আজঃ বুধবার ৬ মে, ২০২৬

অবসর কাটুক দেশীয় সংস্কৃতি চর্চায়

লেখক: মো: ইয়াসির আরাফাত

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

অবসর মানবজীবনের এক বহু আকাঙ্ক্ষিত পর্যায়কাল। আমাদের নিত্য দিনের ছুটে চলা যেন এই এক টুকরো অবসর প্রাপ্তির খোঁজে। কর্মব্যস্ত জীবনে আমরা দিনশেষে একটু প্রশান্তির আশায় থাকি, যখন ব্যস্ততার চাপে অবদমিত শখ ও সুপ্ত ইচ্ছাগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ আসে। অনেকেই অবসরে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ান, কেউবা শখের কাজগুলোর মাধ্যমে নিজেদের ব্যস্ত রাখেন। কিন্তু কেমন হতো যদি এই অবসর আমরা আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি, সাহিত্য ও কৃষ্টির চর্চার মাধ্যমে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারতাম?

বাংলাদেশের সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। এখানে মিশে আছে বাঙালি জাতির ইতিহাস, জীবনধারা, আচার-অনুষ্ঠান, লোকসংস্কৃতি, গান, নৃত্য, নাটক, সাহিত্য এবং আরও নানা ধরণের সাংস্কৃতিক উপাদান। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আমাদের জাতিসত্তার পরিচয় বহন করে, যা বহির্বিশ্বের কাছে আমাদের আলাদা করে তুলে ধরে। এছাড়াও, বাংলাদেশের সাহিত্য জগৎ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। চর্যাপদ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, জীবনানন্দ দাশের সাহিত্য আমাদের কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে। তেমনি গ্রামবাংলার পালাগান, জারি-সারি, ভাটিয়ালি, বাউলগান, গম্ভীরা, পুঁথি-পাঠ আমাদের লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ, বর্তমানের নগরায়নের প্রভাবে এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের কারণে এগুলো দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে।

অবসরে যদি আমরা মানসিক প্রশান্তি লাভের জন্য কোনো সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত না হই, তবে একাকীত্ব ও হীনম্মন্যতা আমাদের গ্রাস করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অবসর সময়ে কোনো সৃজনশীল কাজ বা সাংস্কৃতিক চর্চা না করলে বিষণ্নতা ও অবসাদ দেখা দিতে পারে। তাই অবসর সময়ে দেশীয় সাহিত্য, সংগীত, নাটক, লোকসংস্কৃতি চর্চা করলে মনের খোরাক যেমন মিটে, তেমনি আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্যও টিকে থাকে। বর্তমানে, বিশ্বায়নের কারণে দেশীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টির ওপর বিদেশি সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। নগরায়ন, প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার এবং আধুনিকতার নামে পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুকরণ আমাদের অনেক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক চর্চাকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছে। এক সময় গ্রামবাংলার প্রতিটি অঞ্চলে লোকগানের আসর বসত, পুঁথি পাঠের প্রচলন ছিল, এবং মঞ্চ নাটকের জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক। কিন্তু, এখন এসব ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল বিনোদনের প্রতি এতটাই আসক্ত হয়ে পড়ছে যে তারা নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে, অবসর সময়ে দেশীয় সংস্কৃতি ও সাহিত্য চর্চা একদিকে আমাদের মননশীলতা ও সৃজনশীলতা বাড়াবে, অন্যদিকে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করবে। দেশীয় সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের বই পড়া, নিজে কবিতা, গল্প বা প্রবন্ধ লেখা এবং সাহিত্য আলোচনা চক্রে অংশগ্রহণ করা যেতে পারে। সঙ্গীত ও নৃত্য চর্চায় বাউল, ভাটিয়ালি, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, জারি-সারি ইত্যাদির চর্চা করা এবং লোকনৃত্য শেখা ও শেখানো যেতে পারে। স্থানীয় নাট্যদল গঠন করা, মঞ্চনাটক মঞ্চায়ন করা এবং লোকনাট্যের চর্চার মাধ্যমেও দেশীয় সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তাছাড়া, গ্রামীণ হস্তশিল্প, নকশি কাঁথা, মৃৎশিল্প, শোলাশিল্প ইত্যাদির চর্চা করে এগুলোর প্রচার ও প্রসার ঘটানো যেতে পারে। প্রবীণদের কাছ থেকে গ্রামীণ গল্প ও ঐতিহাসিক কাহিনি সংগ্রহ করে তা লিখে রাখা ও প্রচার করা গেলে সেটি হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।

উপরন্তু, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশীয় সংস্কৃতির প্রচার ও সংরক্ষণ সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অন্যান্য মাধ্যমে লোকসংস্কৃতি, সাহিত্য ও ঐতিহ্য সহজলভ্য করা যেতে পারে। সাথে সাথে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে লোকসংস্কৃতিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশীয় হস্তশিল্প ও কারুশিল্প আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তির সাথে দেশীয় সংস্কৃতির মিলবন্ধন ঘটালে এটি টিকে থাকবে, বিকশিত হবে এবং বিশ্ব দরবারে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। এভাবে, আমরা একই সাথে আধুনিক প্রযুক্তি ও ধারার সংস্পর্শে থেকে আমাদের স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সকল সংস্কৃতি ও কৃষ্টি পুনরুজ্জীবিত করতে পারি।

দেশীয় সংস্কৃতি আমাদের আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি। একে অবহেলা করা মানেই আমাদের শিকড়কে দুর্বল করে ফেলা। তাই অবসর সময়কে কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং মননশীল ও সৃজনশীল কাজের জন্য ব্যয় করা উচিত। দেশীয় সাহিত্য, সংগীত, নাটক, লোকসংস্কৃতি ও কৃষ্টির চর্চার মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে পারি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ভান্ডার রেখে যেতে পারি। তাই আমাদের উচিত অবসর সময়কে মূল্যবান করে তোলা, যেন আমরা আমাদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের গৌরব ধরে রাখতে পারি।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

বিদায়ের সাজানো কফিন

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

তুমি একবার ‘না’ বলো
আমি থেমে যাব
নি:শব্দ রাতের মতো
অসীমে মাঝে মিশে যাব ।

আমি হারিয়ে যাব
অনেক দূরে—
যেখানে কেউ খুঁজে পাবেনা
মায়া মমতাহীন গহীন অন্ধকারে ।

এই পৃথিবী আমার নয়
এই ফুলের বাগান আমার নয়
এখানে কেউ কারো নয়
শুধুই মিথ্যা মায়াময় ।

এখানে অবুঝ প্রেমের খেলা
এখানে ক্ষণিকের ফুলের মেলা
এখানে অজানা পথে চলা
এখানে ঝরা ফুলের মালা ।

এখানে চোখের জলে
কষ্টের ফুল ফোটে
এখানে বোবা কান্নায়
পাথরে ফুল ফোটে ।

আমি যাব চলে
অনেক অনেক দূরে,
কে যেন ডাকে মোরে
মায়া নদীর তীরে ।

আবার আসিব ফিরে
হারানো দিনের গানে
সকল কষ্ট ভুলে যাব
ক্ষণিকের মহামিলনে ।

যদি আর না ফিরি
এই সাজানো বাগানে,
একটি ফুল ছিটিয়ে দিও
বিদায়ের সাজানো কফিনে ।

রচনাকাল :২৭/৪/২০২৬

নানান আনন্দ ও আয়োজনে বর্ষবিদায় জানিয়ে নতুন বর্ষবরণে আন্তর্জাতিক বিশ্বতান।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রামের চৈত্র সংক্রান্তি ১৪৩৩।বর্ষবিদায়ের মধ্যে দিয়ে বর্ষবরণের আয়োজন। চৈত্র সংক্রান্তি ১৪৩৩, ১৩ ও ১৪ এপ্রিল ২০২৬ উৎযাপিত হলো বাঙালির প্রাণের উৎসব নববর্ষ। এই উৎসবের আমেজ অন্যান্য উৎসবের তুলনায় ভিন্ন যা প্রত্যেক বাঙালির বাঙালী মনোভাবকে ফুটিয়ে তুলে।নানান রকম আয়োজনের মধ্যে দিয়ে প্রতিবারের ন্যায় এইবার ও চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমী, সি আর বি শিরীষ তলা, চন্দনাইশ,এপেক্স ক্লাব,বন্ধুই শক্তি ক্লাব -২০০০ চট্রগ্রাম থিয়েটার প্রাঙ্গণে তাদের বর্ষবিদায়ের সর্বকালের সবচেয়ে বেশি উৎসব পালন করেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্বতান এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নরেন সাহার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বিশ্বতান টীম।

নাচ, গান, আবৃত্তি ও অভিনয় সব কিছু মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বতানের শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলেছিলেন ও সাজিয়েছিলেন উৎসবটিকে।নৃত্য পরিচালনায় ছিলো হৃদিতা দাশ পূজা ও সংগীত লিড এ ছিলেন অনিক দাশ। এ সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যগণ।

আলোচিত খবর

ক্রুড অয়েলের সরবরাহ স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরবে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

দীর্ঘ এক মাস বন্ধ থাকার পর আবার চালু হতে যাচ্ছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি।মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) আমদানি ব্যাহত হওয়ায় গত ১৪ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির ক্রুড অয়েল প্রসেসিং ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে পুরো রিফাইনারিতে। ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) সংকট কেটে যাওয়ায় উৎপাদনে ফিরছে রিফাইনারিটি।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৭ মে থেকে প্রতিষ্ঠানটির অপারেশন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে। এদিকে, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন জানিয়েছে, চলতি মাসের শেষদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও আরও এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আসার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, রিফাইনারিতে সাধারণত সৌদি আরবের এরাবিয়ান লাইট এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মারবান ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হয়। প্রতিবছর চাহিদা অনুযায়ী প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়ে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় গত ১৮ ফেব্রুয়ারির পর আর কোনো ক্রুড অয়েল দেশে আসেনি।

এতে করে প্রথমবারের মতো উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয় প্রতিষ্ঠানটি, যা ১৯৬৮ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর নজিরবিহীন ঘটনা।পরবর্তীতে বিকল্প রুট ব্যবহার করে তেল আমদানির উদ্যোগ নেয় বিপিসি। এর অংশ হিসেবে লোহিত সাগর হয়ে সৌদি আরব থেকে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি জাহাজে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে আনা হচ্ছে। জাহাজটি ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাবে এবং ৬ মে থেকে তেল খালাস শুরু হবে। ইস্টার্ন রিফাইনারির উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সৌদি আরব থেকে আমদানি করা এক লাখ টন ক্রুড অয়েলবাহী একটি জাহাজ ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে। জাহাজ থেকে তেল খালাস শেষে ৭ মে থেকে পরিশোধন কার্যক্রম শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, আপাতত ক্রুড অয়েলের বড় ধরনের কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই। চলতি মাসেই আরও একটি জাহাজ তেল নিয়ে দেশে আসার কথা রয়েছে, ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ