আজঃ মঙ্গলবার ১৭ মার্চ, ২০২৬

১০ মাঘের গাউসুল আযম মাইজভান্ডার দরবার শরীফ দেশের সর্ববৃহৎ স্বতঃস্ফূর্ত জনসমাবেশ

লেখক ঃ নাজমুল হাসান চৌধুরী হেলাল আওলাদে গাউসুল আযম মাইজভান্ডারি

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

১০ মাঘ ১৪৩০ বাংলা ২৪ জানুয়ারি ২০২৪ বুধবার বাংলাদেশে প্রবর্তিত একমাত্র ত্বরিকা,বিশ্বসমাদৃত ‘ত্বরিকা-ই-মাইজভা-ারীয়া’র প্রবর্তক গাউসুল আযম হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভা-ারী (ক.) কেবলা কাবার ১১৮তম মহান ১০ মাঘ উরস শরিফ ১০ মাঘ। বাংলা সনের এ তারিখ চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের বর্ষপঞ্জির এক উল্লেখযোগ্য তাৎপর্যময় দিন।এ তারিখটি সারা বাংলাদেশের জন্যই সাংবাৎসরিক গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হিসেবে প্রতিষ্টিত।১০ মাঘ,হযরত গাউসুল আযম মাইজভান্ডারি শাহসূফি হযরত মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহর (ক.)ওফাত দিবস।বাংলা ১৩১৩ সনের ১০ মাঘ মোতাবেক ইংরেজী ১৯০৬ সনের ২৩ জানুয়ারী তিনি ওফাত প্রাপ্ত হন। (সুত্র মাসিক আলোকধারা) এ তারিখে প্রতি বছর মাইজভান্ডার দরবার শরীফে মহাসমারোহে উরস শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছর মাঘ মাস শুরু হবার আগে থেকেই চট্টগ্রাম তথা সমগ্র বাংলাদেশের নিভৃত পল্লী জনপদগুলো ঢোলক, খরতাল প্রভৃতি রখমারী বাদ্যের তালে তালে জেগে উঠে অকস্মাৎ। মুখরিত হয়ে ওঠে গ্রাম বাংলার কৃষকের শান্ত উঠোন,প্রশান্ত আঙিনা। বাদ্যের তালে তালে অনুরণিত হতে থাকে মাইজভা-ারী গানের সুর। ‘মানুষ ধরা কল বসাইছে আমার বাবা ভান্ডারী, সেই কলেতে পড়লে ধরা আর থাকেনা ঘর-বাড়ী’ নানান ধরনের তকরীর দিতে দিতে সারিবদ্ধভাবে চলে মানুষ। পাড়ায় পাড়ায় ঘরে ঘরে গিয়ে সংগ্রহ করে উরস উপলক্ষে চাউল টাকা। ঢোলকের তাল, সানাইয়ের সুর শুনেই বৌ-ঝিরা বুঝতে পারে ওরশের নজরানা যোগাড়ে বেরিয়েছেন ভক্তরা। এসব দলে থাকেন এক কিম্বা একাধিক মাস্তান।শুধু চট্টগ্রামে নয়,বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামেই,এমনকি প্রতিটি মহল্লাতেই পাওয়া যাবে কয়েকজন করে ভান্ডারী-পাগল এমন মাস্তান। তাদের কারো মাথায় লম্বা বাবড়ী কাটা ঝাকড়া চুল। কারো হাতে লোহার কিম্বা গাছের বড় লাঠি,কারো হাতে লোহা বা তামা পিতলের বালা। পোশাকে-আশাকে নিতান্তই সাধারণ। কিন্তু প্রথম দর্শনেই এদের স্বকীয় একটা বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। এদের দেখলে যে কেউই সহজে বুঝতে পারে। এরা ভান্ডারীর পাগল-মাস্তান। হক ভান্ডারীই এদের মুখের বুলি, জপমন। সারা দুনিয়াই যেন এদের ঘর। কেউ এদের পর নয়। উরস শরীফের নজরানা সংগ্রহের মিছিলে এদের উপস্থিতি পরিবেশকে করে তোলে আরো বৈচিত্র্যময়। যেখানে সেখানে এরা হালকায়ে জিকির শুরু করে দেয়। ঢোলক বাঁশীর আওয়াজ পেলে তো কথাই নেই এদের ভাবের সাগরে যেন তুফান উটে। বাল্যকালে এমন মিছিলে দু একজন মাস্তান কে ঢোলকের তালে তালে গাইতে শুনেছি “ফকিরী সহজ কথা না,লম্বা চুলে তেল মাখিলে ফকিরী পাবা না” কিম্বা ভান্ডারী! কি যাদুতে আমায় ভুলাইলি, গোস্ত দিবার আশা দিয়া কত্তি কিনালি (কত্তি অর্থ মাটির বদনা) “দেখে যারে মাইজভান্ডারে হইতাছে নুরের খেলা, নুরের মাওলা বসাইছে প্রেমের মেলা” আরো দেখেছি গান শুনে শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ের অশ্রুসিক্ত অভিব্যক্তি।
১০ মাঘের বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হয় মাইজভান্ডার শরীফ অভিমুখে জনগ্রোত। বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটায় দুর দুরান্ত থেকে শত শত বাস ভাড়া করে আসেন লাখ লাখ মানুষ। সে এক অপরূপ দৃশ্য। ট্রেনে বাসে পায়দলে কেবল মানুষের মিছিল।কিসের টানে কোন সে মোহিনী আকর্ষণে কাতারে কাতারে লক্ষ লক্ষ মানুষ এদিকে ছুটে আসেন।তা আল্লাহপাকই ভাল জানেন। সুফি কবি আবদুল হাদীর ভাষায় চল গো প্রেম সাধুগণ প্রমেরী বাজার,প্রেম হাট বসিয়াছে মাইজভান্ডার মাঝার। নারী পুরুষ, শিশু যুবক সকল বয়সের সকল স্তরের মানুষের সে এক মিলনমেলা মহাসম্মিলন। সমগ্র বাংলাদেশ যেন ভেঙে পড়ে মাইজভান্ডার শরীফ গ্রামে। মাইজভান্ডার শরীফ হয়ে ওঠে সমগ্র বাংলাদেশের মহামিলন তীর্থ। গোটা দেশের সাংস্কৃতিক আর্থিক ঐক্যের প্রতীক- প্রতিভু। লাখো লাখো মানুষ শুধু যায় আর আসে, পিঁপড়ের ঝাকের মত। সে দৃশ্য চোখে না দেখলে বলে বুঝানো যাবেনা।১০ মাঘ এভাবে পরিনত হয় বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম স্বতঃস্ফূর্ত জনসমাগম স্থলে। শুধু জনসমাগম নয়,এই গোটা বিশাল গ্রামটিই তখন পরিনত হয় এক সুবিশাল এবাদতগাহে।সর্বক্ষণ চলে হালকায়ে জিকির,মিলাদ মাহফিল।দরবারের স্থানে স্থানে অজিফা পাঠ। আল্লাহর হামদ, মহনবীর নাত, আওলিয়া কেরামদের শানে গজল কাওয়ালী। ধর্মীয় পবিত্রতা, নিবেদিত প্রানের আকুতি যেন জড়িয়ে রাখে সমগ্র মাইজভান্ডার শরীফ কে। মানুষ নিজের অজান্তেই এতে হারিয়ে যায়, বিলীন হয়ে যায় মিশে যায় সেই অনাদি অনন্ত মহাশক্তির দরদী বুকে, মরমী সত্তায়। ১০ মাঘ উপলক্ষে মাইজভান্ডার শরীফে বসে এক বিরাট মেলা।বর্তমানে ঐ তারিখে দরবার শরীফের আশে পাশে বাজারগুলো যথা নাজিরহাট, নানুপুর লেলাং ফরহাদাবাদ প্রভৃতি জমে উঠে। হস্তশিল্পজাত বহু সামগ্রী এখানে বেচা কেনা হয়। চালুনি কুলা বেলুনি দা চুরি কোদাল বাঁশ বেতের অন্যান্য সামগ্রী। মাটির তৈরি তৈজস খেলনাপাতি মৌসুমি ফসল মূলা খীরা বরই হরেক রকম জিনিস পত্রের পসরা বসে। হালদা নদীর ভেতর চরে জম্মানো সাত/আট থেকে বার/চৌদ্দ কেজি ওজনের বিশাল বিশাল মুলা কাঁধে ঝুলিয়ে ঘরে ফেরেন ওরশার্থীরা। ১০ মাঘের কয়েকদিন আগে পিছে চলে চলে বেচাকেনা। ১০ মাঘ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের হরেক রকম কুটির শিল্পের এক প্রদর্শনী ও বিপণন কেন্দ্র। আবহমান বাংলাকে পরিপূর্ণ রূপে খুঁজে পাওয়া যায় এখানে।
মাইজভান্ডার দরবার শরীফে সকল ঘরে চলে এ উপলক্ষে জেয়াফত। দরবারে আগত লক্ষ লক্ষ মানুষ এখান থেকে খালি মুখে ফিরে যেতে পারেন না ফিরে যান না। তারা কেউ খালি হাতে আসেন না। প্রত্যেক দল সাথে করে নিয়ে আসেন মহিষ গরু ছাগল মোরগ চাউল রান্নার মসল্লা সামগ্রী। জমা দেন দরবারে। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে চলে রান্না বান্না ও পরিবেশনের কাজ।যে যার নিয়ত ও মানত করে খায়। এ দরবারের তবররুক খেয়ে জটিল রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছেন এমন লোকের সংখ্যাও অগণিত। রান্না বান্নার খানা পিনার এ বিশাল আয়োজন প্রকৃত অর্থে এক বিষ্ময়কর ব্যাপার লক্ষ লক্ষ মানুষেরা সারিবদ্ধভাবে শৃঙ্খলার সহিত খেয়ে এখান থেকে যান।এর বৈশিষ্ট্য হলো এ খানা পিনায় ধনী গরীব সকলের জন্য একই ব্যবস্থা।খানা পিনা সরবরাহ করা হয় মাটির সানকিতে (বছি) বর্তমানে মেলামাইনের বাসনে (প্লেট)।হাজার হাজার মাটির সানকির প্রয়োজন হয় মাইজভান্ডার উরশ এ। এই মাইজভান্ডার শরীফই বলতে গেলে চট্টগ্রামের শত শত কুমোর পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছে দীর্ঘদিন।অনেকেরই জানতে ইচ্ছে হয়, এখানে ১০ মাঘ কত মহিষ গরু ছাগল জবাই হয়? হিসেব করে এর জবাব দেওয়া সম্ভব নয়।বলতে গেলে হাজারো হাজার। সে এক এলাহি কান্ড। কেবল মাইজভান্ডার দরবার শরীফে নয় ১০ মাঘ সারা বাংলাদেশে এমন কি দেশের বাইরে যেখানে ভক্ত অনুসারীরা আছেন কিন্তু কোনো না কোনো কারণে দরবারে হাজির হতে পারেন নাই। তারা নিজ নিজ অবস্থানে সমবেতভাবে উরশ শরীফের আয়োজন করেন।এই উরশ শরীফ বাঙালির জাতীয় অনুষ্টানের দাবীদার। বিশেষ করে জাতি ধর্ম দল মত বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের নিঃসংকোচ ও অবাধ অংশগ্রহন এ উরশ শরীফকে সার্বজনীনভাবে গৌরবের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

লেখক ঃ নাজমুল হাসান চৌধুরী হেলাল
আওলাদে গাউসুল আযম মাইজভান্ডারি

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

আঞ্জুমানে খুদ্দামুন নাস শারজাহ্ শাখার উদ্যােগে পবিত্র শোহাদায়ে বদর ও ইফতার মাহফিলের সমর্পণ

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে আঞ্জুমানে খুদ্দামুন নাস শারজাহ শাখার উদ্যােগে পবিত্র শোহাদায়ে বদর শীর্ষক আলোচনা সভা, ইফতার ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। গত (১৩ই মার্চ২৫ইং) শুক্রবার বাদে আসর ৪নং সানাইয়া পাকিস্তান সিগ্নেল পবিত্র শোহাদায়ে বদর দিবস শীর্ষক আলোচনা ও ইফতার মাহফিলে মুহাম্মদ একান্দর আলমের সঞ্চালনায়, অত্র শাখার সভাপতি মাওলানা আব্দুল হক সাহেবের সভাপতিত্বে, প্রধান অতিথি হিসেবে নূরানী ত্বকরীর পেশ করেছেন চট্টগ্রাম থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আগত মেহমান, রাউজান উরকিরচর গাউছিয়া মোহাম্মদীয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও আল্লামা আব্দুল মালেক শাহ (রহঃ) কমপ্লেক্স ট্রাস্ট’র সম্মানিত চেয়ারম্যান আলা হযরত-এর রুহানি সন্তান, অধ্যক্ষ আল্লামা হাসান রেজা আল-কাদেরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন সফর সঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আল্লামা আব্দুল মালেক শাহ (রহঃ) কমপ্লেক্স ট্রাস্ট’র সেক্রেটারি শাহজাদা মহিউদ্দীন মোহাম্মদ তৌসিফ রেজা আল কাদেরী,এতে আরো বক্তব্য রাখেন ইঞ্জিনিয়ার গোলামোর রহমান,মাওলানা আব্দুস ছামাদ,মুহাম্মদ ওসমান, মুহাম্মদ আব্দুস সবুর,,মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, মুহাম্মদ কাজী মাসুদ,মুহাম্মদ শফিউল ইসলাম,মুহাম্মদ নাঈম উদ্দীন,মুহাম্মদ আবু বক্কর,মুহাম্মদ ওমর ফারুক, প্রমুখ,এতে বক্তারা আঞ্জুমানে খুদ্দামুন নাস বাংলাদেশের উদ্যোগে দেশে এবং প্রবাসে সংগঠনিক ভিবিন্ন বৃহত্তর মানবিক কর্ম ও কাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনায় তুলে ধরেন,এবং রমদ্বানের গুরুত্ব ও শোহাদায়ে বদর দিবসের যে শিক্ষা তার উপর গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতার মাধ্যমে মুসলিম মিল্লাতের কি করনীয় শ্রোতাদের মাঝে আলোকপাত করেন, সর্বশেষ দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে সমাপ্তি হয়।

গাউসিয়া হক কমিটি সূর্যগিরি আশ্রম শাখার উদ্যোগে ঈদ সামগ্রী বিতরণ

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

নাজিরহাট প্রতিনিধি: মাইজভাণ্ডারী গাউসিয়া হক কমিটি বাংলাদেশ সূর্যগিরি আশ্রমের উদ্যোগে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঈদ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। গতকাল বিকালে উপজেলা সদরে সূর্যগিরি আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য বলাইয়ের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ফটিকছড়ি থেকে বেসরকারি ভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আলহাজ্ব সরোয়ার আলমগীর।

বিশেষ অতিথি ছিলেন ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম, সাবেক চেয়ারম্যান মোবারক হোসেন কাঞ্চন, মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুল আলম চৌধুরী, নাজিম উদ্দিন শাহীন, জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, মো. জালাল উদ্দিন চৌধুরী, মোজাহারুল ইকবাল লাভলু, এন এম রহমত উল্লাহ, সংগঠনের সভাপতি ধীমান দাশ, সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণ বৈদ্য, উপদেষ্টা ড. তরুণ কুমার আচার্য্য, কেন্দ্রীয় পর্ষদের সভাপতি বিপ্লব চৌধুরী কাঞ্চন, সাধারণ সম্পাদক টিটু চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুবেল শীল, আহমেদ এরশাদ খোকন, সাংবাদিক জিপন উদ্দিন, শিমুল পাল, বিজন শীল, ঝুমুর সর্দ্দার, মিন্টু দাশ গুপ্ত, সুল্বভ দত্ত, কৃপাঞ্জন আচার্য, সোনা রাম আচার্য, উপদেষ্টা নারায়ন আচার্য। সংগঠনের দুই সদস্যকে নগদ অর্থ প্রদান করা হয়।

আলোচিত খবর

আরও পড়ুন

সর্বশেষ