বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত

নেত্রকোনায়, সুদের টাকায় চলছে চিকিৎসা, খবর নেয়নি কেউ

মোঃ নুর উদ্দিন মন্ডল দুলাল,

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

নেত্রকোনায় মদন উপজেলায় সুদের টাকায় চলছে আকাশের চিকিৎসা, খবর নেয়নি কেউ
পরিবারের হাল ধরতে কিশোর বয়স থেকেই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি মিষ্টির দোকানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ নেন মো. আকাশ মিয়া।
গত ২০ জুলাই বিকালে কাজ ফেলে সিদ্ধিরগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগদেন তিনি। আন্দোলন দমাতে পুলিশ বেপরোয়াভাবে টিয়ারসেল-সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি শুরু করলে অগণিত আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয় তার চোখের সামনেই। হতাহত হয় অনেকে।
হতাহতদের রিকশা-ভ্যানে করে হাসপাতালে পাঠানোর পাশাপাশি আন্দোলন চলমান রাখেন আকাশসহ অন্যান্যরা। পুলিশ তখন সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ শুরু করে। এ পর্যায়ে আর টিকতে না পেরে দৌড়ে নিজের কর্মস্থল মিষ্টির দোকানে ঢুকে শার্টার লাগিয়ে দেন। তাতেও রক্ষা হয়নি। শার্টার ভেঙে দোকানে ঢুকে আকাশের বুকে শটগান ঠেকিয়ে গুলি চালাতে উদ্যত হয় পুলিশ।

তবে পরিস্থিতি বুঝে আকাশ শটগানের নল নিচের দিকে টেলে দেয়। এতে তার হাটুর উপরে লাগে গুলিটি। মুহূর্তে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আকাশ। পুলিশ চলে গেলে আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে কাছের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে পঙ্গু হাসপাতালে রেফার্ড করা হলেও গ্রেফতার হয়রানির ভয়ে সেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

লুকিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে দুইদিন চিকিৎসার পর ২৩ জুলাই রাতের আঁধারে একটি গাড়িতে করে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ততদিনে পায়ের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আকাশের বাঁ পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে হয়।

এরমধ্যে খরচ হয়ে গেছে ধার-দেনা আর সুদে আনা প্রায় ৪ লাখ টাকা। এক পা হারিয়ে এখন পঙ্গু ১৯ বছরের টগবগে যুবক আকাশ। যে স্বৈরাচার হটাতে আন্দোলনে গিয়ে পা হারিয়েছেন আকাশ, সেই স্বৈরাচারেরে পতন হয়েছে অনেক গত ৫ আগস্ট। তবে এতদিনেও (১ অক্টোবর পর্যন্ত) পঙ্গু আকাশের খবর নেয়নি কেউ।

একদিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা, অন্যদিকে ঋণের বোঝা সব মিলিয়ে দিশেহারা আকাশের পরিবার। মো. আকাশ মিয়া (১৯) নেত্রকোনার মদন উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের বিয়াশি গ্রামের মো. দুলাল মিয়ার ছেলে।

চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার বড় আকাশ। বাবা দুলাল মিয়া দিনমজুর। অভাবের সংসারে জেএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। দুই বছর আগে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি মিষ্টির দোকানে সেলসম্যানের কাজ নেন আকাশ। এতে সংসারে অভাব ঘুছে যাচ্ছিল। এরমধ্যে পরিচিত একজনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ারও কথা হয়েছিল তার। করেছিল পাসপোর্ট। কিন্তু পুলিশের গুলিতে সব স্বপ্ন শেষ তার।

যে দুপায়ের ওপর ভর করে এত বড় সংসারের বোঝা কাঁধে নিয়েছিলেন আকাশ। পা হারিয়ে তিনি নিজেই পরিবারের বোঝা হয়েছেন। দুলাল মিয়ার বাড়ির জায়গা আর তাতে একটা জীর্ণ ঘর ছাড়া আর কোন জমিজমা নেই।

গত বুধবার (২ অক্টোবর) আকাশ মিয়ার কৃত্রিম পা লাগানো হচ্ছে রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে। বিনামূল্যে ব্র্যাক এনজিও কৃত্রিম পা লাগিয়ে দিচ্ছে বলে জানান আকাশ মিয়া।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনায় আকাশ বলেন, মা-বাবা ও এতগুলো ছোট ভাই বোনের ভার আমার ওপর। তারপরও সেদিন শিক্ষার্থীদের ওপর হওয়া জুলুম দেখে নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি। কাজ ফেলে ছাত্র জনতার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম। ওইদিন বিকেলে পুলিশ চারদিক থেকে ঘিরে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়। চোখের সামনে অনেকে গুলিতে লুটিয়ে পড়ছিল। তাদের তুলে রিকশা ভ্যানে করে হাসপাতালে পাঠিয়েছি। কিন্তু আন্দোলন চলছিল।

তখন পুলিশ আরও সদস্য বৃদ্ধি করে নির্মমভাবে আক্রমণ শুরু করে। এক পর্যায়ে দৌড়ে এসে আমার কর্মস্থল মিষ্টির দোকানে ঢুকে শার্টার লাগিয়ে দেই। কয়েকজন পুলিশ পিছু পিছু দৌড়ে এসে শার্টার ভেঙে দোকানে ঢুকে। আমাকে ধরে বুকে শটগান লাগিয়ে গুলি করার প্রস্তুতি নেয়। পরিস্থিতি বুঝে শটগানের নলটা হাতে ঠেলে নিছের দিকে নামিয়ে দেই। এতে গুলিটা বাম পায়ে লাগে। আমি মেঝেতে পড়ে গেলে পুলিশ চলে যায়। রক্তে সব ভেসে যায়।

তখন আশপাশের লোকজন আমাকে উদ্ধার করে কাছের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। চিকিৎসক পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেও যাওয়া সম্ভব হয়নি। তখন পুলিশ আহতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছিল। সরকারি হাসপাতালে গেলে গ্রেফতার করবে সেই ভয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেই। গুলিতে পায়ের মূল শিরাগুলো ছিঁড়ে গিয়েছিল। ৩ দিন পর রাতের আঁধারে একটি গাড়িতে করে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে চিকিৎসক পা কেটে ফেলেন।

আকাশ আরও জানায়, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে পা হারিয়েছি। তাতে দুঃখ নেই। স্বৈরাচার বিদায় হয়েছে। দেশ মুক্ত হয়েছে। এখন যারা ক্ষমতায় আছে তারা অন্তত আমার চিকিৎসার দায়িত্বটুকু নিক। পঙ্গু হয়ে এক হাসাপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছি। বাবা-মা এলাকা থেকে ঋণ করে সুদে টাকা এনে চিকিৎসা করাচ্ছে। দুঃখ হলো প্রায় আড়াই মাসে কেউ খবরও নিতে এলো না। কোন সহায়তাও পেলাম না। নিজের জীবনের কথা না হয় বাদ দিলাম ছোট ভাইবোন ওদের পড়াশোনা খাওয়া দাওয়া ভরণপোষণ কে চালাবে এই চিন্তা করে কষ্ট পাই। এছাড়া চিকিৎসার ঋণই বা কিভাবে শোধ হবে। বেসরকারি একটা সংস্থা থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা পেয়েছি। এছাড়া কেউ কোনও সহায়তা দেয়নি। বাড়িতে দীর্ঘদিন থেকেছি কেউ একজন সান্তনা দিতেও আসেনি। এটা আরও বড় দুঃখ।

আকাশের বাবা দুলাল মিয়া বলেন, ৪ লাখ টাকা ধার-দেনা করে সুদে এনে চিকিৎসা করিয়েছি। পা কাটা নিয়ে ছেলেটা গ্রামের বাড়িতে শুয়ে রয়েছে। এই আড়াই মাসে কেউ খবরও নেয়নি। পাইনি কোনো সহায়তা। গরীব মানুষ কোন জমিজমা নেই। ছেলেটার আয় দিয়েই পরিবারের খরচ চলতো। এখন তার পায়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় ৪ লাখ টাকা সুদে আনতে হয়েছে। ছেলের জীবন তো শেষ। উল্টো ঋণের বোঝা কাঁধে। আল্লাহ জানেন এই ছেলে মেয়েগুলো নিয়ে কিভাবে চলব। দু’চোখে অন্ধকার দেখছি।

দুলাল মিয়া আরও বলেন, এক আত্মীয়ের মাধ্যমে আকাশকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। ইতিমধ্যে তার পাসপোর্টও করেছিলাম। সব স্বপ্নই তো শেষ। দেশের মানুষের মুক্তির জন্য আমার ছেলে পা হারিয়েছে। দেশ মুক্ত হলো কিন্তু কেউ তার চিকিৎসার ভার নেইনি। খোঁজখবর নেয়নি। আর্থিক সহায়তাও করলো না কেউ। ছেলেটাকে দেখে স্বান্তনা দিতেও বাড়িতে এতদিনে কেউ আসেনি। দুঃখ শুধু এটুকুই।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে চট্টগ্রামে চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের অবস্থান

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফর ঘিরে চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেল ৫টায় নগরের লালখান বাজারে ফ্লাইওভারের মুখে অবস্থান নেন তারা। এ সময় চাকরিতে পুনর্বহালসহ ন্যায্য দাবি পূরণে সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ব্যাংকিং খাতে দায়িত্ব পালনের পর কোনো প্রকার ন্যায়বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তাদের অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ফলে তারা ও তাদের পরিবার বর্তমানে আর্থিক ও সামাজিক সংকটে পড়েছে।

চাকরি হারিয়ে তাদের অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন জানিয়ে তারা বলেন, পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসার খরচ ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া বয়স বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে কোথাও চাকরি পাওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়ে এসেছে। এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও অর্থসংকটের মধ্যে পড়ে ইতিমধ্যে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে বলেও দাবি করেন আন্দোলনকারীরা।

কর্মসূচীতে অংশ নেওয়া চাকরিচ্যুত ব্যাংকাররা আরও জানান, দীর্ঘদিন ব্যাংকিং সেবায় নিয়োজিত থাকার পর হুট করে চাকরি হারিয়ে এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করতে হচ্ছে। নিজেদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে এবং কর্মস্থলে পুনর্বহালের জন্য তারা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হলে তারা আবারও মর্যাদার সঙ্গে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পাবেন বলে প্রত্যাশা তাদের।

চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের এই দাবি অবশ্য নতুন নয়। এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জনসভায় হলুদ রঙের টি-শার্ট উঁচিয়ে তারা নিজেদের দাবি তুলে ধরেছিলেন। ওই দিন সকালেও নগরের হোটেল রেডিসন ব্লুর সামনে অবস্থান নিয়ে তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালান তারা।

চাকরিচ্যুত ব্যাংকার ইলিয়াস হোসেন বলেছিলেন, তাদের অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যেন বিষয়টি সমাধানে উদ্যোগ নেন, সেই প্রত্যাশা থেকেই তারা সেখানে এসেছেন বলে জানান তিনি।

ইন্টারনেট ব্যবহারকে শিশুদেরও মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ইন্টারনেটের ব্যবহারে বয়সভিত্তিক কোনও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন আদালত। শিশুদেরও মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।১৬ অক্টোবর আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারি যে, সংবিধানের ১৯(১)(এ) অনুচ্ছেদের সাথে ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ মিলিয়ে পাঠ করলে ইন্টারনেটে প্রবেশ ও ব্যবহারের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য হয়।

জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেন অ্যালায়েন্স’ নামের শিশুদের অধিকারবিষয়ক একটি এনজিও এবং অপর এক আবেদনকারীর করা আবেদনের শুনানিকালে বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন। সেই আবেদনে অভিযোগ করা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো ভারতে শিশুদের যৌন নিপীড়নের তথ্য ও এমন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।

আলোচিত খবর

রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে; চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে চট্টগ্রাম নগরের জেএম সেন হলে শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করে অংশ নেননি। সবার লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বাধীন করা, গণতন্ত্র রক্ষা করা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।তিনি বলেন, আমরা মুসলমান হই, হিন্দু হই, বৌদ্ধ হই কিংবা খ্রিস্টান হই, ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের নাগরিক।

যে ধর্মেরই হই না কেন, যেহেতু এই দেশে আমরা জন্মেছি, এই দেশে বড় হচ্ছি, তাই আমাদের পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে লাখ লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

অনেকে শহীদ হয়েছেন। সেদিন কেউ দেখেননি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ কিংবা কে খ্রিস্টান। সবাই দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্য নিয়ে লড়াই করেছেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষা ও জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে রাজপথে নেমেছেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। গুলিবিদ্ধ কিংবা আহত ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় জানতে চেয়ে কেউ তাঁদের পাশে দাঁড়াননি। হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, আমার ভাই শহীদ হয়েছে, আমার ভাই আহত হয়েছে। বাকিরা তাঁদের ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। কেউ জিজ্ঞেস করেননি, কী তাঁর ধর্ম পরিচয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মানুষের অধিকার ও মানবিকতার প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য নয়।প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের বিচার করা উচিত নয়।

তিনি নিজেকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁকে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে হয়েছে। বাংলাদেশে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হলেও লন্ডনে অবস্থানের সময় সেই পরিচয় তাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠ করেনি। তাই সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু পরিচয় নয়, একজন মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তারেক রহমান বলেন, দেশের আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র একজন নাগরিককে যে অধিকার ও সুযোগ দেবে, অন্য নাগরিকও তা পাবেন। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও অধিকার খর্ব করা যাবে না।

মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব আন্দোলনে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সবাই শান্তিতে বসবাস করবেন এবং মিলেমিশে থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে যদি সেই বাংলাদেশ গড়তে হয়, আপনাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই। আপনি হিন্দু হোন, মুসলমান হোন, বৌদ্ধ হোন কিংবা খ্রিস্টান হোন, যাই হোন না কেন, আপনার সহযোগিতা আমার দরকার। কারণ আপনার সহযোগিতা ছাড়া আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব না।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীমসহ বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য ও নেতারা।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ