এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম মহানগরের ফুটপাতগুলো স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিক, ছাত্রনেতা, স্থানীয় চাঁদাবাজরা এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ করে চাঁদা আদায় করে আসছে। নগরীর ব্যস্ততম সড়কগুলোর ফুটপাতে হকার বসিয়ে, সড়কে অবৈধ গাড়ির স্ট্যান্ড কিংবা ভ্যান গাড়ির ভাসমান বাজার বসিয়ে এমন কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি চলছে।

বিভিন্ন গ্রুপের নামে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে চলছে এই চাাঁদাবাজির মহোৎসব। প্রভাবশালী নেতাদের নাম ভাঙিয়ে ফুটপাত ও রাস্তা দখলের অপতৎপরতা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় নগরবাসীর দুর্ভোগ বেড়েছে। হঠাৎ করেই দোকান, ভ্যান ও অস্থায়ী স্টলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পথচারীকে চলন্ত যানবাহনের মধ্য দিয়েই চলতে হয়। ফুটপাতে হাঁটতে না পেরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কেই চলছেন পথচারীরা। এতে করে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে মূল সড়ক। নির্বিঘ্নে হাঁটাচলা করতে ফুটপাত রাখার যে বিধান রয়েছে তা একেবারেই উপেক্ষিত।
এদিকে গত শনিবার নগরের নিউ মার্কেট মোড় থেকে ওমর চাঁদ রোড হয়ে সদরঘাট রোড পর্যন্ত এলাকায় সড়ক ও ফুটপাত থেকে প্রায় ২০০টি ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। তবে চসিক অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করে, হকার-ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ফের দখল করে। ফলে সুফল মিলছে না সম্প্রসারিত সড়কগুলোর।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যস্ত এলাকায় ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে প্রভাবশালী চক্রের ব্যবসা চলছে। দখল করা ফুটপাত এবং রাস্তায় ভাসমান ভ্যান এবং হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়। এই টাকা ভাগ হয় নানাভাবে।
চান্দগাঁও থানাধীন বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের সামনে থেকে আবাসিক এলাকার রাস্তা পর্যন্ত ফুটপাত দখল করে বসানো হয়েছে দোকান। শাকসবজি, কাপড়চোপড়, খেলনা, জুতা, মোজা, বিভিন্ন ধরনের ফলসহ রকমারি পণ্যের এসব দোকান বসিয়ে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে। একটি দোকান থেকে দৈনিক পাঁচশ টাকা থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয় বলে অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে স্থানীয় একেকটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে হকারদের কাছে ভাড়া দিচ্ছে। প্রতিটি ভাসমান দোকানকে দৈনিক ভিত্তিতে টাকা দিয়ে ব্যবসা করতে হয়। দখলদারিত্বের কারণে কোটি কোটি টাকা খরচ করে রাস্তা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য ভেস্তে গেছে। ফুটপাত সংস্কারের সুফলও পাচ্ছে না নগরবাসী।
অন্যদিকে নগরীর জিইসি মোড়ে সেন্ট্রাল প্লাজার পাশের ফুটপাত দখল হয়েছে অনেক আগে। রাস্তার উপরও স্থাপন করা হয়েছে ভাসমান হকারদের দোকান। এই মার্কেটের পাশের রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ সিমেন্টের ব্লক দিয়ে ও আর নিজাম রোড থেকে বামে যাওয়া গাড়িগুলোর জন্য সিঙ্গেল একটি লেন করেছে। একটি গাড়ি কোনোরকমে সরু লেনটি দিয়ে চলতে পারে। গত কদিন ধরে ওই সরু লেনের রাস্তা দখল করে কয়েকটি টেবিল বসানো হয়েছে। এছাড়া নগরীর ওয়াসা ও ইস্পাহানীর মোডেও ফুটপাত দখল করা হচ্ছে।
এদিকে জামালখানে রাস্তার উপর কয়েকশ ভ্যানে বেচাকেনা চলে। মোড়টিতে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে ব্যবসা।
চকবাজারের চক সুপার মার্কেট থেকে ফুলতলা, কেয়ারি থেকে অলি খাঁ মসজিদ, তেলপট্টি থেকে চক সুপার মার্কেট পর্যন্ত সড়কের উপর প্রতিদিন অন্তত শ’তিনেক দোকান বসে।চট্টগ্রাম মেডিকেলের সামনের ফুটপাত, রাস্তা, চট্টেশ্বরী রোডের মোড়, জয়নগরের রাস্তার মোড়সহ পুরো এলাকায় ফুটপাত ও রাস্তায় বেচাকেনা চলছে। চকবাজার থেকে ডিসি রোড, দেওয়ান বাজার থেকে চন্দনপুরা হয়ে আন্দরকিল্লা মোড়, আন্দরকিল্লা মসজিদের সামনে থেকে লালদিঘি, নিউ মার্কেট, স্টেশন রোড, লালদিঘি থেকে কোতোয়ালী মোড়, জিপিও থেকে নিউ মার্কেট মোড়, সিরাজউদৌলা রোড, চকবাজারসহ যত্রতত্র ভ্যান এবং টেবিলে নানা পণ্যের ব্যবসা চলে।
নগরীর উইম্যান কলেজ মোড় থেকে গার্লস স্কুল পর্যন্ত রাস্তাটি ব্যস্ত একটি সড়ক। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটির হাজার হাজার মানুষ ছাড়াও অসংখ্য ছাত্রী নিয়মিত এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করে। বহু আগে মোড়ে একটি সবজির বাজার তৈরি করা হয়। গত কয়েক মাস ধরে পুরো রাস্তাটিতে অসংখ্য ভ্যানগাড়ি দখল করে নিয়েছে।
নগরবাসী বলছেন, বর্তমান মেয়র রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ, তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ফুটপাত দখলমুক্ত করা কঠিন নয়। নগরবাসীকে চলাচলের জন্য ফুটপাত মুক্ত করতে তিনি কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেই পাল্টে যাবে চট্টগ্রামের চেহারা।
তবে– চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) দাবি করেছে, তারা নিয়মিত হকার উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে, যাতে ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের উপযোগী থাকে। কিন্তু বাস্তবে এসব অভিযানের স্থায়ী কোনো প্রভাব পড়ে না। অভিযান শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই হকাররা আবার জায়গা দখল করে নেয়।
নগরবাসীর মতে, ফুটপাতে শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালেই হবে না। পুনরুদ্ধার হওয়া ফুটপাত পুনর্দখল রোধে নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। প্রয়োজনে মিনি বাগান করে দিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে উচ্ছেদের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা জায়গা সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় উচ্ছেদ করেও কাজ হবে না। কেউ কেউ ফুটপাতের পরিবর্তে বিকল্প স্থানে হকারদের বসার জায়গা
করে দেয়ার পরামর্শ দেন।
এদিকে গত শনিবার নগরের নিউ মার্কেট মোড় থেকে ওমর চাঁদ রোড হয়ে সদরঘাট রোড পর্যন্ত এলাকায় সড়ক ও ফুটপাত থেকে প্রায় ২০০টি ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করেছে চসিক। অভিযানে পাশের ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। দুপুরে পরিচালিত এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) মো. সোয়েব উদ্দিন খান।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের নির্দেশনায় ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখার লক্ষ্যে আজকের এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অবৈধ স্থাপনা ও টং দোকানের কারণে পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছিল এবং যানজটও বাড়ছিল। এসব সমস্যা নিরসনে আমরা ধারাবাহিকভাবে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছি।
তিনি বলেন, মেয়র মহোদয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা হচ্ছে, নগরের কোনো ফুটপাত বা সড়ক অবৈধভাবে দখল করে রাখা যাবে না। জনগণের চলাচলের জন্য নির্ধারিত স্থান জনগণের কাছেই ফিরিয়ে দিতে হবে। সে লক্ষ্যে শুধু আজকের অভিযান নয়, ভবিষ্যতেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। যারা উচ্ছেদের পর পুনরায় ফুটপাত ও সড়ক দখলের চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, নগরকে পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও চলাচল উপযোগী রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা এ কাজে নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করছি। কোথাও ফুটপাত বা সড়ক অবৈধভাবে দখল করা হলে নাগরিকরা প্রতিবাদ জানাবেন এবং দ্রুত সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন। জনসচেতনতা ও প্রশাসনিক তৎপরতার সমন্বয়েই একটি সুন্দর, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব।
এদিকে উচ্ছেদ হওয়া হওয়া কয়েকজন হকার বলেন, হকার সমিতিতে টাকা দিয়ে তারা ব্যবসা করেন। এছাড়া নোটিশ দেওয়া ছাড়া অভিযান পরিচালনা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে।

















