
রাজধানীর ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে Human Rights Congress for Bangladesh Minorities (HRCBM) দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের কনভেনর অ্যাডভোকেট লাকী বাছাড়। এসময় উপস্থিত ছিলেন কো-অর্ডিনেটর আশিষ কুমার অঞ্জন, ট্রেজারার বিদ্যুৎ কুমার রায়, রংপুর বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর দেবী চরণ রায়, আইটি সেক্রেটারি জীবন কুমার, মৌলভীবাজার জেলা কো-অর্ডিনেটর সৃজন দাস, হিউম্যান রাইটস অ্যাসিস্ট্যান্ট রাজ চাকমা, টুকু বাছাড়, সমীর চন্দ্র মিস্ত্রী, অবজারভার আনন্দ রায়সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

২০২৫-২৬ সালে ৭২৭টি নির্যাতনের অভিযোগ
লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, ২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগঠনের প্রতিনিধিদের তথ্য ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মোট ৪৯৪টি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরও ২৩৩টি ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে।

সংগঠনের তথ্যমতে, চলতি সময়ে—৪৪ জন সংখ্যালঘু ব্যক্তি হত্যা বা রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন,৩০ জন অপহরণ বা নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের অধিকাংশ তরুণ-তরুণী,৮ জন সংখ্যালঘু নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন (নথিভুক্ত),এছাড়া জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, মন্দিরের জমি দখল, প্রতিমা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মিথ্যা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মব সৃষ্টিসহ বিভিন্ন সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে।সংগঠনটি দাবি করে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
মানিকগঞ্জে নাবালিকা উদ্ধারে উদ্বেগ:
সংবাদ সম্মেলনে মানিকগঞ্জে অপহৃত এক ১৫ বছর বয়সী সংখ্যালঘু কিশোরীর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। HRCBM দাবি করে, আদালতের প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাযথভাবে পর্যালোচনা না করেই নাবালিকাকে জিম্মায় পাঠানো হয়েছে, যা আইনগত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ভোলায় বাকপ্রতিবন্ধী নারী ধর্ষণের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে সর্বশেষ আলোচিত হয় তজুমদ্দিন উপজেলা-এ এক বাকপ্রতিবন্ধী হিন্দু নারীর গণধর্ষণের অভিযোগ। সংগঠনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২২ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে কীর্তন শেষে বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তাকে অচেতনকারী পদার্থ খাইয়ে নির্যাতন করে।ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং ভুক্তভোগীর চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানায় HRCBM।
নির্বাচনের পর নির্যাতন বৃদ্ধির অভিযোগ:
সংগঠনটি দাবি করে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের প্রবণতা বেড়েছে। এবারের জাতীয় নির্বাচনে চারজন সংখ্যালঘু প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তা জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে খুবই নগণ্য বলে মন্তব্য করেন সংগঠনের নেতারা। তারা সংখ্যালঘুদের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রতি নিজ নিজ এলাকায় হটলাইন চালু ও নির্যাতনের ঘটনায় সরাসরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান।
পাঁচ দফা দাবী:
সংবাদ সম্মেলন থেকে সংগঠনটি পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করে—১. প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা।২. দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।৩. সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা জোরদার।৪. মিথ্যা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ও মব সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ।৫. সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষে অ্যাডভোকেট লাকী বাছাড় বলেন, “আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ চাই—যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে কেউ নির্যাতিত হবে না এবং আইনের শাসন নিশ্চিত থাকবে।”সংগঠনটি সরকারের প্রতি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানায়।