এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

অভয়ারন্য চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় যৌথ বাহিনীর বড় ধরনের সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। সোমবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় চার হাজার সদস্য অংশ নেয়।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন বলেন, ভোর থেকে অভিযান শুরু হয়। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং কিছু আলামত উদ্ধার হয়েছে। পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযান চলায়।

এদিকে অভিযানের শুরুতেই জঙ্গল সলিমপুরের সব প্রবেশ ও বাহিরের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বসানো হয় তল্লাশিচৌকি, যাতে কোনো চিহ্নিত অপরাধী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় বাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, অভিযানে প্রায় ৫৫০ জন সেনাসদস্য, ১ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ এপিবিএন, ৪০০ র্যাব এবং ১২০ জন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকাশপথে নজরদারির জন্য ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি মাটির নিচে বা ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারে কাজ করে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডগ স্কোয়াড।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় এটিই সবচেয়ে বড় ও সমন্বিত অভিযান। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কমান্ডো ধাঁচের এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি এই জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযান চালানোর সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকেই এলাকাটিতে বড় ধরনের যৌথ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করে সরকার।
এদিকে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়ায় এখন সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। সোমবার দুপুরে সলিমপুরে প্রবেশমুখে অভিযান পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
ড. জিয়াউদ্দীন বলেন, ভবিষ্যতে এই এলাকার উন্নয়নের জন্য সরকার যে পরিকল্পনাগুলো গ্রহণ করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত সহযোগিতায় সেই বাধা দূর হয়েছে।এখন থেকে সরকার পূর্বে গ্রহণ করা পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিতভাবে কাজ করতে পারবে এবং এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, সলিমপুর এলাকা শহরের খুব কাছে হওয়া সত্ত্বেও এতদিন প্রশাসনের জন্য এটি একটি বড় সমস্যা ছিল। বিষয়টি অনেক আগেই সমাধান হওয়া উচিত ছিল। সম্প্রতি সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার কারণে প্রশাসনের মনোযোগ সেদিকে ছিল। নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই সমন্বিতভাবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে এলাকায় সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অনদিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী চক্রের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. আহসান হাবীব পলাশ। এদিন দুপুরে অভিযান নিয়ে সলিমপুরের প্রবেশমুখে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান তিনি। মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, প্রায় ২০০৩ সাল থেকে একটি চক্র সরকারি নিয়মকানুন উপেক্ষা করে এখানে অবৈধভাবে জমির কাগজ তৈরি, জমি দখল ও হস্তান্তরের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। পরিস্থিতি এমন ছিল যে- সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এলাকায় প্রবেশ করতে ভয় পেত।এর আগে চারবার এই এলাকায় অভিযান চালানোর চেষ্টা করা হলেও সফল হওয়া যায়নি। এবার পঞ্চমবারের মতো অভিযান চালিয়ে যৌথবাহিনী সফল হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অভিযানে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি ও জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটরা অংশ নেন। সম্মিলিত এই অভিযানের মাধ্যমে এলাকায় রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে।
অভিযানের পর এলাকায় স্থায়ীভাবে দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে। এখানে বাংলাদেশ পুলিশের একটি ক্যাম্প এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের একটি ক্যাম্প চালু থাকবে। যাতে ভবিষ্যতে এ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা যায়। জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বিভাগীয় কমিশনারকে অনুরোধ জানান তিনি।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, অভিযানে এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে আটক করার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এখনও বিভিন্ন ইউনিট পুরোপুরি রিপোর্ট না দেওয়ায় চূড়ান্ত সংখ্যা বলা যাচ্ছে না। অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল এলাকার উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, যা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। পরবর্তীতে তল্লাশি কার্যক্রম চালিয়ে আরও অস্ত্র উদ্ধার করা যাবে।
এটি অনেক বড় এলাকা। পুরো এলাকায় এখনো তল্লাশি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কোথাও কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ বলেন, অভিযান শেষে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি জোরদার রাখা হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আবার মাথাচাড়া দিতে না পারে সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে বলে তিনি জানান।










