
আলেমদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার, সাদপন্থিদের টঙ্গীর ইজতেমা আয়োজনের অনুমতি না দেওয়া, হিজবুত তাওহীদ নিষিদ্ধ এবং ধর্ম অবমাননার সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়নসহ নয় দফা দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ঐতিহাসিক আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া বাবুনগর মাদ্রাসায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের মতবিনিময় সভায় লিখিতভাবে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মুহাম্মাদ সাজেদুর রহমান স্বাক্ষরিত দাবিপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
হেফাজতের দাবির মধ্যে মহান আল্লাহ, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাসের দাবি রয়েছে। একই সঙ্গে কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন প্রণয়ন না করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনায় জড়িতদের বিচার, ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছে হেফাজত।
কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করে শিক্ষার্থীদের দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে। সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে ধর্মীয় শিক্ষক পদে সরকারি মাদ্রাসার ডিগ্রির পাশাপাশি দাওরায়ে হাদিসের ডিগ্রিকেও শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করার দাবি করেছে সংগঠনটি।
প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা ও হিজবুত তাওহীদ নিষিদ্ধ করার দাবিও জানিয়েছে হেফাজত।
পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের কথিত ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধ এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আলেমদের বিরুদ্ধে করা ‘মিথ্যা’ মামলা প্রত্যাহার করে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে আলেম-ওলামাদের অংশীদার করার দাবিও রয়েছে।
তাবলিগ জামাত ও বিশ্ব ইজতেমা প্রসঙ্গে হেফাজতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভারতের মাওলানা সাদের বাংলাদেশে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থিদের ইজতেমা আয়োজনের অনুমতি না দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে।
হেফাজতের ৯ দফা দাবি
১. মহান আল্লাহ, রাসুল (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস।
২. কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন প্রণয়ন না করা।
৩. ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা।
৪. দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করে কওমি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করা।
৫. প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
৬. কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা এবং হিজবুত তাওহীদ নিষিদ্ধ করা।
৭. পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের কথিত ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধ করা।
৮. আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আলেমদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে আলেম-ওলামাদের অংশীদার করা।
৯. মাওলানা সাদের বাংলাদেশে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থিদের ইজতেমা আয়োজনের অনুমতি না দেওয়া।
বাবুনগর মাদ্রাসায় প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময়
রোববার বিকেল ৪টায় বাবুনগর মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময় সভা শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৭০ জন বিশিষ্ট আলেম এতে অংশ নেন।সভায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও উত্তর চট্টগ্রামের সংসদ সদস্যরা।
এর আগে বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে হেলিকপ্টারে ফটিকছড়িতে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি হেফাজত আমিরের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। পরে শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।
মতবিনিময়ের আগে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দনপত্র দেওয়া হয়। এতে ফটিকছড়ি ও বাবুনগর মাদ্রাসার ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করা হয়।