সরগরম চট্টগ্রামের সংস্কৃতি অঙ্গন

নিজস্ব প্রতিবেদক

আগামী ৮ জুন শিল্পকলা একাডেমির নির্বাচন

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

সরগরম চট্টগ্রামের সংস্কৃতি অঙ্গন
আগামী ৮ জুন শিল্পকলা একাডেমির নির্বাচন
ছবি-২
চট্টগ্রাম ব্যুরো: শিল্পকলা একাডেমির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের সংস্কৃতি অঙ্গন। আগামী ৮ জুন এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে। তিন বছর মেয়াদের ওই কমিটি ছয় বছর পার করার পর সেটি বিলুপ্ত করে সম্প্রতি এডহক কমিটি গঠন করা হয়, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে জুনে। এ অবস্থায় গত ২ মে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. সাদি উর রহমান জাদিদ নির্বাচনী উপ-কমিটির রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। এতে ৮ জুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, গত ৯ মে থেকে মনোনয়ন পত্র বিতরণ শুরু হয়। ১৫ মে ছিল মনোনয়ন পত্র দাখিলের শেষদিন। গতকাল রোববার মনোনয়নপত্র বাছাই হয়। ২৬ মে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন। বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ২৩ জন মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে নির্বাচন আয়োজনের তোড়জোড়ের মধ্যে আবৃত্তিশিল্পী রাশেদ হাসান গত ১৪ মে জেলা প্রশাসক বরাবরে একটি স্মারকলিপি দেন। জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে শিল্পকলা একাডেমির কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি। স্মারকলিপিতে তিনি বিভিন্ন অভিযোগ তুলে পুনঃতফসিল ঘোষণার দাবি জানান।
জানতে চাইলে রাশেদ হাসান বলেন, গঠনতন্ত্রে বার্ষিক সাধারণ সভার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু গত ছয় বছরে সাধারণ সদস্যদের নিয়ে একটি সভাও করা হয়নি। নির্বাচনের পর সহ-সভাপতি রণজিৎ রক্ষিত মারা গেছেন। শূন্যপদ পূরণ করা হয়নি। গঠনতন্ত্রে বলা আছে, তিনবছর পর কমিটি অটো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সেই কমিটি যে আরও তিন বছর তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করল, সেটা তো অবৈধ। ছয় বছরে সদস্যদের একবারও চাঁদা পরিশোধের জন্য বলা হয়নি। অথচ গঠনতন্ত্রে বলা আছে, দুইবছর চাঁদা পরিশোধ না করলে তার সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে। ছয়বছর পর এতে গত ৪ এপ্রিল মেসেজ পেলাম, ২২ এপ্রিলের মধ্যে বার্ষিক চাঁদা পরিশোধ করে সদস্যপদ নবায়ন করতে হবে। চাঁদা পরিশোধের সময় দিল ৪ এপ্রিল থেকে ২২ এপ্রিল। তখন ঈদুল ফিতর, পহেলা বৈশাখের বন্ধের সময়। অনেক সদস্য চাঁদা জমা দিতে পারেননি। মোট সদস্য ছিল ৬৭১ জন। যতদূর খবর পেয়েছি, নবায়ন করেছে ৫৪৩ জন। ১৫-২০ জনের মতো মারা গেছেন। তাহলে আরও একশ’রও বেশি সদস্য তাদের সদস্যপদ নবায়ন করতে পারেননি।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে সাধারণ সদস্যদের মতামত নেওয়া হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, হঠাৎ করে বলা হল ৮ জুন নির্বাচন। কোরবানির ঈদের মাত্র আটদিন আগে, তার ওপর হজের সময়, উপজেলা নির্বাচন চলছে, এটি কি শিল্পকলার নির্বাচন করার উপযুক্ত সময় হলো? এটা হীরক রাজার দেশ নাকি? নির্বাচন দেবেন আর সদস্যদের সঙ্গে কোনো আলাপ করবেন না? সদস্যদের এত অমর্যাদা কেন করছেন ?
কমিটির আর্থিক কর্মকাণ্ডে কোনো স্বচ্ছতা ছিল না অভিযোগ করে রাশেদ হাসান বলেন, করোনার সময় শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে অনেক সদস্যকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে, এটি আমরা দেখেছি। কিন্তু কাকে কত টাকা দেওয়া হয়েছে, কত টাকা এসেছে, কিভাবে বিলিবণ্টন হয়েছে এর কোনো স্বচ্ছতা নেই। গত ছয় বছরে শিল্পকলা একাডেমি বরাদ্দ করা অর্থ কীভাবে খরচ করেছে, সেটিও সদস্যদের জানানো হয়নি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্যবিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বাবু বলেন, বার্ষিক সাধারণ সভা হয়নি, এটি অসত্য তথ্য। প্রথমবার সাধারণ সভা হয়েছে। এরপর করোনার কারণে দুই বছর করতে পারিনি। বর্তমান জেলা প্রশাসক দায়িত্ব নেয়ার পর কমিটি বিলুপ্ত করে এডহক কমিটি গঠন করে দেন। সেই কমিটির মেয়াদ জুন পর্যন্ত। স্বাভাবিকভাবেই এডহক কমিটিকে জুনের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে বিদায় নিতে হবে। অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিষয় বলা হচ্ছে। এখানে তো সাধারণ সম্পাদকের কোনো এখতিয়ার নেই। শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার পদাধিকার বলে কমিটির অর্থ সম্পাদক আর জেলা প্রশাসক সভাপতি। খরচের কোনো বিল-ভাউচার কিংবা চেকে সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর কিংবা মতামত নেওয়ার কোনো গঠনতান্ত্রিক বিধান নেই বলে তিনি জানান।
কিছু সদস্যপদ নবায়ন করতে না পারার অভিযোগের বিষয়ে বাবু বলেন, সদস্যপদ নবায়নের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, ফেসবুকে শিল্পকলা একাডমির পেইজে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। আমরাও নিজেরা নবায়নের অনুরোধ করে নিজেদের টাইমলাইনে পোস্ট করেছি, প্রত্যেক সদস্যকে মেসেজ দেওয়া হয়েছে। এরপরও অবহিত না করার যে বিষয় বলা হচ্ছে, সেটা একান্তই তাদের ব্যক্তিগত। আর কীভাবে বললে অবগত হতেন সেটা আমার জানা নেই।
যুগ্ম সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বী কংকন দাশ বলেন, নির্বাচন সংক্রান্ত কিংবা জেলা শিল্পকলা একাডেমির যে কোনো বিষয়ে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ জাতীয় শিল্পকলা একাডেমি, জেলা প্রশাসক এবং এডহক কমিটির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী যদি নির্বাচন হয়, তাহলে অবশ্যই অংশগ্রহণ করবো। যদি পুনঃতফসিল হয়, তাহলে সে অনুযায়ী অংশ নেব। আমরা এখন সাধারণ সদস্য মাত্র। এখানে আমাদের সিদ্ধান্তের কোনো বিষয় নেই।
জানা গেছে, পুনঃতফসিলের দাবি জানানো রাশেদ হাসান প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের সভাপতি। কংকন দাশ একই সংগঠনের সহ-সভাপতি। সেই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ পাল সদস্য পদে নির্বাচন করছেন। রাশেদ হাসানের সঙ্গে স্মারকলিপি জমা দেয়া আবৃত্তিশিল্পী সেলিম রেজা সাগরও সদস্য পদে মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন। সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সাইফুল আলম বাবু প্রশ্ন তুলেছেন, বার্ষিক সাধারণ সভা কিংবা আর্থিক বিষয়াদি নিয়ে অভিযোগ গত চার বছরে কেন তোলা হয়নি। শিল্পকলা একাডেমি একটি সরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, এটি নাচ-গানের কোনো ক্লাব নয়। গত নির্বাচনের সময়ও এ ধরনের নানা অভিযোগ তোলা হয়েছিল। বলা হচ্ছে, চার বছর ধরে সাধারণ সভা হয়নি, অনিয়ম হয়েছে। তাহলে চার বছরে একজন সদস্যও কেন বিষয়টি বললেন না। ৪ এপ্রিল সদস্যপদ নবায়নের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এরপর ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সময় ছিল। কেউ তো এসে বললেন না যে, সময় বাড়াতে হবে। কেউ বললেন না আপনারা মিটিং ডাকুন।
বাবু আরও বলেন, জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়ে স্মারকলিপি দিয়ে অভিযোগ করার দরকার ছিল না, বিষয়টা তো বসেই সমাধান করা যেত। বাইরে বাইরে কথা না বলে, আমরা তো সবাই বন্ধুবান্ধব, সংস্কৃতিকর্মী, আমরা তো একসঙ্গে বসে কথা বলতে পারতাম। এভাবে আলোচনার মাধ্যমে তো বৃহৎ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটিকে ছোট করা হচ্ছে, সংস্কৃতিকর্মীদের ছোট করা হচ্ছে, যে ৫৪৩ জন তাদের সদস্যপদ নবায়ন করেছেন, তাদেরও ছোট করা হচ্ছে।
সাইফুল আলম বাবু বলেন, আসলে আমি গত ছয় বছর ধরে মাঠে ছিলাম, করোনার সময় সংস্কৃতিকর্মীদের পাশে ছিলাম। এর ফলে আমার যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে, সেটা ক্ষুন্ন করার জন্য কেউ কেউ মরিয়া হয়ে উঠেছেন। যারা সকালে ডিসি অফিসে গিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন, বিকেলে তাদের কেউ কেউ আবার নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, একটা পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য এটা করা হচ্ছে। নির্বাচন বানচালের পরিস্থিতি।
জানতে চাইলে রাশেদ হাসান আরো বলেন, অনেকে বলছেন- এতদিন পর কথাগুলো কেন বলছেন? কখন বলব? ছয়বছরে একটা সাধারণ সভা হয়নি, কোথায় বলব? কেউ কেউ বলছেন- শেষ মুহূর্তে এসে কেন বলছেন? আমি বললাম- শিল্পকলার মেম্বার কী আমি একজন? আপনারা পাবলিকলি বলেননি কেন? শিল্পকলার সদস্যদের কাজ কি শুধু নির্বাচনে ভোট দেওয়া?
আমি আমার প্রতিবাদটা জানিয়ে রাখলাম। নতুন তফসিল ঘোষণার দাবি করেছি এবং বিদ্যমান তফসিলে নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। এরপরও যদি নির্বাচন জোরপূর্বক করে ফেলে, তাহলে করবে। আমি তো আর রাজনৈতিক দলের কর্মী না যে, মারামারি করবো। নির্বাচন হয়ে গেলে হয়ে যাবে। শিল্পকলার সেক্রেটারি হওয়া না হওয়া আমার জন্য বড় বিষয় নয়, আমি তো রাজনৈতিক দলের সদস্য নই, আমার মূল পরিচয় আমি একজন শিল্পী।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে একুশে পদকপ্রাপ্ত নাট্যজন আহমেদ ইকবাল হায়দার বলেন, শিল্পকলার নির্বাচন নিয়ে কিছু কিছু কথাবার্তা হচ্ছে শুনেছি। কেন, ঠিক কী কারণে সমস্যা, সেটা বলতে পারছি না। দুয়েকটি অনলাইন পত্রিকায় কিছু নিউজ দেখেছি। সেখানে বার্ষিক সাধারণ সভা না হওয়া, আর্থিক কিছু বিষয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগগুলো যৌক্তিক, তবে যার বা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে, তাদেরও বক্তব্য থাকতে পারে, সেটা দেখলাম না। যার কারণে সামগ্রিক বিষয় নিয়ে একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে। কেউ ক্ষমতায় গেল বা কোনো পোস্টে বসলো মানেই সব দায়দায়িত্ব তার, বিষয়টা এমন নয়। আমারও তো দায়দায়িত্ব আছে। দিনশেষে ক্ষমতায় যাওয়া ব্যক্তি যেমন শিল্পকলার একজন সাধারণ সদস্য, আমিও একজন সাধারণ সদস্য। আবার দিনশেষে আমরা সবাই সংস্কৃতিকর্মী। সুতরাং সমস্যা থাকলে, সেটা আমরা বসে ঠিক করে ফেলতে পারতাম। কারণ শিল্পীদের জন্যই শিল্পকলা।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। সুন্দরভাবে নির্বাচন হয়ে যাওয়াটাই কাম্য। তবে তিন বছরের নির্বাচন ছয় বছরে হওয়া কাম্য নয়। সাংবাদিকদের নির্বাচন, আইনজীবীদের নির্বাচন যদি মেয়াদের মধ্যে হতে পারে, সংস্কৃতিকর্মীদেরটা হতে পারবে না কেন? নির্বাচন যদি সঠিক সময়ে হয়ে যেত, তাহলে এসব জটিলতা তৈরি হতো না। সার্বিকভাবে বলতে পারি যে, একটা ঐক্যমত্যে পৌঁছে সুন্দরভাবে নির্বাচনটা হওয়া অসম্ভব কিছু নয়, এটার জন্য এত অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগের প্রয়োজন ছিল না।
বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত নাট্যজন রবিউল আলম বলেন, একটা নির্বাচন যেহেতু হচ্ছে, এখানে পক্ষে-বিপক্ষে কথা আসবেই। এটাকে খুব বড়ো করে দেখার কিছু নেই বলে আমি মনে করি। দেশের অনেক শিল্পকলা একাডেমিতে তো নির্বাচনই হয় না। খোদ ঢাকাতেও হয় না। সুতরাং নির্বাচন হলে যে শিল্পকলায় খুব বড়কিছু হয়ে যাবে আর না হলে শিল্পকলা ধ্বংস হয়ে যাবে, সেটা আমি মনে করি না। গত ছয় বছর তো একটা কমিটি ছিল। তাদের তো খুব বেশি কর্মকাণ্ড আমি দেখিনি জাতীয় দিবসে ফুল দেয়া ছাড়া। সেক্রেটারি খুবই একটিভ ছিলেন, উনি ক্যারিশমেটিক লোক। বলতে গেলে, উনি একাই পুরো কমিটিকে ধরে রেখেছিলেন।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

চট্টগ্রামে অদম্য রাব্বির গল্প পা দিয়ে লিখে এইচএসসিতে জিপিএ-৫

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

বিগত ১০ বছর আগে স্কুলে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনায় দু হাত হারানো রফিকুল ইসলাম রাব্বি সকল স্বাভাবিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাফল্য অর্জন করতে প্রস্তুত ছিলেন। এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পা দিয়ে লিখে জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিনি। বিশেষ করে পড়ালেখার প্রতি অদম্য ইচ্ছে ও অধ্যবসায় রাব্বিকে পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের সিঁড়িতে। দুই হাত না থাকার পরও তিনি দমে যাননি।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা মো. রাব্বি। দুই ভাইয়ের এক বোন। তার বোন রোকেয়া আকতারও এবার ভাটিয়ারী বিজয় সরনী কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। বোনও পাস করেছেন। তবে ফলাফলে তিনি রাব্বির চেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন। রাব্বির সাফল্যে খুশি পরিবার ও প্রতিবেশী।
চলতি বছর চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে চট্টগ্রাম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন রাব্বি।। এর আগে এসএসসিতেও একইভাবে পা দিয়ে লিখে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার পথ আটকে রাখতে পারেনি।

জানা গেছে, রাব্বির পথচলা এত সহজ ছিল না। ২০১৬ সালে স্কুলে যাওয়ার সময় এক দুর্ঘটনায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন তিনি। তার দুই হাত কেটে ফেলতে হয়। তখন রাব্বি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন। এর পরও দমে যাননি তিনি। পা দিয়ে লেখা অনুশীলন করতে থাকেন। একসময় তা রপ্ত করেন। এরপর পুনরায় স্কুলে যাওয়া শুরু করেন। এর মধ্যে কয়েকবছর নষ্ট হয় তার। তবুও ২০২৪ সালে এসএসসিতে সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন রাব্বি। তখন পাড়া প্রতিবেশী বুঝতে পারেন রাব্বি হেরে যাওয়ার পাত্র নন।

পা দিয়ে লিখে এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন রাব্বি। তার অসাধারণ সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন মহলের মানুষ তার পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেন। কেউ পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, কেউ আবার নানা সহযোগিতার কথা জানান। তবে দুঃখজনকভাবে, সেই প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই বাস্তবে রূপ নেয়নি।

অভাব-অনটনের সংসারে রাব্বির এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে পরিবারের নিরলস সংগ্রাম। তার বাবা বজলুর রহমান ও মা দুজনেই দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করে সংসার চালান। সীমিত আয়ের মধ্যেও ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন তারা।তবে এই কঠিন পথচলায় কয়েকজন মানুষের সহযোগিতা রাব্বির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষক ও চিকিৎসক ফেরদৌস কাদেরী ব্যক্তিগত উদ্যোগে তার পড়াশোনার ব্যয় বহন করে আসছেন। অন্যদিকে স্থানীয় শিক্ষক মো. ওসমান বিনা পারিশ্রমিকে তাকে কোচিং করিয়ে সহযোগিতা করছেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে রাব্বির স্বপ্ন আরও বড়। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিজ্ঞানী হতে চান তিনি।

২২ বছর পিছিয়ে গেল চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড, কমেছে পাসের হার ও জিপিএ-৫

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চলতি বছরে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে উচ্চমাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমেছে। এই বোর্ডে পাসের হার ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থ। গতবার পাসের হার ছিল ৫২ দশমিক ৫৭। জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৬ হাজার ৯৭ জন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড মিলনায়তনে ফলাফল ঘোষণার সময় এ তথ্য জানান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আব্দুল মান্নান, সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন প্রমুখ।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেন। সব মিলিয়ে এবার পরীক্ষার্থী ছিলেন ৯৯ হাজার ৬৮৮ জন। ছাত্রদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং ছাত্রীদের পাসের হার ৫৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরে পাসের হার ৬৬ দশমিক ২০ শতাংশ। আর নগর বাদে জেলায় পাসের হার ৪৫ দশমিক ৫৯। তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে রাঙামাটিতে পাসের হার ৩৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। খাগড়াছড়িতে ২৯ দশমিক ৮৫ ও বান্দরবানে ৪১ দশমিক ৪২। অন্যদিকে কক্সবাজার জেলায় পাসের হার ৪৩ দশমিক ৩৪।বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৭৪ দশমিক ৪২। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৫৪ দশমিক ১৪ ও মানবিকে ৩৮ দশমিক ৩১।

এদিকে গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে। গত ২২ বছরের মধ্যে এটিই বোর্ডটির সর্বনিম্ন পাসের হার। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় অর্ধেকের বেশি কমেছে।
বোর্ডের সংরক্ষিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এরপর ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ। গত ২২ বছরে পাসের হার আর এত নিচে নামেনি। এমনকি করোনা-পরবর্তী ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৮০ দশমিক ৫০ শতাংশ।

বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এবার মোট নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী ছিলেন ৯৯ হাজার ৮৭৯ জন। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেন ৯৬ হাজার ৩৩৫ জন। পাস করেছেন ৫০ হাজার ১৬৬ জন।পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে এবারও ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা এগিয়ে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৪ হাজার ৬৭১ জন ছাত্রীর মধ্যে পাস করেছেন ২৯ হাজার ৮২২ জন। তাদের পাসের হার ৫৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অন্যদিকে, ৪১ হাজার ৬৬৪ ছাত্রের মধ্যে পাস করেছেন ২০ হাজার ৩৪৪ জন। তাদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৬২ শতাংশ।

এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৯২৯ শিক্ষার্থী। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৯৭ জন। ২০২৪ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ১০ হাজার ২৬৯ জন। অর্থাৎ, দুই বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি থেকে কমে ৩ হাজারের নিচে নেমেছে। এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী ১ হাজার ৫৯৬ জন এবং ছাত্র ১ হাজার ৩৩৩ জন।
এবার বোর্ডের অধীন ২৮৩টি কলেজের মধ্যে তিনটি কলেজের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। গত বছর এমন কলেজের সংখ্যা ছিল পাঁচটি। অন্যদিকে, শতভাগ পাস করেছে মাত্র ছয়টি কলেজ। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল আটটি এবং ২০২৪ সালে ১৩টি।এ ছাড়া এবার এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ২২ হাজার ১১৪ জন শিক্ষার্থী, যা মোট পরীক্ষার্থীর ২২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বহিষ্কার হয়েছেন ২৭ জন।

আলোচিত খবর

১২ লাখ ৭০ হাজার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ আগামীকাল

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল আগামীকাল শনিবার প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সারা দেশের ১২ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটছে।আগামীকাল সকাল ১১টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ফলাফল ঘোষণা করা হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ফল প্রকাশ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।


অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের সচিব, সকল বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।
উদ্বোধনের পরপরই পরীক্ষার্থীরা একযোগে নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নির্ধারিত ওয়েবসাইট এবং এসএমএসের মাধ্যমে তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল জানতে পারবেন। অনলাইনে https://eduboardresults.gov.bd I https://educationboardresults.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে ফল জানা যাবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ