

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সাহসী সাংবাদিকতার যুগনায়ক, নির্ভীক-নির্লোভ সম্পাদক-সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মইনুদ্দীন কাদেরী শওকতের ৭২তম জন্মবার্ষিকী ১০ জুন ২০২৬, বুধবার।
সম্পাদক, সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত ১৯৬৯ সালে সাংবাদিকতায় এবং ১৯৬৪ সালে সার্বজনীন ভোটাধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। তিনি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পূর্বে তিনি বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রতিষ্ঠিত এবং ভাষা আন্দোলনের নেতা অলি আহাদ সম্পাদিত ‘ইত্তেহাদ’-এর বিশেষ সংবাদদাতা, ডেইলি ট্রিবিউনের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি এবং দৈনিক নয়াবাংলার সহ-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১৭ আগস্ট তাঁর সম্পাদনায় চট্টগ্রাম থেকে ‘ইজতিহাদ’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রকাশনার কয়েক মাস পর তৎকালীন এরশাদ সরকার পত্রিকাটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে হাইকোর্টে রিট আবেদনের মাধ্যমে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত চট্টগ্রাম সংবাদপত্র পরিষদ ও চিটাগাং এডিটরস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক, পূর্বাঞ্চলীয় সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি, বাংলাদেশ সম্পাদক সমিতির আহ্বায়ক এবং ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব প্রেস কাউন্সিলস (ডব্লিউএপিসি)-এর নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন।
তিনি বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের প্রেস জুডিশিয়াল ও প্রেস রুলস কমিটির সদস্য (২০০২-২০০৬), বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদের সহ-সভাপতি (২০০২-২০০৩), বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান (১৯৮৮-১৯৯১), চট্টগ্রাম সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি (১৯৮০-১৯৮৪), চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের নির্বাচন কমিশনার (১৯৮৭-১৯৯১), সাংস্কৃতিক সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক (১৯৭৯-১৯৮৪), বুদ্ধিজীবী স্মৃতি সংসদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক (১৯৮৭-১৯৯১), গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা কমিটির সদস্য (১৯৯০-১৯৯১), জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতির কাউন্সিলর (১৯৮৩), গণতান্ত্রিক মুক্তিযোদ্ধা ফোরামের কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান (১৯৯৯-২০০১), চট্টগ্রাম সাংবাদিক কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান (২০০৫) এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান (২০১৪-২০১৭) ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি হাটহাজারী-ফটিকছড়ি আঞ্চলিক মুক্তিবাহিনী (বিএলএফ)-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া হাটহাজারী-ফটিকছড়ি হুকুমদখল জমি উদ্ধার কমিটির সাধারণ সম্পাদক (১৯৭৯-১৯৮৪), ফেডারেশন অব ইয়ুথের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল (১৯৭৬-১৯৭৯) এবং জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক (১৯৮১-১৯৮৩) ছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধা-সম্পাদক মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) আয়োজিত ১৯৯৩ সালের Training Seminar for Editors of Community Newspapers এবং ১৯৯৫ সালের Editors’ Colloquium on Investigative Reporting-এ অংশগ্রহণ করেন।
তিনি চিটাগাং ইউনিভার্সিটি ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম সরকারি বাণিজ্য কলেজ প্রাক্তন ছাত্র সমিতি, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটির সদস্য এবং চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির আজীবন সদস্য। গত পাঁচ দশক ধরে তিনি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য।
১৯৯৬ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক হিসেবে এবং ২০০৬ সালের ১০ অক্টোবর কৃতী সাংবাদিক হিসেবে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব তাঁকে সংবর্ধনা প্রদান করে। তিনি সিনিয়র জার্নালিস্ট ফোরামের আহ্বায়ক এবং কল্পলোক মিডিয়া টাওয়ার সাংবাদিক ফ্ল্যাট মালিক স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ২০১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর তাঁকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সংবর্ধনা প্রদান করে। একই বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম একুশে উৎসব পরিষদ সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তাঁকে একুশে সম্মাননা পদক প্রদান করে। এছাড়া ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ইউনিটি সাহসী সাংবাদিকতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সম্মাননা দেয়।
ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব প্রেস কাউন্সিলসের নির্বাহী সদস্য হিসেবে তিনি ২০০৪ সালের তানজানিয়া ঘোষণা এবং ২০০৬ সালের ইস্তাম্বুল ঘোষণার অন্যতম স্বাক্ষরকারী ছিলেন। ভারতের জাতীয় প্রেস ডে উপলক্ষে প্রেস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া প্রকাশিত স্মারকে ২০০৬ ও ২০০৭ সালে তাঁর দুটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়— Press Freedom: A Continuing Struggle এবং Freedom of the Press is a Fundamental Right।
২০০৭-২০০৮ সালে ডব্লিউএপিসির কান্ট্রি রিপোর্টের মধ্যে তাঁর রিপোর্ট শ্রেষ্ঠ রিপোর্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০০৪ সালের ২৪-২৬ অক্টোবর তানজানিয়ার দার-উস-সালেমে অনুষ্ঠিত ডব্লিউএপিসির নবম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাঁর রিপোর্ট অন্যতম সেরা রিপোর্ট হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং তিনি ১১ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া ২০০৬ সালে ইস্তাম্বুলে গঠিত ডব্লিউএপিসির সংবিধান কমিটির সদস্য ছিলেন। তাঁর রিপোর্ট ২০০৯ সালে ইস্তাম্বুল এবং ২০১০ সালে সাইপ্রাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ অ্যাসেম্বলিতেও প্রশংসিত হয়।
২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে কারারুদ্ধ করা হলে তাঁর প্রতিবাদে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত। ২০২৩ সালের ৩ জুন বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক সংস্থা তাঁকে সাহসী সাংবাদিকতার জন্য ‘তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া স্মৃতি পদক’ প্রদান করে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের পর ৬ আগস্ট চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক-সম্পাদক ও ছাত্র-জনতার সমাবেশে তাঁকে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এছাড়া তিনি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব, বাংলাদেশ এডিটরস ফোরাম, চট্টগ্রাম এডিটরস ক্লাব, চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ইউনিটি, সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ, চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম সাংবাদিক পরিষদ, ক্রাইম রিপোর্টার্স সোসাইটি, চট্টগ্রাম সাংবাদিক সংস্থা, বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক সংস্থা এবং জাতীয়তাবাদী সাংবাদিক ফোরামসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
মরহুমা আনোয়ারা বেগম এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ বৃহত্তর চট্টগ্রাম শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি (১৯৪৯), নিখিল ভারত মুসলিম লীগ চট্টগ্রাম শাখার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক (১৯২৪) ও চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির প্রথম মুসলিম সভাপতি মরহুম আবদুল লতিফ উকিলের কনিষ্ঠ পুত্র মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত।
তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নিউরোসার্জন ও বিএমএ-এর সাবেক সভাপতি মরহুম অধ্যাপক ডা. এল. এ. কাদেরীর ছোট ভাই এবং হযরত মাওলানা নুর আহমদ আল কাদেরী (রহ.)-এর দৌহিত্র।
তাঁর স্ত্রী শেখ আফসানা কাদেরী ‘ইজতিহাদ’ পত্রিকার সাবেক ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। একমাত্র পুত্র শিহাব কাদেরী ‘ইজতিহাদ’-এর সহযোগী সম্পাদক এবং একমাত্র কন্যা সামিনা কাদেরী। তিনি ১৯৯৬ সালে পবিত্র হজব্রত পালন করেন।
সংগৃহীত –