“আপোষহীন নেতৃত্বের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়া—ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম”

লেখক : মো: জহিরুল ইসলাম জহির সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক, চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

“বেগম খালেদা জিয়া গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে ৪১ বছর পার করেছেন।১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপাসন নির্বাচিত হন তিনি। এরপর থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেছেন দেশনেত্রী। 

বিএনপি চেয়ারপারসনের দায়িত্বে থাকার পাশাপাশি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছেন খালেদা জিয়া। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর খালেদা জিয়াকে দেওয়া হয় আপসহীন নেত্রীর উপাধি। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন।

বিএনপির চেয়ারপারসন আপসহীন নেত্রী, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ধারক, তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সংসদীয় আসনে একসময়কার বিজয়ী, আপসহীন সংগ্রামে দুটি স্বৈরশাসনকে (’৮২-৯০, ২০০৭-০৮) বিদায় দেওয়ার অসামান্য কৃতিত্বের অধিকারী বেগম খালেদা জিয়া। সময়ের পরিক্রমায় সাধারণ গৃহবধূ থেকে আপসহীন নেত্রী তিনি। যাঁকে বাংলাদেশের মানুষ ‘আপোষহিন নেত্রী’র খেতাব দিয়েছে। কিন্তু কেন তাঁকে এই উপাধী দেয়া হলো তা হয়ত জানে না এখনকার প্রজন্ম। জানার কথাও না। বিগত ১৬ বছরে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিলো বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে জিয়া পরিবারের ভূমিকা মুছে ফেলার। কিন্তু পারেনি, বরং খালেদা জিয়া এখন বিএনপির ঐক্যের প্রতীক থেকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছেন। এক সময়কার চার দেয়ালের মাঝ থেকে বেরিয়ে বিএনপির মত বড় দলের অভিযাত্রায় জেল, জুলুম, চিকিৎসাহীনতা সহ্য করে তিনি আপোষহীন নেত্রীর তকমা পেয়েছেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সৃষ্টি হয় অনিশ্চয়তা। ঠিক এ সময়ই বেগম খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব নেন। বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চার যে পথ সৃষ্টি করেছিলেন জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া সেই পথ ধরেই এগিয়ে নেন বিএনপিকে। তার নেতৃত্বের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় ১৯৯০ সালে পতন হয় স্বৈরশাসক এরশাদের। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিজয়ী হয় এবং তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০০১ সালেও বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

টানা ৪১ বছরেরও বেশি সময় ধরে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকে তার। পাশাপাশি সইতে হয়েছে অচিন্তনীয় অমানবিক নির্যাতন। সশস্ত্র হুমকিতেও দেশ ছেড়ে যাননি শুধু বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার জন্য। কর্মগুণে ও সততায় হয়ে গেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে প্রমাণ করেছেন, ক্ষমতার প্রলোভন বা নিপীড়নের ভয়—কোনোটিই তাকে জনগণের স্বার্থ থেকে সরাতে পারেনি। “আপোষহীন নেত্রী” উপাধি তিনি পেয়েছেন রাজপথে রক্ত, কারাবাস ও অটল অবস্থানের বিনিময়ে।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম জিয়া। তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদে কিছু বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। কর্মসংস্থানের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এই সময় এবং শুধুমাত্র তৈরি পোশাকশিল্প খাতেই পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি ছিল ২৯%। প্রায় দুই লাখ নারী এই সময় তৈরি পোশাকশিল্প খাতে যোগ দিয়েছেন।
তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানি-বণ্টনের সমস্যা উত্থাপন করেন যাতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য অংশ পায়। ১৯৯২ সালে তাকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হলে সেখানে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যা উত্থাপন করেন এবং পরে মিয়ানমার সরকার ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি করে।
স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এ পর্যন্ত তিন দফায় প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন খালেদা জিয়া। ১৯৯৩ সালে তিনি সার্কের প্রথম মহিলা চেয়ারপারসন হন।
১৯৯৬ সালে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর খালেদা জিয়া টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতির কারণে, তিনি এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন। যদিও বিএনপি ১৯৯৬ সালের জুনের নতুন নির্বাচনে হেরে যায়, দলটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে ১১৬টি আসন পায় সেই নির্বাচনে।
বিএনপি ১৯৯৯ বেগম জিয়ার নেতৃত্বে সালে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ঐক্যজোটের সাথে চারদলীয় জোট গঠন করে এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করে। বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হন। ফোর্বস ম্যাগাজিন নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে তার ভূমিকার জন্য ২০০৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তাকে ২৯ নম্বরে স্থান দেয়।২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট নির্বাচনে জয়লাভের পর তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে।
২০০৬ সালে, তিনি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে, তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্বাসনে পাঠানোর একাধিক প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দুর্নীতির তুচ্ছ এবং ভিত্তিহীন অভিযোগে স্বৈরাচারী সরকার গ্রেপ্তার করে।
ক্ষমতায় থাকাকালীন, খালেদা জিয়ার সরকার বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, ছাত্রীদের জন্য একটি শিক্ষা “উপবৃত্তি” এবং শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য খাদ্য প্রবর্তন করে শিক্ষা ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি করেছিল। তার সরকার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করে এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করে।
বেগম জিয়া কোনো আসনেই পরাজিত না হওয়ার অনন্য রেকর্ডের অধিকারী। তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলোতে পাঁচটি পৃথক সংসদীয় আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে, তিনি যে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন সেখানে তিনি জয়লাভ করেছিলেন।
২০০৯ সাল থেকে, যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে, তখন তিনি গণতন্ত্রের জন্য তার লড়াই নতুন করে শুরু করেছিলেন। সরকার তাকে জোরপূর্বক তার বাড়ি থেকে বের করে দেয় এবং গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন শুরু করায় তাকে দুইবার গৃহবন্দী করা হয়ে। গণতন্ত্রের প্রতি তার ভূমিকার জন্য, তাকে ২০১১ সালে নিউ জার্সির স্টেট সিনেট “গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা” উপাধিতে সম্মানিত করে।

পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনার ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়ে মিথ্যা বানোয়াট মামলায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়াকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। শুধুমাত্র আকাশচুম্বী জনপ্রিয়ই বেগম খালেদা জিয়ার অপরাধ।

“ভেবেছিলেন, আপস করবেন? দেশ ছেড়ে পালাবেন? না! ইতিহাস বলে, তিনি আপসহীন। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি জানিয়ে দিলেন — গণতন্ত্রের লড়াইয়ে কারাবাসই যদি হয় তার ভাগ্য, তবে তা তিনি মাথা পেতে নেবেন।”
২০২০ সালের কান্ট্রি রিপোর্টস অন হিউম্যান রাইটস প্র্যাকটিস প্রতিবেদনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় আইন বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে যে, মূলত নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত হিসেবেই তাঁকে সাজা দেয়া হয়েছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে তার “ন্যায্য বিচারের অধিকারকে সম্মান করা হচ্ছে না।”
“আমি কোনো অন্যায় করিনি। আমি জনগণের জন্য রাজনীতি করি। আমার ওপর যে রায় দেয়া হয়েছে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু আমি মাথানত করবো না।
“দেশত্যাগ অথবা কারাগার— আওয়ামী লীগ সরকারের এমন শর্তের সামনে দাঁড়িয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বেছে নিয়েছিলেন কারাগার। বিনা অপরাধে তাকে বন্দি করা হয়। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাস্তবায়ন করতে এক-এগারোর সেনাসমর্থিত সরকারের দায়ের করা মিথ্যা মামলায় ফরমায়েশি রায় ঘোষণা করা হয়।”
“নির্জন কারাগারে একাকী তিন বছর কাটান তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। অসুস্থতা তাকে কাবু করলেও, নত করেনি। তার পরিবারের পক্ষথেকে বিদেশে চিকিৎসার আবেদন বারবার নাকচ করে দেয় ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকার।”
হাসিনার সাজানো মিথ্যা দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হলে ছয় মাসের জন্য সাজা স্থগিত করে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ খালেদা জিয়াকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেয় সরকার। তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন এবং বিদেশে যেতে পারবেন না, এমন শর্তে সাজা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সেই থেকে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। এর মধ্যে কয়েক দফায় লিভার সিরোসিস, হার্টের জটিলতাসহ নানা রোগে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। বর্তমানে মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন নিয়ে যাওয়া হয় বেগম জিয়া কে। দীর্ঘদিন বিনা চিকিৎসার কারনে নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত ১৮ কোটি মানুষের প্রিয় নেত্রী উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনের ডাক্তারদের অধীন চিকিৎসাধীন আছেন।
“২৫ মার্চ ২০২১, সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু এটি ছিল একধরনের গৃহবন্দিত্ব। চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে চাইলেও, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার শর্ত দেয়— রাজনীতি ছাড়তে হবে! কিন্তু আপসহীন বেগম খালেদা জিয়া তাতে রাজি হননি।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন সকাল। ফ্যাসিবাদের পতন চূড়ান্ত হয়। নির্যাতন ও গৃহবন্দিত্বের অবসান ঘটে, মুক্তি পান নিরপরাধ খালেদা জিয়া। গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম দিনেই বাংলাদেশের জনগণ তাদের নেত্রীকে স্বাগত জানায়, ফিরে আসে ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের স্বপ্ন।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ৬ আগস্ট হাসিনার কোর্টের দেওয়া সাজা মওকুফ করেন রাষ্ট্রপতি। তিন বছরের গৃহবন্দিত্ব শেষে মুক্ত হয়ে তিনি ফিরে আসেন জনতার মাঝে, আর বাংলাদেশের রাজপথ ফিরে পায় তার অদম্য নেত্রীকে।
আজ বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনার এক জীবন্ত প্রতীক। ক্ষমতার লোভ, কারাবাস, নির্যাতন—কোনো কিছুই তার রাজনৈতিক বিশ্বাসকে নড়াতে পারেনি। তার এই মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন স্বীকার করে—এদেশে গণতন্ত্রের পথ যতবার বিপন্ন হয়েছে, ততবার তিনি ছিলেন লড়াইয়ের সম্মুখসারিতে।

রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ৩৭ দিন দেশবিদেশের ডাক্তার-নার্সদের নিরলস পরিশ্রম আর দেশবাসী সহ বিশ্বের অগনিত মানুষের দোয়া সব কিছু বিফলে ফেলে ৩০ ডিসেম্বর মহান আল্লাহর ডাকে চলে গেছেন এই দুনিয়ার মায়া চেড়ে । শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের অজস্র সৈনিকের রাজনৈতিক মা, প্রিয় নেত্রী এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ যতোদিন থাকবে ততোদিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে আমাদের মাঝে বেচে থাকবেন অনন্তকাল। তিনি শুধু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণীই নন, বরং নিজ গুণে ও নেতৃত্বে নিজেকে একজন শক্তিশালী ও শ্রদ্ধেয় জাতীয় নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। গণতন্ত্রের জন্য তাঁর সংগ্রাম, আপসহীন মনোভাব এবং দেশপ্রেম ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।

মা, মাটি ও মানুষের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এ দেশের জনগণের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন ও অবিস্মরণীয় এক নেত্রী হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং বিনীত ফরিয়াদ জানাই—মহান আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

কিশোর অপরাধের রাশ টানতে হবে ——-

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

‘কিশোর’ শব্দটি কানে আসলেই একটু আদর, ভালোবাসা-ভালো লাগা, কিছুটা আবেগ কিংবা হৃদ্যতা মনে ভেসে ওঠে। সন্দেহ নেই, বয়সটাও আদুরে। কোমলমতি চেহারাটাকে ভালোবাসতে সবারই মন চায়। কঠোর মানসিকতার মানুষও কিশোর-তরুণ বয়সীদের ভালোবাসে। বয়সটাই এমন।

কিন্তু এখন? কিছু কিছু কিশোরের অসংলগ্ন আচরণের কারণে মানুষের স্মৃতিপটে এখন সে ধরনের সহানুভূতি কমই জেগে উঠছে। এর সংগত কারণও আছে। এতসব কারণ এখন সময়, অবস্থা, প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি—সামগ্রিক দৃশ্যপট বিবেচনায় কিশোর অপরাধের বিষয়টি এখন কঠিন বাস্তবতা। প্রতিনিয়ত এ বাস্তবতা কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। আগামীতে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে কিনা কিংবা আদৌ সম্ভব কিনা তাও বলা যাচ্ছে না।

দুই। নিকট অতীতেও সন্ধ্যার পর কিশোর বয়সী কেউ বাসার বাইরে থাকত না। বলা যায়, পরিবার থেকে এমন অনুমতি ছিল না। অনেকটা নিষিদ্ধই ছিল। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকাটা কোনো মতেই অনুমতি ছিল না। কেউ কখনো কোনো কারণে যদি সন্ধ্যার পর বাইরে থেকে যেত, তখন তার ওপর অলিখিত ‘১৪৪ ধারা’ জারি হয়ে যেত। পুরো বুক ধুকধুক নিয়েই তাকে ঘরে ফিরতে হতো। প্রতিনিয়ত শঙ্কায়ই থাকতে হতো। মনে মনে ভাবত—‘জানি না আজ কী হবে। কোন ঝড়ো হাওয়া বইবে আমার ওপর।’ এমন কঠোর ও কঠিন মনোভাব নিয়ে বাসায় ফিরতে হতো। তদুপরি বাসায় ফিরেই কঠোর জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হতো। রীতিমতো আদালতের জবানবন্দি দেওয়া বা জেরার মতোই অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে কখনো বেত্রাঘাত, কখনো হুমকি-ধামকিসহ নানা শাস্তির সম্মুখীন হতে হতো।

কিন্তু এখন? এখন তো প্রায়ই সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা। আগের এসব দৃশ্য, পরিস্থিতি কিংবা শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার মতো কোনো অবস্থাই এখন আর অবশিষ্ট আছে কিনা সন্দেহ। ফলে পরিবার ও সমাজে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সন্ধ্যার পর একজন কিশোর বা শিক্ষার্থীর কাজ কী? সন্ধ্যার পর তো ক্লাস বা কোচিং থাকার কথা নয়। তাহলে কেন একজন কিশোর বা শিক্ষার্থী সন্ধ্যার পর বাসার বাইরে থাকবে? অভিভাবকই বা কেন তাদের সন্তানদের সন্ধ্যার পর বাইরে থাকার অনুমতি দেবেন? এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন এবং সতর্ক হওয়া জরুরি।

প্রতিদিন সন্ধ্যার পর চট্টগ্রাম শহরের জামাল খান মোড়, কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়াম এলাকা, চেরাগি পাহাড় মোড়, জিইসি মোড়, বিবিরহাট
বশর মার্কেট,গ্রীন ভিউ, সুন্নিয়া মাদ্রাসার মাঠ সংলগ্ন” রেললাইনের উত্তর- দক্ষিণ, এশিয়া ফ্যান ফ্যাক্টরি পূর্ব পাশে, মুরাদ পুর, চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্সের পূর্ব পাশের সড়ক এবং দক্ষিণ পাশের সড়ক, ষোল শহর,
দুই নাম্বার গেট বিপ্লব উদ্যান ও এর আশেপাশের এলাকা সহ- বিভিন্ন অভিজাত বিপণিবিতানের চত্বরে কিশোর-তরুণদের সরব উপস্থিতি অনেক প্রশ্নেরই উদ্রেক করে। হয়তো কোনো সচেতন অভিভাবক চোখ-কান খোলা রেখে এসব এলাকায় একটু সময় ব্যয় করলে বাস্তব ও কঠিন অবস্থা অবলোকন করার সুযোগ হবে। তবে এমনটি মোটেও নয় যে, এসব স্থানে সব কিশোর-তরুণের উপস্থিতি অপরাধের সঙ্গে জড়িত। অতএব এখনো সময় আছে সতর্ক, সচেতন, কঠোর ও সাবধান হওয়ার।

তিন। কিশোর-তরুণরা অপরাধে জড়াচ্ছে কেন? বিষয়টি আসলেই একটি গবেষণার। তবে এর অনেক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সর্বসাকুল্যে কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ বলা যায়। এর মধ্যে আছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের ঘাটতি, সমকালীন প্রেক্ষাপটে পারিবারিক অনুশাসন কমে যাওয়া, বন্ধু নির্বাচনে অপরিণামদর্শিতা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ কমে যাওয়া, উন্নত প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্টতা ও অনুকরণ, সুষ্ঠু ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা না হওয়া, ক্রমাগত হারে খেলার মাঠ কমে যাওয়া, সামাজিকভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন না থাকা, প্রতিনিয়ত সাইবার জগতে ডুবে থাকা এবং সেখান থেকে যা শিখছে তা প্রয়োগ করতে গিয়ে বিপথগামী হওয়া।

তাছাড়া ভিন্ন একটি চিত্রও আছে। অনেক পরিবারে দেখা যায় বাবা-মা দুজনই চাকরিজীবী। ফলে সন্তানের প্রতি তাদের সচেতনতা থাকার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা হচ্ছে না। এতে করে সন্তানরা সহজেই বিপথগামী হয়ে উঠছে।

তবে একটি বিষয় খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার মাধ্যমে প্রচুর টাকার মালিক হচ্ছে অনেকে। ফলে এসব পরিবারের সন্তানরা ছোটবেলা থেকেই অর্থের প্রতি প্রলুব্ধ হচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই সহজে তাদের হাতে চলে আসছে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অর্থ। সেই অর্থ কেউ কেউ খরচ করছে নানা অপকর্মে। মিশছে অপরাধচক্রের সঙ্গে।

চার। কিশোর অপরাধ প্রবণতার নতুন সংস্করণ হলো ‘কিশোর গ্যাং’। সাধারণত কিশোর গ্যাং বলতে বোঝায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা কয়েকজনের একটি গ্রুপ বা অভিন্ন কোনো স্বার্থকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দল। মূলত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়েই গড়ে উঠছে এ ধরনের গ্যাং বা গ্রুপ। স্কুল-কলেজের কিছু ছাত্র আড্ডা দিতে দিতে গড়ে ওঠে ছোট ছোট গ্রুপ। একসঙ্গে ঘোরাঘুরি, চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় পরস্পর বন্ধুত্ব। পরে ক্ষমতা, সিনিয়র-জুনিয়র, আধিপত্য, নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হয় দ্বন্দ্ব। বন্ধুত্বের রূপ নেয় হিংস্র ও সহিংসতায়। ঘটায় ছোটখাটো সন্ত্রাস, ছিনতাইয়ের ঘটনা। এই কিশোররা ড্রাগ, খুন, ইভটিজিং, ছিনতাই, মাদকসেবন, চুরি এমনকি ধর্ষণের মতো ভয়ংকর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে। বলা যায় যে আমাদের দেশে প্রথম, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর উত্তরায় কিশোর আদনান হত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি প্রকাশ পায়। এরপর থেকে শুরু হয় কিশোর গ্যাংয়ের নানা অপকর্ম।

পাঁচ। কিশোর অপরাধের কারণে পরিবার ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। মা-বাবা প্রতিনিয়তই চিন্তিত থাকেন সন্তানদের নিয়ে। কখন কোন দুঃসংবাদ কানে বাজে। একজন বিপথগামী কিশোরের জন্য একটি পরিবার যারপরনাই শঙ্কিত থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি একটি পরিবারের জন্য হয়ে ওঠে চরম অভিশাপ। কিন্তু এমন আতঙ্কিত সময় পার আর কত?

ঘটনা তো ঘটছে বা ঘটবে একদিন। সেই একটি ঘটনাই অনেক কিছু এলোমেলো করে দেওয়ার মতো। প্রশ্ন উঠতে পারে, আজকের সময় কাটানোর উপায় না থাকলে কিশোর-তরুণদের সময় কাটানোর দোষের কী আছে? এমন প্রশ্নও আসতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটা সময় কাটানোর নয়, গুরুত্বপূর্ণ এবং মুখ্য বিষয় হলো, সময়টা কখন, কোথায়, কার সঙ্গে এবং কী করে কাটানো হচ্ছে, সেটাই বিবেচ্য।

আজকের একটি সময় কাটানোর বিষয়টাও একজন কিশোরের আগামী জীবনের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। অতএব এখনো সময় আছে সতর্ক, সচেতন, কঠোর ও সাবধান হওয়ার।

এর জন্য প্রয়োজন পরিবারের কর্তব্যবোধ, অভিভাবক, সমাজ এবং দায়িত্বশীলদের সতর্ক ও সচেতনতা। কিশোর-তরুণদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ। কিশোরদের সামাজিক-পরিবারিক সহযোগিতা প্রদান। সুস্থ-সুন্দর সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ দেওয়া। খেলাধুলা, মননশীল ও শৈল্পিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহী করে তোলা। পাঠ্যবই ও বাহ্যিক জ্ঞান আহরণের সুযোগ করা। নৈতিকতা ও মানবিক জ্ঞান আহরণে তৎপর হওয়া। তবেই কিশোর-তরুণ হবে বিপদমুক্ত। সমাজ হবে জ্ঞাননির্ভর। দেশ পাবে মেধাবী সন্তান।

প্রয়াত জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর জন্মদিন আজ

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর রাজনৈতিক ইতিহাস, জনসেবা ও উন্নয়নচর্চার আলোচনায় যে নামটি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তিনি আলহাজ্ব জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। সাবেক বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজের কর্মময় জীবনের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুধু দলীয় কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না; বাঁশখালীর মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, এলাকার উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয়ও ছিল তাঁর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আজ ১৪ অক্টোবর, তাঁর জন্মদিন। এ উপলক্ষে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন প্রয়াত রাজনীতিবিদকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং তাঁর রাজনৈতিক জীবন, জনসম্পৃক্ততা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার যে প্রত্যাশা তিনি রেখে গেছেন, তা নতুন করে মূল্যায়ন করা। তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করে ছেলে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার প্রচেষ্টাও সেই উত্তরাধিকারের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

জন্ম, শিক্ষা ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ
——————————

আলহাজ্ব জাফরুল ইসলাম চৌধুরী ১৯৫০ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে পরবর্তী সময়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে অনুপ্রাণিত করে। তিনি বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক (বি.কম) ডিগ্রি অর্জন করেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিকশিত হয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, দলীয় কর্মসূচি ও নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত তাঁর পরিচিতি বিস্তৃত হয়।

একজন রাজনীতিবিদের মূল্যায়ন কেবল তাঁর পদ-পদবি দিয়ে সম্পন্ন হয় না; মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, এলাকার সমস্যা নিয়ে তাঁর অবস্থান এবং জনস্বার্থে তাঁর ভূমিকার মধ্য দিয়েও সেই মূল্যায়ন গড়ে ওঠে। জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনকে ঘিরেও বাঁশখালীর মানুষের স্মৃতি, প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।

### সংসদ সদস্য থেকে প্রতিমন্ত্রী: জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা

জাফরুল ইসলাম চৌধুরী বাঁশখালীর সংসদীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। তিনি চট্টগ্রাম-১৬ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে স্থানীয় উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং জনসেবামূলক বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর ভূমিকা আলোচিত হয়েছে।

২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর তিনি বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে জাতীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি।

বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল দেশের বনসম্পদ সংরক্ষণ, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালা বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি স্থানীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়েও পরিচিতি অর্জন করেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা—দুটিই ইতিহাসের অংশ। তবে দীর্ঘ সময় ধরে সংসদীয় রাজনীতি ও মন্ত্রিসভার দায়িত্বে থাকা তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পরিধি এবং জাতীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার গুরুত্বকে তুলে ধরে।

### চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপিতে সাংগঠনিক নেতৃত্ব

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতেও জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের বিভিন্ন দায়িত্বে থেকে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন।

রাজনৈতিক সংগঠনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের বিকাশ এবং দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নিজের সাংগঠনিক অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেন।

রাজনীতিতে মতপার্থক্য, প্রতিকূলতা ও পরিবর্তন থাকবেই। কিন্তু একজন নেতার সাংগঠনিক উত্তরাধিকার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে কাজ করা নেতাকর্মীদের অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক সহকর্মীদের স্মৃতিচারণ এবং এলাকার মানুষের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাফরুল ইসলাম চৌধুরীকে ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যে স্মৃতি ও আলোচনা রয়েছে, তার যথাযথ মূল্যায়নও সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ।

### বাঁশখালীর উন্নয়ন ও জনসেবার প্রত্যাশা

বাঁশখালী একটি বিস্তৃত উপকূলীয় উপজেলা। এখানে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, কৃষি ও মৎস্য খাতের বিকাশ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়ন দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

এ ধরনের এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেওয়া নয়; বরং মানুষের বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করা, উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি তদারক করা এবং সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে ভূমিকা রাখা। জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনও বাঁশখালীর উন্নয়ন ও জনসেবার আলোচনায় স্মরণ করা হয়।

তাঁর সময়ে এলাকার বিভিন্ন অবকাঠামো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নিয়ে যে আলোচনা রয়েছে, সেগুলো নির্দিষ্ট প্রকল্প, সরকারি নথি এবং স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতার আলোকে আরও বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এতে তাঁর উন্নয়ন-অবদানের একটি তথ্যভিত্তিক চিত্র তৈরি হবে।

তবে বাঁশখালীর উন্নয়নের ইতিহাস কোনো একজন ব্যক্তির একক প্রচেষ্টায় সীমাবদ্ধ নয়। জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন, সরকারি দপ্তর, শিক্ষাবিদ, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্য দিয়েই একটি জনপদ এগিয়ে যায়। এই বাস্তবতা স্বীকার করেই জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর অবদানকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

### পিতার আদর্শ অনুসরণে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পার পথচলা

প্রয়াত জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করার ক্ষেত্রে তাঁর ছেলে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পার নামও আলোচনায় রয়েছে। পিতার রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করে তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি বাঁশখালীর মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন।

রাজনীতিতে পারিবারিক পরিচয় একজন ব্যক্তির পথচলার সূচনা সহজ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন নিজস্ব যোগ্যতা, সততা, দায়িত্ববোধ ও ধারাবাহিক জনসম্পৃক্ততা। পিতার পরিচয়কে সম্মানের সঙ্গে ধারণ করার পাশাপাশি নিজের কাজের মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করাই তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বাঁশখালীর মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, স্থানীয় সমস্যার সমাধান, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় সহায়তা এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির মতো বিষয়গুলোতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারলে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা আরও অর্থবহ হতে পারে।

বিশেষ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ি ঢল কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো উপকূলীয় জনপদের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগের সময় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয় এবং পুনর্বাসন সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানেও উদ্যোগ প্রয়োজন। দিন-রাত মানুষের কল্যাণে কাজ করার প্রত্যয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও এসব কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন তাই শুধু তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং মাঠপর্যায়ে তাঁর কাজ, মানুষের পাশে থাকার ধারাবাহিকতা এবং জনস্বার্থে গৃহীত উদ্যোগের ভিত্তিতে হওয়াই প্রত্যাশিত।

### মানুষের কাছে থাকার রাজনীতিই হোক উত্তরাধিকার

বাঁশখালীর মানুষের প্রত্যাশা অনেক। কোথাও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন, কোথাও স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো জরুরি, আবার কোথাও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনই সবচেয়ে বড় চাহিদা। এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, জনসম্পৃক্ততা এবং জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব।

জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হতে পারে মানুষের এসব প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও জনসম্পৃক্ততার ইতিবাচক দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের রাজনীতিকদের এগিয়ে যেতে হবে। ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এলাকার মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে সেই শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন।

একজন জননেতার প্রকৃত উত্তরাধিকার শুধু তাঁর পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী, অনুসারী, সামাজিক পরিমণ্ডল এবং যে জনপদের মানুষের সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার মধ্যে।

### চিরবিদায়ের পরও স্মৃতিতে অমলিন

২০২২ সালের ৮ নভেম্বর ৭২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন আলহাজ্ব জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে শোকের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অর্জিত পরিচিতি এবং বাঁশখালীর রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান তাঁকে স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্রে পরিণত করেছে।

মানুষের জীবন একদিন শেষ হয়, কিন্তু তাঁর কাজ, সিদ্ধান্ত, সম্পর্ক ও স্মৃতি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নানা প্রশ্ন ও শিক্ষা রেখে যায়। জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর জীবনও সেই অর্থে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তাঁর অবদান যেমন স্মরণ করা প্রয়োজন, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক সময়ের বাস্তবতা ও এলাকার উন্নয়নে বিভিন্ন পক্ষের সম্মিলিত ভূমিকার তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নও জরুরি।

আজ তাঁর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এই প্রবীণ রাজনীতিবিদকে। তাঁর ছেলে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পাসহ পরবর্তী প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানুষের কল্যাণ, সততা, সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীলতার পথ অনুসরণ করুক—এটাই প্রত্যাশা।

বাঁশখালীর মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, দুর্যোগে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যার কার্যকর সমাধানে যাঁরা কাজ করবেন, তাঁদের মধ্য দিয়েই জনসেবার এই ধারাবাহিকতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

পরিশেষে, মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা—তিনি যেন মরহুম আলহাজ্ব জাফরুল ইসলাম চৌধুরীকে ক্ষমা করেন, তাঁর নেক আমলগুলো কবুল করেন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। আমিন।

আলোচিত খবর

১২ লাখ ৭০ হাজার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ আগামীকাল

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল আগামীকাল শনিবার প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সারা দেশের ১২ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটছে।আগামীকাল সকাল ১১টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ফলাফল ঘোষণা করা হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ফল প্রকাশ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।


অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের সচিব, সকল বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।
উদ্বোধনের পরপরই পরীক্ষার্থীরা একযোগে নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নির্ধারিত ওয়েবসাইট এবং এসএমএসের মাধ্যমে তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল জানতে পারবেন। অনলাইনে https://eduboardresults.gov.bd I https://educationboardresults.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে ফল জানা যাবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ