আজঃ শনিবার ২০ জুন, ২০২৬

চট্টগ্রামে থানা হাজতে আসামির আত্যাহত্যায় স্বজনদের আহাজারি

চট্টগ্রামে চান্দগাঁও থানার হাজতে মামলার আসামির অস্বাভাবিক মৃত্যু

চট্টগ্রাম ব্যুরো:

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রামে থানা হাজতে সাত মামলার এক আসামির অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তার নাম মো. জুয়েল (২২)। গতকাল বুধবার ভোর ৬টা ২৫ মিনিটের দিকে নগরের চান্দগাঁও থানার হাজতখানায় এ ঘটনা ঘটে। ডাকাতি ও ছিনতায় মামলায় গ্রেফতারের ৬ ঘণ্টার মাথায় এ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। জুয়েল চান্দগাঁও খেজুরতলা এলাকার মৃত আব্দুল মালেক প্রকাশ আব্দুল মাবুদের ছেলে।
পুলিশ জানায়, আসামি জুয়েলকে রাত ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে নগরের কোতোয়ালী থানার পাথরঘাটা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর চান্দগাঁও থানার হাজতে রাখা হলে সেখানেই তিনি ‘আত্মহত্যা’ করেছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ।
জানা গেছে, কোতোয়ালী থানায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়ের হওয়া একটি অস্ত্র মামলায় আদালতের পরোয়ানামূলে চান্দগাঁও থানা পুলিশ জুয়েলকে বাসা থেকে গ্রেফতার করে। নিয়ম অনুযায়ী, রাতে তাকে থানা হাজতে রাখা হয়। গতকাল বুধবার দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করার কথা ছিল।
থানায় গিয়ে দেখা গেছে, হাজতখানার ভেতরে দেয়ালের সঙ্গে লাগোয়া একপাশে আধাদেয়াল ঘেরা একটি শৌচাগার আছে। এর ওপরে আছে ভেন্টিলেটর। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, পরণের শার্ট খুলে শৌচাগারের আধাদেয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে প্রথমে জুয়েল শার্টের এক হাত ভেন্টিলেটরের সঙ্গে বাঁধেন। নিচে ঝুলে থাকা হাতটি গলায় পেঁচিয়ে তিনি ঝুলে পড়েন। মিনিটখানেকের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে যান।

চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল কবীর জানান, রাতভর হাজতে জুয়েল একাই ছিলেন। রাত আড়াইটার দিকে ডিউটি অফিসার গিয়ে হাজতে তার সঙ্গে কথা বলেন। ভোর ৫টা ২৫ মিনিট থেকে ৬টা পর্যন্ত ডিউটি অফিসার ও হাজতরক্ষীর সঙ্গে জুয়েলের হাজতের সামনে দফায় দফায় কথা হয়। ভোর ৬টা ২৪ মিনিট থেকে ৬টা ২৭ মিনিটের মধ্যে তাকে ভেন্টিলেটরের সঙ্গে শার্ট বেঁধে ঝুলে পড়তে দেখা যায় সিসি ক্যামেরায়। ‘ভোরে ডিউটি অফিসার ও সেন্ট্রি যখন জুয়েলের কাছে যায়, তখন সে জানায়, সকালে নাস্তা খাওয়ার পর সে একটি ওষুধ খায়, কিন্তু ওষুধের নাম সে জানে না। এজন্য তাকে তার ভগ্নিপতি সাগরের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে দেয়ার জন্য বলেন। ডিউটি অফিসার তাকে মোবাইলে কথা বলে দেন। ছয়টার পর হাজতখানার সামনে থেকে ডিউটি অফিসার ও সেন্ট্রি চলে যান। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর সেন্ট্রি পরিবর্তন করা হয়। সকাল সাতটায় নতুন সেন্ট্রি দায়িত্ব গ্রহণ করে পাঁচ মিনিট পর গিয়ে দেখেন, জুয়েল ঝুলে আছে। তখনও রাতের ডিউটি অফিসারই দায়িত্বরত ছিলেন।
জুয়েলের বোন সালমা বেগম বলেন, সকালে পুলিশের ফোন থেকে কল করে জুয়েল প্রথমে আমার বড় বোনের সঙ্গে কথা বলে। এরপর আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলে তার জন্য ওষুধ নেয়ার কথা জানায়। আমি ও আমার স্বামী সকাল সাতটার একটু পরে ওষুধ নিয়ে থানায় আসি। আমাদের নয়টা পর্যন্ত এখানে (ডিউটি অফিসারের কক্ষ) বসিয়ে রাখে পুলিশ। দুই ঘণ্টা পর পুলিশ আমাদের একটি ভিডিও দেখায়। সেখানে দেখি, আমার ভাই তার শার্ট খুলে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে।এদিকে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট থানায় গিয়ে লাশের সুরতহাল সম্পন্ন করে। পুলিশের পক্ষ থেকেও আলাদাভাবে সুরতহাল করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে শুধুমাত্র গলায় ফাঁসজনিত জখমের চিহ্ন ছাড়া অস্বাভাবিক আর কিছু পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (উত্তর) মো. জাহাঙ্গীর।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনবছর আগে জুয়েল মাদক সেবন, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িত ছিলেন। সাত-আটমাস আগ থেকে অপরাধ কর্মকাণ্ড ছেলে প্রথমে টানা রিকশা চালাতে শুরু করে। এরপর সম্প্রতি তার ভগ্নিপতি রুবেলসহ মিলে ব্যাটারি চালিত রিকশা (ইজিবাইক) চালাতে শুরু করেন। নগরীর কোরবানিগঞ্জ এলাকায় একটি গ্যারেজ থেকে ইজিবাইক ভাড়া নিয়ে চালাতেন।
গত ২৫ জুন রাত সাড়ে এগারোটার দিতে যাত্রী নিয়ে যান নগরীর ফিরিঙ্গিবাজার লইট্যাঘাট এলাকায়। সেখানে জুয়েলকে বেধড়ক পিটিয়ে রিকশা ছিনিয়ে নেয় একদল দুর্ব্ত্তৃ। এ ঘটনা গ্যারেজ মালিককে জানানোর পর তিনি কোনোভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্বাস করেননি। তিনি এক লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
সালমা বেগম আরো বলেন, এক লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা মালিককে দিতে হবে শুনে জুয়েল পাগলের মতো হয়ে যায়। এত টাকা কোত্থেকে দেবে, বারবার শুধু একথা বলে টেনশন করতো। আমি, আমার বোন ও জুয়েলের স্ত্রী মিলে ত্রিশ হাজার টাকা জোগাড় করি। সেটা নিতে প্রথমে রাজি হয়নি গ্যারেজ মালিক। জুয়েলকে ডেকে নিয়ে গ্যারেজে আটকে মারধর করে। পরে সেই টাকা রেখে প্রতিদিন দুইশ টাকা করে কিস্তি দাবি করে। ‘বাসায় ফিরে জুয়েল প্রথমে একবার নিজের রুমে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আমার মা দেখে তাকে কোনোমতে রক্ষা করে। এরপর বাসার বাইরে টয়লেটে ঢুকে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। তখন আমার বোন এবং অন্যান্য ভাড়াটিয়ারা দেখে তাকে বের করে আনে।
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে ছিনতাইকারীদের এবং পরবর্তীতে গ্যারেজ মালিকের মারধরের কারণে জুয়েল অসুস্থ হয়ে পড়েন। ব্যাথায় কাতর জুয়েল কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন ওষুধ সেবন করে আসছিলেন।
এদিকে বেলা বারোটার দিকে থানার সামনে যান জুয়েলের মা, স্ত্রীসহ আরও কয়েকজন স্বজন। তারা থানার সামনে আহাজারি করছিলেন। পুলিশকে উদ্দেশ্য করে তার মা মিনারা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে সুস্থ অবস্থায় এনেছেন আপনারা। সে হাসিমুখে আপনাদের সাথে এসেছে। সে কেন মারা যাবে ? তাকে আমার কাছে ফেরত দেন। আমি আমার ছেলেকে জীবিত ফেরত চাই। তাদের সামনে দিয়ে লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নেয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। অ্যাম্বুলেন্স যাত্রার সময় আহাজারিরত স্বজনরা সামনে শুয়ে সেটা কিছুক্ষণ আটকে রাখেন। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে লাশ মর্গে নিয়ে যায়।এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে চান্দগাঁও থানার ওসি জাহিদুল কবীর জানিয়েছেন।
চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল কবির বলেন, তার বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় ডাকাতির প্রস্তুতি এবং অস্ত্র আইনে মোট ৭টি মামলা রয়েছে। এ ঘটনায় আমরা জিডি করেছি। ম্যাজিস্ট্রেট এসে সুরতহাল করে লাশের পোস্টমর্টেমের জন্য মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

চট্টগ্রামে ৮০০ কেজি চিনিসহ ২ চোরাকারবারি আটক

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম মহানগরে ৮০০ কেজি চোরাই চিনিসহ দুই চোরাকারবারিকে আটক করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে পতেঙ্গা থানার চরপাড়া ঘাট সংলগ্ন মেরিন ড্রাইভ সড়কে কোস্ট গার্ড আউটপোস্ট পতেঙ্গার সদস্যরা অভিযান পরিচালনা করে এদের আটক করে।

কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সুমন আল মুকিত জানান, একটি চক্র বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে অবৈধভাবে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে খালাস করা বিপুল পরিমাণ চিনি বাজারজাত করার উদ্দেশ্যে পরিবহন করবে গোপনে এমন তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়।অভিযান চলাকালে একটি সন্দেহভাজন ট্রাকে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের ৮০০ কেজি চিনি উদ্ধার করা হয়।

এ সময় চোরাচালানে ব্যবহৃত ট্রাকসহ দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়।লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সুমন আল মুকিত আরো বলেন, জব্দ করা চিনি, ট্রাক এবং আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

স্ত্রীর মরদেহ রেখে পালালো স্বামী

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খাদিজা আক্তার কাশফি নামের এক গৃহবধূর মরদেহ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রেখে পালিয়ে গেছেন স্বামী মো. মারুফ। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাতে এ ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, কাশফিকে মৃত অবস্থায় আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসেন স্বামী মারুফ।

কর্তব্যরত চিকিৎসক কাশফিকে মৃত ঘোষণার পরপরই মরদেহ জরুরি বিভাগে রেখে কৌশলে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান তিনি। নিহতের গলায় মোটা দাগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. উপমা চৌধুরী। পরে কাশফির মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন স্বজনরা। পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ হাসপাতাল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চমেক হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ঘটনার পর থেকে স্বামী পলাতক রয়েছেন।

আলোচিত খবর

আলোচিত রামিসা ধর্ষণ-হত্যা: সোহেল-স্বপ্না দম্পতির মৃত্যুদণ্ড

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সি রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার দম্পতির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি সোহেলের পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্নার দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। আজ রোববার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে এ রায় ঘোষণা করেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন।এ সময় কাঠগড়ায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ছিলেন। তাদের সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায় ঘিরে সকাল থেকে আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।


রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা।এর মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে ধর্ষণ-হত্যা মামলার বিচার কাজ শেষ হওয়ার নজির তৈরি হলো।বিচার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে এ ধরনের মামলার বিচার কাজ এতো কম সময়ে সম্পন্ন হয়নি। আলোচিত মামলাটি বিচার শুরু থেকে রায়ের পর্যায়ে এসেছে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে।

আত্মপক্ষ শুনানি শেষে ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ঠিক করা হয়। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে রাষ্ট্রপক্ষে কৌঁসুলি আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড চান। আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ দুই আসামির পক্ষে যুক্তিতর্কে অংশ নেন। তিনি আসামিদের লঘুদণ্ড প্রার্থনা করেন।

যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে সোহেল রানার দেওয়া জবানবন্দি পড়ে শোনান রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি দুলু। সেখানে উঠে আসে, সোহেলকে পালানোর সুযোগ করে দিয়েই সেদিন রুমের দরজা খোলেন স্বপ্না।গত ২০ মে সোহেল রানা দোষ স্বীকার করে ঢাকার মহানগর হাকিম আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন।রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় বিচারক রায় ঘোষণা করলেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ