষ্ঠতা তালিকার ভিত্তিতে তাঁর অবস্থান ৬২ বলা হয়েছে।
যদি সত্যিই ৬১ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে অতিক্রম করে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক যুক্তি কী ছিল—এ প্রশ্নের উত্তর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও বাপাউবোর কাছ থেকেই আসা উচিত।
বঙ্গবন্ধু পরিষদের কমিটিতে নাম—রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন:

হাসান মাহমুদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাপাউবো বঙ্গবন্ধু পরিষদের ২০২২–২৪ মেয়াদের কমিটিতে হাসান মাহমুদের নাম নির্বাহী সদস্য হিসেবে ছিল। একই প্রতিবেদনে কমিটির তালিকায় তাঁর অবস্থান সাত নম্বর নির্বাহী সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে হাসান মাহমুদ নিজে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি কখনো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না।

ছাত্রজীবন ও নিয়োগ পরীক্ষার ফল নিয়েও প্রশ্ন:
হাসান মাহমুদ চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে ২০০৭ সালে বাপাউবোর সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন—এমন তথ্য তাঁর চাকরিজীবন নিয়ে প্রচারিত বক্তব্যে রয়েছে।তবে তাঁর নিয়োগ পরীক্ষায় অবস্থান, কোটায় নিয়োগের দাবি কিংবা ৬৩ জনের মধ্যে তাঁর অবস্থান ৫০-এর পরে ছিল বলে অভিযোগ উঠে। পাউবোর ২০০৭ সালের নিয়োগ পরীক্ষার মেধাতালিকা, কোটা-সংক্রান্ত নথি এবং নিয়োগসংক্রান্ত সরকারি কাগজপত্র কি প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট মহল।

বগুড়ার দায়িত্বকাল – কাজ বণ্টন নিয়ে অভিযোগ:
হাসান মাহমুদ ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বগুড়া পানি উন্নয়ন বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন—এ তথ্য অভিযোগপত্র ও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর ওই সময়ের দায়িত্ব পালন নিয়ে অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে RFQ, DPMসহ বিভিন্ন কাজ দেওয়া হয়েছিল। নতুন লাইসেন্সধারী একটি প্রতিষ্ঠানকে বিপুলসংখ্যক কাজ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগের আরও নির্দিষ্ট অংশে ‘পারিশা ট্রেড সিস্টেম’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এবং পরবর্তীতে TTSL নামে নতুন লাইসেন্সের কথা বলা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি হলো—২০১৭–২০১৯ সালের RFQ ও DPM-এর কার্যাদেশ, দরপত্র নথি, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা, কাজের মূল্য, কার্যাদেশের তারিখ এবং বিল পরিশোধের রেকর্ড।

ভোলার পাঁচ বছর: জ্যাকবের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ:
হাসান মাহমুদ ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভোলা পানি উন্নয়ন বিভাগ-২, চরফ্যাশনে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকালিন এই সময় তৎকালীন ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন কাজের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।
প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জ্যাকবের কমিশন আদায়ের সহযোগী হিসেবে হাসান মাহমুদের নাম এসেছে এবং কার্যাদেশের বিপরীতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।আরেকটি প্রকাশিত প্রতিবেদনে চরফ্যাশন ও মনপুরায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন কাজের ওপর জ্যাকবের প্রভাব এবং সেখানে হাসান মাহমুদের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ প্রকাশ করা হয়েছিল।

জ্যাকবের সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে উপস্থিতির প্রমাণ:
হাসান মাহমুদের ভোলায় দায়িত্ব পালনের সময়ের কিছু সরকারি/স্থানীয় সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁকে সাবেক এমপি আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের সঙ্গে সরকারি অনুষ্ঠানের বাহিরে ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিত থাকতো বলেও একাধিক অভিযোগ উঠে । এমপি জ্যাকবের ক্যাশিয়ার হিসেবেও তার ব্যপক পরিচিত লাভ করে। আরেকটি সুত্ত বলছে হাসান মাহমুদ সে সাবেক সচিব এবং আওয়ামী ক্যাডার কবির বিন আনোয়ারের একান্ত কাছের লোক ছিল ও তারও ক্যাশিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতো।

পিডি নিয়োগে স্বজনপ্রীতি নাকি আর্থিকপ্রীতি:
হাসান মাহমুদের পিডি নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ভাবে গুঞ্জন উঠেছে বগুড়া বাড়ি হওয়াতে হয়তো স্বজনপ্রীতি হয়েছে নয়তো মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি সমালোচনা নিয়ে দপ্তরের প্রতিটি টেবিলে কানাঘুঁষা চলছে।
‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশ’—নিয়োগের নেপথ্যে কী?:
হাসান মাহমুদের নিয়োগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে—এমন দাবি রয়েছে।

তার এই পিডি নিয়োগের নেপথ্যে কারা রয়েছে বিষয়টি ঘুরপাক খাচ্ছে বাপাউবো’র প্রতিটি দপ্তরে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে উত্তর অঞ্চলের কোনো এক প্রতিমন্ত্রীর ইশারায় এই সাবেক ছাত্রলীগের নেতা প্রকৌশলী হাসান মাহমুদকে পিডি করা হয়েছে, আরেকটি বিশেষ সুত্রে জানা যায়, পরিকল্পনা কমিশন থেকে কিছুদিন পুর্বে পাসম তে যোগদানকারী অতিরিক্ত সচিব জনাব মোহা: এনামুল সাহেব হাসান মাহমুদ, এছাড়া পানি সম্পদ সচিব মো: শাহাবুদ্দিন এবং বাপাউবোর ডিজি মো: রুহুল আমিনও এই আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসরের পক্ষে কাজ করেছেন এবং তাদেরও ভূমিকা থাকতে পারে বলে সুত্র প্রকাশ পিডি হওয়ার পিছনে ভুমিকা রেখেছেন।
অন্যদিকে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের পিডি হিসেবে তাঁকে নিয়োগের অফিস আদেশের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা যায়। ২৭ আগস্ট পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-২ শাখা থেকে আদেশটি জারি হয় এবং উপসচিব মোহাম্মদ আব্দুর রহিম রিপন তাতে স্বাক্ষর করেন।

অতএব এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন:
হাসান মাহমুদের নাম কে প্রস্তাব করেছিলেন? কোন দপ্তর সুপারিশ করেছিল? কোন নোটশিটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল? কার অনুমোদনে তাঁকে চতুর্থ গ্রেড থেকে এত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলো?
এই চারটি প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ পেলেই বিতর্কের বড় অংশের অবসান হতে পারে বলে সচেতন সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

পদ্মা ব্যারেজে স্বচ্ছতার পরীক্ষা:
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের ব্যয় ৩৪ হাজার ৪৯৭.২৫ কোটি টাকা এবং এটি পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের কথা। প্রকল্পের অফিস আদেশে সরকারি আর্থিক ও পরিকল্পনা-সংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণের পাশাপাশি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সামনে রয়েছে বিপুল সরকারি অর্থের ব্যবহার। এই অবস্থায় পিডি নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটিকে রাজনৈতিক বিতর্কে আটকে না রেখে নথিভিত্তিক প্রশাসনিক ও আর্থিক অনুসন্ধানে নেওয়া প্রয়োজন।
যে নথিগুলো প্রকাশ করা দরকার:
হাসান মাহমুদের নিয়োগ বিতর্কের অবসান ঘটাতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও বাপাউবোর কাছে নিম্নোক্ত নথি প্রকাশের দাবি তুলা যেতে পারে –

১. পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি।
২. প্রকল্প পরিচালকের অনুমোদিত গ্রেড ও জনবল কাঠামো।
৩. হাসান মাহমুদকে পিডি নিয়োগের অফিস আদেশ।
৪. নিয়োগের নোটশিট ও সুপারিশ।
৫. বাপাউবোর সর্বশেষ জ্যেষ্ঠতা তালিকা।
৬. পিডি নিয়োগের জন্য বিবেচিত কর্মকর্তাদের তালিকা।
৭. হাসান মাহমুদের চাকরির পূর্ণ সার্ভিস রেকর্ড।
৮. ২০১৭–২০১৯ সালের বগুড়া বিভাগের RFQ ও DPM-এর কার্যাদেশের তালিকা।
৯. ২০১৯–২০২৪ সালের চরফ্যাশন বিভাগের টেন্ডার ও কার্যাদেশের তথ্য।
১০. তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় তদন্ত, অডিট আপত্তি বা দুদক অনুসন্ধান হয়ে থাকলে তার অবস্থা।
দুদকে অভিযোগ :
হাসান মাহমুদ’র বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী সরকারের আমলে মোটা অংকের অর্থ বিনিময়ে ফাইল দামাচাপা দেয় বলেও অভিযোগ উঠে।

অর্থপাচার ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ প্রকৌশলী হাসান মাহমুদের বিরুদ্ধে:
প্রকৌশলী হাসান মাহমুদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার আব্দুর রাজ্জাকের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল অর্থ স্থানান্তর ও বিনিয়োগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র ও নির্ভরযোগ্য সঠিক তদন্ত করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার বসিলায় অবস্থিত মধু সিটিতেও হাসান মাহমুদ তার ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। এসব বিনিয়োগের অর্থের উৎস ও প্রকৃত মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে হাসান মাহমুদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করারও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার সেগুনবাগিচাভিত্তিক একটি অনলাইন পোর্টালকে তিনি অনেকটা নিজস্ব ‘লাঠিয়াল বাহিনী’ হিসেবে ব্যবহার করতেন। তার বিরুদ্ধে কোনো সাংবাদিক সংবাদ প্রকাশ করলে কিংবা কোনো গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে, সংশ্লিষ্ট সংবাদ সরিয়ে ফেলা এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে সমঝোতা করানোর ক্ষেত্রে ওই পোর্টালটির ভূমিকা থাকত বলে অভিযোগ।

আরও অভিযোগ করা হচ্ছে, হাসান মাহমুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অনলাইন পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন পরবর্তীতে অর্থের বিনিময়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হাসান মাহমুদের সম্পদ, দেশ-বিদেশে বিনিয়োগ, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের আর্থিক লেনদেন এবং তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত ও পরবর্তীতে অপসারিত সংবাদগুলোর তথ্য-উপাত্ত খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

লোহাগাড়া সওজের জায়গা দখল করে রেস্টুরেন্ট নির্মাণ, ওপর দিয়ে ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ লাইন

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

 

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জায়গা দখল করে ‘কুঁড়েঘর’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা পরিষদের সামনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পূর্ব পাশে সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে চলছে স্থাপনাটির নির্মাণকাজ। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় সাড়ে ছয় শতক সরকারি জায়গায় কাঠ, বাঁশ ও ছন দিয়ে রেস্টুরেন্টটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

শুধু জায়গা দখলের অভিযোগই নয়, নির্মাণাধীন রেস্টুরেন্টটির ওপর দিয়ে গেছে ১১ হাজার ভোল্টের উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক লাইন। পাশের স্পোর্টস টার্ফের ওপর দিয়ে রয়েছে ৩৩ হাজার ভোল্টের আরেকটি বৈদ্যুতিক লাইন। ফলে স্থাপনাটি নির্মাণ ও ব্যবহারে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদের সামনের মহাসড়কের পূর্ব পাশে ‘কুঁড়েঘর’ রেস্টুরেন্টের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কাঠ, বাঁশ ও ছনের আদলে তিনটি গোলঘর এবং একটি রান্নাঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থাপনাটির পেছনে রয়েছে একটি স্পোর্টস টার্ফ। স্থানীয়দের দাবি, রেস্টুরেন্ট ও টার্ফ নির্মাণে সওজের জায়গা ব্যবহার করা হয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, লোহাগাড়া মৌজায় ওই জায়গার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ছয় শতক। বর্তমান বাজারদরে জমিটির মূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা। তবে জমির বাজারমূল্য বা সওজের মালিকানাধীন জায়গার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী মহল জায়গাটি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করছে। প্রশাসন ও সওজের সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের কাছেই নির্মাণকাজ চললেও দীর্ঘ সময় ধরে তা বন্ধ হয়নি। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারাও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না বলে তাঁরা জানান।

এদিকে নির্মাণাধীন স্থাপনাটির ওপর দিয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক লাইন নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, স্থাপনাটি নির্মাণের কারণে বর্ষার পানি চলাচলের জায়গাও সংকুচিত হয়েছে। এতে জলাবদ্ধতা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর লোহাগাড়া জোনাল অফিসের ডিজিএম রফিকুল ইসলাম খান বলেন, টার্ফের ওপর দিয়ে পিডিবির ৩৩ হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক লাইন এবং রেস্টুরেন্টের ওপর দিয়ে পল্লী বিদ্যুতের ১১ হাজার ভোল্টের উচ্চক্ষমতার লাইন রয়েছে।

তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ দূরত্বে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ না করতে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু তাঁরা সতর্কতা আমলে না নিয়ে নিজ দায়িত্বে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
সওজের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী শহীদুল আলম বলেন, সড়ক ও জনপথের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখা হয়েছে। জায়গা জবরদখলকারীদের বিরুদ্ধে নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলছে। পরবর্তী সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সরকারি জায়গায় নির্মাণকাজ দ্রুত বন্ধ করে জায়গাটি দখলমুক্ত করা এবং উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক লাইনের নিচে নির্মাণকাজের কারণে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাঝুঁকি নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

 

পাহাড়তলী ডিজেল শপে এক-তৃতীয়াংশ জনবল, জোড়াতালিতে সচল শত শত ইঞ্জিন

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

 

পূর্বাঞ্চলের রেল বহরের মিটারগেজ লোকোমোটিভ সচল রাখার অন্যতম প্রধান কারিগরি কেন্দ্র চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানা। রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ কেপিআইভুক্ত এই স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জনবল সংকট, বাজেট স্বল্পতা, আমদানিনির্ভর যন্ত্রাংশের ঘাটতি এবং ঋণপত্র বা এলসি জটিলতার সঙ্গে লড়াই করে আসছে। মঞ্জুরিকৃত ৩৩০টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত মাত্র ১১০ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জনবলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দিয়েই প্রতিদিন পূর্বাঞ্চলের রেল বহরের লোকোমোটিভ মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সচল রাখার কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

কারখানা-সংশ্লিষ্টদের মতে, বছরের পর বছর নতুন নিয়োগ না হওয়া এবং অভিজ্ঞ ও প্রবীণ টেকনিশিয়ানদের অবসরে যাওয়ায় দক্ষ জনবলের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রমের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। একদিকে পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য বিপুলসংখ্যক লোকোমোটিভ প্রয়োজন, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নেই। ফলে সীমিতসংখ্যক মেকানিক ও টেকনিশিয়ানকে অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও দৈনিক মজুরি বা অদক্ষ শ্রমিকের সহায়তাও নিতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জনবল সংকটের পাশাপাশি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে লোকোমোটিভের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ। পূর্বাঞ্চলের বহরে থাকা বহু মিটারগেজ লোকোমোটিভ পুরোনো হওয়ায় নিয়মিতভাবেই বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রয়োজন হয়। এসব যন্ত্রাংশের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু ডলার সংকট, ব্যাংকে এলসি খোলার জটিলতা, বাজেট বরাদ্দের দীর্ঘসূত্রতা এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সময়মতো কারখানায় পৌঁছায় না। কারখানা-সংশ্লিষ্টদের দাবি, কোনো প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের রিকুইজিশন দেওয়ার পর বাজেট ও প্রশাসনিক অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পাহাড়তলী) দপ্তর থেকে সেটি হাতে পেতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়।

ফলে মেরামতের টেবিলে এসে থেমে থাকে লোকোমোটিভ। প্রয়োজনীয় জেনুইন স্পেয়ার পার্টস না থাকায় পুরোনো ইঞ্জিন কিংবা অচল ইঞ্জিন থেকে কার্যকর যন্ত্রাংশ খুলে অন্য ইঞ্জিনে ব্যবহার করে অনেক সময় কাজ চালিয়ে নিতে হয়। কারিগরি কর্মীদের ভাষায়, এক ইঞ্জিনের ‘জীবন’ বাঁচাতে আরেকটি অচল ইঞ্জিনের পার্টস ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ইঞ্জিন সচল করা সম্ভব হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

কারখানা সূত্রের ভাষ্য, ইয়ার্ড বা লাইন থেকে কোনো লোকোমোটিভ বিকল হয়ে পাহাড়তলী ডিজেল শপে এলে সেটিকে দ্রুত মেরামত করে লাইনে ফেরত পাঠানোর চাপ থাকে। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, দক্ষ জনবল এবং পর্যাপ্ত সময়ের অভাবে অনেক সময় গভীর সংস্কার বা নির্ধারিত ওভারহোলিং করা সম্ভব হয় না। তখন সাময়িক বা দ্রুত মেরামত—কারিগরি ভাষায় ‘কুইক ফিক্স’—করে ইঞ্জিনটি লাইনে পাঠানো হয়। এর ফলে কোনো কোনো ইঞ্জিন কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ চলার পর একই ধরনের ত্রুটি নিয়ে আবারও কারখানায় ফিরে আসে। রেলওয়ের কারিগরি পরিভাষায় এ ধরনের পুনঃপুন বিকল হওয়াকে ‘রিপিট ফেইলিওর’ বলা হয়। কর্মীদের ভাষায়, এটাই অনেকটা ইঞ্জিনের ‘ইউ-টার্ন’।

একটি লোকোমোটিভ বারবার বিকল হয়ে কারখানায় ফিরে এলে একদিকে মেরামত সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, অন্যদিকে ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রস্তুত লোকোমোটিভের সংখ্যা কমে যায়। ফলে অন্য ইঞ্জিনগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এভাবে সংকটটি একটি চক্রে পরিণত হয়—যন্ত্রাংশের অভাব, দ্রুত মেরামত, লাইনে পাঠানো, পুনরায় বিকল হয়ে ফিরে আসা এবং আবার মেরামতের চাপ।

তবে নানা সংকটের মধ্যেও পাহাড়তলী ডিজেল শপের কারিগরি সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২টি মৃতপ্রায় লোকোমোটিভ মেরামত করে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে পাঠানো হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪টি মৃতপ্রায় এবং ২টি দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ মেরামত করে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে প্রেরণ করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও ৪টি মৃতপ্রায় লোকোমোটিভ মেরামত করে সচল করা হয়েছে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫টি মৃতপ্রায় এবং ২টি দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ মেরামত করে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ চার অর্থবছরে মোট ১৫টি মৃতপ্রায় এবং ৪টি দুর্ঘটনাকবলিত—সর্বমোট ১৯টি লোকোমোটিভ মেরামতের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

কারখানা সূত্র অনুযায়ী, গত তিন-চার বছরে এখানকার মেকানিকরা প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮টি লোকোমোটিভের ছোট-বড় মেরামত ও লাইট ওভারহোলিংয়ের কাজ সম্পন্ন করেছেন। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগে ট্রেনের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে বিশেষ প্রস্তুতিও নিতে হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিটি ঈদের আগে একযোগে প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫টি লোকোমোটিভ প্রস্তুত করে লাইনে আউট-টার্ন দেওয়ার কাজ করেছে এই কারখানা। সীমিত জনবল ও যন্ত্রাংশের মধ্যেও পূর্বাঞ্চলের রেল বহর সচল রাখতে কারখানাটির ওপর যে চাপ রয়েছে, তার বড় অংশই এখানকার কর্মীদের সামাল দিতে হচ্ছে।

শুধু পুরোনো মিটারগেজ লোকোমোটিভ নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে আনা ৩০০০ সিরিজের ২২টি আধুনিক লোকোমোটিভও বিভিন্ন সময়ে কারিগরি ত্রুটির কারণে পাহাড়তলী ডিজেল শপে মেরামত করতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে আধুনিক লোকোমোটিভের ক্ষেত্রেও দক্ষ মেকানিক, ডায়াগনস্টিক সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টসের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এদিকে সংকটের মধ্যেই কারখানাটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে নেওয়া হয়েছে একাধিক উদ্যোগ। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দুটি আধুনিক অটোমেশন মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। এর একটি স্বয়ংক্রিয় ডায়াগনস্টিকস মেশিন। কারখানা-সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মাধ্যমে লোকোমোটিভের জটিল ইলেকট্রিক্যাল ও ফুয়েল সিস্টেমের ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করা যাচ্ছে। অন্যদিকে পার্টস ক্লিনিং ও ফিটিং অটোমেশন মেশিনের মাধ্যমে সিলিন্ডার হেড, ক্র্যাঙ্কশ্যাফ্টসহ ভারী যন্ত্রাংশ পরিষ্কার ও ফিটিংয়ের কাজ তুলনামূলক দ্রুত ও নিখুঁতভাবে করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ম্যানুয়াল কাজের ক্ষেত্রে ভুলের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি মেরামতের গুণগত মান ও সময়—দুই ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মূল্যবান কর্মঘণ্টা সাশ্রয় এবং মেরামত করা যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতা সঠিকভাবে যাচাই করে কার্যোপযোগিতা নির্ণয়ের জন্য সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে Jib Crane, AC Motor Testing Plant এবং Compressor Testing Plant তৈরি ও স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তিগত সুবিধার মাধ্যমে মেরামত ও পরীক্ষণ কার্যক্রমে সময় কমানোর পাশাপাশি যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতা যাচাই আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতি সত্ত্বেও মূল সংকট থেকে যাচ্ছে জনবল ও যন্ত্রাংশে। আধুনিক ডায়াগনস্টিক মেশিন ত্রুটি শনাক্ত করতে পারলেও ত্রুটিপূর্ণ অংশ পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় জেনুইন স্পেয়ার পার্টস না থাকলে মেরামত সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। একইভাবে দক্ষ জনবল ছাড়া আধুনিক যন্ত্রপাতির সর্বোচ্চ ব্যবহারও নিশ্চিত করা কঠিন।

একটি ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল অনেকাংশে নির্ভর করে সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্ধারিত ওভারহোলিংয়ের ওপর। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে নির্ধারিত সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ সংস্কার ব্যাহত হলে ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ক্র্যাঙ্কশ্যাফ্ট, ট্র্যাকশন মোটর, টার্বোচার্জারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্টের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে পুরোনো লোকোমোটিভগুলোকে দীর্ঘদিন সচল রাখার ব্যয়ও বাড়তে থাকে এবং সময়ের আগেই ইঞ্জিন অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানার কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) প্রকৌশলী এতেশাম মো. শফিক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে কারখানায় দক্ষ জনবল ও মানসম্মত স্পেয়ার পার্টসের ঘাটতি চলায় মেরামত কাজ করা অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। তবে দক্ষ জনবল ঘাটতি মোকাবেলা এবং মুল্যবান কর্মঘন্টা সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন রকম অটোমেশন প্রযুক্তি এর ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত প্ল্যান্টস এন্ড মেশিনারিজ এর পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতে ডায়াগনস্টিক প্ল্যান্টস ও স্থাপন করা হচ্ছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

তিনি বলেন, “সরঞ্জাম বিভাগ যদি বাজেট ও এলসি জটিলতা কাটিয়ে আমদানিকৃত মালামালের দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে কারখানার কাজের গতি ও লোকোমোটিভ সচল করার হার আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।”

কারখানা-সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়তলী ডিজেল শপের বর্তমান সংকট সমাধানে শুধু নতুন মেশিন স্থাপন যথেষ্ট নয়। মঞ্জুরিকৃত শূন্য পদে দ্রুত দক্ষ জনবল নিয়োগ, অভিজ্ঞ মেকানিকদের জ্ঞান নতুন কর্মীদের মধ্যে স্থানান্তর, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ, সময়মতো বাজেট বরাদ্দ এবং জেনুইন স্পেয়ার পার্টস আমদানির জন্য দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

কারণ পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগ অনেকাংশেই লোকোমোটিভের নির্ভরযোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। একটি ইঞ্জিন বারবার বিকল হওয়া মানে শুধু একটি মেশিনের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় ট্রেন পরিচালনা, শিডিউল, যাত্রীসেবা এবং পুরো রেল বহরের ওপর বাড়তি চাপ। পাহাড়তলী ডিজেল শপের কর্মীরা সীমিত জনবল ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিদিন সেই চাপ সামাল দিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে গত চার অর্থবছরে ১৯টি মৃতপ্রায় ও দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভকে মেরামতের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সচল করে রানিং ডিভিশনে ফেরত পাঠানো এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে বিভিন্ন টেস্টিং প্ল্যান্ট ও অটোমেশন স্থাপনের মাধ্যমে কারখানাটি তার সক্ষমতারও প্রমাণ দিয়েছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে অপ্রতুল জনবল, পুরোনো যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতা এবং জেনুইন স্পেয়ার পার্টস পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান না হলে এই সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হবে। মঞ্জুরিকৃত জনবল পূরণ, নির্ধারিত ওভারহোলিং নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় জেনুইন স্পেয়ার পার্টস দ্রুত সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে দেশীয় প্রযুক্তির এসব উদ্যোগের সুফল আরও বড় পরিসরে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। এতে পূর্বাঞ্চলের লোকোমোটিভ বহরের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি বারবার বিকল হয়ে কারখানায় ফিরে আসা ইঞ্জিনের সংখ্যাও কমানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

 

আলোচিত খবর

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায়

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছেছে । আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইড মিটিং এ দুই দেশের মধ্যে এ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ বিষয়ে বক্তব্য স্পষ্ট, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ