যুদ্ধের গর্ভে জন্ম, মানবতার নেতা শাইখুল আজহার ড. আহমেদ তৈয়ব হাফি।

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান, লেখক ও কলামিস্ট, শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ইতিহাস কোনো কোনো মানুষকে শুধু জন্ম দেয় না—তাদের নির্মাণ করে সময়ের নিষ্ঠুর হাতুড়িতে। যুদ্ধ, উদ্বাস্তুতা, স্মৃতি ও সাধনার দীর্ঘ পথে হাঁটিয়ে তারা হয়ে ওঠে একটি যুগের নৈতিক প্রতিনিধি। শাইখুল আজহার, ইমামুল আকবর ড. আহমেদ তৈয়ব (হাফিযাহুল্লাহ্) তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন আধুনিক মুসলিম বিশ্বের ব্যথা, প্রতিরোধ ও বিবেকের এক গভীর ভাষ্য।

ড. আহমেদ তৈয়ব জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৬ সালের ৬ জানুয়ারি, মিশরের ঐতিহাসিক লুক্সুর অঞ্চলের এক প্রাচীন গ্রামে। নীলনদের তীরঘেঁষা এই ভূমি শুধু ফেরাউনদের নয়, বরং নবুয়তের স্মৃতি, আলেমদের সাধনা ও সভ্যতার দীর্ঘ উত্তরাধিকার বহন করে। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধর—একটি পরিচয় যা তাঁর জীবনে গৌরবের অলংকার হয়ে নয়, বরং দায়িত্বের ভার হয়ে উপস্থিত ছিল। এই বংশপরিচয় তাঁকে শিখিয়েছে বিনয়, ন্যায়বোধ এবং মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।

তাঁর শৈশব কেটেছে অস্থির সময়ের গর্ভে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত তখনো শুকায়নি, আর মধ্যপ্রাচ্য প্রবেশ করছিল নতুন সংঘাতের যুগে। ১৯৫৬ সালের আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন এক শিশু। বোমার শব্দ আর বিস্ফোরণের ভয় থেকে বাঁচতে তাঁকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল পাহাড়ের গুহায়। সেই গুহা ছিল না কোনো কাব্যিক রূপক; ছিল যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা, যেখানে একটি শিশুর চোখে সহিংসতা প্রথমবারের মতো তার নগ্ন রূপ মেলে ধরেছিল।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনকে ভেঙে দেয়নি—বরং ভিত গড়ে দিয়েছে। সেখান থেকেই তাঁর মনে জন্ম নেয় এই উপলব্ধি যে, অস্ত্র দিয়ে মানুষকে পরাস্ত করা যায়, কিন্তু ন্যায় ও জ্ঞান ছাড়া মানবতাকে রক্ষা করা যায় না। এই উপলব্ধিই তাঁকে আল-আজহারের পথে নিয়ে যায়—যেখানে ইসলামকে তিনি খুঁজে পান ভারসাম্য, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার ধর্ম হিসেবে।

দীর্ঘ অধ্যয়ন, আত্মসংযম ও সাধনার মধ্য দিয়ে ড. আহমেদ তৈয়ব নিজেকে গড়ে তোলেন এমন এক আলেম হিসেবে, যিনি ঐতিহ্যকে ধারণ করেন কিন্তু সময়কে অস্বীকার করেন না। তাঁর চিন্তায় কুরআন ও সুন্নাহর গভীরতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আধুনিক বিশ্বের জটিল বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে আল-আজহারের শীর্ষ নেতৃত্বে নিয়ে আসে—এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানের কণ্ঠকে তিনি সমকালীন বিশ্বের সঙ্গে সংলাপে যুক্ত করেন।

শাইখুল আজহার হিসেবে তাঁর অবদান কেবল প্রশাসনিক নয়; তা নৈতিক ও ঐতিহাসিক। তিনি ধর্মের নামে সহিংসতা, চরমপন্থা ও বিকৃত ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে ইসলাম কখনো প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলে না; কথা বলে ন্যায়, দয়া ও সহাবস্থানের ভাষায়। আন্তধর্মীয় সংলাপ, মানবিক সহনশীলতা এবং বিশ্বশান্তির প্রশ্নে তিনি আজ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নৈতিক কণ্ঠস্বর।

আজ, যখন তিনি ৮০ বছরে পদার্পণ করেছেন, ড. আহমেদ তৈয়ব কেবল আল-আজহারের শাইখ নন—তিনি এক সময়ের বিবেক। যুদ্ধের গুহায় আশ্রয় নেওয়া সেই শিশুটি আজ আল-আজহারের মিনার থেকে বিশ্বমানুষের উদ্দেশে শান্তি ও মানবতার আহ্বান জানান।

তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত নেতৃত্ব জন্ম নেয় না ক্ষমতার করিডরে। তা জন্ম নেয় স্মৃতির ভার, সহনশীলতার সাধনা এবং মানুষের জন্য কিছু করার নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা থেকে। ইতিহাস তাই তাঁকে শুধু একজন আলেম হিসেবে নয়, এক যুগের নৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবেই স্মরণ করবে।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায়

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছেছে । আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইড মিটিং এ দুই দেশের মধ্যে এ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ বিষয়ে বক্তব্য স্পষ্ট, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে।

পাকিস্তানে মসজিদে বোমা হামলায় নিহত অন্তত ১৬

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে মসজিদে বোমা হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। যারমধ্যে ১১ জন বেসামরিক সাধারণ মানুষ। আর বাকি পাঁচজন পুলিশ সদস্য শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) এ বোমা হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে পেশোয়ার পুলিশ।

আলোচিত খবর

আরও পড়ুন

সর্বশেষ