নির্ভীক-নির্লোভ সম্পাদক-সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা মইনুদ্দীন কাদেরী শওকতের কর্ম ও জীবন

নজরুল ইসলাম

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সাহসী সাংবাদিকতার যুগনায়ক, নির্ভীক-নির্লোভ সম্পাদক-সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মইনুদ্দীন কাদেরী শওকতের ৭২তম জন্মবার্ষিকী ১০ জুন ২০২৬, বুধবার।

সম্পাদক, সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত ১৯৬৯ সালে সাংবাদিকতায় এবং ১৯৬৪ সালে সার্বজনীন ভোটাধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। তিনি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পূর্বে তিনি বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রতিষ্ঠিত এবং ভাষা আন্দোলনের নেতা অলি আহাদ সম্পাদিত ‘ইত্তেহাদ’-এর বিশেষ সংবাদদাতা, ডেইলি ট্রিবিউনের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি এবং দৈনিক নয়াবাংলার সহ-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১৭ আগস্ট তাঁর সম্পাদনায় চট্টগ্রাম থেকে ‘ইজতিহাদ’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রকাশনার কয়েক মাস পর তৎকালীন এরশাদ সরকার পত্রিকাটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে হাইকোর্টে রিট আবেদনের মাধ্যমে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত চট্টগ্রাম সংবাদপত্র পরিষদ ও চিটাগাং এডিটরস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক, পূর্বাঞ্চলীয় সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি, বাংলাদেশ সম্পাদক সমিতির আহ্বায়ক এবং ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব প্রেস কাউন্সিলস (ডব্লিউএপিসি)-এর নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন।

তিনি বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের প্রেস জুডিশিয়াল ও প্রেস রুলস কমিটির সদস্য (২০০২-২০০৬), বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদের সহ-সভাপতি (২০০২-২০০৩), বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান (১৯৮৮-১৯৯১), চট্টগ্রাম সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি (১৯৮০-১৯৮৪), চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের নির্বাচন কমিশনার (১৯৮৭-১৯৯১), সাংস্কৃতিক সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক (১৯৭৯-১৯৮৪), বুদ্ধিজীবী স্মৃতি সংসদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক (১৯৮৭-১৯৯১), গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা কমিটির সদস্য (১৯৯০-১৯৯১), জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতির কাউন্সিলর (১৯৮৩), গণতান্ত্রিক মুক্তিযোদ্ধা ফোরামের কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান (১৯৯৯-২০০১), চট্টগ্রাম সাংবাদিক কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান (২০০৫) এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান (২০১৪-২০১৭) ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি হাটহাজারী-ফটিকছড়ি আঞ্চলিক মুক্তিবাহিনী (বিএলএফ)-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া হাটহাজারী-ফটিকছড়ি হুকুমদখল জমি উদ্ধার কমিটির সাধারণ সম্পাদক (১৯৭৯-১৯৮৪), ফেডারেশন অব ইয়ুথের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল (১৯৭৬-১৯৭৯) এবং জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক (১৯৮১-১৯৮৩) ছিলেন।

মুক্তিযোদ্ধা-সম্পাদক মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) আয়োজিত ১৯৯৩ সালের Training Seminar for Editors of Community Newspapers এবং ১৯৯৫ সালের Editors’ Colloquium on Investigative Reporting-এ অংশগ্রহণ করেন।

তিনি চিটাগাং ইউনিভার্সিটি ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম সরকারি বাণিজ্য কলেজ প্রাক্তন ছাত্র সমিতি, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটির সদস্য এবং চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির আজীবন সদস্য। গত পাঁচ দশক ধরে তিনি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য।

১৯৯৬ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক হিসেবে এবং ২০০৬ সালের ১০ অক্টোবর কৃতী সাংবাদিক হিসেবে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব তাঁকে সংবর্ধনা প্রদান করে। তিনি সিনিয়র জার্নালিস্ট ফোরামের আহ্বায়ক এবং কল্পলোক মিডিয়া টাওয়ার সাংবাদিক ফ্ল্যাট মালিক স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ২০১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর তাঁকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সংবর্ধনা প্রদান করে। একই বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম একুশে উৎসব পরিষদ সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তাঁকে একুশে সম্মাননা পদক প্রদান করে। এছাড়া ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ইউনিটি সাহসী সাংবাদিকতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সম্মাননা দেয়।

ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব প্রেস কাউন্সিলসের নির্বাহী সদস্য হিসেবে তিনি ২০০৪ সালের তানজানিয়া ঘোষণা এবং ২০০৬ সালের ইস্তাম্বুল ঘোষণার অন্যতম স্বাক্ষরকারী ছিলেন। ভারতের জাতীয় প্রেস ডে উপলক্ষে প্রেস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া প্রকাশিত স্মারকে ২০০৬ ও ২০০৭ সালে তাঁর দুটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়— Press Freedom: A Continuing Struggle এবং Freedom of the Press is a Fundamental Right।

২০০৭-২০০৮ সালে ডব্লিউএপিসির কান্ট্রি রিপোর্টের মধ্যে তাঁর রিপোর্ট শ্রেষ্ঠ রিপোর্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০০৪ সালের ২৪-২৬ অক্টোবর তানজানিয়ার দার-উস-সালেমে অনুষ্ঠিত ডব্লিউএপিসির নবম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাঁর রিপোর্ট অন্যতম সেরা রিপোর্ট হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং তিনি ১১ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া ২০০৬ সালে ইস্তাম্বুলে গঠিত ডব্লিউএপিসির সংবিধান কমিটির সদস্য ছিলেন। তাঁর রিপোর্ট ২০০৯ সালে ইস্তাম্বুল এবং ২০১০ সালে সাইপ্রাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ অ্যাসেম্বলিতেও প্রশংসিত হয়।

২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে কারারুদ্ধ করা হলে তাঁর প্রতিবাদে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত। ২০২৩ সালের ৩ জুন বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক সংস্থা তাঁকে সাহসী সাংবাদিকতার জন্য ‘তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া স্মৃতি পদক’ প্রদান করে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের পর ৬ আগস্ট চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক-সম্পাদক ও ছাত্র-জনতার সমাবেশে তাঁকে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এছাড়া তিনি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব, বাংলাদেশ এডিটরস ফোরাম, চট্টগ্রাম এডিটরস ক্লাব, চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ইউনিটি, সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ, চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম সাংবাদিক পরিষদ, ক্রাইম রিপোর্টার্স সোসাইটি, চট্টগ্রাম সাংবাদিক সংস্থা, বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক সংস্থা এবং জাতীয়তাবাদী সাংবাদিক ফোরামসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

মরহুমা আনোয়ারা বেগম এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ বৃহত্তর চট্টগ্রাম শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি (১৯৪৯), নিখিল ভারত মুসলিম লীগ চট্টগ্রাম শাখার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক (১৯২৪) ও চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির প্রথম মুসলিম সভাপতি মরহুম আবদুল লতিফ উকিলের কনিষ্ঠ পুত্র মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত।

তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নিউরোসার্জন ও বিএমএ-এর সাবেক সভাপতি মরহুম অধ্যাপক ডা. এল. এ. কাদেরীর ছোট ভাই এবং হযরত মাওলানা নুর আহমদ আল কাদেরী (রহ.)-এর দৌহিত্র।

তাঁর স্ত্রী শেখ আফসানা কাদেরী ‘ইজতিহাদ’ পত্রিকার সাবেক ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। একমাত্র পুত্র শিহাব কাদেরী ‘ইজতিহাদ’-এর সহযোগী সম্পাদক এবং একমাত্র কন্যা সামিনা কাদেরী। তিনি ১৯৯৬ সালে পবিত্র হজব্রত পালন করেন।
সংগৃহীত –

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

চট্টগ্রামে মশাল মিছিলের চেষ্টায় ছাত্রলীগের ১৩ কর্মী আটক

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম মহানগরে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ১৩ কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা মশাল মিছিল করার জন্য জড়ো হয়েছিলেন বলে পুলিশ জানায়। রোববার রাতে নগরের চান্দগাঁও থানা থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সোমবার তাদের আদালতে হাজিরের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

গ্রেফতার ১৩ জন হলো, মোরশেদ আলম (৩৫), আয়াতুর রহমান হামিম (২০), সামি উদ্দিন (১৯), সাজ্জাদুল ইসলাম (২১), আরিফুর রহমান (২৮), দিদারুল ইসলাম বাবু (২৮), মাঈনুদ্দিন (৩৮), আজগর হোসেন (২৪), জাবেদুল ইসলাম (২৪), জুনাইদ হাসনাত ইফতি (১৯), সাজ্জাদ হোসেন (২৬), জিয়াউল হক রুবেল (২৭) এবং সাইফুদ্দিন (২২)।
চান্দগাঁও থানার ওসি জসিম উদ্দিন বলেন, গ্রেফতার কর্মীদের কাছ থেকে একটি ব্যানার ও ১০টি মশাল জব্দ করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সবাইকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

রূপগঞ্জের দুইশত পরিবার আবারো উচ্ছেদ আতঙ্কে, অনাবাসিক জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া, কুলিয়াদি, রঘুরামপুর, শিমুলিয়া, ব্রাহ্মণখালী এলাকার দুইশত পরিবার আবারো উচ্ছেদ আতঙ্কে রয়েছে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সদস্যদের আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে ৩৮ দশমিক ৭৬একর জমি ভূমি হুকুম দখল করাকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসীর মধ্যে এ আতঙ্ক দিন দিন ছড়িয়ে পড়েছে। পূর্বাচল উপশহর থেকে উচ্ছেদ হওয়া আদি বাসিন্দাসহ সহস্রাধিক মানুষ আবারও ঘরভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী। কোনো ধরণের গণশুনানি বা জনমত যাচাই ছাড়াই অত্যন্ত গোপনে সার্ভে পরিচালনা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনাবাসিক, পতিত কিংবা খাস জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে রাজউকের পূর্বাচল উপশহর নির্মাণে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার ৪২গ্রামের ১৭মৌজার ৬হাজার ১৫১একর ভূমি হুকুম দখল করা হয়। পরে পূর্বাচলের আদি বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করে সেখানে উন্নয়ন কাজ চলে। সেসময় আদি বাসিন্দাদের পারিবারিক কবরস্থান নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। একপর্যায়ে পূর্বাচলের আদি বাসিন্দারা ফুলবাড়িয়া, কুলিয়াদি, শিমুলিয়া, ব্রাহ্মণখালীসহ আশপাশের এলাকায় জমি ক্রয় করে বাড়ি ঘর নির্মাণের পর বসবাস করতে শুরু করে।

এরই মধ্যে পূর্বাচলের উত্তর-পূর্ব সিমানাবর্তী ফুলবাড়িয়া, কুলিয়াদি, শিমুলিয়া, রঘুরামপুর ও ব্রাহ্মণখালী এলাকায় আবারো ভূমি হুকুম দখল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। রঘুরামপুর মৌজার ১৯ দশমিক ২১ একর, ব্রাহ্মণখালী মৌজার ১৫ দশমিক ৮৫ একর এবং কুলিয়াদি মৌজার ৩ দশমিক ৭০ একর জমি প্রস্তাবিত প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এবিষয়টি নিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুরো এলাকা জুড়ে রয়েছে এক ধরণের চাপা উৎকণ্ঠা। স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে একটাই প্রশ্ন- একবার উচ্ছেদ হওয়ার পরও কি আবারও আমাদের ঘর ছাড়তে হবে? আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় নির্ঘুম রাত কাটছে এলাকার হাজারো মানুষের।

কৃষিকাজই যাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেই যাদের প্রতিদিনের জীবনযাপন। অধিগ্রহণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গৃহহীন ও কর্মহীন হয়ে পড়বে সহস্রাধিক মানুষ। শুধু ঘর নয়, হারাবে জীবিকাও স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আবাদি জমিই তাদের প্রধান জীবিকা। জমি চলে গেলে শুধু ঘর নয়, কর্মসংস্থানও হারাবে তারা। পুরো এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে। বর্তমানে এ এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরণের গণআন্দোলনের শঙ্কাে রয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একটাই দাবি, উচ্ছেদের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের আশু হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সংকটের সুরাহা দেখছেন না স্থানীয়রা। তারা চান অনাবাসিক সরকারি খাস জমি কিংবা পতিত খালি জমি অধিগ্রহণ করে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হোক।
রঘুরামপুর গ্রামের মুজিবর রহমান খান বলেন, পূর্বাচলে আমার দাদা-নানার কবর ছিল। সরকারি অধিগ্রহণের পর সব ভেঙে সেখানে প্লট বানানো হয়েছে। এখন আবার পরিবারের অন্য সদস্যদের কবরও কি একই পরিণতি হবে?

কুলিয়াদি গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন, সরকারি অধিগ্রহণের ফলে ২০০০ সালে নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে কুলিয়াদি গ্রামে বসবাস শুরু করি। পূর্বাচলের আমাদের পারিবারিক কবর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে সেখানে প্লট নির্মাণ করা হয়েছে। এক জীবনে একবার নয়, দ্বিতীয়বার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় এখন তাদের দিন কাটছে।
ব্রাহ্মণখালী গ্রামের মোস্তফা কামাল বলেন, মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি, পারিবারিক কবরস্থান এবং বহু বছরের গড়ে তোলা জীবন-জীবিকা আবারো হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভেঙে-গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল পূর্বপুরুষের কবর, বসতভিটা আর জীবিকার শেষ সম্বলটুকু। নামমাত্র ক্ষতিপূরণ নিয়ে একটু দূরে সরে গিয়ে নতুন করে সংসার গড়ে তুলেছিলাম।

কুলিয়াদী গ্রাামের মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, ফসলি জমিগুলো শুধু জীবিকার উৎস নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন। নামমাত্র দামে জমি অধিগ্রহণের সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে প্রান্তিক মানুষ সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়বে। রক্ত দিবো, তবুও আামাদের বাপ দাদার বসতভিটা ছাড়বো না।

পূর্বাচল উপশহরের আলমপুর গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে রঘুরামপুর মৌজায় এসে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনেছিলেন মহসিন মিয়া। তিন শতক জায়গার ওপর গড়ে তোলা সেই ছোট্ট ঠিকানাও আজ প্রস্তাবিত প্রকল্পের বুলডোজারের হুমকির মুখে। ভাগ্য যেন বারবার তার সঙ্গে প্রতারণা করে চলেছে, বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মহসিন মিয়া। শিমুলিয়া গ্রামের ভুক্তভোগী বৃদ্ধ আব্দুল মতিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। এই মাটি ছেড়ে আমরা কোথায় যাব? সরকারি একটি সংস্থা নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে আমাদের উচ্ছেদ করতে চাইছে, যা দিয়ে অন্য কোথাও এক টুকরো জমিও কেনা সম্ভব নয়।

আলমপুর গ্রামের মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন বলেন, বাপ দাদার বসতভিটা তথা নিজের জন্মস্থান হারানোর কষ্ট অন্য কেউ বুঝবেনা। তার উপর জমির বিল ও ক্ষতি পূরণের টাকা উত্তোলণের ভোগান্তিতো আছেই। বসতবাড়ি হারানোদের পুনর্বাসন করতে হবে। জমির বিল মৌজা রেট নয়,সরকারি নিয়মের বাস্তব মূ্ল্েযর তিনগুণ টাকা দিতে হবে। তবেই বসতভিটা হারানোর কষ্ট কিছুটা হলেও লাগব হবে বলে আমি মনে করি ।

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসার মোঃ নাজমুল হাসান বলেন, রঘুরামপুর ও কুলিয়াদি এলাকায় ভোটার সংখ্যা ১৬ শতাধিক। পূর্বাচল রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফরিদ-আল-সোহান বলেন, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সদস্যদের আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে ৩৮ দশমিক ৭৬একর জমি ভূমি হুকুম দখল করার কাজ চলছে। এবিষয়ে এক মাস আগেই তথ্য যাচাই-বাছাই করে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পে ভূমি হুকুম দখল করা হলে ক্ষতিগ্রস্থদের ন্যায্য পাওনা অবশ্যই পরিশোধ করা হবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো: রায়হান কবির বলেন, ভূমি হুকুম দখল বিষয়ে আইন রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থদের অভিযোগ থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্থদের আবেদন নিবেদন থাকলেও তা ভূমি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে উত্থাপন করা হবে।
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো: রিয়াজুল ইসলাম বলেন, সরকারি আইন অনুযায়ী ভূমি হুকুম দখলের জমি ও ক্ষতিপূরণের বিল অবশ্যই পরিশোধ করা হবে। ক্ষতিগ্রস্থদের কেউ বঞ্চিত হবে না। তারা তাদের ন্যায্য অধিকার পাবে।

আলোচিত খবর

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আহমেদ পদত্যাগ করেছেন

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। আজ শুক্রবার ২৪ জুলাই বিকেলে তিনি গণমাধ্যমকে নিজেই পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র এরই মধ্যে পৌঁছানো হয়েছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে সংসদ ভবনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন।

কয়েক দিন ধরেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছিল। বঙ্গভবন সূত্রে জাবা যায়, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং পদত্যাগপত্রও প্রস্তুত করেছেন। তবে স্পিকার বিদেশ সফরে থাকায় তা জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত থাকার কথা ছিল। দায়িত্ব পালনকালে তিনি সময়ের ব্যবধানে তিনজন সরকারপ্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করান।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন মহল থেকে তার পদত্যাগের দাবি ওঠে। তখন তিনি পদত্যাগ করেনননি। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালিত হয়। তবে সংসদ ভেঙে দেওয়া, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।

২২ তম এরাষ্ট্রপতির পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলো। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিন জেলা ও দায়রা জজ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনা জেলার স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন এবং ১৯৭১ সালে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ