
চট্টগ্রামে বিভিন্ন উপজেলায় তীব্র ভাঙনে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলের পানি নামতে শুরু করার সাথে এলাকাগুলোতে ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হঠাৎ শুরু হওয়া এই নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন নদীপাড়ের শত শত মানুষ। স্থানীয়দের দাবি, আকস্মিক এই দুর্যোগে ওই এলাকায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পানি নামার সঙ্গে ভাঙনে কেড়ে নিচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও নদী-খালের তীরবর্তী জনপদ। প্রথমদফায় বন্যার ভাঙনের পর এবার দ্বিতীয়ধাপে সৃষ্ট ভাঙনে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রাথমিক হিসাব বলছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ২৬৯ স্থানে বেশি ভাঙন ধরেছে। প্রায় সবমিলে ২২ দশমিক ১০৭ কিলোমিটার এলাকা ভেঙেছে। জরুরিভিত্তিতে এসব ভাঙন সংস্কার ও মেরামতের জন্য ১৫১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা প্রয়োজন বলে জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, কর্ণফুলী, হালদা, ইছামতি, সাঙ্গু, শিলক ও বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন সৃষ্টি হয়। সরেজমিন দেখা যায়, বাঁশখালীতে ভাঙন বেশি হয়েছে। উপজেলার সরল, বাহারছড়া, কাথারিয়া, শেখেরখীল, চাম্বল, সাধনপুর, শীলকূপ, ছনুয়া ও গণ্ডামারা-এসব উপকূলীয় এলাকা বন্যায় তীব্র ভাঙন ধরেছে। সাঙ্গু, জলকদর খাল, সোনাইছড়ি খাল, সরকার খাল, রাজাখালসহ বিভিন্ন খালের ভাঙন তীব্র হয়েছে। সাতকানিয়ার সাঙ্গু, ডলু নদী ও কাটাখালী খালের ভাঙনে বাজালিয়া ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া, বাংলাবাজার, আধুনগর পূর্বপাড়া, আমিলাইশ ইউনিয়ন এবং লোহাগাড়া উপজেলার সরদানীপাড়া, আধুনগরের পূর্বপাড়া, কলাউজানের আঁধারচর আবদুস ছালাম বাড়ি, আমিরাবাদ ইউনিয়ন, উত্তর পদুয়ার সওদাগর পাড়া, চরম্বা ইউনিয়নের তেলিবিলা গ্রামের বিভিন্ন স্থানে নদী ও খালের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। হালদা নদী ও ধুরং খালের নাজিরহাট পৌরসভার বিভিন্ন স্থানে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। পটিয়া উপজেলার চান্দখালী, হারগাজী ও খরণা খালের ভাঙন ধরেছে। ধলঘাট, আশিয়া, শোভনদন্ডী, কচুয়াই, কোলাগাঁও ইউনিয়নের বিভিন্ন পয়েন্টে নদী-খালের ভাঙন দেখা দেয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। বিশেষ করে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ উপজেলাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত পানির তোড়ে এসব এলাকার জনপদের বেড়িবাঁধ ও তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেই বিষয়ে পাউবো প্রাথমিক প্রস্তুতি আগ থেকে ছিল। ভাঙন প্রতিরোধে জরুরিভিত্তিতে কাজ করা হবে বলে জানান প্রধান প্রকৌশলী।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) খ ম জুলফিকার তারেক বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় বিভিন্ন স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও নদী-খালের তীর ভেঙে গেছে। পানি নামার সঙ্গে নতুন করে ফের ভাঙন ধরেছে। ভাঙনের বিষয়টি মাথায় রেখে আগ থেকে পরিকল্পনা ছিল। তীব্র ভাঙন এলাকায় জরুরিভিত্তিতে ভাঙনরোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এবারের বন্যায় কর্ণফুলী, সাঙ্গু, হালদা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়। সরকারি হিসাবে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দী ছিল।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পওর-১) নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহিদ বলেন, বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এগুলোর কাজ করে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। এছাড়া ভাঙনের পয়েন্টও বেশি। তাই বেশি ভাঙনপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে জরুরিভাবে কাজ শুরু করা হবে।
প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, কিছু এলাকায় বেশি ভেঙেছে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। অত্যাধিক ভাঙন এলাকার জন্য নতুন করে প্রকল্প নেওয়া হবে। এবারের বন্যা ভয়াবহ রূপ নেয় বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলায়। চন্দনাইশ, লোহাগাড়া এলাকায় বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া জেলার সবকটি উপজেলায় নদী ও খালের ভাঙনে বিভিন্ন জনপদে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড রাঙামাটি বিভাগের অধীনে কর্ণফুলী, ইছামতি, শিলক, কাপ্তাই হৃদ, সত্তাখাল, ডাবুয়া খাল, বোয়ালখালী খাল-রায়খালী খালসহ বিভিন্ন খালের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। ১০২টি স্থানে ভাঙনের প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই বিভাগ। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এসব স্থানের ৮ দশমিক ৫৩০ কিলোমিটার এলাকা ভেঙেছে। তা মেরামতের জন্য ৪২ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে জানান নির্বাহী প্রকৌশলী।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পওর-১) এর আওতায় বিভিন্ন উপজেলায় ৭৪ পয়েন্টে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব স্থানের ৬ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার এলাকা ভেঙেছে। তা মেরামতের জন্য ২৩ কোটি টাকার প্রয়োজন বলে জানান নির্বাহী প্রকৌশলী।একইভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পওর-২) এর আওতায় বিভিন্ন উপজেলায় ৯৩ পয়েন্টে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব স্থানের ৬ দশমিক ৯৬ কিলোমিটার এলাকা ভেঙেছে। তা মেরামতের জন্য ৮৭ কোটি টাকার প্রয়োজন বলে জানান নির্বাহী প্রকৌশলী।