
টেলিফোনে হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবি, না পেয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যাসহ সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনায় নাম উঠে আসে মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের। পুলিশের তালিকাভুক্ত সস্ত্রাসী এক সময় পর্যন্ত ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। চট্টগ্রামের এই শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেফতারের পর তার অপরাধ জগতের নেটওয়ার্ক, অস্ত্রের উৎস, চাঁদাবাজির অর্থের প্রবাহ, তদবিরকারীদের টাকার ভাগ দেওয়া এবং ভারতে পালানোর পরিকল্পনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে ডেভিড ইমনের গ্রুপ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত।একইসঙ্গে চাঁদাবাজির অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর কাছে পাঠানো হতো। সেখানে ডেভিড ইমনের জন্য ‘আজহার খান’ নামে তৈরি করা হয়েছে আধার কার্ড।
বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী হিসেবে চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন ইমন।
ডেভিড ইমন অবশেষে ধরা পড়লেন গত বুধবার ভোরে নড়াইল-যশোর সড়কের ঝুমঝূম এলাকায়। যশোর ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অভিযানে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হন ইমন। পুলিশ বলছে, অবৈধপথে দেশ ছাড়ার চেষ্টায় ছিলেন ডেভিড ইমন।
ফেসবুকে ডেভিড ইমনের বিভিন্ন ছবিতে গোঁফ দেখা গেলেও গ্রেফতারের পর ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে ইমনের গোঁফ নেই। চেহারায় পরিবর্তন আনতে ইমন গোঁফ ফেলে দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, অভিযানের মুখে সে তার সহযোগীসহ পালিয়ে যশোর চলে যায়। সেখান থেকে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় হত্যা, চাঁদাবাজি, ভাঙচুরসহ বিভিন্ন অভিযোগে অসংখ্য মামলা রয়েছে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মোহাম্মদ মুছার ছেলে মোবারক হোসেন ইমনকে সন্ত্রাসী হিসেবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তেমন কেউ চিনতেন না। কৃষক পরিবারের সন্তান হলেও কিশোর গ্যাংয়ের সাথে যুক্ত থাকা ইমন এক সময় বিদেশে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের গ্রুপের সাথে যুক্ত হন অপর সন্ত্রাসী রায়হানের হাত ধরে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চট্টগ্রামে সংগঠিত বিভিন্ন সন্ত্রাসী কাজের সাথে বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে ইমন ও রায়হানের নাম আলোচনায় আসে। ওই সময় বড় সাজ্জাদের নামে সংগঠিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিতেন ছোট সাজ্জাদ।ঢাকায় ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তারের পর ওই গ্রুপের নেতৃত্বের পর্যায়ে চলে আসে ইমন ও রায়হান। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে ঘোষণা দিয়ে চাঁদা দাবি ও ফেসবুকে সক্রিয় থাকায় তিনি বেশি আলোচনায় আসেন।
চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গত বছরের ২৯ মার্চ নগরীর চকবাজার থানার বাকলিয়া এক্সেস রোডে একটি প্রাইভেটকারে গুলি করলে দুইজন নিহত হয়। গত বছরের ৩ নভেম্বর পাঁচলাইশের চালিতাতলী এলাকায় নির্বাচনী প্রচারের সময় গুলিতে নিহত হন বাবলা। এ দুই ঘটনায় ডেভিড ইমনের নাম উঠে আসে। গত বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবর নামের এক সন্ত্রাসীকে। চলতি বছরের ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলীতে প্রকাশ্যে দিনদুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে। এ ঘটনায় হওয়া মামলার আসামিরা বেশিরভাগই ইমনের সহযোগী।
এছাড়া গত ৮ মে নগরীর রৌফাবাদে হাসান রাজু নামে রাউজানের এক যুবক খুন হন। রাউজানে হওয়া এক ঘটনার বদলা হিসেবে বড় সাজ্জাদ গ্রুপের সন্ত্রাসীরা এ ঘটনা ঘটায় বলে অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের ২ জানুয়ারি ও ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে ১০ কোটি টাকা চাঁদা চেয়ে না পেয়ে তার চন্দনপুরা এলাকার বাসভবনে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে ডেভিড ইমনের সহযোগীরা।
সবশেষ গত ১৩ জুলাই ইন্টারনেট সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএন এর মালিকের কাছে ফোন করে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে না পেয়ে বাকলিয়া এক্সেস রোডের কার্যালয় ভাঙচুর করে। ইমনের সহযোগীরা দল বেঁধে এসে ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর করে বলে জানায় পুলিশ। এ ঘটনার পর পুলিশ নড়েচড়ে বসে। খুঁজতে থাকে ইমনকে। পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা তার কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করলেও তিনি অধরাই থেকে যায়। এসব ছাড়াও নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি ও হুমকির ঘটনা ঘটলেও প্রাণভয়ে অনেকে চুপ ছিল।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বড় সাজ্জাদের অনুসারী হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইমন ও রায়হান নিজেরাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছিল। ওই গ্রুপের সন্ত্রাসীদের কাছে আধুনিক অস্ত্র রয়েছে। নগরীর বায়েজিদ, চকবাজার, চান্দগাঁও, বহদ্দারহাট, রাউজানসহ কয়েকটি উপজেলায় তাদের দাপট রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম আরো জানান, গ্রেফতারের সময় ডেভিড ইমনের কাছ থেকে ভারতের একটি আধার কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। সাজ্জাদ আলীর পরামর্শেই এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং সীমান্তের ওপারে তাকে গ্রহণ করার জন্য লোকজনও প্রস্তুত ছিল।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমনকে গ্রেফতারের জন্য কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালানো হয়।প্রথমে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার পথে কুমিল্লায় তাকে আটকের চেষ্টা করা হয়। পরে খুলনার উদ্দেশে রওনা হলে পদ্মা সেতু এলাকাতেও তাকে ধরা সম্ভব হয়নি। গোপালগঞ্জ ও নড়াইল পেরিয়ে যশোরের দিকে যাওয়ার সময়ও অভিযান চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত যশোর থেকে গ্রেফতার করা হয়।
তদন্তে পুলিশ আরও জানতে পেরেছে, ডেভিড ইমন ও সন্ত্রাসী রায়হান নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে চাঁদাবাজি পরিচালনা করতেন। ডেভিড ইমন চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় এবং রায়হান চট্টগ্রাম জেলা এলাকায় চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করতেন। একজনের এলাকায় অন্যজন কার্যক্রম পরিচালনা করতেন না।
পুলিশের ভাষ্য, আগে রায়হানের সঙ্গে ২৫ থেকে ৩০ জন সশস্ত্র সহযোগী চলাফেরা করলেও সাম্প্রতিক অভিযানের পর তার নেটওয়ার্ক অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, চাঁদাবাজির অর্থ দিয়ে রায়হান সম্প্রতি প্রায় ৩৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি গাড়ি কিনেছেন। এছাড়া ডেভিড ইমন ও রায়হান চাঁদাবাজির অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন তদবিরকারীর কাছেও পৌঁছে দিতেন।