আজঃ মঙ্গলবার ৫ মে, ২০২৬

কুরবে ইলাহী ও হজরত শাহে চরণদ্বীপি (কঃ)।

লেখক : শাইখ সাইফুল্লাহ ফারুকী চরণদ্বীপি ইসলামী লেখক ও গবেষক।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর অগ্রবর্তীগণইতো অগ্রবর্তী। তারাই মুকাররাবিন তথা নৈকট্য প্রাপ্ত।’ (সুরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত ১০-১১)। পবিত্র কোরআনুল কারিমের অত্র আয়াতে আল্লাহ তায়ালার বাণী ‘মুকাররাবীন’ শব্দ হতে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনকে আরবীতে তাক্বাররোব ইলাল্লাহ এবং উর্দু ও ফার্সী ভাষায় ‘কুরবে ইলাহী’ বলা হয়। আল্লাহ তায়ালার প্রিয়ভাজন বান্দায় পরিণত হওয়ার পথপরিক্রমায় ‘মাকামে কুরবে ইলাহী’ অর্জন পূর্বক ‘মাকামে মাহবুবিয়ত’ অর্জানান্তে আল্লাহর প্রিয়ভাজন বান্দা তথা অলি আল্লাহ হিসাবে পরিগণিত হন। ইসলামের অন্তর্নিহিত দিক তরিকতের পরিভাষায় ‘কুরবে ইলাহী’ হলো পরম প্রেমাস্পদ আল্লাহর সাথে মিলনের প্রত্যাশায় রুহানী পরিভ্রমণের সবিশেষ অবস্থা যা সালিকের হৃদয়ের আল্লাহর প্রেমকে অধিকতর জাগ্রত রাখে এবং স্রষ্টার নৈকট্য হতে সামান্যতম দূরত্ব ব্যক্তিকে বিচ্ছেদের যাতনায় ব্যথিত করে তোলে। চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলাধীন চরণদ্বীপ গ্রামে আবির্ভূত আরবের বিখ্যাত কোরাইশ বংশধর কুতুবুল আকতাব হজরত মাওলানা শাহসুফী শাইখ অছিয়র রহমান ফারুকী কোরাইশী চরণদ্বীপি (কঃ) ছিলেন খোদা প্রেমে বিভোর কুরবে ইলাহী তথা আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত বিখ্যাত অলি আল্লাহ। ছাত্রাবস্থায় বিকেলে সহপাঠিদের সাথে খেলাধুলা না করে নদীর তীরে কিংবা নির্জন স্থানে একাকী তন্ময় হয়ে ভাবনা, গভীর রাতে মসজিদে তাহাজ্জুদ আদায়পূর্বক মোরাকাবা-মোশাহাদা রত থাকা, দিবসে নিয়মিত রোজা পালন হজরত শাহে চরণদ্বীপি (কঃ)’কে কুরবে ইলাহী তথা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে পরম মাকাম শিখরে উন্নীত করে।

পবিত্র কোরআনুল কারিমের কুরবে ইলাহী তথা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের ব্যাপারে বিভিন্ন স্থানে আলোকপাত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর গ্রামবাসীদের মধ্যে কতিপয় লোক এমনও আছে যারা আল্লাহর প্রতি এবং কিয়ামাত দিনের প্রতি পূর্ণ ঈমান রাখে, আর যা কিছু ব্যয় করে তা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপকরণ ও রাসূলের দু‘আ লাভের উপকরণ রূপে গ্রহণ করে। স্মরণ রেখ, তাদের এই ব্যয় কার্য নিঃসন্দেহে তাদের জন্য (আল্লাহর) নৈকট্য লাভের (কুরবে ইলাহী) কারণ; নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে নিজের রহমতে দাখিল করে নিবেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ হচ্ছেন অতি ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়। (সুরা তাওবাহ, আয়াত : ৯৯) । মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন, ‘অবশ্যই পুণ্যবানদের আমলনামা ইল্লিয়্যীনে থাকবে। ইল্লিয়্যীন কি তা আপনি জানেন? (তা হচ্ছে) লিখিত পুস্তক। আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্তরা (কুরবে ইলাহী প্রাপ্তগণ) এটা প্রত্যক্ষ করবেন। (সুরা মুতাফফিফীন, আয়াত : ১৮ – ২১)। পবিত্র হাদীস শরীফেও কুরবে ইলাহী সম্পর্কে সবিস্তার বর্ণনা রয়েছে যা ব্যক্তিকে পার্থিব সৌন্দর্য পরিহারপূর্বক সৌন্দর্যের আধার পরম প্রেমাস্পদ আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট করে । আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রতিপালক আল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেনঃ আমার বান্দা যখন আমার দিকে এক বিঘত নিকটবর্তী (তাকাররোব , কুরবত) হয়, আমি তখন তার দিকে এক হাত নিকটবর্তী (তাকাররোব , কুরবত) হই। আর সে যখন আমার দিকে এক হাত নিকটবর্তী হয়, আমি তখন তার দিকে দু‘হাত নিকটবর্তী (তাকাররোব , কুরবত) হই। সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই। (সহীহ বুখারী, অধ্যায় : জাহমিয়াদের মতের খন্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ।)
অত্র হাদীসে পাকে আল্লাহর প্রতি বান্দার নৈকট্য তথা কুরবে ইলাহীর বিনিময়ে আল্লাহর নৈকট্য প্রদানের কথা বিধৃত হয়েছে।

কুরবে ইলাহী প্রাপ্ত ব্যক্তির মর্যাদাগত অবস্থান সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জিত হয় সহীহ বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদীসে পাকে। হজরত আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ্‌ বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোন ওলীর সঙ্গে দুশমনি রাখবে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করব। আমি যা কিছু আমার বান্দার উপর ফরয করেছি, তা দ্বারা কেউ আমার নৈকট্য লাভ করবে। আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদাত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকবে। এমন কি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নেই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, তবে আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দেই। আমি কোন কাজ করতে চাইলে তা করতে কোন দ্বিধা করি না, যতটা দ্বিধা করি মু’মিন বান্দার প্রাণ নিতে। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে আর আমি তার বেঁচে থাকাকে অপছন্দ করি। (সহিহ বুখারী, অধ্যায় : কোমল হওয়া।) নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের প্রকৃষ্ট উদাহরণ পরিলক্ষিত হয় কুতুবুল আকতাব হজরত মাওলানা শাহসুফী শাইখ অছিয়র রহমান ফারুকী চরণদ্বীপি (কঃ) এর জীবন চরিতে। বর্ণিত রয়েছে, একদা এক ব্যক্তি গভীর রজনীতে হজরত শাহে চরণদ্বীপি (কঃ) এর পাশ্ববর্তী মহল্লায় পাকা আম চুরি উদ্দেশ্য আম গাছে উঠে। গাছে উঠার সাথে সাথে সে অন্ধ হয়ে যায়। হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে কোন রকম গাছ থেকে নেমে সে চিৎকার করে কান্না করতে থাকে। চিৎকার আর কান্নার আওয়াজ শুনে ঘুমন্ত পাড়া প্রতিবেশী জাগ্রত হয়ে তার করুণ অবস্থার কারণ জানতে জিজ্ঞাসিত হলে উপস্থিত লোকজনকে চুরি ও তার শাস্তির কথা উল্লেখ পূর্বক হজরত শাহে চরণদ্বীপি (কঃ) কদমে নিয়ে যাওয়ার অনুনয় বিনয় করতে থাকে। তন্মধ্যে উপস্থিত একজন বলেন, ফকির মাওলানা সাহেব (হজরত শাহ চরণদ্বীপি) দরবারে নেই। তিনি তাহাজ্জুদ ও মোরাকাবার নিমিত্তে ফকিরাখালী জামে মসজিদে গেছেন। ইচ্ছা করলে সেখানে যেতে পারেন। চোর লোকটি উপস্থিত একজনকে নিয়ে অন্ধত্ব হতে মুক্তি পাওয়ার প্রত্যাশায়‌ হজরত শাহে চরণদ্বীপি (কঃ) দোয়ার জন্য ছুটে গেলেন উক্ত মসজিদে। মসজিদের নিকটবর্তী হতেই সঙ্গী লোকটি প্রত্যক্ষ করলো, মসজিদে অনেক নুরানী ব্যক্তির সমাবেশ। জুব্বা ও পাগড়ী পরিহিত নুরানী ব্যক্তিবর্গের চেহেরায় নুরের আলো বিকিরণ হচ্ছে। হজরত শাহে চরণদ্বীপি (কঃ) সম্মুখে আর সবাই তারই পেছনে আস্তে আস্তে মসজিদ হতে বের হচ্ছে। অনুমিত হয় যে নুরানী ব্যক্তিগুলো জমিনে পরিভ্রমণরত আল্লাহর ফেরেস্তাগণ যাদের সাথে হজরত শাহে চরণদ্বীপি (কঃ) নামাজ আদায় করেন। সবাই মোলাকাতপূর্বক প্রস্থানের পর দূর হতে প্রত্যক্ষকারী সঙ্গী ব্যক্তি সর্বশেষে হজরত শাহে চরণদ্বীপি (কঃ)’র নিকট এসে চুরের করুণ কাহিনী অন্ধত্বের বর্ণনাপূর্বক তা দূরীকরণের দোয়া আরজি করেন। হজরত শাহে চরণদ্বীপি চোরের দিকে নজর দেয়ার সাথে সাথে তার অন্ধত্ব বিদূরীত হয়। সঙ্গী লোকটি নুরানী ব্যক্তিগণ সম্পর্কে পুনরায় জিজ্ঞাস করলে তিনি এ সম্পর্কে লোক সমাজে বর্ণনা না করার জন্য হুকুম দিয়ে প্রস্থান করেন।’ এ ঘটনায় অনুমিত হয় যে, হজরত শাহে চরণদ্বীপি আল্লাহ তায়ালার এমন নৈকট্যপ্রাপ্ত তথা কুরবে ইলাহী প্রাপ্ত আল্লাহর অলি যিনি নুরানী ফেরেস্তার সাথে ইবাদত ও বিচরণ করেন।

কুরবে ইলাহী অর্জনে কুতুবুল আকতাব হজরত অছিয়র রহমান ফারুকী চরণদ্বীপি (কঃ) ছিলেন অনন্য‌ ও বেলায়ত গগণে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। বোয়ালখালী উপজেলার গোমদন্ডী নিবাসী মোহাম্মদ ছদর আলী ফকির ছাহেব হজরত অছিয়র রহমান ফারুকী চরণদ্বীপি (ক.) এর ফয়েজ প্রাপ্ত ভক্ত শিষ্য ও খলিফা ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন, ‘আমি লোক পরম্পরায় হজরত অছিয়র রহমান ফারুকী চরণদ্বীপি (ক.) এর অলৌকিক কারামত ও আধ্যাত্মিক শক্তির বিষয় অবগত আছি। গোমদন্ডী নিবাসী জান আলী ফকির ও মুন্সী মিঞাজি তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন। তারা হজরত শাহে চরণদ্বীপি (ক.) এর হাতে বায়াত হওয়ার জন্য আমাকে বলেন। উত্তরে আমি বললাম, তিনি যদি সত্য কামেল অলি আল্লাহ হয়ে থাকেন, তবে তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাবে আমাকে তাঁর খেদমতে পৌঁছাতে পারেন। একদা মেরাজ রজনীতে নামাজ সমাপণ করতঃ নিদ্রিত হয়েছি, স্বপ্নে দেখলাম, কেহ বলতেছে, অদ্য রজনীতে বহু লোক ফয়েজ নেয়ামত লাভ করবেন। তৎপর দেখলাম একখানা মণিমুক্তা খচিত জ্যোতির্ময় সিংহাসনে হজরত অছিয়র রহমান ফারুকী চরণদ্বীপি (ক.)। চতুস্পার্শ্বে অসংখ্যক লোক তাঁর যশঃ কীর্তন করতঃ গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী, হজতর শাহ চরণদ্বীপির জয় ঘোষণার সহিত তকবির ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনিতে দিগমন্ডল প্রকম্পিত করেছেন। এই দৃশ্য দেখে আমার হৃদকম্প হল। ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ জপনা করছি। এমন সময় একজন লোক আমার হাত ধরে জনতার মধ্য দিয়ে হজরত অছিয়র রহমান ফারুকী চরণদ্বীপি (ক.) এর সামনে উপস্থিত করল। আমি ভয়ে জড়সড় হয়ে পুন:পুন: ভূমি চুম্বন করছি। হজরত অছিয়র রহমান ফারুকী চরণদ্বীপি (ক.) আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করতঃ বলেন-‘মিঞা হুঁশিয়ার হও, গাফেল থাকিও না, আমি তোমাকে পথ দেখাচ্ছি। আমার নির্দেশিত পথে চল।’ এই বলে আমাকে তাঁর সামনের বদনা হতে জল পান করালেন। মুহূর্তের মধ্যে আমার অজ্দ ও রোখছ হতে লাগল। নিদ্রা হতে জাগরিত হয়ে বেখুদী অবস্থায় জিকিরের সহিত অজ্দ করতে থাকি।” (জীবনী ও কেরামত, অধ্যায় : কারামত ও তাছাররোফ)। কুরবে ইলাহীর মাকাম অর্জনান্তে মাকামে মাহবুবিয়ত অর্জনে হজরত অছিয়র রহমান ফারুকী চরণদ্বীপি (ক.) বেলায়ত জগতে এমন মর্তবার অধিকারী হন। আল্লাহ তায়ালার বেলায়ত ও নৈকট্য তথা কুরবে ইলাহী প্রাপ্ত কুতুবুল আকতাব হজরত মাওলানা শাহসুফী শেখ অছিয়র রহমান ফারুকী চরণদ্বীপি (কঃ)’র ওফাত শরীফ স্মরণে আসন্ন ১২ ভাদ্র বেসাল বার্ষিকী ওরশ শরীফে উনার নুরানী সত্তায় অগণিত সালাম আরজ করছি।

 

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

দেশে শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

দেশে শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সকল ধর্মের অনুসারীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে চট্টগ্রামে নগরে আয়োজিত এক ‘আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি সম্মিলনে’। শনিবার (২৫ এপ্রিল) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব’র জুলাই-বিপ্লব স্মৃতি হলে “পরিবর্তনশীল বিশ্বে ধর্মসাম্যের প্র‍য়োজনীয়তা ও ধর্মগ্রন্থসমূহে এর দিক নির্দেশনা” শিরোনামে সম্মিলনটি অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, বিশ্বসমাদৃত ‘ত্বরিকা-ই-মাইজভাণ্ডারীয়া’-র প্রতিষ্ঠাতা গাউসুল আযম হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.) এর জন্ম দ্বিশতবার্ষিকী ও মহান ১০ মাঘ ১২০তম পবিত্র উরস শরিফ উদযাপনের অংশ হিসেবে তাঁর মহান অসাম্প্রদায়িক মতাদর্শ প্রতিপালনে নিবেদিত প্রতিষ্ঠান শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারি ট্রাস্টের (এস জেড এইচ এম) সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ১৩তম আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি সম্মিলনের আয়েজন করেছে মাইজভান্ডারি একাডেমি। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসনের মাননীয় সাংসদ জনাব আবু সুফিয়ান এম.পি।

তিনি তার বক্তব্যে বলেন, “সকল ধর্মের মর্মবাণী হচ্ছে, দেশপ্রেম, শান্তি ও মানব কল্যাণ। ইসলাম ধর্মের অনুসারী হিসেবে বলব ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা যাবে না। প্রত্যেক ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল হতে ইসলাম শিক্ষা দেয়। সমাজে মানবিক সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। উৎপীড়ন ও প্রতিহিংসা, সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে যারা সমাজকে, মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করতে চায়, প্রতিষ্ঠিত করতে চায় কুশাসন, তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠা করাই আন্তঃধর্মীয় সম্প্রতি সম্মিলনের অন্তর্নিহিত তাগিদ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্প্রতি সম্মিলনে আলোচক হিসেবে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন স্বাধীনতা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি এন্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগের সুপারনিউম্যারারি প্রফেসর অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার পাঁচরিয়া তপোবন আশ্রমের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী রবীশ্বরান্দপুরী মহারাজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবুল হোসাইন, চট্টগ্রাম ক্যাথিড্রাল প্যারিসের সহকারী পাল পুহিত ফাদার রুপক আইজেক রোজারিও এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার জনাব শশাঙ্ক বরণ রায়।

আলোচনায় বৌদ্ধতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. সকোমল বড়ুয়া বলেন,বর্তমান পৃথিবীর অস্থিরতার প্রধান কারণ হচ্ছে সহিংসতা, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, বিশ্বশক্তি কিংবা আগ্রাসন মনোবৃত্তি লালন করা। তাই আজ সর্বপ্রথম প্রয়োজন সকল সম্প্রদায়ের মন থেকে এ চারটি কুধারণা অপসারণ করা। দেহ ছাড়া মনের আশ্রয় যেমন কল্পনা করা যায় না, তেমনি নীতি বা ধর্ম ছাড়া সমাজ জীবনের উন্নয়ন ও অগ্রগতির চিন্তা অর্থহীন। দুই মেরুতে দুটি অবস্থান করলেও উভয়ের সমন্বয়ে বাংলাদেশে একটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতামুক্ত, শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে গড়ে উঠবে।

শ্রীমৎ স্বামী রবীশ্বরান্দপুরী মহারাজ বলেন, “দুঃখের বিষয় হলো এত ধর্মীয় চেতনায় সব ধর্মের সহাবস্থান এর কথা স্বীকৃত থাকলেও বিদ্বেষপূর্ণ ভাভ ধারার কোন পরিবর্তন হয়নি। দুঃখের সাথে আজ তা স্বীকার করতে হয়। আজ সমগ্র বিশ্বে ন্যায়বোধ, প্রীতিবোধ, ভ্রাতৃত্ববোধ, সংযমবোধ, সহিষ্ণুতা, মানবতা ও শৃংখলার বড়ই দুর্ভিক্ষ। ধর্ম আচরণ পদ্ধতি ভিন্ন হলেও প্রতিটি মানুষের লক্ষ ও গন্তব্য কিন্তু এক ও অভিন্ন।”

ড. মুহাম্মদ আবুল হোসাইন বলেন, “প্রায় সকল ধর্ম গ্রন্থই ন্যায়পরায়ণতা, সততা, দয়া ও পরোপকারের মতো সার্বজনিন নৈতিক গুণাবলির উপর জোর দেয়। এই সাধারণ নৈতিক ভিত্তি বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সংলাপ ও সহযোগীতার পথ সুগম করে ধর্মগ্রন্থগুলো প্রায়ই ঈশ্বর বা দিব্যসত্তার সামনে সকল মানুষের সমান মর্যাদার কথা ঘোষণা করে, যা আন্তঃধর্মিক, আন্তঃসাংস্কৃতিক সম্মানের ভিত্তি তৈরি করে।
উচ্চারক আবৃত্তি কুঞ্জ’র নির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ শাহ হোসাইনের সঞ্চালনায় সম্প্রতি সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারি (ক.) ট্রাস্টের সচিব অধ্যাপক এ ওয়াই এমডি জাফর।

শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ) ট্রাস্ট এর মাননীয় ম্যানেজিং ট্রাস্টি হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী এর বাণী পাঠ করেন এস জেড এইচ এম ট্রাস্ট এর গবেষণা সহকারী জনাব সাইদুল ইসলাম সাইদু। এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করেন হাফেজ মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসনাইন, গীতাপাঠ করেন অধ্যাপক শ্রী স্বদেশ চক্রবর্তী, ত্রিপিটক পাঠ করেন ভদন্ত এম বোধি মিত্র ভিক্ষু, বাইবেল পাঠ করেন পাস্টর রিপন রায়। হামদ পরিবেশন করেন সৈয়দ সামিউল হক ফরহাদাবাদী এবং মাইজভান্ডারি সংগীত পরিবেশন করেন মাইজভান্ডারি মরমী গোষ্ঠীর সিনিয়র সদস্য সৈয়দ জাবের সরওয়ার।

আত্মসমর্পণ ও সংযমেই মকবুল হজ্বের শিক্ষা

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আত্মঅহমিকা ও আমিত্ব পরিহার করে মহান আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ—এই চেতনায়ই নিহিত রয়েছে পবিত্র হজ্বের মূল শিক্ষা। ধৈর্য, সহনশীলতা ও আত্মসংযমের মাধ্যমে একজন মুসলমান নিজেকে পরিশুদ্ধ করে তুলতে পারেন—এমনটাই মন্তব্য করেছেন বক্তারা।

চট্টগ্রাম নগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৯টায় আল-মারচুচ হজ্ব কাফেলার উদ্যোগে আয়োজিত ‘পবিত্র হজ্ব প্রশিক্ষণ কর্মসূচি–২০২৬’-এ এসব কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানের সূচনায় পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন মাওলানা নুরুল ইসলাম।

হজ্ব গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মুহাম্মদ মোরশেদুল আলমের সভাপতিত্বে এবং মাওলানা সরওয়ার আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বায়তুশ শরফ কামিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আবু ছালেহ মুহাম্মদ ছলিমুল্লাহ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. জুনাইদ, গারাংগিয়া মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা মহিউদ্দিন, বাকলিয়া বায়তুন নূর জামে মসজিদের খতিব আলহাজ্ব মাওলানা মুহাম্মদ আখতার হোসাইন ফারুকী, হাবের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি হাজী শরিয়ত উল্লাহসহ বিভিন্ন আলেম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

বক্তারা বলেন, পবিত্র হজ্ব হচ্ছে ধৈর্য ও ত্যাগের সর্বোচ্চ অনুশীলন। মকবুল হজ্বের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়। দীর্ঘ সফর, ভিড় ও নানাবিধ প্রতিকূলতার মধ্যেও সংযম ধরে রাখা এবং অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে বিরত থাকাই হজ্বের প্রকৃত তাৎপর্য।

তারা আরও বলেন, আল-মারচুচ হজ্ব কাফেলা গত ২৬ বছর ধরে হজ্বযাত্রীদের আন্তরিক সেবা দিয়ে দেশের হজ্ব ব্যবস্থাপনায় একটি আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আল্লাহর ঘরের মেহমানদের সেবায় প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা ক্রমেই বিস্তৃত ও প্রশংসিত হচ্ছে।

প্রশিক্ষণ কর্মশালায় পুরুষ ও নারী হজ্বযাত্রীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনায় হজ্বকালীন করণীয় বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়, যা অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
অনুষ্ঠান শেষে দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় বিশেষ মুনাজাত পরিচালনা করা হয়।

আলোচিত খবর

ক্রুড অয়েলের সরবরাহ স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরবে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

দীর্ঘ এক মাস বন্ধ থাকার পর আবার চালু হতে যাচ্ছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি।মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) আমদানি ব্যাহত হওয়ায় গত ১৪ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির ক্রুড অয়েল প্রসেসিং ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে পুরো রিফাইনারিতে। ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) সংকট কেটে যাওয়ায় উৎপাদনে ফিরছে রিফাইনারিটি।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৭ মে থেকে প্রতিষ্ঠানটির অপারেশন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে। এদিকে, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন জানিয়েছে, চলতি মাসের শেষদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও আরও এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আসার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, রিফাইনারিতে সাধারণত সৌদি আরবের এরাবিয়ান লাইট এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মারবান ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হয়। প্রতিবছর চাহিদা অনুযায়ী প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়ে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় গত ১৮ ফেব্রুয়ারির পর আর কোনো ক্রুড অয়েল দেশে আসেনি।

এতে করে প্রথমবারের মতো উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয় প্রতিষ্ঠানটি, যা ১৯৬৮ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর নজিরবিহীন ঘটনা।পরবর্তীতে বিকল্প রুট ব্যবহার করে তেল আমদানির উদ্যোগ নেয় বিপিসি। এর অংশ হিসেবে লোহিত সাগর হয়ে সৌদি আরব থেকে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি জাহাজে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে আনা হচ্ছে। জাহাজটি ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাবে এবং ৬ মে থেকে তেল খালাস শুরু হবে। ইস্টার্ন রিফাইনারির উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সৌদি আরব থেকে আমদানি করা এক লাখ টন ক্রুড অয়েলবাহী একটি জাহাজ ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে। জাহাজ থেকে তেল খালাস শেষে ৭ মে থেকে পরিশোধন কার্যক্রম শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, আপাতত ক্রুড অয়েলের বড় ধরনের কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই। চলতি মাসেই আরও একটি জাহাজ তেল নিয়ে দেশে আসার কথা রয়েছে, ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ