চট্টগ্রাম থেকে ভারতে নারী পাচারের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত চক্রের সদস্য মো. তারেকক (৩৪)

সীমান্ত এলাকার ‘দালালে’র মাধ্যমে অনুপ্রবেশ ঘটায় চট্টগ্রামে ভারতে নারী পাচারকারী চক্র সক্রিয়

চট্টগ্রাম ব্যুরো:

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

: চট্টগ্রাম থেকে ভারতে নারী পাচারকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে ভারতের ঝাড়খণ্ডের একটি অপরাধী চক্রের যোগাযোগ থাকায় অতি সহজে নারীদের পাচার করে আসছে। বিশেষ করে পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকদের ভারতে ভালো বেতনে চাকুরীর প্রলোভন দেখিয়ে সীমান্ত এলাকার ‘দালালে’র মাধ্যমে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তবে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি থানা পুলিশ এ চক্রের এক সদস্যকে গ্রেফতারের পাশাপাশি আরো কয়েকজনের তথ্য পেয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, চাকরি দেওয়ার কথা বলে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল দুই তরুণীকে। এক তরুণী কৌশলে পালিয়ে দেশে চলে আসেন। তবে আরেকজন এখনো ‘নিখোঁজ’ আছেন। দেশে ফেরা তরুণীর অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়ে পাচারকারী চক্রটির সন্ধান পাওয়া গেছে। গত ২৩ জুন গভীর রাতে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার চন্দ্রনগর আবাসিক এলাকায় একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে ওই চক্রের সদস্য মো. তারেককে (৩৪)। তার বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া ইউনিয়নে। নগরীর চন্দ্রনগর আবাসিক এলাকায় দিদার ভবনে থাকেন তিনি।
বায়েজিদ বোস্তামি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সঞ্জয় কুমার সিনহা জানান, তারেক ছাড়াও চক্রের আরও তিন সদস্যের নাম-পরিচয় তারা জানতে পেরেছেন। তারা হলেন— ঝুমু, পারভিন আক্তার ও আনিছুর রহমান। এর মধ্যে ঝুমু সম্পর্কে তারেকের স্ত্রী।
পুলিশের তথ্য বলছে, এই চক্রের সঙ্গে ভারতের ঝাড়খণ্ডের একটি অপরাধী চক্রের যোগাযোগ আছে। এরা পরস্পরের যোগসাজশে সীমান্ত এলাকার ‘দালালে’র মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ভারতে বিভিন্ন বয়সী নারীদের অনুপ্রবেশ ঘটায়। এরপর ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন হোটেলে তাদের আটকে রেখে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করে। তারেকসহ চক্রের সদস্যদের বৈধ-অবৈধপথে নিয়মিত ভারতে যাতায়াতের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ওসি।
পুলিশ আরো জানায়, পাচারের শিকার তরুণী পূর্ব ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাজধানী রাঁচি থেকে কোলকাতা হয়ে গত ৬ জুন দেশে পালিয়ে আসেন। এরপর ২৩ জুন তিনি চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও তিন-চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, তরুণীর বাড়ি রংপুর জেলায়। পোশাক কারখানায় চাকরির সুবাদে তিনি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমানবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। পাশের মাইজপাড়া এলাকায় রয়েল অ্যাপারেলস নামে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। গত এপ্রিলে তিনি ও তার বান্ধবী চাকরি ছেড়ে দেন।
২০২১ সালে তারা হাটহাজারীর চৌধুরীহাটে গার্মেন্টস পার্ক নামে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। একই কারখানায় পারভিন আক্তার নামে এক নারীও কর্মরত ছিলেন। রয়েল অ্যাপারেলস থেকে চাকরি ছাড়ার পর নতুন কাজের খোঁজে পারভিন আক্তারের কাছে গিয়ে মূলত দুই তরুণী পাচারকারী চক্রের খপ্পড়ে পড়েন।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, গত ২০ মে পারভিন আক্তারের সঙ্গে নগরীর অক্সিজেন মোড়ে তারা দেখা করেন। পারভিন তাদের ভারতের রাঁচিতে পার্লারে ভালো বেতনে চাকরির প্রস্তাব দেন। রাজি হলে পরদিন সকালে তাদের তারেকের বাসায় নিয়ে যান। তারেকের স্ত্রী ঝুমু তাদের জানান, ভারতে পার্লারে চাকরি করলে তারা মাসে ৪০ হাজার টাকা বেতন পাবেন, তবে ভারতের যাওয়ার বিষয়টি গোপন রাখতে হবে। ২৯ মে সন্ধ্যায় দুই বান্ধবীকে নিয়ে তারেক, ঝুমু ও পারভিন নগরীর দামপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে করে যশোরের পথে রওয়ানা দেন। পরদিন ভোরে তাদের যশোরে আনিছুর রহমানের বাসায় নেওয়া হয়। সেদিন রাতে তারা সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে একটি কলাবাগানের ভেতরে অবস্থান নেন। সেখান থেকে কখনো ভ্যানে, আবার কখনো পায়ে হেঁটে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া পাড়ি দিয়ে ৩১ মে ভোরে ভারতে পৌঁছান। তাদের সঙ্গে ছিলেন ঝুমু ও পারভিন এবং ভারতের সীমান্ত এলাকার কয়েকজন দালাল।
ভারতের ভেতরে সীমান্তবর্তী এলাকায় এক দালালের বাসায় তারা আশ্রয় নেন। ৩১ মে ভোরে পারভিন এক তরুণীকে নিয়ে ঝাড়খণ্ডের উদ্দেশে চলে যান। আরেক তরুণী, যিনি মামলার বাদী, তিনি ওই দালালের আশ্রয়ে তিন দিন ছিলেন। ২ জুন রাতে ঝুমু তাকে নিয়ে ঝাড়খণ্ডে পৌঁছান। রাঁচিতে একই হোটেল দুই বান্ধবীকে রাখা হয়। শুরুতেই তারা জানতে পারেন, ওই হোটেলে পতিতাবৃত্তি হয়। তাদেরও মূলত এ কাজের জন্য সেখানে নেওয়া হয়েছে। দুজন কান্নাকাটি করতে থাকলে তাদের মারধর করা হয় এবং একপর্যায়ে আলাদা করে ফেলা হয়।
৩ জুন বিকেলে হোটেল থেকে পালিয়ে এক তরুণী রাঁচি থেকে ট্রেনে করে কোলকাতার হাওড়া স্টেশনে পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি মোবাইলে তার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। হাওড়া স্টেশনে বিভিন্নজনের সহায়তায় ট্রেনে করে যশোর সীমান্তে যান। এরপর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ৬ জুন ভোরে তিনি দেশে পৌঁছান।
ওসি সঞ্জয় কুমার সিনহা বলেন, দেশে ফিরে আসা তরুণী জানিয়েছেন, তাদের পাচারের পর রাঁচিতে মনীষা রায় নামে এক নারীর কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। ওই নারী তাদের হোটেলে রেখেছিল। খুব সম্ভবত পুলিশের অভিযানের মুখে অথবা বিপদের আঁচ করে মনীষাই আবার এক তরুণীকে কোলকাতার হাওড়া স্টেশনে পাঠিয়ে দেন। তার লোকজনই যশোর সীমান্তে এনে তাকে আবার বাংলাদেশে ফেরত আসতে সহায়তা করেন। আরেক তরুণীর বিষয়টি আমরা এখনো স্পষ্ট না।
মামলার বাদী জানিয়েছেন, ওই তরুণীকে আলাদা হোটেলে নেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে উনি পালিয়ে গেছেন। আদৌ এর সত্যতা কতটুকু, জানি না। তিনি কি ঝাড়খণ্ডের পুলিশ হেফাজতে আছেন, নাকি এখনো পাচারকারীর হাতে জিম্মি রয়েছেন, নাকি দেশে ফিরেছেন আমরা খতিয়ে দেখছি।
ওসি আরও বলেন, গ্রেফতার তারেকের কাছে তথ্য থাকতে পারে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে এ বিষয়ে কিছুই জানে না বলে জানিয়েছে। তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। রিমান্ডের আবেদন মঞ্জুর হলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে তিনি জানান।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র ও গুলি রাখার মামলায় যুবককে কারাদণ্ড

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র ও গুলি রাখার মামলায় মো. হাবিবুল্লাহ ওরফে হাবিব (৩৭) নামের এক যুবককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন একটি আদালত। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-৮ এর বিচারক আফরোজা জেসমিন কলি এ রায় দেন।একই মামলায় তাকে আরও সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।দণ্ডপ্রাপ্ত হাবিবুল্লাহ পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থানার ধানীসাফা ইউনিয়নের সাফা বাজার মাওলানা তাজাম্বার আলী হাওলাদার বাড়ির চুন্নু মিয়ার ছেলে।রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানামূলে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ছয়জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত প্রমাণে অবৈধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি রাখার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন। এছাড়া অন্য একটি ধারায় সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১৯ জুন নগরের চান্দগাঁও থানার পশ্চিম মোহরা শিল্পনগরী এলাকার মেহরাজ খান চৌধুরী ঘাটসংলগ্ন ইউনিক বোর্ড মিলের (হাবিব কার্টুন ফ্যাক্টরি) ভেতরে অভিযান চালায় পুলিশ। এসময় হাবিবুল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়।অভিযানে তার কাছ থেকে দুটি দেশীয় তৈরি এলজি ও তিন রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। পরে এ ঘটনায় চান্দগাঁও থানায় অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়। মামলার তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। পরে ২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মামলাটির রায় ঘোষণা করেন আদালত।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন হিসেবে ফাহিম আহমেদ নামে আরও এক তরুণকে আটক

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে সন্দেহভাজন হিসেবে ফাহিম আহমেদ নামে আরও এক তরুণকে আটক করেছে পুলিশ। এর আগে, তুহিন ও আনাস নামের দুই তরুণকে আটক করা হয়।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস।

সহকারী পুলিশ সুপার জানান, অপ্রতিমের নিখোঁজের পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে অপ্রতীমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা যায়। পরে তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আনাস ও ফাহিম আহমেদকে আটক করা হয়েছে। দুইনজনকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এদিকে ফাহিম আহমেদের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক। তিনি বলেন, তুহিন ও আনাসকে আটকের পর ফাহিমকে আটক করা হয়।

আলোচিত খবর

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায়

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছেছে । আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইড মিটিং এ দুই দেশের মধ্যে এ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ বিষয়ে বক্তব্য স্পষ্ট, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ