আজঃ বুধবার ১৮ মার্চ, ২০২৬

বৈধ ইটভাটা ৪০৬, অবৈধ ৩২১টি

আট মাসে ২৯টি ইটভাটার বিরুদ্ধে মামলা

বিশ্বজিৎ পাল, চট্টগ্রাম

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রামে ব্যাঙের ছাতার মত একের পর এক গড়ে উঠছে অবৈধ ইটভাটা। নিয়মিত অভিযান, জরিমানার মাঝেই কোনোভাবেই ইটভাটার লাগাম টানা যাচ্ছে না। বেশিরভাগ ইটভাটা কয়লার পরিবর্তে জ্বালানি হিসেবে গাছের গুঁড়ি, কাঠ ব্যবহার করায় পরিবেশ দূষণ হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ইট তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ফসলি জমির মাটি। এতে কৃষিজমির মাটি যেরকম উর্বরতা হারাচ্ছে, তেমনি ধ্বংস হচ্ছে বনজ সম্পদ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইটভাটায় পোড়ানো গাছ-কয়লা থেকে নির্গত হওয়া ধোঁয়ার সঙ্গে পার্টিকুলেট কার্বন, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ও নাইট্রোজেনের অক্সাইড বের হয়, যা মানুষের চোখ, ফুসফুস ও শ্বাসনালীতে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ২০১০ ও ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৩-এ বলা হয়েছে, বসতি এলাকা, পাহাড়, বন ও জলাভূমির এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটভাটা করা যাবে না। কৃষিজমিতেও ইটভাটা অবৈধ। কিন্তু ইটভাটার মালিকরা এ আইন মানছে না।
জানা গেছে, চট্টগ্রামে মোট ইটভাটা আছে ৪০৬টি। এর মধ্যে মাত্র ৮৫টির বৈধতা আছে। বাকি ৩২১টি ইটভাটা অনুমোদনহীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদফতর।
পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রামে ফিক্স চিমনি (৮৯-১২০ ফুট উঁচু) ভাটা আছে ২৭৯টি, জিগজ্যাগ চিমনি আছে ১১৬টি এবং পরিবেশ ফ্রেন্ডলি টেকনোলজির ইটভাটা আছে মাত্র ১১টি। এর মধ্যে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় ১২টি ইটভাটার মধ্যে সবগুলোর অনুমোদন আছে। আনোয়ারায় দুটির মধ্যে একটি, পটিয়ায় দুটির মধ্যে একটি, সন্দ্বীপে ১১টির মধ্যে নয়টি, বাঁশখালীতে ১২টির মধ্যে ১০টি, বোয়ালখালীতে পাঁচটির মধ্যে চারটি, মিরসরাইয়ে ১৫টির মধ্যে নয়টি অবৈধ। এছাড়া সীতাকুণ্ডে আটটির মধ্যে ছয়টি, চন্দনাইশে ৩২টির মধ্যে ২৫টি, লোহাগাড়ায় ৪৮টির মধ্যে ৪৫টি, ফটিকছড়িতে ৫৫টির মধ্যে ৪৩টি, সাতকানিয়ায় ৭০টির মধ্যে ৪৫টি, রাউজানে ৩৭টির মধ্যে ২৯টি, রাঙ্গুনিয়ায় ৬৯টির মধ্যে ৬৬টি ও চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ৩৫টির মধ্যে ২০টি ইটভাটা অবৈধ বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম জেলার উপ পরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার বলেন, লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা চালালে দুই বছরের জেল ও ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদফতর থেকে সবসময় অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে ইটভাটার মালিকরা হাইকোর্টে গিয়ে মামলার বিরুদ্ধে রিট করে ভাটা পরিচালনা করে।
এদিকে পাহাড় কাটা, খাল-জলাধার ভরাট ও ফসলি জমির মাটি কাটার অভিযোগে গত আট মাসে ২৯টি ইটভাটার বিরুদ্ধে মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর, যার বেশিরভাগই অনুমোদনহীন, অবৈধ।
পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, ইটভাটা সাধারণত বেশি সক্রিয় থাকে বছরের অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত। এ সময়কে ইট তৈরির মৌসুম বলা হয়। গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত যেসব ইটভাটার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে, এর বেশিরভাগেই কয়লার পরিবর্তে জ্বালানি হিসেবে গাছের গুঁড়ি, কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছিল। ইট তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছিল ফসলি জমির মাটি। এতে কৃষিজমির মাটি যেরকম উর্বরতা হারাচ্ছে, তেমনি ধ্বংস হচ্ছে বনজ সম্পদ।
সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, ইটভাটার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েও সুফল মিলছে না। সেগুলোর মালিকপক্ষ রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে খুবই প্রভাবশালী। আইনের ফাঁক গলে ঠিকই ইটভাটাগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছে।
পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত লোহাগাড়া উপজেলায় নয়টি, সাতকানিয়ায় তিনটি, সীতাকুণ্ডে চারটি, ফটিকছড়িতে একটি, বাঁশখালীতে দুটি, রাউজানে পাঁচটি, রাঙ্গুনিয়ায় চারটি ও আনোয়ারায় একটি ইটভাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম জেলার উপ-পরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার আরো বলেন, ইট প্রয়োজনীয় জিনিস। চাহিদার কারণেই দিন দিন ইটভাটার পরিমাণ বাড়ছে, অধিকাংশের লাইসেন্স নেই। ইচ্ছেমতো ইটভাটা পরিচালনা করছে তারা। পাহাড়ের ও ফসলি জমির মাটি কেটে এসব ইটভাটা পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া লোকালয়ের আশেপাশে ইটভাটা পরিচালনা করার কোনো সুযোগ নেই। তবুও অনেক ইটভাটা লোকালয়ের পাশেই গড়ে উঠছে। আমরা প্রতি মাসেই এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালাই।

তিনি আরও বলেন, আমরা এখন জরিমানার চেয়ে মামলা বেশি করছি। ইটভাটার মালিকরা চায় আমরা তাদের জরিমানা করি। এতে অতি সহজেই তারা পার পেয়ে যায়। তাই আমরা জরিমানা করি সর্ব্বোচ্চ তিন থেকে চারটি ইটভাটাকে। মামলা করলে তারা শাস্তির মুখে পড়ে।
এদিকে লোহাগাড়া উপজেলার মেসার্স আকতারিয়া ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারের ছাড়পত্র না থাকায় চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি মামলা করে পরিবেশ অধিদফতর। মামলায় ইটভাটার আট অংশীদারকে আসামি করা হয়। এদের মধ্যে একজন মো. ইসমাইল।
ইসমাইল বলেন, করোনার পর আমরা আট জন মিলে একটি ইটভাটা চালু করি। তখনই আমরা পরিবেশ অধিদফতরের কাছে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করি। কিন্তু তারা আমাদের জানায় সরকার তখন কোনো ইটভাটাকে লাইসেন্স দিচ্ছে না। আমাদের ইটভাটার আশেপাশে কোনো জনবসতি নেই। পাহাড়ের বা ফসলি জমির মাটিও আমরা কাটি না। শুধু লাইসেন্স না থাকায় পরিবেশ অধিদফতর আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়।
পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম জেলার সহকারী পরিচালক আফজারুল ইসলাম বলেন, শীতকালে পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ ইটভাটা। অন্যান্য সময়েও দূষণ হয়। তবে শীতকালে হয় বেশি। জরিমানা করেও এসব ইটভাটার মালিককে কিছু করা যাচ্ছে না।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

পথশিশুদের আইন দিয়ে নয় আদর দিয়ে মূলধারায় ফিরিয়ে আনুন – আমীরুল ইসলাম

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

পথশিশুদের প্রতি সহমর্মিতা ও ভালোবাসা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তর জোনের ডিসি আমীরুল ইসলাম। তিনি বলেন, পথশিশুরা আমাদেরই সন্তান। অযত্ন ও অবহেলায় বেড়ে উঠলেও এদের মধ্যেও রয়েছে অসীম মেধা ও সম্ভাবনা। সঠিক পরিচর্যা ও দিকনির্দেশনা পেলে তারাও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

মঙ্গলবার বিকেলে “আমরা চাটগাঁবাসী” সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত পথশিশু ও কিশোরদের জন্য ইফতার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং ভালোবাসা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে পথশিশুদের কাছে টানতে হবে। তাদের পাশে দাঁড়াতে পারলে সমাজে অপরাধ প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল এবিএম ইমরানের সভাপতিত্বে প্রধান আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সেক্রেটারি গোলাম মওলা মুরাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুল হাছান রুমী, পাঁচলাইশ থানার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল করিম এবং প্রোগ্রামের স্পন্সর ওয়াহিদ ইলেক্ট্রিশিয়ান্স ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার অধ্যক্ষ মো. আব্দুল বাতেন।

আমরা চাটগাঁবাসীর যুগ্ম সম্পাদক জানে আলম চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পাঁচলাইশ থানার সেকেন্ড অফিসার নুরুল আবসার, স্বর্ণলতা স্কুলের উদ্যোক্তা মোহাম্মদ রবিউল হোসেন, আরটিআর তারেক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠক তাহসান হাবিব, অধরা মেঘ কলি ও মোঃ আলীসহ অনেকে।অনুষ্ঠানে পথশিশুদের মাঝে ইফতার বিতরণ করা হয় এবং তাদের কল্যাণে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।অনুষ্ঠান শেষে ডিসি মহোদয় বাছাইকৃত শিশু-কিশোরদের নিজ কার্যালয়ে তুলে এনে ঈদের জামা উপহার দেন।

চট্টগ্রামে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন না করায় জরিমানা গুনল ৪ বাস কাউন্টার

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম মহানগরের বাস কাউন্টারগুলোতে অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে এ অভিযান চালানো হয়। সোমবার মহানগরীর গরিবুল্লাশাহ মাজার এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করেন তীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক মো. ফয়েজ উল্ল্যাহ। অভিযানে আরও উপস্থিত ছিলেন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আনিছুর রহমান, মাহমুদা আক্তার ও রানা দেবনাথ।

মো. ফয়েজ উল্ল্যাহ বলেন, গরীবুল্লাহশাহ মাজার এলাকায় বাস কাউন্টারগুলোতে অভিযান চালিয়েছি। এসময় ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন না করায় সেন্টমার্টিন পরিবহনেকে ৫ হাজার টাকা, রিলাক্স পরিবহনকে ৩ হাজার, দেশ ট্রাভেলস ৩ হাজার ও রয়েল মত্রি সার্ভিসকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ঈদে যাতে কেউ অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে না পারে সে লক্ষ্যে আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।

আলোচিত খবর

আরও পড়ুন

সর্বশেষ