কর্ণফুলী নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা মেরিন একাডেমি

বিপুল সম্ভাবনা স্বপ্ন দেখাচ্ছে তরুণদের প্রতি বছর তৈরি হয় প্রায় ১৬০ মেরিনার

ডেস্ক নিউজ

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মোহনায় ১৯৬২ সালে ১০০ একর জায়গায় গড়ে তোলা হয় ‘বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি। মহাসাগর দাপিয়ে বেড়ানো আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের বিশাল জাহাজ পরিচালনার কারিগর তৈরির এক অনন্য পাঠশালা। আটলান্টিকের বরফশীতল ঢেউ থেকে শুরু করে সুয়েজ কিংবা পানামা খাল— বিশ্বের মেগা জাহাজগুলোর স্টিয়ারিং যেসব দক্ষ হাতে বিশ্ববাণিজ্য সচল রাখছে প্রতিদিন, তাদের অনেকেরই শিক্ষা ও দীক্ষা এই চত্বর থেকে। সবুজ-শ্যামল, ছায়া-সুনিবিড়, অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই ক্যাম্পাস অর্থনীতির দুয়ার যেমন খুলে দিচ্ছে, তেমনি বিপুল সম্ভাবনা স্বপ্ন দেখাচ্ছে তরুণদের এই ক্যাম্পাস। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনবল তৈরি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মেরিন একাডেমী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে ভোরের আলো ফুটতেই প্যারেড গ্রাউন্ড কেঁপে ওঠে শৃঙ্খলিত বুটের শব্দে। না, কোনো ক্যান্টনমেন্ট নয়। দূর থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প মনে করে ভুলও করতে পারেন কেউ কেউ। আর এ ভুল ভাঙবে ভেতরে ঢুকলেই! সমুদ্রজয়ের ছয় হাজার দক্ষ নাবিক গড়ার কারিগর বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি। বিশ্বমানের মেরিনার গড়ার এক বাতিঘর হয়েই জ্বলজ্বল করে জ্বলছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠান।

জাহাজে বড় অঙ্কের বেতন, মহাদেশ থেকে মহাদেশ, এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে ঘোরার রোমাঞ্চকর যাত্রা দেখা এবং একেবারে কম সময়ে বড় আয়ের সুযোগ— এই তিন কারণেই মেরিনার হতে চান তরুণরা। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৭০০ মেরিনার তৈরি হয়। এর মধ্যে এখান থেকে বের হন ১৬০ জন। বাকি ৫৪০ জন আসেন দেশের অন্য সাতটি একাডেমি থেকে। এই সাতটির মধ্যে তিনটি বেসরকারি। এসএসসির বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারেন এসব প্রতিষ্ঠানে। তিন হাজার প্রতিযোগীর মধ্যে লিখিত, মৌখিক ও কায়িক পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্ত হয় ৭০০। এর মধ্যে মেধা তালিকার শীর্ষে থাকা ১৬০ জন ভর্তির সুযোগ পান।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার সবুজ-শ্যামল নিভৃত এলাকায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ৬৪ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি শুধু সমুদ্রযাত্রার নাবিক তৈরি করেনি, গড়ে তুলেছে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব আর প্রযুক্তিগত দক্ষতায় বলীয়ান আন্তর্জাতিক মানবসম্পদ। সামরিক আদলে কঠোর নিয়মে পরিচালিত এই একাডেমিতে নটিক্যাল বিজ্ঞান পড়ে হয় জাহাজের ক্যাপ্টেন। আর ইঞ্জিনিয়ারিং শেখানো হয় জাহাজের চিফ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার গড়তে।ফিলিপাইন, ভারত ও চীন মিলে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মেরিনার (নাবিক ও অফিসার) সরবরাহ দেয়।

এই তিন দেশের সমমানের নাবিক তৈরি করে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি। এটি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থা (আইএমও) স্বীকৃত ‘হোয়াইট লিস্টেড’ প্রতিষ্ঠান। সুইডেনভিত্তিক ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির ‘শাখা প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি রয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট অব মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ এবং ‘দ্য নটিক্যাল ইনস্টিটিউট’ যৌথভাবে বিশ্বের প্রথম একাডেমি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ‘সার্টিফিকেট অব এক্সিলেন্স’ খেতাব দিয়েছে মেরিন একাডেমিকে। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ান মেরিটাইম সেফটি অথরিটি, যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম অ্যান্ড কোস্ট গার্ড এজেন্সি (এমসিএ) এবং সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষ মেরিন একাডেমির প্রাক-সমুদ্র প্রশিক্ষণকে তাদের সমমানের স্বীকৃতি দিয়েছে আগেই। বিশ্বমানের নটিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং সিমুলেটর, আন্তর্জাতিক মানসম্মত আইএমও মডেল কোর্স এবং আন্তর্জাতিক অডিটে নিয়মিত উত্তীর্ণ হওয়ার সক্ষমতাই এই একাডেমিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা মেরিটাইম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। এ রকম উচ্চমাত্রার ‘ব্র্যান্ডভ্যালু’ একাডেমি শিক্ষার্থীদের অনায়াসে চাকরি নিশ্চিত করে।

একাডেমি সূত্রে জানা গেছে, শতভাগ ইংরেজি মাধ্যমে সামরিক ধাঁচের প্রশিক্ষণ, আধুনিক জাহাজের স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিন রুম পরিচালনা, ইলেকট্রনিক চার্ট ডিসপ্লে অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ ও ইঞ্জিন সিমুলেটরের বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ অন্য দেশের তুলনায় এই একাডেমির ক্যাডেটদের এগিয়ে রেখেছে। তবে কিছু অবকাঠামো সুবিধা, অভিজ্ঞ শিক্ষক, ভিসা জটিলতার সমাধান এবং সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতি বাস্তবায়ন করা গেলে এই খাত ফিলিপাইনের মতো বাংলাদেশের জিডিপিতে বড় অবদান রাখতে পারবে। এমন মত দিয়ে মেরিন একাডেমির প্রধান, অর্থাৎ কমান্ড্যান্ট ক্যাপ্টেন কাজী এ বি এম শামীম বললেন, বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিল রেখে সিলেবাসের বাইরেও অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে ডিকার্বনাইজেশন, ডিজিটালাইজেশন ও সাইবার সিকিউরিটি অন্তর্ভুক্ত করেছি। শিপিংয়ে চীনের বিশাল বাজার ধরে ক্যাডেটদের সক্ষমতা বাড়াতে শনিবারের ছুটি বাতিল করে মৌলিক চায়নিজ ভাষা প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে। একাডেমির ব্র্যান্ডভ্যালু বিশ্বের শীর্ষ শিপিং লাইন, বন্দর অপারেটরদের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যমে এই খাতের বিশাল সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব।

বিশ্বের শীর্ষ শিপিং লাইন এমএসসি, মায়েরর্স্ক লাইন, সিএমএ সিজিএম, হ্যাপাগ-লয়েড, এনওয়াইকে এবং এভারগ্রিনের মতো জাহাজ পরিচালনাকারীদের কনটেইনার ও খোলা পণ্যবাহী বড় জাহাজ চালাচ্ছেন বাংলাদেশি মাস্টার মেরিনার এবং চিফ ইঞ্জিনিয়াররা। বিশ্ব জুড়ে অন্তত দেড় হাজার বাণিজ্যিক জাহাজে এক মহাসাগর থেকে আরেক মহাসাগরে দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং চালাচ্ছে বাংলাদেশের চৌকস মেরিনাররা। শুধু জাহাজ চালানোতেই সীমাবদ্ধ নয়, ডেনমার্ক, দুবাই ও সিঙ্গাপুরের বড় বন্দর ব্যবস্থাপনা, লন্ডনের শিপ ব্রেকিং ফার্ম, ইউকে মেরিটাইম অ্যান্ড কোস্ট গার্ড এজেন্সি, বারমুডার অফশোর রিগ এবং আইএমওর নীতিনির্ধারণী দপ্তরেও শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছে মেরিন একাডেমির অ্যালামনাই। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ফোরামে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য একাধিক বাংলাদেশি মেরিনার ‘আইএমও ব্র্যাভারি অ্যাওয়ার্ড’সহ বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেছেন। জাহাজে কাজ করা ছাড়াও অভিজ্ঞ সিনিয়র মেরিনার দেশের নৌপরিবহন অধিদপ্তর, সমুদ্রবন্দর, বেসরকারি খাতের লজিস্টিকস, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং সেক্টরে প্রধান নির্বাহী বা কনসালট্যান্ট হিসেবে বড় অঙ্কের বেতনে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে।

বিশ্বের বৃহত্তম স্বাধীন কনটেইনার জাহাজ মালিক এবং চার্টার অপারেটর ‘সি স্প্যান করপোরেশন’ কাজ করেন মেরিন একাডেমির ৫০ ব্যাচের শিক্ষার্থী নাজমুস সাকিব। ‘কসকো থাইল্যান্ড’ কনটেইনারবাহী জাহাজ চালিয়ে আলাস্কা থেকে সাংহাই যাওয়ার সময় সেকেন্ড অফিসার জানালেন, একাডেমির ক্যাডেটরা যে দক্ষ চৌকস সাহসী সেই ব্র্যান্ডভ্যালু এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। সুনাম ছড়িয়েছেন অ্যালামনাইরা। এখন সময় সেই ভ্যালুকে কাজে লাগিয়ে মাইলস্টোন গড়া।

তিন বছর মেয়াদের প্রশিক্ষণে প্রত্যেক ক্যাডেটের জন্য গড়ে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা ব্যয় করে মেরিন একাডেমি। তবে এই বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্তি অভাবনীয় ও অকল্পনীয়। প্রশিক্ষণ শেষ করে জুনিয়র অফিসার বা চতুর্থ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে মাসে আড়াই থেকে ৪ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা) দিয়ে চাকরি শুরু করেন তারা। ১২ বছরের ব্যবধানে ক্যাপ্টেন বা চিফ ইঞ্জিনিয়ার পদে উন্নীত হলে মাসিক বেতন ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি ১২ থেকে ১৮ লাখ টাকা। গ্যাস-তেলবাহী ট্যাংকারে চাকরি করলে মাসে বেতন ২০ হাজার ডলারের (২৫ লাখ টাকা) বেশি।

কম বিনিয়োগে নিশ্চিত চাকরি ও বেশি রিটার্ন পেতে বাংলাদেশে এর চেয়ে ভালো চাকরি আর নেই বলছেন বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের সেকেন্ড অফিসার প্রণয় সেন। তিনি বলেন, রেমিট্যান্স পাঠানোর দিক থেকেও বেশ এগিয়ে বাংলাদেশি মেরিনাররা। সাধারণ প্রবাসী কর্মীদের তুলনায় একজন মেরিনার প্রায় ১০ গুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনেন। শতভাগ বৈধ চ্যানেলে বছরে ১৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার (১ ডলার ১২৫ টাকা হিসাবে) রেমিট্যান্স পাঠান তারা। মেরিনার সংখ্যা যত বাড়বে, এই রেমিট্যান্সও লাফাবে।

১২ ব্যাচের শিক্ষার্থী বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী আক্ষেপ করে বললেন, কম বিনিয়োগে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এই পেশাকে সফল করতে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতি, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন জরুরি। ফিলিপাইন ভারতীয় মেরিনার বিশ্ব জুড়ে দ্রুত ভিসা সুবিধা পেয়ে সুযোগ লুফে নিচ্ছে। আমরা যথাযথভাবে সুযোগ কাজে লাগাতে পারছি না। বর্তমানে দেশীয় পতাকাবাহী ১০৮ বাণিজ্যিক জাহাজে প্রায় সবাই বাংলাদেশি মাস্টার মেরিনার ও প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে। দেশের অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক রুটে নিজেদের জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই খাতকে সাজানোর সময় এখন।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে; চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে চট্টগ্রাম নগরের জেএম সেন হলে শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করে অংশ নেননি। সবার লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বাধীন করা, গণতন্ত্র রক্ষা করা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।তিনি বলেন, আমরা মুসলমান হই, হিন্দু হই, বৌদ্ধ হই কিংবা খ্রিস্টান হই, ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের নাগরিক।

যে ধর্মেরই হই না কেন, যেহেতু এই দেশে আমরা জন্মেছি, এই দেশে বড় হচ্ছি, তাই আমাদের পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে লাখ লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

অনেকে শহীদ হয়েছেন। সেদিন কেউ দেখেননি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ কিংবা কে খ্রিস্টান। সবাই দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্য নিয়ে লড়াই করেছেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষা ও জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে রাজপথে নেমেছেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। গুলিবিদ্ধ কিংবা আহত ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় জানতে চেয়ে কেউ তাঁদের পাশে দাঁড়াননি। হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, আমার ভাই শহীদ হয়েছে, আমার ভাই আহত হয়েছে। বাকিরা তাঁদের ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। কেউ জিজ্ঞেস করেননি, কী তাঁর ধর্ম পরিচয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মানুষের অধিকার ও মানবিকতার প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য নয়।প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের বিচার করা উচিত নয়।

তিনি নিজেকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁকে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে হয়েছে। বাংলাদেশে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হলেও লন্ডনে অবস্থানের সময় সেই পরিচয় তাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠ করেনি। তাই সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু পরিচয় নয়, একজন মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তারেক রহমান বলেন, দেশের আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র একজন নাগরিককে যে অধিকার ও সুযোগ দেবে, অন্য নাগরিকও তা পাবেন। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও অধিকার খর্ব করা যাবে না।

মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব আন্দোলনে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সবাই শান্তিতে বসবাস করবেন এবং মিলেমিশে থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে যদি সেই বাংলাদেশ গড়তে হয়, আপনাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই। আপনি হিন্দু হোন, মুসলমান হোন, বৌদ্ধ হোন কিংবা খ্রিস্টান হোন, যাই হোন না কেন, আপনার সহযোগিতা আমার দরকার। কারণ আপনার সহযোগিতা ছাড়া আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব না।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীমসহ বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য ও নেতারা।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলে প্রতিদিন ব্যয় ৫৪ লাখ, গড়ে আয় ১১ লাখ টাকা

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পর্যটন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খোলার প্রত্যয় নিয়ে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা হয়েছিল। ১০ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে টানেলটিতে ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর গাড়ি চলাচল শুরু হয়। যেখানে ২০২৫ সালে প্রতিদিন গাড়ি চলাচল করার কথা ছিল ২৮ হাজার ৩০৫টি। সেখানে চলেছে মাত্র ৩ হাজার ৮৭২টি, যা প্রত্যাশার মাত্র ১৪ শতাংশ। একই বছর আয় হওয়ার কথা ছিল ৪০০ কোটি। বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ৩৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। টানেলটি সচল রাখতে গত তিন বছরে লোকসান গুনতে হয়েছে ৪০৯ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেছেন, সমীক্ষায় ট্রাফিক বেশি দেখানো হয়নি। তখন ধারণা করা হয়েছিল, টানেল নির্মাণের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক হয়ে যাবে। কিন্তু কভিড মহামারী, আর্থিক বিষয় ও সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে টানেলের কাজ যে গতিতে এগিয়েছে, আনুষঙ্গিক কাজগুলো সে গতিতে এগোয়নি।

এদিকে লোকসান কমাতে সেতু কর্তৃপক্ষ ১০টি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে। এর মধ্যে সিসিসিসির সঙ্গে করা ৯৮৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি থেকে জনবল ও ব্যয় কমিয়ে ১২৩ কোটি টাকা সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আনোয়ারা-বরকল-গাছবাড়িয়া সড়ক এবং আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া সড়ক প্রশস্তকরণ ও কর্ণফুলী ড্রাই-ডক এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আনোয়ারা প্রান্তে সাতটি নতুন জেটি নির্মাণ।

এগুলো চালু হলে টানেল থেকে বছরে ২০০ থেকে ২৪০ কোটি টাকা অতিরিক্ত টোল আদায় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি চায়না ইকোনমিক জোন ও কোরিয়ান ইপিজেডের কার্যক্রম গতিশীল করা এবং দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক টানেল দিয়ে চলাচলে উদ্বুদ্ধ করতে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদন, ২০১৩ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে টানেলের প্রাক্কলন ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের এই ফারাক পাওয়া গেছে। যৌথভাবে কর্ণফুলী টানেলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছিল চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) ও হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওভি আরুপ।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষার এই ত্রুটি, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আর্থিক লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। জানতে চাইলে সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বললেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার (ফিজিবিলিটি স্টাডি) মধ্যেই যত ধরনের সমস্যা, এটি খুব পরিষ্কার। বিগত দিনে এ ধরনের বড় প্রকল্প কেন নেওয়া হয়েছিল, তা জনগণের কতটা কাজে লাগল এবং ভুলটা কোথায় ছিল— এটি কি স্রেফ ভুল ছিল, নাকি অপরাধ ছিল, তা খতিয়ে দেখা হবে।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, টানেল পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে বছরে ব্যয় হবে ৩২ থেকে ৪৫ কোটি টাকা। সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিসিসি) সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য ৯৮৪ কোটি টাকার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি করা হয়েছে।
চুক্তিমূল্য অনুযায়ী, টানেল সচল রাখতে বছরে ব্যয় দাঁড়ায় ১৯৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রতিদিনে ব্যয় হচ্ছে ৫৪ লাখ টাকা। বিপরীতে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত টানেল থেকে মোট টোল আদায় হয়েছে মাত্র ৪৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে আয় হয়েছে ১১ লাখ টাকা। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে ৪২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। গত তিন অর্থবছরে টানেল সচল রাখতে ৫১৩ কোটি টাকা খরচ হলেও টোল আদায় হয়েছে মাত্র ১০৪ কোটি টাকা।

সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের কারণে টানেল ব্যবহারকারী মোট গাড়ির প্রায় ৫০ শতাংশই হবে ট্রাক। কিন্তু সেতু কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, টানেল চালুর পর থেকে চলাচল করা গাড়ির মধ্যে ৭০ দশমিক ৬০ শতাংশই প্রাইভেট কার, জিপ ও মাইক্রোবাসের মতো হালকা যানবাহন। বাস চলেছে ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ, ট্রাক ১৭ দশমিক ৯৫ এবং ট্রেইলার চলেছে মাত্র ১ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলছিলেন, প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়া ও দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য অনেক সময় সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বাস্তব অনেক কিছু উপেক্ষা করে প্রাক্কলন করা হয়। এটি ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, সমীক্ষায় ভুল হয়েছে। তবে যেহেতু বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হয়ে গেছে, তাই টানেলটিকে সচল ও কার্যকর করতে হলে আনোয়ারা প্রান্ত থেকে কক্সবাজারমুখী বাইপাস সড়ক এবং ফ্লাইওভারের সংযোগ দ্রুত শেষ করতে হবে।

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত শাহ আমানত তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু ও কালুরঘাট সেতুর ওপর থেকে যানবাহনের চাপ কমানো। কিন্তু সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), সেতু কর্তৃপক্ষ এবং রেলওয়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে শাহ আমানত সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৭ হাজার ৪১৬টি এবং শতবর্ষী কালুরঘাট সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১১ হাজার গাড়ি চলাচল করে। অর্থাৎ দুটি সেতু ও একটি টানেল মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪২ হাজার ২৪৪টি যানবাহন কর্ণফুলী নদী পারাপার হয়। এর মধ্যে শাহ আমানত সেতু দিয়ে ৬৫ শতাংশ এবং কালুরঘাট সেতু দিয়ে ২৬ শতাংশ— অর্থাৎ দুই সেতু মিলিয়ে ৯১ শতাংশ গাড়ি পার হচ্ছে। আর টানেল দিয়ে পার হচ্ছে মাত্র ৯ শতাংশ গাড়ি।

শাহ আমানত সেতুতে গাড়িপ্রতি গড় টোল পড়ছে মাত্র ৮২ টাকা, যেখানে টানেলে গাড়িপ্রতি গড় টোল পড়ছে ৩০৬ টাকা ৬৩ পয়সা। প্রাইভেট কারের টোল সেতুতে ৭৫ টাকা হলেও টানেলে ২০০ টাকা। আবার ৩১ আসনের কম বাসের টোল সেতুতে ৫০ টাকা হলেও টানেলে তা ৬ গুণ বেশি— ৩০০ টাকা। এ ছাড়া সেতুতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচলের সুযোগ থাকলেও টানেলে তা নিষিদ্ধ।

আলোচিত খবর

আরও পড়ুন

সর্বশেষ