
চট্টগ্রাম মহানগরে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত রিকশার বেপরোয়া চলাচলের কারণে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। নগরবাসীর জীবনে ‘সাক্ষাৎ আজরাইল’ হয়ে উঠা এই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো আগে অলিগলিতে চলাচল সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন মূল সড়ক দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। পরাগ ও বিভাটেক এর নির্মিত এই ইজিবাইক ও ব্যাটারি রিকশাগুলোর দাপটে অসহায় হয়ে পড়েছে অন্যান্য যান ও পথচারীরা। এসব রিকশায় অদক্ষ চালকের এলোমেলো চলাচল, আইন না মানার প্রবণতা, উল্টোপথে চলা, যেখানে- সেখানে হুটহাট রিকশা ঘোরানো, পার্কিংসহ সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম নগরীতে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। ঘটছে দূর্ঘটনা। যেন দেখার কিউ নেই। ট্রাফিক বিভাগ অনেক অসহায় ভাবে যেন তেন ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মহানগরের চকবাজার, বাকলিয়া, নিউ মার্কেট, কোতোয়ালি, আগ্রাবাদ, জিইসি, ২ নম্বর গেইট, বাকলিয়া নতুনব্রিজ, খুলশী, জালালাবাদ, বায়েজিদ, পোর্ট কলোনী, আকবর শাহ, হালিশহর, পাহাড়তলী এলাকা ঘুরে প্রায় সব মূল সড়কে অসংখ্য ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক চলতে দেখা গেছে। এতে বাড়ছে জনভোগান্তি, সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। গণপরিবহনকেও ওভারটেক করতে পিছপা হয় না এসব যানবাহন। এ বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা হলেও কোনোভাবেই এসব বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। চসিকও নীরব।
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভুঁইয়া বলেন, মহানগরীর গণপরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এক ধরনের মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে দেখা যাবে, আহতদের ১০ থেকে ৩০ শতাংশই অটোরিকশাজনিত দুর্ঘটনার শিকার। এসব গাড়ির বিষয়ে সরকার একটি সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে। আমরা আপাতত সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে, অভিযান আরও জোরদার করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

এদিকে চট্টগ্রাম শহরে ঠিক কতটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নগরের সড়কে অবৈধভাবে দেড় লাখের বেশি অটোরিকশা চলছে। এসব গাড়ির নেই অনুমোদন, লাইসেন্স ও রুট পারমিটও নেই। অথচ অপ্রশিক্ষিত চালকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে দ্রুতগতির এই যান। অনেক সময় পুলিশ ধরবে এ কারণে বেপরোয়া গতিতে রংসাইডে দ্রুতগতিতে চালিয়ে নিয়ে যান। এতে প্রাণহানি কিংবা পঙ্গুত্ব বরণের ঘটনা ঘটছে। গতির বিষয়ে কোনো ধারণা নেই চালকদের। খেয়ালখুশিমতো রাস্তায় এসব ‘ভয়ংকর যান’ রাজত্ব করছে। মনে হচ্ছে দেখার কেউ নেই। এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ করা না হলে সামনে ভয়ংকর বিপদ অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নগরের সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। এরপর বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে এসব রিকশা জব্দ করা হয়। গত বছরের ১৮ এপ্রিল কাপাসগোলা এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা উল্টে হিজরা খালে পড়ে ছয় মাস বয়সী সেহেরীশ নিহত হয়। এরপর এসব রিকশার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে সিএমপি। নগরের বিভিন্ন সড়ক ও গ্যারেজ থেকে তিন হাজারের বেশি রিকশা জব্দ এবং ব্যাটারি চার্জিং পয়েন্টের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
কিন্তু কয়েক দিন পরই জব্দ করা রিকশা ছেড়ে দেওয়া হয়। আবারও সেগুলো নিয়ে রাস্তায় নামেন চালকেরা। নগরের বিভিন্ন দোকানেও নির্বিঘ্নে বিক্রি হচ্ছে এসব যান। ফলে শুধু সড়কে অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বন্ধ করতে হবে আমদানি ও বিক্রি, ঠেকাতে হবে কারখানায় তৈরি। তবেই কমানো সম্ভব দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও অঙ্গহানির ঝুঁকি।
জানা গেছে, মো. সাকিবের বাড়ি বাঁশখালী উপজেলায় হলেও থাকতেন চট্টগ্রাম শহরে। পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করতেন, করতেন টিউশনিও। মাকে একটু সুখে রাখতে চলছিল তাঁর বিরামহীন জীবনসংগ্রাম। কিন্তু বাকলিয়া থেকে টিউশনি শেষে ফেরার পথে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় থেমে যায় সেই সংগ্রাম।
হাসপাতালে চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত ২৬ জুলাই না ফেরার দেশে পাড়ি জমান সাকিব। সাকিবের মতো এমন অনেকের জীবনেই এখন আতঙ্কের নাম ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এটি কারও কেড়ে নিচ্ছে জীবন, কারও জন্য রেখে যাচ্ছে সারাজীবনের ক্ষত। সেই আতঙ্ক থেকে রেহাই পায়নি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী নাওয়াল আনসারীও। পুলিশ কর্মকর্তা বাবা আনসারুল করিম মেয়েকে বিদ্যালয়ে দিয়ে যান। অথচ দুপুরে নিজের বাসার সামনেই সেই মেয়েকে অটোরিকশার ধাক্কায় রক্তাক্ত হতে দেখেন তিনি। দ্রুতগতির অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হয় ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই ছাত্রী। দুই হাত, মাথা, ঠোঁটসহ পুরো মুখমণ্ডলে গুরুতর জখম হয় তার। পরে দুটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয় শিশুটিকে।
মেয়ের এমন পরিণতিতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্ট দেন আনসারুল করিম। নিজের বাসার নিচেও সন্তান নিরাপদ না থাকলে নগরবাসী কোথায় নিরাপদ-এমন প্রশ্ন তুলে তিনি লেখেন, মানবতাবাদী কোন বিচারপতি কিংবা আইনজীবী কি দেশে নেই-যিনি বা যাঁরা আজরাইল-রূপী এই অটোরিকশা থেকে বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচানোর লক্ষ্যে একেবারেই নিষিদ্ধ করতে পারবেন।
শুধু সাকিব কিংবা নাওয়াল নয়, এসব যানবাহনের ধাক্কায় কিংবা অন্য যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অনেকে। ঘটেছে প্রাণহানিও। মহাসড়কে এসব যান চলাচল নিষিদ্ধ হলেও নগরের সড়ক ও অলি-গলিতে এগুলোর চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
বিশিষ্ট নগরপরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদারও এই অটোরিকশার ভুক্তভোগী। বাসার সামনে সড়ক পার হওয়ার সময় অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে প্রায় দুই মাস বিছানাবন্দি ছিলেন তিনি। চিকিৎসায় খরচ হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা। প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, এই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পঙ্গু মানুষের দেশে পরিণত হবে।
গত এক বছরে শুধু লালখান বাজার এলাকায় আমি এক ডজন অটোরিকশা দুর্ঘটনা চাক্ষুষ করেছি। এই গাড়ি কোনোভাবেই সড়কের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ নয়। অপ্রশিক্ষিত ও নিবন্ধনবিহীন চালকেরা এসব গাড়ি চালাচ্ছেন, যাদের ওপর রাষ্ট্রীয় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এই গাড়ি দেখে মনে হয়-যেন মানুষ হত্যার একটা মেশিন সড়কে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।