আজঃ মঙ্গলবার ১৭ মার্চ, ২০২৬

চট্টগ্রামে থানা হাজতে আসামির আত্যাহত্যায় স্বজনদের আহাজারি

চট্টগ্রামে চান্দগাঁও থানার হাজতে মামলার আসামির অস্বাভাবিক মৃত্যু

চট্টগ্রাম ব্যুরো:

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রামে থানা হাজতে সাত মামলার এক আসামির অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তার নাম মো. জুয়েল (২২)। গতকাল বুধবার ভোর ৬টা ২৫ মিনিটের দিকে নগরের চান্দগাঁও থানার হাজতখানায় এ ঘটনা ঘটে। ডাকাতি ও ছিনতায় মামলায় গ্রেফতারের ৬ ঘণ্টার মাথায় এ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। জুয়েল চান্দগাঁও খেজুরতলা এলাকার মৃত আব্দুল মালেক প্রকাশ আব্দুল মাবুদের ছেলে।
পুলিশ জানায়, আসামি জুয়েলকে রাত ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে নগরের কোতোয়ালী থানার পাথরঘাটা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর চান্দগাঁও থানার হাজতে রাখা হলে সেখানেই তিনি ‘আত্মহত্যা’ করেছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ।
জানা গেছে, কোতোয়ালী থানায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়ের হওয়া একটি অস্ত্র মামলায় আদালতের পরোয়ানামূলে চান্দগাঁও থানা পুলিশ জুয়েলকে বাসা থেকে গ্রেফতার করে। নিয়ম অনুযায়ী, রাতে তাকে থানা হাজতে রাখা হয়। গতকাল বুধবার দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করার কথা ছিল।
থানায় গিয়ে দেখা গেছে, হাজতখানার ভেতরে দেয়ালের সঙ্গে লাগোয়া একপাশে আধাদেয়াল ঘেরা একটি শৌচাগার আছে। এর ওপরে আছে ভেন্টিলেটর। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, পরণের শার্ট খুলে শৌচাগারের আধাদেয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে প্রথমে জুয়েল শার্টের এক হাত ভেন্টিলেটরের সঙ্গে বাঁধেন। নিচে ঝুলে থাকা হাতটি গলায় পেঁচিয়ে তিনি ঝুলে পড়েন। মিনিটখানেকের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে যান।

চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল কবীর জানান, রাতভর হাজতে জুয়েল একাই ছিলেন। রাত আড়াইটার দিকে ডিউটি অফিসার গিয়ে হাজতে তার সঙ্গে কথা বলেন। ভোর ৫টা ২৫ মিনিট থেকে ৬টা পর্যন্ত ডিউটি অফিসার ও হাজতরক্ষীর সঙ্গে জুয়েলের হাজতের সামনে দফায় দফায় কথা হয়। ভোর ৬টা ২৪ মিনিট থেকে ৬টা ২৭ মিনিটের মধ্যে তাকে ভেন্টিলেটরের সঙ্গে শার্ট বেঁধে ঝুলে পড়তে দেখা যায় সিসি ক্যামেরায়। ‘ভোরে ডিউটি অফিসার ও সেন্ট্রি যখন জুয়েলের কাছে যায়, তখন সে জানায়, সকালে নাস্তা খাওয়ার পর সে একটি ওষুধ খায়, কিন্তু ওষুধের নাম সে জানে না। এজন্য তাকে তার ভগ্নিপতি সাগরের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে দেয়ার জন্য বলেন। ডিউটি অফিসার তাকে মোবাইলে কথা বলে দেন। ছয়টার পর হাজতখানার সামনে থেকে ডিউটি অফিসার ও সেন্ট্রি চলে যান। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর সেন্ট্রি পরিবর্তন করা হয়। সকাল সাতটায় নতুন সেন্ট্রি দায়িত্ব গ্রহণ করে পাঁচ মিনিট পর গিয়ে দেখেন, জুয়েল ঝুলে আছে। তখনও রাতের ডিউটি অফিসারই দায়িত্বরত ছিলেন।
জুয়েলের বোন সালমা বেগম বলেন, সকালে পুলিশের ফোন থেকে কল করে জুয়েল প্রথমে আমার বড় বোনের সঙ্গে কথা বলে। এরপর আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলে তার জন্য ওষুধ নেয়ার কথা জানায়। আমি ও আমার স্বামী সকাল সাতটার একটু পরে ওষুধ নিয়ে থানায় আসি। আমাদের নয়টা পর্যন্ত এখানে (ডিউটি অফিসারের কক্ষ) বসিয়ে রাখে পুলিশ। দুই ঘণ্টা পর পুলিশ আমাদের একটি ভিডিও দেখায়। সেখানে দেখি, আমার ভাই তার শার্ট খুলে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে।এদিকে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট থানায় গিয়ে লাশের সুরতহাল সম্পন্ন করে। পুলিশের পক্ষ থেকেও আলাদাভাবে সুরতহাল করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে শুধুমাত্র গলায় ফাঁসজনিত জখমের চিহ্ন ছাড়া অস্বাভাবিক আর কিছু পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (উত্তর) মো. জাহাঙ্গীর।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনবছর আগে জুয়েল মাদক সেবন, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িত ছিলেন। সাত-আটমাস আগ থেকে অপরাধ কর্মকাণ্ড ছেলে প্রথমে টানা রিকশা চালাতে শুরু করে। এরপর সম্প্রতি তার ভগ্নিপতি রুবেলসহ মিলে ব্যাটারি চালিত রিকশা (ইজিবাইক) চালাতে শুরু করেন। নগরীর কোরবানিগঞ্জ এলাকায় একটি গ্যারেজ থেকে ইজিবাইক ভাড়া নিয়ে চালাতেন।
গত ২৫ জুন রাত সাড়ে এগারোটার দিতে যাত্রী নিয়ে যান নগরীর ফিরিঙ্গিবাজার লইট্যাঘাট এলাকায়। সেখানে জুয়েলকে বেধড়ক পিটিয়ে রিকশা ছিনিয়ে নেয় একদল দুর্ব্ত্তৃ। এ ঘটনা গ্যারেজ মালিককে জানানোর পর তিনি কোনোভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্বাস করেননি। তিনি এক লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
সালমা বেগম আরো বলেন, এক লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা মালিককে দিতে হবে শুনে জুয়েল পাগলের মতো হয়ে যায়। এত টাকা কোত্থেকে দেবে, বারবার শুধু একথা বলে টেনশন করতো। আমি, আমার বোন ও জুয়েলের স্ত্রী মিলে ত্রিশ হাজার টাকা জোগাড় করি। সেটা নিতে প্রথমে রাজি হয়নি গ্যারেজ মালিক। জুয়েলকে ডেকে নিয়ে গ্যারেজে আটকে মারধর করে। পরে সেই টাকা রেখে প্রতিদিন দুইশ টাকা করে কিস্তি দাবি করে। ‘বাসায় ফিরে জুয়েল প্রথমে একবার নিজের রুমে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আমার মা দেখে তাকে কোনোমতে রক্ষা করে। এরপর বাসার বাইরে টয়লেটে ঢুকে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। তখন আমার বোন এবং অন্যান্য ভাড়াটিয়ারা দেখে তাকে বের করে আনে।
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে ছিনতাইকারীদের এবং পরবর্তীতে গ্যারেজ মালিকের মারধরের কারণে জুয়েল অসুস্থ হয়ে পড়েন। ব্যাথায় কাতর জুয়েল কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন ওষুধ সেবন করে আসছিলেন।
এদিকে বেলা বারোটার দিকে থানার সামনে যান জুয়েলের মা, স্ত্রীসহ আরও কয়েকজন স্বজন। তারা থানার সামনে আহাজারি করছিলেন। পুলিশকে উদ্দেশ্য করে তার মা মিনারা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে সুস্থ অবস্থায় এনেছেন আপনারা। সে হাসিমুখে আপনাদের সাথে এসেছে। সে কেন মারা যাবে ? তাকে আমার কাছে ফেরত দেন। আমি আমার ছেলেকে জীবিত ফেরত চাই। তাদের সামনে দিয়ে লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নেয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। অ্যাম্বুলেন্স যাত্রার সময় আহাজারিরত স্বজনরা সামনে শুয়ে সেটা কিছুক্ষণ আটকে রাখেন। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে লাশ মর্গে নিয়ে যায়।এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে চান্দগাঁও থানার ওসি জাহিদুল কবীর জানিয়েছেন।
চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল কবির বলেন, তার বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় ডাকাতির প্রস্তুতি এবং অস্ত্র আইনে মোট ৭টি মামলা রয়েছে। এ ঘটনায় আমরা জিডি করেছি। ম্যাজিস্ট্রেট এসে সুরতহাল করে লাশের পোস্টমর্টেমের জন্য মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

চট্টগ্রামে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন না করায় জরিমানা গুনল ৪ বাস কাউন্টার

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম মহানগরের বাস কাউন্টারগুলোতে অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে এ অভিযান চালানো হয়। সোমবার মহানগরীর গরিবুল্লাশাহ মাজার এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করেন তীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক মো. ফয়েজ উল্ল্যাহ। অভিযানে আরও উপস্থিত ছিলেন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আনিছুর রহমান, মাহমুদা আক্তার ও রানা দেবনাথ।

মো. ফয়েজ উল্ল্যাহ বলেন, গরীবুল্লাহশাহ মাজার এলাকায় বাস কাউন্টারগুলোতে অভিযান চালিয়েছি। এসময় ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন না করায় সেন্টমার্টিন পরিবহনেকে ৫ হাজার টাকা, রিলাক্স পরিবহনকে ৩ হাজার, দেশ ট্রাভেলস ৩ হাজার ও রয়েল মত্রি সার্ভিসকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ঈদে যাতে কেউ অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে না পারে সে লক্ষ্যে আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।

সিএমপির নতুন কমিশনার মো. শওকত আলী

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ডিআইজি হাসান মো. শওকত আলী।

সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ জারি করা হয়।প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিআইজি) হাসান মো. শওকত আলীকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের নতুন কমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজকে অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) বদলি করা হয়েছে।বিষয়টি নিশ্চিত করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী কমিশনার (সদর), অতিরিক্ত দায়িত্বে সহকারী পুলিশ কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ।

এছাড়া বিশেষ শাখা (এসবি) ঢাকার ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামানকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) হিসেবে বদলি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আহসান হাবীব পলাশকে সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে মহাপরিচালক (অতিরিক্ত আইজিপি) হিসেবে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (র‌্যাব) পদায়ন করা হয়েছে।

আলোচিত খবর

আরও পড়ুন

সর্বশেষ