রিপন শান

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

 

ঊনিশ শতকের ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানরা ছিল সকল পক্ষের দ্বারা শোষিত এক সম্প্রদায়। উপমহাদেশের এক সময়কার শাসকরা ব্রিটিশদের কাছে তাদের শাসন ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি তাদের সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অবস্থাকেও হারিয়ে বসেছিল। ব্রিটিশদের প্রতি তাদের বিরাগ ও তাদের প্রতি ব্রিটিশদের সন্দেহপ্রবণতা পাশাপাশি ব্রিটিশদের সহযোগিতা নিয়ে প্রতিবেশি সম্প্রদায়সমূহের মধ্য থেকে নতুন গড়ে ওঠা পুঁজিপতিরা মুসলমানদের জন্য সামগ্রিক পরিস্থিতিকে প্রতিকূল করে তোলে। এরমধ্যে বাংলার মুসলমানদের অবস্থা ছিল সর্বাধিক শোচনীয়।

এই প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে মুসলমানদের বের করে আনার জন্য যে সকল মহাপুরুষ অগ্রসর হন, মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ তাদের মধ্যে অন্যতম। সাংবাদিকতার জগতে বাঙালী মুসলমানের অবস্থান তৈরি এবং তাদের বক্তব্যকে প্রচারের কাজে তিনি অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন।

১৮৬৮ সালের ৭ই জুন বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বশিরহাট মহকুমার হাকিমপুর গ্রামে এই মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাওলানা আবদুল বারী খাঁ ছিলেন সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভীর জিহাদ আন্দোলনের একজন সক্রিয় সদস্য। এমন পিতার সন্তান হিসেবে মাওলানা আকরম খাঁ শৈশব থেকেই ছিলেন বিপ্লবী মানসিকতার মানুষ।
শৈশবেই তিনি তার পিতা-মাতাকে হারান। কিন্তু তাতে হতাশ না হয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। ১৯০০ সালে তিনি কলকাতা আলীয়া মাদরাসা থেকে এফ. এম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

অল্প বয়সেই মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ সাংবাদিকতা ও রাজনীতির সাথে জড়িত হন। সাংবাদিকতার শুরুতে তিনি ‘আহল-ই-হাদীস’ ও ‘মোহাম্মদী আখবার’ পত্রিকায় কাজ করেন। পরবর্তীতে কলকাতার বিখ্যাত মুসলমান ব্যবসায়ী হা্জী আলতাফের সহযোগিতায় ১৯১০ সালে তিনি ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ নামে এক পত্রিকার প্রকাশ শুরু করেন।

মাওলানা আকরাম খাঁর সম্পাদনায় পত্রিকাটি বাংলা, আসাম সহ ভারত ও বার্মার অন্যান্য স্থানের বাংলাভাষী মুসলমানদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সমালোচনা ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তুর্কি ওসমানী খেলাফতের প্রতি সমর্থন পত্রিকাটি ব্রিটিশ সরকারের ক্রোধের শিকার হয়। ফলে সরকারী আদেশে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

১৯১৩ সালে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর উদ্যোগে বাংলার আলেমদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার মানসে “আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাঙ্গালা” নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। মাওলানা আকরাম খাঁ এই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। পাশাপাশি ১৯১৫ সালে সংগঠনটির মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হওয়া ‘মাসিক আল-এসলাম’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯১৯ সালে তুর্কি ওসমানী খেলাফতের সমর্থনে ভারতে সৃষ্ট খিলাফত-অসহযোগ আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯২০ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় খিলাফত কমিটির মহাসম্মেলনে তিনি কমিটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। একই বছর তিনি উর্দু দৈনিক ‘জামানা’ ও পরের বছর ১৯২১ সালে বাংলা দৈনিক ‘সেবক’ প্রকাশ করেন এবং এই পত্রিকা দুটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। খিলাফত-অসহযোগ আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে এই দুটি পত্রিকা ভূমিকা পালন করে। ১৯২৩ সালের ১০ ডিসেম্বরে দৈনিক সেবকে “অগ্রসর! অগ্রসর!” শিরোনামে এক সম্পাদকীয় লেখার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে। ব্রিটিশ রাজবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে বিচারে তাকে এক বছরের কারাদন্ড প্রদান করা হয় এবং দৈনিক সেবক পত্রিকার প্রকাশনার অনুমতি বাতিল করা হয়।

১৯২৭ সালে মাসিক হিসেবে ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকা নতুন করে প্রকাশিত হয়। মুসলিম সমাজের চিন্তাজগতে সংস্কার সাধন ও ইসলামী মূল্যবোধের প্রচারে মাসিক মোহাম্মদী ভূমিকা পালন করে । এই সময়ে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে সাম্প্রদায়িকতাপূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ ও ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক ‘শ্রীপদ্ম’কে নির্ধারন করার জন্য ভারতীয় হিন্দু নেতৃবৃন্দ দাবী করলে মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয় । এ নিয়ে মাওলানা আকরাম খাঁ মাসিক মোহাম্মদীতে তার লেখার মাধ্যমে মুসলমানদের বিরোধীতার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। মূলত মাসিক মোহাম্মদীতে তার লিখনী মুসলমানদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সচেতনতার জন্ম দেয় । এই সচেতনতার প্রেক্ষিতে তারা ভারতীয় উপমহাদেশে নিজেদের আলাদা আবাসভূমি গড়ে তোলার দিকে অগ্রসর হয়।

১৯৩৬ সালে মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ মুসলিম লীগে যোগদান করেন। একই বছর ৩১ অক্টোবর, ‘আজাদ’ নামে কলকাতা থেকে একটি বাংলা দৈনিক পত্রিকার প্রকাশ শুরু করেন। বাংলা ও আসামের বাঙালি মুসলমানের মুখপত্র হিসেবে পত্রিকাটি বিপুল জনপ্রিয় হয়।

১৯৩৭ সালে তিনি মুসলিম লীগের বাংলা প্রদেশের প্রাদেশিক সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। একই বছর অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের নির্বাচনে পরিষদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। মূলত এসময় তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের কণ্ঠস্বরকে প্রকাশের জন্য সংগ্রাম করেন। একদিকে দৈনিক আজাদের মাধ্যমে তিনি মুসলমানদেরকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন ও স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য উদ্বুদ্ধ করছিলেন, অপরদিকে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ও বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য হিসেবে বাঙালি মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করছিলেন। ১৯৪০ এর দশকে তার নেতৃত্বেই বাঙালি মুসলমানরা ভারতে তাদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ‘পাকিস্তান’ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করলে তিনি ভারতের অধীনস্থ কলকাতা ছেড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় চলে আসেন। একইসাথে ১৯৪৮ সালের দিকে কলকাতা থেকে দৈনিক আজাদ ও মাসিক মোহাম্মদীকে ঢাকায় নিয়ে আসেন।

১৯৫৪ সালে স্বাস্থ্যগত কারনে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন । তবুও দৈনিক আজাদ ও মাসিক মোহাম্মদীর মাধ্যমে ইসলামী মূল্যবোধ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা এবং বাঙালি মুসলমানদের মাঝে সাংস্কৃতিক সচেতনতা তৈরির জন্য মাওলানা আকরাম খাঁ কাজ করে গেছেন।

শুধু সাংবাদিকতা ও রাজনীতিই নয়, মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ ছিলেন একজন সুসাহিত্যিক । ছাত্রজীবনে বাংলা, ফারসী ও উর্দু ভাষায় তিনি কাব্যচর্চা করতেন। তার রচিত বিভিন্ন গ্রন্থের মধ্যে রাসূল (সা.)-এর সীরাতগ্রন্থ ‘মোস্তফা-চরিত’, ‘মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’, ‘সমস্যা ও সমাধান’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি বাংলায় পাঁচ খন্ডে কুরআনের তাফসীর ‘তাফসীরুল কুরআন’ রচনা করেন।

১৯৬৯ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকার বংশালে আহলে হাদীস মসজিদে নামাজরত অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মসজিদ প্রাঙ্গনেই তাকে দাফন করা হয়।মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁর হাত ধরেই বাঙালি মুসলমানের সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি । ব্রিটিশ ভারত ও পাকিস্তানি আমলের অনেক প্রথিতযশা মুসলিম সাংবাদিক মাওলানা আকরাম খাঁর তত্ত্বাবধানেই সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন ।

সাংবাদিকতার মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানদের বক্তব্যকে প্রচারের ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম অগ্রসর হন । সাফকথায়, সাংবাদিকতায় বাঙালি মুসলমানদের পথনির্দেশনা দানে আলোকবর্তিকা হিসেবে যিনি প্রথম এগিয়ে এসেছিলেন ; তিনিই বহুমাত্রিক বাঙালি মুসলিম সমাজচিন্তক মনীষী মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ ।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

দেশের অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর: স্পিকার হাফিজ উদ্দিন

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

দেশের অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা ঘুষ ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত এবং তাদের অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে তীব্র নাভিশ্বাস উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা অডিটোরিয়ামে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।তিনি আরও বলেন , বিগত সরকারের আমলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যে অনিয়ম ও দুর্নীতির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তার খেসারত এখনো সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে।

নীরবতার ভাষা

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

নীরবতার ভাষা দূর্বলতা নয়
সাহসের অভাব নয়,
কখনো তা কষ্ট হজমের
নীরব অভিনয় ।

নীরবতার ভাষা হেরে যাওয়া নয়
থেমে যাওয়া নয়,
কখনো তা ব্যক্তিত্বের প্রকাশ
শান্তির পরশ বুলায় ।

নীরবতার ভাষা বোকামী নয়
জ্ঞানের অভাব নয়,
কখনো তা নম্রতার প্রকাশ
ধৈর্যের শিক্ষা দেয় ।

নীরবতার ভাষা ভুলে যাওয়া নয়
মায়ার বাঁধন ছিন্ন নয়,
নীরবতা মনের গভীরতা
জীবনের ফুল ফোটায় ।

রচনাকাল: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আলোচিত খবর

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায়

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছেছে । আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইড মিটিং এ দুই দেশের মধ্যে এ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ বিষয়ে বক্তব্য স্পষ্ট, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ