আজঃ বুধবার ১৮ মার্চ, ২০২৬

সমাজে ক্রমশ নীতি-নৈতিকতাহীন অমানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।

জাহাঙ্গীর আলম

নীতিহীন সমাজ যে উচ্ছৃঙ্খল, বিভ্রান্তিকর, অনিশ্চিত ও অসহিষ্ণু হয়, তার ভুরিভুরি উদাহরণ আছে

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

মানুষকে বলা হয় সৃষ্টির সেরা জীব। সেটা তার বিবেকবোধ বা আচরণগত কারণের জন্যই। মানুষের যে গুণটি সবার আগে থাকা উচিত সেটি হচ্ছে মানবিকতা। মানুষকে মানুষ বলা হয় কারণ তার মধ্যে মানবিকতা আছে, বোধ-বিবেক আছে, হিতাহিত জ্ঞান আছে, ভালো-মন্দ যাচাই করার সক্ষমতা আছে যা অন্য কোনো প্রাণী বা জীবের মধ্যে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

প্রত্যেক সমাজে তার সদস্যদের আচরণ পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি থাকে। নীতিহীন সমাজ হয় উচ্ছৃঙ্খল, বিভ্রান্তিকর ও অনিশ্চিত। নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় হলে সমাজে নেমে আসে অধঃপতন। তখন মানুষের ভেতর ভর করে পশুত্ব। চারপাশে ঘটে যাওয়া এমন সব ঘটনা আমাদের অবলোকন করতে হয় যে মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে- মানুষের বিবেকবোধ কি বিলুপ্ত হয়ে গেল?

নীতিহীন সমাজ যে উচ্ছৃঙ্খল, বিভ্রান্তিকর, অনিশ্চিত ও অসহিষ্ণু হয়, তার ভুরিভুরি উদাহরণ আছে আমাদের চারপাশে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে মানুষের মধ্যে দেখা দেয় নানা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন। সমাজ ও পরিবারে বেজে উঠছে ভাঙনের সুর। নষ্ট হচ্ছে পবিত্র সম্পর্কগুলো। চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান বেশি হয়ে যাওয়ার ফলে বাড়ছে আত্মহত্যাসহ নানা অপরাধপ্রবণতা।

মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবসহ সম্পর্কের এমন নির্ভেজাল জায়গাগুলোতে ফাটল ধরেছে। ঢুকে পড়েছে অবিশ্বাস। ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্কেও সৃষ্টি হচ্ছে আস্থার সংকট। সমাজে প্রায় প্রতিটি সম্পর্কই নড়বড়ে হয়ে গেছে। ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা, শ্রদ্ধাবোধের বদলে সম্পর্কগুলোতে প্রাধান্য পাচ্ছে বৈষয়িক নানা বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ের শিশুহত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, সন্ত্রাস, নকলপ্রবণতা, খাদ্যে ভেজাল, নকল ওষুধ ইত্যাদি সমাজের করুণ রূপ। সমাজের মানুষ কেউ যেন কারো বন্ধু নয়। প্রত্যেকে পরোক্ষভাবে একে-অপরের ক্ষতিসাধনে মগ্ন।

যে মানুষের ভিতরে মনুষ্যত্ব নেই সে মানুষ পশুর সমান। মানুষগৃহে জন্মগ্রহণ করলেই মনুষ্যত্বের অধিকারী হওয়া যায় না। এজন্য প্রয়োজন হয় কঠোর সাধনার। জ্ঞান আহরণ, সংস্কৃতি চর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ নিজের বুদ্ধি ও বিবেককে বৃদ্ধি ও বিকশিত করতে পারে। অন্য কোনো প্রাণী বা বৃক্ষলতা তা পারে না। জন্মের পর তাদের শুধু দৈহিক বৃদ্ধি হয়, কিন্তু মনের বিকাশ হয় না। কিন্তু তরুলতা ও পশুপাখির তুলনায় মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। জন্মের সময় মানুষ পশু প্রবৃত্তি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। জন্ম পরবর্তী সময়ে বিদ্যা–শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে মানবিক গুণসম্পন্ন হয়।

এ মানবিক গুণই তাকে তরুলতা ও পশুপাখি থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে। তাছাড়া জীবন চলার পথে মানুষের অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়। এ প্রয়োজন মিটানোর জন্য মানুষকে একে একে অনেক কিছুই আবিষ্কার করতে হয়; যা তরুলতা কিংবা পশুপাখির বেলায় কল্পনাও করা যায় না। এ আবিষ্কারের জন্যও মানুষকে দীর্ঘ গবেষণা করতে হয়। প্রকৃতির নিয়মে জন্মলাভ করেই তরুলতা ও পশুপাখি তরুলতা ও পশুপাখি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু মানুষ হওয়ার জন্যে মানুষকে মনুষ্যত্ব অর্জন করতে হয়। কিন্তু মনুষ্যত্ব অর্জন করা খুবই কঠিন। প্রাণপণ চেষ্টা ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনার মধ্য দিয়ে মনুষ্যত্ব অর্জন করতে হয়।

সম্প্রতি হোমনা থেকে মুরাদনগরে বাবার বাড়ি বেড়াতে আসা এক নারীকে পাঁচকিত্তা গ্রামের শহিদ মিয়ার ছেলে ফজর আলী কৌশলে ঘরের দরজা খুলে ধর্ষণ করেন। ঘটনার সময় আশপাশের কয়েকজন লোকজন ঘটনাস্থলে এসে ভুক্তভোগী নারীকে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখে ভিডিও ধারণ করে এবং পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ধর্ষণ ও ভিডিও ছড়ানোর ঘটনায় প্রধান আসামিসহ গ্রেপ্তার করেন পুলিশ ৫ জনকে।

এমন আরো অনেক অপরাধই সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। এমন সব সংবাদ আমরা গণমাধ্যমে দেখি, তাতে আমাদের শিউরে উঠতে হয়। এসব ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সমাজে ক্রমশ নীতি-নৈতিকতাহীন অমানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, আর আমরা হারিয়ে ফেলছি সামাজিক মূল্যবোধ।

সামাজিক মূল্যবোধ তথা ধৈর্য, উদারতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা, শৃঙ্খলা, শিষ্টাচার সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, নান্দনিক সৃষ্টিশীলতা, দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ, পারস্পরিক মমতাবোধ ইত্যাদি নৈতিক গুণাবলি লোপ পাওয়ার কারণেই সামাজিক অবক্ষয় দেখা দেয়, মানুষের মধ্যে বেড়ে যায় নানা অপরাধপ্রবণতা। যা বর্তমান সমাজে প্রকট। সামাজিক নিরাপত্তা আজ ভূলুণ্ঠিত। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি এ থেকে মুক্তি পাব না?

মানুষ কি মানুষের প্রতি সহনশীল হবে না? এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়া কঠিন হলেও এর প্রতিকারের উপায় আমাদের বের করতে হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা আশা করি, মানুষের বিবেক জাগ্রত হবে। সমাজে ফিরে আসবে নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁকগুলোতে বিআরটিএ’র সতর্ক সংকেত

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁকগুলোতে সতর্ক সংকেত হিসেবে লাল পতাকা স্থাপন করেছে। ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নিরাপদ করতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ৯টি বাঁকে উভয় পাশে সারিবদ্ধভাবে এসব পতাকা বসানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছরে এসব বাঁকে একাধিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে গত বছরের ঈদুল ফিতরের দিন সকালে লোহাগাড়ার জাঙ্গালিয়া এলাকায় একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় কয়েকজন নিহত হন। এরপর থেকেই বাঁকগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি ওঠে।

মহাসড়কে চলাচলকারী কয়েকজন বাস চালক জানান, রাতে বা কুয়াশার সময় হঠাৎ বাঁক সামনে চলে আসায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। নতুন করে লাল পতাকা বসানোয় আগেভাগেই সতর্ক হওয়া সহজ হবে।তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অস্থায়ী পতাকা নয়-স্থায়ী সাইনবোর্ড, গতিসীমা নির্দেশনা, রিফ্লেক্টর ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও জরুরি। পাশাপাশি অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

বিআরটিএর তালিকা অনুযায়ী, যেসব স্থানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে লোহাগাড়ার চুনতির শেষ সীমানায় বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সংলগ্ন বাঁক, লোহাগাড়া–চুনতির জাঙ্গালিয়া বাঁক, চুনতির ডেপুটি বাজারের আগে ও পরের বাঁক, চুনতি ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন এলাকা, লোহাগাড়া রাজাঘাটা, সাতকানিয়ার মিঠা দীঘি, চন্দনাইশের খানহাট পুকুর এবং পটিয়ার পাইরুল মাজারসংলগ্ন বাঁক।

বিআরটিএ চট্টগ্রাম জেলা সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) উথুয়াইনু চৌধুরী বলেন, ঈদের সময় এই মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তাই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে আগাম সতর্কতা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি বিআরটিএর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি বাঁকের উভয় পাশে পাঁচটি করে মোট ১০টি লাল পতাকা বসানো হয়েছে। ফলে দূর থেকেই চালকেরা বিপজ্জনক বাঁক সম্পর্কে সতর্ক হতে পারবেন।

কালিয়াকৈরে ড্রাম ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে যুবক নিহত।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার হাটুরিয়াচালা–লস্করচালা এলাকায় অবৈধভাবে মাটি কাটাকে কেন্দ্র করে আবারও একটি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। শনিবার (১৫ মার্চ) রাতে ড্রাম ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মাসুম নামে এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় অবৈধভাবে মাটি কাটা ও পরিবহন কার্যক্রম চলছিল। শনিবার রাতে মাটি পরিবহনের সময় একটি ড্রাম ট্রাক চলাচলের সময় মাসুম নামে ওই যুবক ট্রাকের নিচে পড়ে যান। এতে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ মাটি কাটার সঙ্গে জড়িতদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের কারণেই এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এলাকাবাসীর দাবি, প্রশাসনের নজরদারির অভাবে দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ কার্যক্রম চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

দুর্ঘটনার পর এলাকাজুড়ে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বিষয়টি তদন্ত করছে।এ বিষয়ে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার নাছির উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

আলোচিত খবর

আরও পড়ুন

সর্বশেষ