৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৫ মিলিয়ন ঘনফুটে

চালুর ১২০ দিনের মাথায় কাফকোর উৎপাদন বন্ধ দীর্ঘদিন উৎপাদনের বাহিরে সিইউএফএল -ডিএপি

নিজস্ব প্রতিবেদক

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

বহুজাতিক সার কারখানা কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) ১২০ দিনের মাথায় আবার উৎপাদন বন্ধ করেছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত কারকানাটিতে গ্যাস সরবরাহও কমিয়ে দেওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রাখা হচ্ছে। কাফকোর উৎপাদন বন্ধের বিষয়ে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে বিষয়টি জানাজানি হয়। এর আগে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টা থেকে কারখানাটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

এর আগে, দীর্ঘ প্রায় দুই মাস গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকার পর গত ১ মে কাফকোতে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। প্রস্তুতি শেষে ২ মে বিকেল থেকে উৎপাদন শুরু করে কারখানাটি। তখন দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন হচ্ছিল।বর্তমানে কাফকোর দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দৈনিক ৩২ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়।কাফকোর উৎপাদন বন্ধ থাকায় এর প্রভাব পড়তে পারে আনোয়ারায় অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএপিএফসিএল) ওপরও। কারণ, ওই কারখানার উৎপাদনের জন্য কাফকো থেকে পাওয়া অ্যামোনিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়।

কাফকো কর্তৃপক্ষ বলছে, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়াই উৎপাদন বন্ধের মূল কারণ নয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কারখানায় বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ বা ওভারহোলিং করা হয়। এবারও সেই নির্ধারিত কাজের অংশ হিসেবে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে।কাফকোর চিফ অব পার্সোনেল ফারুখ আহমেদ বলেন, প্ল্যান্টের সচলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি তিন বছর পরপর এক থেকে দেড় মাসের জন্য ওভারহোলিং করা হয়। রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় টিউনিং শেষ হলে কারখানাটি আবার পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে ফিরবে।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, কাফকোতে এতদিন দৈনিক ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও সোমবার থেকে তা কমিয়ে সাড়ে ৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা ও কারখানার চাহিদার ভিত্তিতেই সরবরাহ কমানো হয়েছে।

কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ উত্তর) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাফকোতে গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ দেওয়া হবে।
এদিকে কাফকোর পাশেই রাষ্ট্রায়ত্ত চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের বাইরে। গ্যাস সংকটের কারণে চলতি বছরের ৪ মার্চ কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ হয়। আগস্টের শেষ সপ্তাহেও কারখানাটি টানা সাড়ে পাঁচ মাস বন্ধ ছিল।

সিইউএফএলের কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিভিন্ন সময়ে কারখানাটির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনের জন্য দৈনিক প্রায় ৪৮ থেকে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। একসময় দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে কার্যকর সক্ষমতা কমেছে। কারখানাটির উৎপাদন বন্ধের ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিইউএফএল মাত্র পাঁচ দিন চালু ছিল। ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বন্ধ হওয়ার পর ১৩ অক্টোবর চালু হয়। এরপর ২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি যান্ত্রিক ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি চালুর পর দেড় মাসের মাথায় ১১ এপ্রিল গ্যাস সংকটে আবার বন্ধ হয়।

প্রায় ছয় মাস বন্ধ থাকার পর গত বছরের ২ নভেম্বর চালু হলেও ওই দিনই আবার বন্ধ হয়ে যায়। পরে চলতি বছরের ২ মার্চ চালু করা হলেও দুই দিন পর ৪ মার্চ গ্যাস সংকটে ফের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সবশেষ গত ২৫ আগস্ট (মঙ্গলবার) সকালে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। এতে সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা কারখানাটিতে শিগগিরই ইউরিয়া উৎপাদন শুরুর আশা ছিল কর্তৃপক্ষের। প্রায় ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও কারখানাটি সরবরাহ হওয়ার পর এখনো উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। এছাড়া আনোয়ারার রাঙ্গাদিয়ায় অবস্থিত দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার কারখানাটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। গত ১৮ এপ্রিল রাতে কারখানায় মজুত থাকা শেষ অ্যামোনিয়া শেষ হয়ে গেলে প্রথম দফায় উৎপাদন বন্ধ হয়।

কাফকোতে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে সেখান থেকে অ্যামোনিয়া পেয়ে ৮ মে ডিএপি কারখানাটি আবার উৎপাদনে ফেরে। কিন্তু জর্ডান থেকে আমদানি করা ফসফরিক অ্যাসিডের সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়ায় ২৮ জুন সকাল ৮টা থেকে কারখানাটির উৎপাদন আবার পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।কারখানাটিতে দৈনিক প্রায় ৬০০ টন ফসফরিক অ্যাসিড প্রয়োজন হয় এবং সর্বোচ্চ প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন চালুর সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।ডিএপিএফসিএলের দুটি ইউনিটে দৈনিক ৮০০ টন করে মোট ১ হাজার ৬০০ টন ডিএপি সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় স্টেশনের মূল্যবান সরঞ্জাম ও সম্পদ চুরির ঝুঁকি

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে সেবার মান দিনে দিনে গতি হারাচ্ছে। যার ফলে বন্ধ রয়েছে পূর্বাঞ্চলের ৫৩টি রেলস্টেশন। বিশেষ করে স্টেশন মাস্টার থেকে শুরু করে গেটকিপার, পয়েন্টসম্যান ও লোকোমাস্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ট্রেন পরিচালনা ও যাত্রীসেবা।রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনবল সংকটের কারণে কর্মরতদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়ছে। কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মী না থাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

জানা গেছে, পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে মোট জনবলের প্রায় অর্ধেকই শূন্য। বিশেষ করে গেটকিপার ও পয়েন্টসম্যান সংকটের কারণে রেলক্রসিং এবং স্টেশন পরিচালনায় বাড়ছে ঝুঁকি। অন্যদিকে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক লোকোমাস্টার থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে কর্মরত চালকদের। এতে ট্রেনের সময়সূচি ঠিক রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

পূর্বাঞ্চল চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্টেশন মাস্টার (গ্রেড-১) পদে ২৭টি অনুমোদিত পদের একটিতেও কর্মকর্তা নেই। গ্রেড-২ এর ৬৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। অর্থাৎ এই গ্রেডে ৬৩টি পদই শূন্য। স্টেশন মাস্টার (গ্রেড-৩) পদে ১৫৬টির মধ্যে কর্মরত ১৩৪ জন, শূন্য ২২টি। গ্রেড-৪ এর ২৪৫টি পদের মধ্যে কর্মরত ৬৬ জন, শূন্য ১৭৯টি। এছাড়া সহকারী স্টেশন মাস্টারের ৩৬৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৪৭ জন, শূন্য ২১৯টি। কেবিন মাস্টারের ৪০টি পদের মধ্যে কর্মরত ১৭ জন, শূন্য ২৩টি। সবচেয়ে বেশি সংকট গেটকিপার ও পয়েন্টসম্যান পদে। ৪৫০টি গেটকিপার পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৯৪ জন, শূন্য ২৬৫টি। আর ৯৮৫টি পয়েন্টসম্যান পদের মধ্যে কর্মরত ৫৫৮ জন, শূন্য রয়েছে ৪২৭টি।

এদিকে এমন জনবল সংকটে পূর্বাঞ্চলে বন্ধ রয়েছে ৫৩টি রেলস্টেশন। এর মধ্যে ৫১টি সম্পূর্ণ এবং দুটি আংশিক বন্ধ। স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যান না থাকায় অনেক স্টেশনের সিগন্যাল রুম ও টিকিট কাউন্টারে তালা ঝুলছে।যার ফলে রেলস্টেশন বন্ধ থাকায় যাত্রীসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় এসব স্টেশনের মূল্যবান সরঞ্জাম ও সম্পদ চুরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঢাকা বিভাগের ৩২টি স্টেশন সম্পূর্ণ এবং দুটি আংশিক বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিভাগের ১৯টি স্টেশন সম্পূর্ণ বন্ধ। চট্টগ্রাম বিভাগের বন্ধ স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে-বাড়বকুন্ড, বারৈয়াঢালা, মিরসরাই, মস্তাননগর, মুহুরীগঞ্জ, কালিদহ, শশদী, নাওটি, আলীশহর, ময়নামতি, ঝাউতলা, সরকারহাট, কাঞ্চননগর, ধলঘাট, দৌলতগঞ্জ, খিলা, বজরা, শাহাতলী ও চিতোষী রোড।বিভাগীয় পরিবহন বিভাগ বলছে, জনবল সংকটের কারণেই এসব স্টেশন চালু করা যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জনবল নিয়োগ হলে পর্যায়ক্রমে বন্ধ স্টেশনগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এদিকে জনবল সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে ট্রেন পরিচালনাতেও। পূর্বাঞ্চলে ১২০ জন লোকোমাস্টারের প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৬৫ জন। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক লোকবল দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে।রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, লোকোমাস্টারদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য আগে মাইলেজসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হতো। এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত ডিউটি করতেও অনীহা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ট্রেনের সময়সূচিতে।

লোকোমাস্টার মো. ওমর ফারুক বলেন, মাইলেজসহ বেশ কিছু সুবিধা বাতিল হওয়ায় লোকোমাস্টাররা অতিরিক্ত ডিউটি করতেও অনীহা প্রকাশ করছেন। আগে জনবল সংকট থাকায় নিয়মিত ডিউটির পরও আমরা অতিরিক্ত কাজ করতাম। এর জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হতো। এখন সেগুলোও নেই।তিনি বলেন, রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী ১০০ মাইল বা আট ঘণ্টা ট্রেন পরিচালনার জন্য রানিং স্টাফরা এক দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ রানিং ভাতা বা মাইলেজ পেতেন। বর্তমানে সেই সুবিধা নেই।

বিপুল সম্ভাবনা স্বপ্ন দেখাচ্ছে তরুণদের প্রতি বছর তৈরি হয় প্রায় ১৬০ মেরিনার

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মোহনায় ১৯৬২ সালে ১০০ একর জায়গায় গড়ে তোলা হয় ‘বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি। মহাসাগর দাপিয়ে বেড়ানো আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের বিশাল জাহাজ পরিচালনার কারিগর তৈরির এক অনন্য পাঠশালা। আটলান্টিকের বরফশীতল ঢেউ থেকে শুরু করে সুয়েজ কিংবা পানামা খাল— বিশ্বের মেগা জাহাজগুলোর স্টিয়ারিং যেসব দক্ষ হাতে বিশ্ববাণিজ্য সচল রাখছে প্রতিদিন, তাদের অনেকেরই শিক্ষা ও দীক্ষা এই চত্বর থেকে। সবুজ-শ্যামল, ছায়া-সুনিবিড়, অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই ক্যাম্পাস অর্থনীতির দুয়ার যেমন খুলে দিচ্ছে, তেমনি বিপুল সম্ভাবনা স্বপ্ন দেখাচ্ছে তরুণদের এই ক্যাম্পাস। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনবল তৈরি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মেরিন একাডেমী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে ভোরের আলো ফুটতেই প্যারেড গ্রাউন্ড কেঁপে ওঠে শৃঙ্খলিত বুটের শব্দে। না, কোনো ক্যান্টনমেন্ট নয়। দূর থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প মনে করে ভুলও করতে পারেন কেউ কেউ। আর এ ভুল ভাঙবে ভেতরে ঢুকলেই! সমুদ্রজয়ের ছয় হাজার দক্ষ নাবিক গড়ার কারিগর বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি। বিশ্বমানের মেরিনার গড়ার এক বাতিঘর হয়েই জ্বলজ্বল করে জ্বলছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠান।

জাহাজে বড় অঙ্কের বেতন, মহাদেশ থেকে মহাদেশ, এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে ঘোরার রোমাঞ্চকর যাত্রা দেখা এবং একেবারে কম সময়ে বড় আয়ের সুযোগ— এই তিন কারণেই মেরিনার হতে চান তরুণরা। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৭০০ মেরিনার তৈরি হয়। এর মধ্যে এখান থেকে বের হন ১৬০ জন। বাকি ৫৪০ জন আসেন দেশের অন্য সাতটি একাডেমি থেকে। এই সাতটির মধ্যে তিনটি বেসরকারি। এসএসসির বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারেন এসব প্রতিষ্ঠানে। তিন হাজার প্রতিযোগীর মধ্যে লিখিত, মৌখিক ও কায়িক পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্ত হয় ৭০০। এর মধ্যে মেধা তালিকার শীর্ষে থাকা ১৬০ জন ভর্তির সুযোগ পান।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার সবুজ-শ্যামল নিভৃত এলাকায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ৬৪ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি শুধু সমুদ্রযাত্রার নাবিক তৈরি করেনি, গড়ে তুলেছে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব আর প্রযুক্তিগত দক্ষতায় বলীয়ান আন্তর্জাতিক মানবসম্পদ। সামরিক আদলে কঠোর নিয়মে পরিচালিত এই একাডেমিতে নটিক্যাল বিজ্ঞান পড়ে হয় জাহাজের ক্যাপ্টেন। আর ইঞ্জিনিয়ারিং শেখানো হয় জাহাজের চিফ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার গড়তে।ফিলিপাইন, ভারত ও চীন মিলে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মেরিনার (নাবিক ও অফিসার) সরবরাহ দেয়।

এই তিন দেশের সমমানের নাবিক তৈরি করে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি। এটি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থা (আইএমও) স্বীকৃত ‘হোয়াইট লিস্টেড’ প্রতিষ্ঠান। সুইডেনভিত্তিক ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির ‘শাখা প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি রয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট অব মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ এবং ‘দ্য নটিক্যাল ইনস্টিটিউট’ যৌথভাবে বিশ্বের প্রথম একাডেমি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ‘সার্টিফিকেট অব এক্সিলেন্স’ খেতাব দিয়েছে মেরিন একাডেমিকে। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ান মেরিটাইম সেফটি অথরিটি, যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম অ্যান্ড কোস্ট গার্ড এজেন্সি (এমসিএ) এবং সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষ মেরিন একাডেমির প্রাক-সমুদ্র প্রশিক্ষণকে তাদের সমমানের স্বীকৃতি দিয়েছে আগেই। বিশ্বমানের নটিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং সিমুলেটর, আন্তর্জাতিক মানসম্মত আইএমও মডেল কোর্স এবং আন্তর্জাতিক অডিটে নিয়মিত উত্তীর্ণ হওয়ার সক্ষমতাই এই একাডেমিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা মেরিটাইম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। এ রকম উচ্চমাত্রার ‘ব্র্যান্ডভ্যালু’ একাডেমি শিক্ষার্থীদের অনায়াসে চাকরি নিশ্চিত করে।

একাডেমি সূত্রে জানা গেছে, শতভাগ ইংরেজি মাধ্যমে সামরিক ধাঁচের প্রশিক্ষণ, আধুনিক জাহাজের স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিন রুম পরিচালনা, ইলেকট্রনিক চার্ট ডিসপ্লে অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ ও ইঞ্জিন সিমুলেটরের বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ অন্য দেশের তুলনায় এই একাডেমির ক্যাডেটদের এগিয়ে রেখেছে। তবে কিছু অবকাঠামো সুবিধা, অভিজ্ঞ শিক্ষক, ভিসা জটিলতার সমাধান এবং সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতি বাস্তবায়ন করা গেলে এই খাত ফিলিপাইনের মতো বাংলাদেশের জিডিপিতে বড় অবদান রাখতে পারবে। এমন মত দিয়ে মেরিন একাডেমির প্রধান, অর্থাৎ কমান্ড্যান্ট ক্যাপ্টেন কাজী এ বি এম শামীম বললেন, বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিল রেখে সিলেবাসের বাইরেও অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে ডিকার্বনাইজেশন, ডিজিটালাইজেশন ও সাইবার সিকিউরিটি অন্তর্ভুক্ত করেছি। শিপিংয়ে চীনের বিশাল বাজার ধরে ক্যাডেটদের সক্ষমতা বাড়াতে শনিবারের ছুটি বাতিল করে মৌলিক চায়নিজ ভাষা প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে। একাডেমির ব্র্যান্ডভ্যালু বিশ্বের শীর্ষ শিপিং লাইন, বন্দর অপারেটরদের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যমে এই খাতের বিশাল সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব।

বিশ্বের শীর্ষ শিপিং লাইন এমএসসি, মায়েরর্স্ক লাইন, সিএমএ সিজিএম, হ্যাপাগ-লয়েড, এনওয়াইকে এবং এভারগ্রিনের মতো জাহাজ পরিচালনাকারীদের কনটেইনার ও খোলা পণ্যবাহী বড় জাহাজ চালাচ্ছেন বাংলাদেশি মাস্টার মেরিনার এবং চিফ ইঞ্জিনিয়াররা। বিশ্ব জুড়ে অন্তত দেড় হাজার বাণিজ্যিক জাহাজে এক মহাসাগর থেকে আরেক মহাসাগরে দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং চালাচ্ছে বাংলাদেশের চৌকস মেরিনাররা। শুধু জাহাজ চালানোতেই সীমাবদ্ধ নয়, ডেনমার্ক, দুবাই ও সিঙ্গাপুরের বড় বন্দর ব্যবস্থাপনা, লন্ডনের শিপ ব্রেকিং ফার্ম, ইউকে মেরিটাইম অ্যান্ড কোস্ট গার্ড এজেন্সি, বারমুডার অফশোর রিগ এবং আইএমওর নীতিনির্ধারণী দপ্তরেও শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছে মেরিন একাডেমির অ্যালামনাই। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ফোরামে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য একাধিক বাংলাদেশি মেরিনার ‘আইএমও ব্র্যাভারি অ্যাওয়ার্ড’সহ বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেছেন। জাহাজে কাজ করা ছাড়াও অভিজ্ঞ সিনিয়র মেরিনার দেশের নৌপরিবহন অধিদপ্তর, সমুদ্রবন্দর, বেসরকারি খাতের লজিস্টিকস, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং সেক্টরে প্রধান নির্বাহী বা কনসালট্যান্ট হিসেবে বড় অঙ্কের বেতনে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে।

বিশ্বের বৃহত্তম স্বাধীন কনটেইনার জাহাজ মালিক এবং চার্টার অপারেটর ‘সি স্প্যান করপোরেশন’ কাজ করেন মেরিন একাডেমির ৫০ ব্যাচের শিক্ষার্থী নাজমুস সাকিব। ‘কসকো থাইল্যান্ড’ কনটেইনারবাহী জাহাজ চালিয়ে আলাস্কা থেকে সাংহাই যাওয়ার সময় সেকেন্ড অফিসার জানালেন, একাডেমির ক্যাডেটরা যে দক্ষ চৌকস সাহসী সেই ব্র্যান্ডভ্যালু এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। সুনাম ছড়িয়েছেন অ্যালামনাইরা। এখন সময় সেই ভ্যালুকে কাজে লাগিয়ে মাইলস্টোন গড়া।

তিন বছর মেয়াদের প্রশিক্ষণে প্রত্যেক ক্যাডেটের জন্য গড়ে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা ব্যয় করে মেরিন একাডেমি। তবে এই বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্তি অভাবনীয় ও অকল্পনীয়। প্রশিক্ষণ শেষ করে জুনিয়র অফিসার বা চতুর্থ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে মাসে আড়াই থেকে ৪ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা) দিয়ে চাকরি শুরু করেন তারা। ১২ বছরের ব্যবধানে ক্যাপ্টেন বা চিফ ইঞ্জিনিয়ার পদে উন্নীত হলে মাসিক বেতন ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি ১২ থেকে ১৮ লাখ টাকা। গ্যাস-তেলবাহী ট্যাংকারে চাকরি করলে মাসে বেতন ২০ হাজার ডলারের (২৫ লাখ টাকা) বেশি।

কম বিনিয়োগে নিশ্চিত চাকরি ও বেশি রিটার্ন পেতে বাংলাদেশে এর চেয়ে ভালো চাকরি আর নেই বলছেন বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের সেকেন্ড অফিসার প্রণয় সেন। তিনি বলেন, রেমিট্যান্স পাঠানোর দিক থেকেও বেশ এগিয়ে বাংলাদেশি মেরিনাররা। সাধারণ প্রবাসী কর্মীদের তুলনায় একজন মেরিনার প্রায় ১০ গুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনেন। শতভাগ বৈধ চ্যানেলে বছরে ১৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার (১ ডলার ১২৫ টাকা হিসাবে) রেমিট্যান্স পাঠান তারা। মেরিনার সংখ্যা যত বাড়বে, এই রেমিট্যান্সও লাফাবে।

১২ ব্যাচের শিক্ষার্থী বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী আক্ষেপ করে বললেন, কম বিনিয়োগে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এই পেশাকে সফল করতে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতি, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন জরুরি। ফিলিপাইন ভারতীয় মেরিনার বিশ্ব জুড়ে দ্রুত ভিসা সুবিধা পেয়ে সুযোগ লুফে নিচ্ছে। আমরা যথাযথভাবে সুযোগ কাজে লাগাতে পারছি না। বর্তমানে দেশীয় পতাকাবাহী ১০৮ বাণিজ্যিক জাহাজে প্রায় সবাই বাংলাদেশি মাস্টার মেরিনার ও প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে। দেশের অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক রুটে নিজেদের জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই খাতকে সাজানোর সময় এখন।

আলোচিত খবর

জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

আজ শনিবার (২২ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর তিনি শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। তখন বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ