এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

রেলের অংশ সীমিত থাকায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে সড়কের ওপর চাপ বাড়ছে। অথচ রেলপথে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে দীর্ঘ দূরত্বে ট্রাকের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয়ও কমানো সম্ভব হতো। বিশেষ করে বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাড়লেও পণ্য পরিবহনে রেলের প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনের সংকট, কনটেইনারবাহী ট্রেনের স্বল্পতা এবং অনিয়মিত পরিচালনার কারণে আমদানি- রপ্তানি পণ্য সরবরাহে বাড়ছে বিলম্ব ও ব্যয়। তবে সম্প্রতি রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম রেলে পণ্য পরিবহনের অংশ ১৬ থেকে ১৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন। বর্তমানে বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে রেলের অংশ প্রায় ১ দশমিক ৩৩ থেকে ৪ শতাংশ।

জানা গেছে, বন্দর ও রেলওয়ের সক্ষমতাগত সীমাবদ্ধতার প্রভাব পড়ছে ব্যবসায়ীদের ওপর। রেলপথে পর্যাপ্ত পরিবহনসেবা না থাকায় আমদনিকারকদের পণ্য পরিবহনে ট্রাক ও ট্রেইলারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি, যানজট, চালক ও শ্রমিকের মজুরি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। পণ্য পৌঁছাতে বিলম্ব হলে গুদামভাড়া বাড়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যানজটের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্য পরিবহনের ব্যয় সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন ব্যয় এবং রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে ২০ ফুটের একটি কনটেইনার রেলপথে পরিবহনের সরকারি ভাড়া ৯ হাজার ৭০০ থেকে ১৬ হাজার ১০০ টাকা। অন্যদিকে, সাধারণ সময়ে সড়কপথে কাভার্ড ভ্যানে কনটেইনার পরিবহনের স্বাভাবিক ভাড়া থাকে ১৭ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা। তবে তীব্র জ্বালানি সংকট বা বিশেষ পরিস্থিতিতে এই ভাড়া বেড়ে ২৬ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরে বন্দরে ৩৫ লাখ ১৮ হাজার ৮৪১ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৭ টিইইউ। এক বছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ । অন্যদিকে, বাংলাদেশ পূর্বাঞ্চলে কনটেইনার ট্রেনের ট্রিপ ২০২২-২৩ অর্থবছরের ২ হাজার ৮৭৮টি থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৬৭টিতে নেমেছে। একই সময়ে কনটেইনার।পরিবহন থেকে আয় ২৯৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা থেকে কমে ১৬৩ কোটি ৩১ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন ১১৯টি ইঞ্জিন প্রয়োজন হলেও প্রাপ্যতা রয়েছে ৬৫টি। ইঞ্জিনের এই ঘাটতির কারণে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার পাশাপাশি পণ্যবাহী ট্রেনের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কনটেইনার ট্রেনের নিয়মিত চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রেলের পরিবহন সক্ষমতা ও আয়-দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে পণ্য পরিবহনের জন্য প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি ইঞ্জিন প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে গড়ে চার থেকে পাঁচটি ইঞ্জিন পাওয়া যায়। কোনো কোনো দিন ইঞ্জিনের প্রাপ্যতা কমে এক বা দুটিতে নেমে আসে। এতে চাহিদা অনুযায়ী কনটেইনার পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে না এবং পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে । ইঞ্জিনের সংখ্যা বাড়াতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, চলতি অর্থবছরের জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে মোট ৮ লাখ ৬৩ হাজার ২৭৮ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। এ সময়ে রেলপথে কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ বন্দরের মোট হ্যান্ডলিংয়ের মাত্র ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। পর্যাপ্ত ইঞ্জিন ও কনটেইনারবাহী ট্রেনের অভাবে রেলপথে পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বন্দর সচিবের মতে, ইঞ্জিনের প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং নিয়মিত কনটেইনার ট্রেন পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে রেলের অংশ বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে সড়কের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী পরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, রেলওয়ের দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জনবলসংকট ও রোলিংস্টকের অভাবে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে। রেলপথে পর্যাপ্ত ইঞ্জিন ও কনটেইনারবাহী ট্রেন না থাকায় ব্যবসায়ীদের সড়কপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি খরচ ও যানজটের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে।তিনি আরও বলেন, রেলওয়ের সক্ষমতা বাড়াতে ইঞ্জিন ও ওয়াগনের সংকট নিরসন, প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। এতে পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সড়কের ওপর চাপও কমানো সম্ভব হবে।











