৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৫ মিলিয়ন ঘনফুটে

চালুর ১২০ দিনের মাথায় কাফকোর উৎপাদন বন্ধ দীর্ঘদিন উৎপাদনের বাহিরে সিইউএফএল -ডিএপি

নিজস্ব প্রতিবেদক

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

বহুজাতিক সার কারখানা কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) ১২০ দিনের মাথায় আবার উৎপাদন বন্ধ করেছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত কারকানাটিতে গ্যাস সরবরাহও কমিয়ে দেওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রাখা হচ্ছে। কাফকোর উৎপাদন বন্ধের বিষয়ে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে বিষয়টি জানাজানি হয়। এর আগে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টা থেকে কারখানাটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

এর আগে, দীর্ঘ প্রায় দুই মাস গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকার পর গত ১ মে কাফকোতে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। প্রস্তুতি শেষে ২ মে বিকেল থেকে উৎপাদন শুরু করে কারখানাটি। তখন দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন হচ্ছিল।বর্তমানে কাফকোর দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দৈনিক ৩২ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়।কাফকোর উৎপাদন বন্ধ থাকায় এর প্রভাব পড়তে পারে আনোয়ারায় অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএপিএফসিএল) ওপরও। কারণ, ওই কারখানার উৎপাদনের জন্য কাফকো থেকে পাওয়া অ্যামোনিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়।

কাফকো কর্তৃপক্ষ বলছে, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়াই উৎপাদন বন্ধের মূল কারণ নয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কারখানায় বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ বা ওভারহোলিং করা হয়। এবারও সেই নির্ধারিত কাজের অংশ হিসেবে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে।কাফকোর চিফ অব পার্সোনেল ফারুখ আহমেদ বলেন, প্ল্যান্টের সচলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি তিন বছর পরপর এক থেকে দেড় মাসের জন্য ওভারহোলিং করা হয়। রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় টিউনিং শেষ হলে কারখানাটি আবার পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে ফিরবে।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, কাফকোতে এতদিন দৈনিক ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও সোমবার থেকে তা কমিয়ে সাড়ে ৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা ও কারখানার চাহিদার ভিত্তিতেই সরবরাহ কমানো হয়েছে।

কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ উত্তর) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাফকোতে গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ দেওয়া হবে।
এদিকে কাফকোর পাশেই রাষ্ট্রায়ত্ত চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের বাইরে। গ্যাস সংকটের কারণে চলতি বছরের ৪ মার্চ কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ হয়। আগস্টের শেষ সপ্তাহেও কারখানাটি টানা সাড়ে পাঁচ মাস বন্ধ ছিল।

সিইউএফএলের কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিভিন্ন সময়ে কারখানাটির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনের জন্য দৈনিক প্রায় ৪৮ থেকে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। একসময় দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে কার্যকর সক্ষমতা কমেছে। কারখানাটির উৎপাদন বন্ধের ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিইউএফএল মাত্র পাঁচ দিন চালু ছিল। ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বন্ধ হওয়ার পর ১৩ অক্টোবর চালু হয়। এরপর ২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি যান্ত্রিক ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি চালুর পর দেড় মাসের মাথায় ১১ এপ্রিল গ্যাস সংকটে আবার বন্ধ হয়।

প্রায় ছয় মাস বন্ধ থাকার পর গত বছরের ২ নভেম্বর চালু হলেও ওই দিনই আবার বন্ধ হয়ে যায়। পরে চলতি বছরের ২ মার্চ চালু করা হলেও দুই দিন পর ৪ মার্চ গ্যাস সংকটে ফের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সবশেষ গত ২৫ আগস্ট (মঙ্গলবার) সকালে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। এতে সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা কারখানাটিতে শিগগিরই ইউরিয়া উৎপাদন শুরুর আশা ছিল কর্তৃপক্ষের। প্রায় ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও কারখানাটি সরবরাহ হওয়ার পর এখনো উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। এছাড়া আনোয়ারার রাঙ্গাদিয়ায় অবস্থিত দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার কারখানাটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। গত ১৮ এপ্রিল রাতে কারখানায় মজুত থাকা শেষ অ্যামোনিয়া শেষ হয়ে গেলে প্রথম দফায় উৎপাদন বন্ধ হয়।

কাফকোতে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে সেখান থেকে অ্যামোনিয়া পেয়ে ৮ মে ডিএপি কারখানাটি আবার উৎপাদনে ফেরে। কিন্তু জর্ডান থেকে আমদানি করা ফসফরিক অ্যাসিডের সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়ায় ২৮ জুন সকাল ৮টা থেকে কারখানাটির উৎপাদন আবার পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।কারখানাটিতে দৈনিক প্রায় ৬০০ টন ফসফরিক অ্যাসিড প্রয়োজন হয় এবং সর্বোচ্চ প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন চালুর সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।ডিএপিএফসিএলের দুটি ইউনিটে দৈনিক ৮০০ টন করে মোট ১ হাজার ৬০০ টন ডিএপি সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে; চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে চট্টগ্রাম নগরের জেএম সেন হলে শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করে অংশ নেননি। সবার লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বাধীন করা, গণতন্ত্র রক্ষা করা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।তিনি বলেন, আমরা মুসলমান হই, হিন্দু হই, বৌদ্ধ হই কিংবা খ্রিস্টান হই, ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের নাগরিক।

যে ধর্মেরই হই না কেন, যেহেতু এই দেশে আমরা জন্মেছি, এই দেশে বড় হচ্ছি, তাই আমাদের পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে লাখ লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

অনেকে শহীদ হয়েছেন। সেদিন কেউ দেখেননি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ কিংবা কে খ্রিস্টান। সবাই দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্য নিয়ে লড়াই করেছেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষা ও জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে রাজপথে নেমেছেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। গুলিবিদ্ধ কিংবা আহত ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় জানতে চেয়ে কেউ তাঁদের পাশে দাঁড়াননি। হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, আমার ভাই শহীদ হয়েছে, আমার ভাই আহত হয়েছে। বাকিরা তাঁদের ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। কেউ জিজ্ঞেস করেননি, কী তাঁর ধর্ম পরিচয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মানুষের অধিকার ও মানবিকতার প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য নয়।প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের বিচার করা উচিত নয়।

তিনি নিজেকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁকে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে হয়েছে। বাংলাদেশে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হলেও লন্ডনে অবস্থানের সময় সেই পরিচয় তাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠ করেনি। তাই সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু পরিচয় নয়, একজন মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তারেক রহমান বলেন, দেশের আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র একজন নাগরিককে যে অধিকার ও সুযোগ দেবে, অন্য নাগরিকও তা পাবেন। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও অধিকার খর্ব করা যাবে না।

মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব আন্দোলনে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সবাই শান্তিতে বসবাস করবেন এবং মিলেমিশে থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে যদি সেই বাংলাদেশ গড়তে হয়, আপনাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই। আপনি হিন্দু হোন, মুসলমান হোন, বৌদ্ধ হোন কিংবা খ্রিস্টান হোন, যাই হোন না কেন, আপনার সহযোগিতা আমার দরকার। কারণ আপনার সহযোগিতা ছাড়া আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব না।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীমসহ বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য ও নেতারা।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলে প্রতিদিন ব্যয় ৫৪ লাখ, গড়ে আয় ১১ লাখ টাকা

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পর্যটন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খোলার প্রত্যয় নিয়ে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা হয়েছিল। ১০ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে টানেলটিতে ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর গাড়ি চলাচল শুরু হয়। যেখানে ২০২৫ সালে প্রতিদিন গাড়ি চলাচল করার কথা ছিল ২৮ হাজার ৩০৫টি। সেখানে চলেছে মাত্র ৩ হাজার ৮৭২টি, যা প্রত্যাশার মাত্র ১৪ শতাংশ। একই বছর আয় হওয়ার কথা ছিল ৪০০ কোটি। বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ৩৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। টানেলটি সচল রাখতে গত তিন বছরে লোকসান গুনতে হয়েছে ৪০৯ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেছেন, সমীক্ষায় ট্রাফিক বেশি দেখানো হয়নি। তখন ধারণা করা হয়েছিল, টানেল নির্মাণের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক হয়ে যাবে। কিন্তু কভিড মহামারী, আর্থিক বিষয় ও সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে টানেলের কাজ যে গতিতে এগিয়েছে, আনুষঙ্গিক কাজগুলো সে গতিতে এগোয়নি।

এদিকে লোকসান কমাতে সেতু কর্তৃপক্ষ ১০টি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে। এর মধ্যে সিসিসিসির সঙ্গে করা ৯৮৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি থেকে জনবল ও ব্যয় কমিয়ে ১২৩ কোটি টাকা সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আনোয়ারা-বরকল-গাছবাড়িয়া সড়ক এবং আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া সড়ক প্রশস্তকরণ ও কর্ণফুলী ড্রাই-ডক এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আনোয়ারা প্রান্তে সাতটি নতুন জেটি নির্মাণ।

এগুলো চালু হলে টানেল থেকে বছরে ২০০ থেকে ২৪০ কোটি টাকা অতিরিক্ত টোল আদায় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি চায়না ইকোনমিক জোন ও কোরিয়ান ইপিজেডের কার্যক্রম গতিশীল করা এবং দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক টানেল দিয়ে চলাচলে উদ্বুদ্ধ করতে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদন, ২০১৩ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে টানেলের প্রাক্কলন ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের এই ফারাক পাওয়া গেছে। যৌথভাবে কর্ণফুলী টানেলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছিল চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) ও হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওভি আরুপ।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষার এই ত্রুটি, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আর্থিক লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। জানতে চাইলে সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বললেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার (ফিজিবিলিটি স্টাডি) মধ্যেই যত ধরনের সমস্যা, এটি খুব পরিষ্কার। বিগত দিনে এ ধরনের বড় প্রকল্প কেন নেওয়া হয়েছিল, তা জনগণের কতটা কাজে লাগল এবং ভুলটা কোথায় ছিল— এটি কি স্রেফ ভুল ছিল, নাকি অপরাধ ছিল, তা খতিয়ে দেখা হবে।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, টানেল পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে বছরে ব্যয় হবে ৩২ থেকে ৪৫ কোটি টাকা। সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিসিসি) সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য ৯৮৪ কোটি টাকার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি করা হয়েছে।
চুক্তিমূল্য অনুযায়ী, টানেল সচল রাখতে বছরে ব্যয় দাঁড়ায় ১৯৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রতিদিনে ব্যয় হচ্ছে ৫৪ লাখ টাকা। বিপরীতে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত টানেল থেকে মোট টোল আদায় হয়েছে মাত্র ৪৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে আয় হয়েছে ১১ লাখ টাকা। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে ৪২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। গত তিন অর্থবছরে টানেল সচল রাখতে ৫১৩ কোটি টাকা খরচ হলেও টোল আদায় হয়েছে মাত্র ১০৪ কোটি টাকা।

সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের কারণে টানেল ব্যবহারকারী মোট গাড়ির প্রায় ৫০ শতাংশই হবে ট্রাক। কিন্তু সেতু কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, টানেল চালুর পর থেকে চলাচল করা গাড়ির মধ্যে ৭০ দশমিক ৬০ শতাংশই প্রাইভেট কার, জিপ ও মাইক্রোবাসের মতো হালকা যানবাহন। বাস চলেছে ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ, ট্রাক ১৭ দশমিক ৯৫ এবং ট্রেইলার চলেছে মাত্র ১ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলছিলেন, প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়া ও দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য অনেক সময় সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বাস্তব অনেক কিছু উপেক্ষা করে প্রাক্কলন করা হয়। এটি ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, সমীক্ষায় ভুল হয়েছে। তবে যেহেতু বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হয়ে গেছে, তাই টানেলটিকে সচল ও কার্যকর করতে হলে আনোয়ারা প্রান্ত থেকে কক্সবাজারমুখী বাইপাস সড়ক এবং ফ্লাইওভারের সংযোগ দ্রুত শেষ করতে হবে।

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত শাহ আমানত তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু ও কালুরঘাট সেতুর ওপর থেকে যানবাহনের চাপ কমানো। কিন্তু সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), সেতু কর্তৃপক্ষ এবং রেলওয়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে শাহ আমানত সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৭ হাজার ৪১৬টি এবং শতবর্ষী কালুরঘাট সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১১ হাজার গাড়ি চলাচল করে। অর্থাৎ দুটি সেতু ও একটি টানেল মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪২ হাজার ২৪৪টি যানবাহন কর্ণফুলী নদী পারাপার হয়। এর মধ্যে শাহ আমানত সেতু দিয়ে ৬৫ শতাংশ এবং কালুরঘাট সেতু দিয়ে ২৬ শতাংশ— অর্থাৎ দুই সেতু মিলিয়ে ৯১ শতাংশ গাড়ি পার হচ্ছে। আর টানেল দিয়ে পার হচ্ছে মাত্র ৯ শতাংশ গাড়ি।

শাহ আমানত সেতুতে গাড়িপ্রতি গড় টোল পড়ছে মাত্র ৮২ টাকা, যেখানে টানেলে গাড়িপ্রতি গড় টোল পড়ছে ৩০৬ টাকা ৬৩ পয়সা। প্রাইভেট কারের টোল সেতুতে ৭৫ টাকা হলেও টানেলে ২০০ টাকা। আবার ৩১ আসনের কম বাসের টোল সেতুতে ৫০ টাকা হলেও টানেলে তা ৬ গুণ বেশি— ৩০০ টাকা। এ ছাড়া সেতুতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচলের সুযোগ থাকলেও টানেলে তা নিষিদ্ধ।

আলোচিত খবর

আরও পড়ুন

সর্বশেষ