সমাজকল্যাণমন্ত্রীর দু*র্নীতি ফাঁ*স করে দিলেন আপন ছোট ভাই।

লালমনিরহাট প্রতিনিধি:

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

প্রচার-প্রচারণার প্রথম দিনেই সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমদের আপন ছোট ভাই মাহবুবুজ্জামান আহমেদ প্রকাশ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য ভোট চাইছেন ভোটারদের কাছে। এমনকী স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী সমাবেশে সমাজকল্যাণমন্ত্রীকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। সমাজকল্যাণমন্ত্রীর ছোট ভাই লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি।

গতকাল মঙ্গলবার (১৯ ডিসেম্বর) রাতে কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা উত্তর বাংলা কলেজ মিলনায়তনে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তিনি। সেখানে লালমনিরহাট-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সিরাজুল হকের (ঈগল মার্কা) জন্য ভোট চান।

মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বক্তব্যে মাহবুবুজ্জামান আহমেদ বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে গত মাসে দুইটা রিকশা দিয়েছে। যার একটা দিয়েছেন আপনার (মন্ত্রী) বাড়ির পাহারাদার জমিরকে আর একটি দিলেন আপনার ছেলের পাকোয়ানী (বাবুর্চি) ইদ্রীসকে। আর গরিব লোক ছিল না? ৫০ কোটি, একশত কোটি টাকার চেক দিয়েছেন গরিব অসহায় ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসায়। সেই চেক কে পেলেন? আমিনগঞ্জের বজলুর প্রফেসর আর আদিতমারীর রাজ্জাক মাস্টার পান গরিব ক্যান্সার রোগীর চেক।

মাহাবুবুজ্জামান বলেন, গরিব মানুষের বাড়ি পোড়া গেলে ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে টিন দেওয়া হয়। সেই টিন পায় আমার আপনার (মন্ত্রী) জ্যেঠাতো ভাই নজরুল মাস্টার আর কেচু মাস্টার। এরা গরিব অসহায়?

কালীগঞ্জের রুদ্বেশ্বরে দক্ষতা উন্নয়নের অফিস হবে। তার জন্য ওনি (মন্ত্রী) জমি কিনলেন ৪/৫ লাখ টাকায় গরিব কৃষকদের কাছ থেকে। সেই জমি রেজিস্ট্রি হলো ওনার (মন্ত্রী) ভাতিজা, ফুফাতো ভাই হেলাল, মোস্তফা ফারুকদের নামে। কিনলো ৫ লাখে লিখে নিলো ৩০ লাখ টাকায়। সবাই মিলে ৩০ লাখ করে ভাগ করে নিলেন। সরকারের টাকা গরিব কৃষকরা পেলে দুঃখ ছিল না। মানুষের সঙ্গে প্রতারণা না করতেও মন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান মাহাবুবুজ্জামান।

মাহবুবুজামান আহমেদ আরও বলেন, গোপন ফাঁস করে দেই। আপনি (মন্ত্রী) নৌকা নিয়েছেন না! নৌকায় ভিড়তে পারবেন না। কারণ ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আপনি (মন্ত্রী) নৌকা পুড়িয়েছেন। নৌকা আপনাকে মান করবে না। আমার ব্যারিস্টার ছেলের বিয়েতে দাওয়াত করেছি। তিনি (মন্ত্রী) সোজা বলেছেন, আমি যাব না কাউকে যেতেও দেব না। ছেলের বিয়েতে কাউকে আসতে দেননি। উল্টো বিয়ের দিন বিদ্যুৎও বন্ধ করে দিয়েছেন। আপনি (মন্ত্রী) কেন এমন হলেন? ছেলে আর বউ মিলে আপনার মাথা নষ্ট করে দিয়েছে।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে মাহবুবুজামান আহমেদ বলেন, ভোটমারী থেকে মহিষখোচা পর্যন্ত তিস্তা নদীতে বাঁধ দিতে চেয়ে মন্ত্রী দেননি। তার একটাই জবাব, আপনি (মন্ত্রী) বাঁধ দেননি, আমরা আপনাকে বাদ (বয়কট) দিলাম।

পরে মঞ্চে থাকা আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী সিরাজুল হককে দেখিয়ে তার ঈগল প্রতীকে ভোট ও ভোটে কর্মী হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানান মাহবুবুজামান আহমেদ।

কর্মী সভায় লালমনিরহাট ২ আসনের আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সিরাজুল হক, আদিতমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস, ভাদাই ইউপি চেয়ারম্যান কৃষ্ণকান্ত রায় বিদুর, কমলাবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান মাহমুদ ওমর চিশতি ও সারপুকুর ইউপি চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবিরসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

এ বিষয়ে কালীগঞ্জ সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল রাজ্জাক বলেন, তালিকা, কমিটি করেছে। কমিটি যাদের তালিকা করে দিয়েছেন আমরা বিতরণ করেছি। এর থেকে বেশি কিছু আমার জানা নেই।

আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জহির ইমাম বলেন, কমিটি করে রিকশা দরিদ্র ব্যক্তিদের দেওয়া হয়। দুই রিকশার বিষয়য়ে যেটি বলা হচ্ছে সেটি আমার সময় নয়। তবে বিষয়টি খোঁজ-খবর নিয়ে আমি জানাতে পারবো।

প্রসঙ্গত, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লালমনিরহাট ২ (আদিতমারী কালীগঞ্জ) আসনে নৌকা প্রতীকে ভোট করছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ এমপি। তার শক্ত প্রতিপক্ষ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সিরাজুল হক আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঈগল প্রতীকে ভোট করছেন। মন্ত্রীর ছোট ভাই মাহাবুবুজামান আহমেদ বড় ভাইয়ের নৌকার ভরাডুবি করতে মরিয়া হয়ে স্বতন্ত্রের পক্ষে প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছেন।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

লোহাগাড়া সওজের জায়গা দখল করে রেস্টুরেন্ট নির্মাণ, ওপর দিয়ে ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ লাইন

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

 

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জায়গা দখল করে ‘কুঁড়েঘর’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা পরিষদের সামনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পূর্ব পাশে সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে চলছে স্থাপনাটির নির্মাণকাজ। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় সাড়ে ছয় শতক সরকারি জায়গায় কাঠ, বাঁশ ও ছন দিয়ে রেস্টুরেন্টটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

শুধু জায়গা দখলের অভিযোগই নয়, নির্মাণাধীন রেস্টুরেন্টটির ওপর দিয়ে গেছে ১১ হাজার ভোল্টের উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক লাইন। পাশের স্পোর্টস টার্ফের ওপর দিয়ে রয়েছে ৩৩ হাজার ভোল্টের আরেকটি বৈদ্যুতিক লাইন। ফলে স্থাপনাটি নির্মাণ ও ব্যবহারে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদের সামনের মহাসড়কের পূর্ব পাশে ‘কুঁড়েঘর’ রেস্টুরেন্টের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কাঠ, বাঁশ ও ছনের আদলে তিনটি গোলঘর এবং একটি রান্নাঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থাপনাটির পেছনে রয়েছে একটি স্পোর্টস টার্ফ। স্থানীয়দের দাবি, রেস্টুরেন্ট ও টার্ফ নির্মাণে সওজের জায়গা ব্যবহার করা হয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, লোহাগাড়া মৌজায় ওই জায়গার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ছয় শতক। বর্তমান বাজারদরে জমিটির মূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা। তবে জমির বাজারমূল্য বা সওজের মালিকানাধীন জায়গার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী মহল জায়গাটি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করছে। প্রশাসন ও সওজের সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের কাছেই নির্মাণকাজ চললেও দীর্ঘ সময় ধরে তা বন্ধ হয়নি। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারাও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না বলে তাঁরা জানান।

এদিকে নির্মাণাধীন স্থাপনাটির ওপর দিয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক লাইন নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, স্থাপনাটি নির্মাণের কারণে বর্ষার পানি চলাচলের জায়গাও সংকুচিত হয়েছে। এতে জলাবদ্ধতা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর লোহাগাড়া জোনাল অফিসের ডিজিএম রফিকুল ইসলাম খান বলেন, টার্ফের ওপর দিয়ে পিডিবির ৩৩ হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক লাইন এবং রেস্টুরেন্টের ওপর দিয়ে পল্লী বিদ্যুতের ১১ হাজার ভোল্টের উচ্চক্ষমতার লাইন রয়েছে।

তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ দূরত্বে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ না করতে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু তাঁরা সতর্কতা আমলে না নিয়ে নিজ দায়িত্বে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
সওজের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী শহীদুল আলম বলেন, সড়ক ও জনপথের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখা হয়েছে। জায়গা জবরদখলকারীদের বিরুদ্ধে নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলছে। পরবর্তী সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সরকারি জায়গায় নির্মাণকাজ দ্রুত বন্ধ করে জায়গাটি দখলমুক্ত করা এবং উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক লাইনের নিচে নির্মাণকাজের কারণে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাঝুঁকি নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

 

পাহাড়তলী ডিজেল শপে এক-তৃতীয়াংশ জনবল, জোড়াতালিতে সচল শত শত ইঞ্জিন

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

 

পূর্বাঞ্চলের রেল বহরের মিটারগেজ লোকোমোটিভ সচল রাখার অন্যতম প্রধান কারিগরি কেন্দ্র চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানা। রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ কেপিআইভুক্ত এই স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জনবল সংকট, বাজেট স্বল্পতা, আমদানিনির্ভর যন্ত্রাংশের ঘাটতি এবং ঋণপত্র বা এলসি জটিলতার সঙ্গে লড়াই করে আসছে। মঞ্জুরিকৃত ৩৩০টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত মাত্র ১১০ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জনবলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দিয়েই প্রতিদিন পূর্বাঞ্চলের রেল বহরের লোকোমোটিভ মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সচল রাখার কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

কারখানা-সংশ্লিষ্টদের মতে, বছরের পর বছর নতুন নিয়োগ না হওয়া এবং অভিজ্ঞ ও প্রবীণ টেকনিশিয়ানদের অবসরে যাওয়ায় দক্ষ জনবলের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রমের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। একদিকে পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য বিপুলসংখ্যক লোকোমোটিভ প্রয়োজন, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নেই। ফলে সীমিতসংখ্যক মেকানিক ও টেকনিশিয়ানকে অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও দৈনিক মজুরি বা অদক্ষ শ্রমিকের সহায়তাও নিতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জনবল সংকটের পাশাপাশি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে লোকোমোটিভের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ। পূর্বাঞ্চলের বহরে থাকা বহু মিটারগেজ লোকোমোটিভ পুরোনো হওয়ায় নিয়মিতভাবেই বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রয়োজন হয়। এসব যন্ত্রাংশের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু ডলার সংকট, ব্যাংকে এলসি খোলার জটিলতা, বাজেট বরাদ্দের দীর্ঘসূত্রতা এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সময়মতো কারখানায় পৌঁছায় না। কারখানা-সংশ্লিষ্টদের দাবি, কোনো প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের রিকুইজিশন দেওয়ার পর বাজেট ও প্রশাসনিক অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পাহাড়তলী) দপ্তর থেকে সেটি হাতে পেতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়।

ফলে মেরামতের টেবিলে এসে থেমে থাকে লোকোমোটিভ। প্রয়োজনীয় জেনুইন স্পেয়ার পার্টস না থাকায় পুরোনো ইঞ্জিন কিংবা অচল ইঞ্জিন থেকে কার্যকর যন্ত্রাংশ খুলে অন্য ইঞ্জিনে ব্যবহার করে অনেক সময় কাজ চালিয়ে নিতে হয়। কারিগরি কর্মীদের ভাষায়, এক ইঞ্জিনের ‘জীবন’ বাঁচাতে আরেকটি অচল ইঞ্জিনের পার্টস ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ইঞ্জিন সচল করা সম্ভব হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

কারখানা সূত্রের ভাষ্য, ইয়ার্ড বা লাইন থেকে কোনো লোকোমোটিভ বিকল হয়ে পাহাড়তলী ডিজেল শপে এলে সেটিকে দ্রুত মেরামত করে লাইনে ফেরত পাঠানোর চাপ থাকে। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, দক্ষ জনবল এবং পর্যাপ্ত সময়ের অভাবে অনেক সময় গভীর সংস্কার বা নির্ধারিত ওভারহোলিং করা সম্ভব হয় না। তখন সাময়িক বা দ্রুত মেরামত—কারিগরি ভাষায় ‘কুইক ফিক্স’—করে ইঞ্জিনটি লাইনে পাঠানো হয়। এর ফলে কোনো কোনো ইঞ্জিন কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ চলার পর একই ধরনের ত্রুটি নিয়ে আবারও কারখানায় ফিরে আসে। রেলওয়ের কারিগরি পরিভাষায় এ ধরনের পুনঃপুন বিকল হওয়াকে ‘রিপিট ফেইলিওর’ বলা হয়। কর্মীদের ভাষায়, এটাই অনেকটা ইঞ্জিনের ‘ইউ-টার্ন’।

একটি লোকোমোটিভ বারবার বিকল হয়ে কারখানায় ফিরে এলে একদিকে মেরামত সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, অন্যদিকে ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রস্তুত লোকোমোটিভের সংখ্যা কমে যায়। ফলে অন্য ইঞ্জিনগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এভাবে সংকটটি একটি চক্রে পরিণত হয়—যন্ত্রাংশের অভাব, দ্রুত মেরামত, লাইনে পাঠানো, পুনরায় বিকল হয়ে ফিরে আসা এবং আবার মেরামতের চাপ।

তবে নানা সংকটের মধ্যেও পাহাড়তলী ডিজেল শপের কারিগরি সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২টি মৃতপ্রায় লোকোমোটিভ মেরামত করে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে পাঠানো হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪টি মৃতপ্রায় এবং ২টি দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ মেরামত করে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে প্রেরণ করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও ৪টি মৃতপ্রায় লোকোমোটিভ মেরামত করে সচল করা হয়েছে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫টি মৃতপ্রায় এবং ২টি দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ মেরামত করে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ চার অর্থবছরে মোট ১৫টি মৃতপ্রায় এবং ৪টি দুর্ঘটনাকবলিত—সর্বমোট ১৯টি লোকোমোটিভ মেরামতের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

কারখানা সূত্র অনুযায়ী, গত তিন-চার বছরে এখানকার মেকানিকরা প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮টি লোকোমোটিভের ছোট-বড় মেরামত ও লাইট ওভারহোলিংয়ের কাজ সম্পন্ন করেছেন। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগে ট্রেনের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে বিশেষ প্রস্তুতিও নিতে হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিটি ঈদের আগে একযোগে প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫টি লোকোমোটিভ প্রস্তুত করে লাইনে আউট-টার্ন দেওয়ার কাজ করেছে এই কারখানা। সীমিত জনবল ও যন্ত্রাংশের মধ্যেও পূর্বাঞ্চলের রেল বহর সচল রাখতে কারখানাটির ওপর যে চাপ রয়েছে, তার বড় অংশই এখানকার কর্মীদের সামাল দিতে হচ্ছে।

শুধু পুরোনো মিটারগেজ লোকোমোটিভ নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে আনা ৩০০০ সিরিজের ২২টি আধুনিক লোকোমোটিভও বিভিন্ন সময়ে কারিগরি ত্রুটির কারণে পাহাড়তলী ডিজেল শপে মেরামত করতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে আধুনিক লোকোমোটিভের ক্ষেত্রেও দক্ষ মেকানিক, ডায়াগনস্টিক সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টসের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এদিকে সংকটের মধ্যেই কারখানাটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে নেওয়া হয়েছে একাধিক উদ্যোগ। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দুটি আধুনিক অটোমেশন মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। এর একটি স্বয়ংক্রিয় ডায়াগনস্টিকস মেশিন। কারখানা-সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মাধ্যমে লোকোমোটিভের জটিল ইলেকট্রিক্যাল ও ফুয়েল সিস্টেমের ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করা যাচ্ছে। অন্যদিকে পার্টস ক্লিনিং ও ফিটিং অটোমেশন মেশিনের মাধ্যমে সিলিন্ডার হেড, ক্র্যাঙ্কশ্যাফ্টসহ ভারী যন্ত্রাংশ পরিষ্কার ও ফিটিংয়ের কাজ তুলনামূলক দ্রুত ও নিখুঁতভাবে করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ম্যানুয়াল কাজের ক্ষেত্রে ভুলের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি মেরামতের গুণগত মান ও সময়—দুই ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মূল্যবান কর্মঘণ্টা সাশ্রয় এবং মেরামত করা যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতা সঠিকভাবে যাচাই করে কার্যোপযোগিতা নির্ণয়ের জন্য সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে Jib Crane, AC Motor Testing Plant এবং Compressor Testing Plant তৈরি ও স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তিগত সুবিধার মাধ্যমে মেরামত ও পরীক্ষণ কার্যক্রমে সময় কমানোর পাশাপাশি যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতা যাচাই আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতি সত্ত্বেও মূল সংকট থেকে যাচ্ছে জনবল ও যন্ত্রাংশে। আধুনিক ডায়াগনস্টিক মেশিন ত্রুটি শনাক্ত করতে পারলেও ত্রুটিপূর্ণ অংশ পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় জেনুইন স্পেয়ার পার্টস না থাকলে মেরামত সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। একইভাবে দক্ষ জনবল ছাড়া আধুনিক যন্ত্রপাতির সর্বোচ্চ ব্যবহারও নিশ্চিত করা কঠিন।

একটি ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল অনেকাংশে নির্ভর করে সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্ধারিত ওভারহোলিংয়ের ওপর। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে নির্ধারিত সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ সংস্কার ব্যাহত হলে ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ক্র্যাঙ্কশ্যাফ্ট, ট্র্যাকশন মোটর, টার্বোচার্জারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্টের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে পুরোনো লোকোমোটিভগুলোকে দীর্ঘদিন সচল রাখার ব্যয়ও বাড়তে থাকে এবং সময়ের আগেই ইঞ্জিন অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানার কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) প্রকৌশলী এতেশাম মো. শফিক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে কারখানায় দক্ষ জনবল ও মানসম্মত স্পেয়ার পার্টসের ঘাটতি চলায় মেরামত কাজ করা অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। তবে দক্ষ জনবল ঘাটতি মোকাবেলা এবং মুল্যবান কর্মঘন্টা সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন রকম অটোমেশন প্রযুক্তি এর ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত প্ল্যান্টস এন্ড মেশিনারিজ এর পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতে ডায়াগনস্টিক প্ল্যান্টস ও স্থাপন করা হচ্ছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

তিনি বলেন, “সরঞ্জাম বিভাগ যদি বাজেট ও এলসি জটিলতা কাটিয়ে আমদানিকৃত মালামালের দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে কারখানার কাজের গতি ও লোকোমোটিভ সচল করার হার আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।”

কারখানা-সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়তলী ডিজেল শপের বর্তমান সংকট সমাধানে শুধু নতুন মেশিন স্থাপন যথেষ্ট নয়। মঞ্জুরিকৃত শূন্য পদে দ্রুত দক্ষ জনবল নিয়োগ, অভিজ্ঞ মেকানিকদের জ্ঞান নতুন কর্মীদের মধ্যে স্থানান্তর, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ, সময়মতো বাজেট বরাদ্দ এবং জেনুইন স্পেয়ার পার্টস আমদানির জন্য দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

কারণ পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগ অনেকাংশেই লোকোমোটিভের নির্ভরযোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। একটি ইঞ্জিন বারবার বিকল হওয়া মানে শুধু একটি মেশিনের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় ট্রেন পরিচালনা, শিডিউল, যাত্রীসেবা এবং পুরো রেল বহরের ওপর বাড়তি চাপ। পাহাড়তলী ডিজেল শপের কর্মীরা সীমিত জনবল ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিদিন সেই চাপ সামাল দিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে গত চার অর্থবছরে ১৯টি মৃতপ্রায় ও দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভকে মেরামতের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সচল করে রানিং ডিভিশনে ফেরত পাঠানো এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে বিভিন্ন টেস্টিং প্ল্যান্ট ও অটোমেশন স্থাপনের মাধ্যমে কারখানাটি তার সক্ষমতারও প্রমাণ দিয়েছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে অপ্রতুল জনবল, পুরোনো যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতা এবং জেনুইন স্পেয়ার পার্টস পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান না হলে এই সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হবে। মঞ্জুরিকৃত জনবল পূরণ, নির্ধারিত ওভারহোলিং নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় জেনুইন স্পেয়ার পার্টস দ্রুত সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে দেশীয় প্রযুক্তির এসব উদ্যোগের সুফল আরও বড় পরিসরে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। এতে পূর্বাঞ্চলের লোকোমোটিভ বহরের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি বারবার বিকল হয়ে কারখানায় ফিরে আসা ইঞ্জিনের সংখ্যাও কমানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

 

আলোচিত খবর

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায়

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছেছে । আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইড মিটিং এ দুই দেশের মধ্যে এ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ বিষয়ে বক্তব্য স্পষ্ট, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ